বৃহস্পতিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০২০

# বিষয় - 'হিন্দুধর্ম'

নাম - 'হিন্দু-হিন্দুত্ব এবং বিবর্তন'
   ✍  মৃদুল কুমার দাস।
           ( ৪র্থ পর্ব )
   শুরুটা মহাভারত দিয়েই করা যাক। মহাভারতের পরিচয় কি নয়! ধর্মশাস্ত্র, মোক্ষ শাস্ত্র, ইতিহাস,সংহিতা। এমনকি পঞ্চম বেদ। কোথাও মহাকাব্য বলা হয়নি। মহাকাব্য বলা হয় প্রশস্তিসূচক সম্মানার্থে। পঞ্চম বেদ কেন বলার আগে মহাভারতের পরিচয়টা আগে জানা যাক।
মহাভারত রচিত হয় খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম বা চতুর্থ শতক থেকে। শেষ হয় খ্রিস্টীয় চতুর্থ বা পঞ্চম শতকে। আর রামায়ণ খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় বা দ্বিতীয় শতকে। শেষ হয় খ্রীষ্টীয় দ্বিতীয় বা তৃতীয় শতকে। মহাভারতের রচনা আগে। শেষ হয় রামায়ণ শেষের পরে। তাই রামায়ণকে আদি কাব্য বলা হয়। রামায়ণ আগে শেষ হওয়ার কারণ শ্লোক সংখ্যা চব্বিশ হাজারের মতো ছিল বলে। সেখানে মহাভারতের শ্লোক সংখ্যা লক্ষাধিক।
   মহাভারতের কাহিনী কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ নিয়ে। প্রথম চব্বিশ হাজার শ্লোক নিয়ে 'জয়' নাম নিয়ে প্রকাশিত হয়। কবি আদি বেদব্যাস শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ণ। তিনি এই মহাকাব্য প্রথম শোনালেন তাঁর চার শিষ্যকে। প্রধান শিষ্য ছিলেন শুক বৈশম্পায়ন( বিশম্পার পুত্র বলে নাম বৈশম্পায়ন)। তাঁর উপাধি 'শুক'। অসাধারণ শ্রুতিধর ছিলেন বলে। অর্থাৎ ভালোই কন্ঠ্যস্থ করতে পারতেন বলে এই শুক উপাধি পেয়েছিলেন। এই চব্বিশ হাজার শ্লোক তিনি মুখস্থ করে রাজা জন্মেজয়ের সর্পযজ্ঞে অন্যান্য উপস্থিত ঋষিগণের অনুরোধে তিনি পাঠ করে শোনান। সমসাময়িক সমাজ,রাষ্ট্র,মানবিক মূল্যবোধকে বাড়তি যোগ করে জনশিক্ষার আকর করে তোলেন তিনি এই মহাকাব্যটিকে। এতে করে  শ্লোক সংখ্যা অনেকটাই বেড়ে যায়। আর যেহেতু ভরত রাজার বংশের কাহিনী, তাই নাম হয় 'ভারত'। এই 'ভারত' কাহিনী শুনতে উপস্থিত ছিলেন উগ্রস্রবা - ইনি সারথি বংশের লোমহর্ষনের পুত্র ছিলেন। 
এই উগ্রস্রবা আবার সৌনকের দ্বাদশবর্ষব্যাপী সোমযাগ কালে 'ভারত' কাহিনীর আরো শ্লোক সংখ্যা বাড়িয়ে দেন। তখনই নাকি লক্ষাধিক হয়ে যায়। উগ্রস্রবাকেই 'ভারত' কাব্যের শেষ কবি ধরা হয়। শ্লোক সংখ্যার উপর ভিত্তি করে নাম হয় 'মহাভারত'। অনেকের আবার মত ভৃগু বংশের মুণিঋষিদের সংযোজিত অংশের পর থেকেই মহাভারত নামে খ্যাত হয়। এই হল মহাভারতের কাহিনী ও নাম নিয়ে বিবর্তনের ধারাবাহিকতার ইতিহাস।
   পৌরাণিক যুগের কথায় যদি আসি সেখানেও বিবর্তনের চিত্র পাই। যেমন - দশাবতার - মৎস্য,কূর্ম,বরাহ, ব্রাহ্মণ, নৃসিংহ, পরশুরাম,রাম,কৃষ্ণ,বুদ্ধ ও কল্কি- এঁদের যদি এক এক করে ধরে আলোচনায় আসি তাহলে অবশ্যই বিবর্তনের ধারা লক্ষ করব। যেমন - 'মৎস' - পৃথিবীর জলমগ্ন অবস্থার চিত্র।কূর্ম - জল ও স্থলের সংযোগের প্রতীক। 'বরাহ' - কেবল স্থলচর প্রাণী। 'নৃসিংহ' - পশু ও মানুষের অন্তর্বর্তী। 'বামন'- তাসিক ক্ষুদ্র মানব। 'পরশুরাম'- রাজসিক গুণ সম্পন্ন মানুষের প্রতীক। রামচন্দ্র সাত্ত্বিক গুণ সম্পন্ন মানুষ। 'শ্রীকৃষ্ণ' - অধিমানস গুণ সম্পন্ন মানুষ, আত্মার মুক্তি ও চৈতন্যের দূত। 'বুদ্ধ' - নিষ্কাম কর্মের আদর্শ। কল্কি আধ্যাত্মিক ভাববাদ ও বিজ্ঞানের বস্তুবাদের সমণ্বয় সাধনে এলেন। এই বিবর্তনের জন্যই যেন তাঁদের আবির্ভাব। এই বিবর্তনের কথা বলেছেন কবি জয়দেব তাঁর 'গীতগোবিন্দম্' কাব্যের মধ্যে। আর তার ঠিক পাঁচশ' বছর পরে ডারউইন বলেছেন তাঁর অভিব্যক্তিবাদে। তারও একশ' বছর পরে আইনস্টাইন বলেছেন তাঁর আপেক্ষিকতাবাদের কথায়। 
সুতরাং ধর্ম ও বিজ্ঞান মিলেমিশে একাকার। ভারতীয় বৈদিক সংস্কৃতি আধুনিক বিজ্ঞানেরও পথপ্রদর্শক বলে আমরা গর্ব প্রকাশ করি। বিবর্তনের ধারায় বিশ্ব নিরপেক্ষতা ভারতীয় সংস্কৃতির আমদানি বললে ভুল বলা হবে না। যেমন - বুদ্ধের পরে শঙ্করাচার্য। তিনি জ্ঞাণের বর্তিকা নিয়ে এলেন। খ্রিস্ট ও চৈতন্য প্রেমের আদর্শ,মহম্মদ আত্ম সমর্পণের। আর শ্রীরামকৃষ্ণ সর্বধর্মের সমন্বয়ের সূত্র নিয়ে এলেন। যাক যে কথা মহাভারতকে নিয়ে হচ্ছিল, সেই কথায় আবার আসি।
   এখন প্রশ্ন কেন মহাভারতকে পঞ্চম বেদ বলা হলো? কারণ বৈদিক ব্রাহ্মণ্যসমাজ ফতোয়া জারি করেছিলেন মেয়েদের বেদ পাঠ করা চলবে না। বেদের শুদ্ধতা তাতে নষ্ট হবে। 
প্রত্যেক ধর্মের বিরোধী বা প্রোটেস্টান্ট পন্থী থাকে। ব্রাহ্মণ্যশ্রেনীর বিরোধী গোষ্ঠী এই নীতির তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু তাঁদের প্রতিবাদের কোনো সুরাহা দেখতে না পেয়ে তাঁরা মেয়েদের বেদপাঠের অধিকার নিয়ে গেলেন বেদ বিশেষজ্ঞ আদি বেদব্যাস শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ণের কাছে ( বেদব্যাস উপাধি। বেদ বিশেষজ্ঞগণই এই উপাধি লাভ করেন। পরবর্তীকালে অনেকেই এই উপাধি লাভ করেছিলেন। তাই মহাভারত রচনাকার হিসেবে শুধু বেদব্যাস বলা ঠিক নয়। বলতে হয় আদি বেদব্যাস শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ণ)। আদি বেদব্যাসের কাছে তাঁরা যুক্তি দেখালেন মেয়েদের সন্তান পালন ও শিক্ষাদান করতে গেলে বেদ পাঠ জরুরি। এই যুক্তির সারবত্তা দেখে আদি বেদব্যাস বললেন কিছুদিন পরে আসতে, এব্যাপারে তিনি ভেবে দেখবেন কী করা যায়। আর সেই সমস্যার মীমাংসা সূত্র হল বেদের সারাংশ শ্রীমদ্ভাগবৎগীতা রচনা করে মহাভারতের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া। মহাভারত পাঠে মেয়েদের অধিকার তো আর কেড়ে নেওয়া হয়নি। এই শ্রীমদ্ভাগবতগীতাই হলো বেদের সারাংশ। মেয়েরা মহাভারতের সংযোযিত অংশ গীতা পাঠ করলেই বেদের সারাংশ গ্রহণ করতে পারবে। সমস্যা সমাধান এভাবেই করেছিলেন আদি বেদব্যাস। তাই মহাভারতকে পঞ্চম বেদ বলা হয়।
   বেদ বিশেষজ্ঞ আদি বেদব্যাস শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন যদি নারীর শাস্ত্র শিক্ষার অধিকারকে নতুন মোড়কে হাজির করতে পারেন,মুনিবর শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ণ শিষ্য শুক বৈশম্পায়ন যদি সামাজিক ন্যায়নীতির, মানবিক মূল্যবোধের ও পারিবারিক আদর্শবাদের প্রবক্তা হতে পারেন তবে বৈশম্পায়ণের শিষ্য যাজ্ঞবল্ক্য ( বিশ্বামিত্রের বংশধর) বিবর্তনের ধারায় বা কম কিসে! যাজ্ঞবল্ক্য ভারতীয় সংস্কৃতিকে এক নতুন ধারায় প্রবহমানতা দেন। সময়ের স্রোতধারায় অজস্র গুণগ্রাহী তৈরি করেন। ভাবের রসদ যোগান দেন। চলার পথে নির্ভরতা দেন। তাই তিনি শ্রেষ্ঠ প্রবক্তাগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছিলেন। তিনি শুধু নিজেকে তাঁর সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখেননি, বর্তমান পর্যন্ত তাঁর সমান প্রসঙ্গিকতা রয়েছে তিনি শুক্ল যজুর্বেদ শতপথব্রাহ্মণ,বৃহদারণ্যকোপনিষদ- এর রচয়িতা ছিলেন। আর হিন্দু ধর্মের অন্যতম প্রবক্তা ছিলেন। এই যাজ্ঞবল্ক্য সমাজে নারীর স্থান ও তার স্বরূপ নিয়ে উপনিষদে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। আত্মার সন্ধান দিয়েছেন কীভাবে তাই নিয়ে আসব পরের পর্বে।
                         ( চলবে)
@ copyright reserved for Mridul Kumar Das. 
  
   
   
 

৪টি মন্তব্য:

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...