"বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি
পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর "
প্রথমেই তিথিকে ধন্যবাদ দিই এতো সুন্দর একটা টপিক দেয়ার জন্য। আর রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাস তো আছেন ই প্রিয় কবির লিস্টে! ছোট বেলায় নিজ গ্রাম ছিল ছুটি কাটানোর আদর্শ জায়গা! আর ছিলো আমার ঠাকুরমার অমোঘ আকর্ষণ!
আমাদের গ্রাম টা আসলে বইয়ের পাতায় আঁকা রূপসী বাংলার যেন স্থির কোন চিত্র! গ্রামের পাশ ঘেঁষে বয়ে চলা হালদা নদী যেন ধানসিঁড়ি নদীর ই আরেক রূপ! বর্ষায় অতিবর্ষণের ফলে পুরো গ্রাম যখন বুক সমান পানিতে ডুবে যেতো, পাড়ার দুষ্টরা কলা গাছের ভেলা বানিয়ে নেমে পড়ত বাড়ির চওড়া উঠোনে, যা নাকি তখন ছোট খাটো একটা লেকের আকার নিতো। সাঁতার জানতাম না বলে ভয়ে উঠতে চাইতাম না ভেলায়। ঠাকুরমা আমার জোর করে ভেলায় বসিয়ে নিজে পানিতে ভিজে দাঁড়িয়ে থাকতো! মানে নাতনির শখ পূরণ করা চাই!
আমাদের বাড়ির পিছনে ছিলো পাশাপাশি জোড়া পুকুর। এখনও আছে সেরকম। একটাই সারা বছর মাছের চাষ হয়, আর অন্যটি রাস্তার ধারে বলে অবহেলায় পড়ে থাকতো। সেই পুকুরটি ভর্তি হয়ে থাকতো কচুরিপানা আর শাপলায়। আর পাড়ের চারিদিকে জন্মাত হেলেঞ্জা, কলমি লতা,নানা ধরনের বুনো লতা! আহা!! কি অপরূপ সেই দৃশ্য! তো সেই কচুরিপানা ফুল,কলমি লতা আর নাম না জানা হরেক রকম বুনো ফুল দিয়ে চলত আমাদের চড়ুইভাতি ও রান্না - বান্নার খেলা! বিকেলে নদীর তীর সংলগ্ন চরের ফাঁকা জায়গায় সবাই দল বেঁধে খেলতাম। বর্ষা কালেই যা একটু সমস্যা হতো। সুদিনের সময় চরের মাঠ থাকতো ধবধবে পরিস্কার! সেই মাঠের এক প্রান্তে চলত আমাদের ছোটদের ছোট ছোট যতো খেলা আর বড়োদের দখলে থাকতো বিরাট একটা অংশ ফুটবল, ক্রিকেটের জন্য। নদীর বুকে পাল তোলা নৌকা দেখে, আর নদীর ওপার থেকে ভেসে আসা রাখালিয়ার বাঁশির সুরে কাটতো স্বর্ণালী সন্ধ্যা!
হেমন্তে, নতুন ফসল ঘরে উঠার পরে চারিদিক ভরে থাকতো খুশির জোয়ারে! ঠাকুরমার হাতে বানানো নতুন চালের পিঠার সেই স্বাদ আজো যেনো অমৃত হয়ে লেগে আছে মুখে! গ্রামের প্রতিটি ঘরে ঘরে শুরু হতো পিঠা উৎসব! আমাদের গ্রামে আজো হেমন্তের এই সময়ে পরিযায়ী পাখিদের মেলা বসে। বিকেল বেলা নদীর পাড়ে বসলেই চোখে পড়ে পাখিদের ঝাঁক! আগের মতো হয়তো তেমন একটা সবুজের সমারোহ চোখে পড়ে না। কিন্তু যা দেখা যায় তাই বা কম কি?
সন্ধ্যায় আজো দেখা মেলে মাছরাঙা আর সারসের মাছ কেড়ে খাওয়ার প্রতিযোগিতা। গিরগিটির রঙ বদলানোর দৃশ্য, বড়ো বড়ো গুইসাপেদের হেলে দুলে হেঁটে যাওয়া আর গাছে গাছে কাঠ বিড়ালীদের লাফিয়ে বেড়ানোর দৃশ্য! রাতের আঁধারে শোনা যায় তক্ষকের ডাক! মিস করি ঠাকুরমার হাতের সেই গরম গরম ভাপা পিঠা সাথে খেজুরের রস, পুকুরের তাজা মাছ, বাড়ির উঠোনের এক পাশে মাচায় লাগানো নানা ধরনের শাক - সবজি, ছোট বেলায় জোর করে খাওয়া গরুর খাঁটি দুধ,ধান কাটার দৃশ্য, পৌষ মেলা, নৌকা বাইচ, হেমন্তের আকাশে উড়ে বেড়ানো সেই সোনালী ডানার চিল, গ্রামের বন্ধুদের আর সবচেয়ে বেশী আমার ঠাকুরমাকে!
আমার কাছে আমার পিতৃভূমি, ঠাকুরমার ভালবাসায় ঘেরা হালদা পাড়ের সেই ছোট গ্রামটিই সমগ্র রূপসী বাংলার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। খুব ইচ্ছে আছে, পদ্মাসেতু হয়ে গেলে একবারের জন্য হলেও রূপসী বাংলার কবির সেই প্রিয় "ধানসিঁড়ি নদী" দেখে আসবো। কেননা, এই নদীর তীরে বসেই তো প্রকৃতি প্রেমিক নির্জনতা প্রিয় "কবি জীবনানন্দ দাস" ভেবেছিলেন বসে নাটোরের "বনলতা সেন" এর কথা!! তার পাখির নীড়ের মতো চোখের কথা! আর মনে মনে বলেছিলেন, "সুরঞ্জনা, ওইখানে যেওনাকো তুমি, বলো নাকো কথা ঐ যুবকের সাথে"। কি কথা তাহার সাথে? তার সাথে"! কি ব্যাথতুর হৃদয়ে কবি আমার জানাতে চেয়েছিলেন নিজের আকুলতা!
আজ এই বড়ো বেলায় এসে, বছরে একবার কি দুবার যখন প্রিয় পিতৃভূমির মাটিতে পা দেই, আনমনে খুঁজে ফিরি শৈশবের প্রিয় সেই রূপসী বাংলাকে! হারিয়ে যাওয়া খেলার সাথী আর আমার অতি প্রিয় ঠাকুরমাকে! বিকেলে প্রিয় সেই নদীর পাড়ে বসে, নদীর শান্ত জলে হাঁসেদের জলকেলি, মাছরাঙা, পানকৌড়ির অবিরত খুনসুটি দেখতে দেখতে গোধূলির আলোয় রাঙা আকাশপানে চেয়ে আমি ভাবতে থাকি আমার ফেলে আসা সেই রূপসী গ্রামের কথা। মনে মনে বলতে থাকি অতিপ্রিয় কবিতার ক'টা লাইন...
"হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর কেঁদোনাকো উড়ে-উড়ে ধানসিড়ি নদীটির পাশে!
তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে;
পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাদের মতো সে যে চ’লে গেছে রূপ নিয়ে দূরে;
আবার তাহারে কেন ডেকে আনো? কে হায় হৃদয় খুঁড়ে
বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!
হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর উড়ে-উড়ে কেঁদোনাকো ধানসিড়ি নদীটির পাশে"!!
সমাপ্ত।।

দারুণ সুন্দর বর্ননা দিলে দিদি👌👌👌👌👌💐💐💐💐🤗🤗🤗🤗🤗
উত্তরমুছুনদারুণ! অসাধারণ! সমৃদ্ধ হলাম। ধন্যবাদ। 👌👌❤❤💫💫💥💥💯💯💅💅
উত্তরমুছুনঅপূর্ব বর্ণনা।আমি তোমার কলমের ভক্ত।
উত্তরমুছুনঅসাধারণ বর্ণনা ❤❤❤ সত্যিই মুগধ করার মতো
উত্তরমুছুনদারুণ বর্ণনা । তোমার কলমে ঘুরে এলাম সেই গ্রামে ।
উত্তরমুছুনখুব সুন্দর লাগলো
উত্তরমুছুনদারুণ লেগেছে🤗🤗
উত্তরমুছুন