শুক্রবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২০

#নাম- 'নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ও টেনিদা'

# নাম - 'টেনিদা ও নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়'
  ✍️ - মৃদুল কুমার দাস।

    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের (১৯১৮- ১৯৭০)অমর সৃষ্টি টেনিদা। সুকুমার রায়ের পাগলা দাশু,প্রেমেন্দ্র মিত্রের ঘণাদা- এরা বাংলা সাহিত্যে সব কালজয়ী চরিত্র। টেনিদাকে নিয়ে বাঙালির হাসি আর ধরে না,সময় কাটানোর অনাবিল নির্মল বিশুদ্ধ হাসি এমনটি আজও দুর্লভ। তিন দশক ধরে উপন্যাস, গল্পে,নাটকীয় টেনিদা। টেনিদার স্রষ্টা 'আমাদের মাষ্টারমশাই'( জন্ম দিনাজপুর জেলার বালিয়াডাঙ্গি গ্রামে। পোশাকি নাম তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। লিখতেন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় নামে।) নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে চির ঋণী। বাংলা ভাষায় এমন পান্ডিত্য সত্যিই বিরল। উপন্যাস ও ছোটোগল্পের গবেষণা করে ডি ফিল পান। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার,অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য প্রমুখ গণের শিক্ষক ছিলেন তিনি।কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ বিল্ডিংলের ১৮ নং ঘরে পড়াতেন। আমি ১৯৮৯ এ এই আশুতোষ বিল্ডিংলে ১৮ নং এ ক্লাস করেছি। ক্লাস  করতাম যখন তখন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের শিক্ষকতা নিয়ে কত স্বপ্নের মত গল্প শুনেছি। 
     ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ছেলে মেয়েরা যেত নুন শো দেখতে যে যার সুযোগ বুঝে দল বাঁধত চুপিচুপি। শোয়ের শেষে পড়িমরি করে ছুটত,কারণ এখনি আছে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ক্লাস। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ক্লাস শুরু হলেই অন্য ডিপার্টম্যান্ট থেকে ছেলে মেয়েরা দলে দলে এসে ক্লাসে ভিড় করত। ক্লাসের তিল ঠাঁই আর নাইয়ের অবস্থা হতো। তিল ধারণের জায়গা থাকত না। যখন পড়াতেন বাম হাত মাঝে মাঝে পাঞ্জাবির পকেটে ঢুকিয়ে খুচরো পয়সা ঝনঝনাতেন,আর পকেট থেকে রুমাল বের করে ফর্সা গাল মুছতেন। রবীন্দ্রনাথের নষ্টনীড় পড়াবেন। কি নাটকীয় ভঙ্গিমা! পড়ানোর সময় বললেন - "সত্যজিৎ রায়ের চারুলতা ফিল্ম যেন চোখের সামনে না ভাসে। আমাদের কল্পনায় যেন রবীন্দ্রনাথ থাকেন। কথাকোবিদ রবীন্দ্রনাথ।" এই গল্প পড়াতে পড়াতে বিশ্বসাহিত্যের প্রাসঙ্গিক বক্তব্য টেনে এনে সে কি অপূর্ব রসভোজসভা বসিয়ে দিতেন।
   মাত্র বাহান্নটা বছরের স্বল্পায়ু এই টেনিদার স্রষ্টা টেনিদাকে আমাদের কাছেই রেখে যাওয়ার জন্য আজও তিনি বাংলা সাহিত্যের একজন প্রোথিতযশা সাহিত্যিক। টেনিদার কথা বলব আর স্রষ্টার কথা বলব না, তাহলে আলোচনা দুধ ছেড়ে ঘোলের আলোচনা  হয়ে যায়।  
 চারের দশক। রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষিতে মণ্বন্তর এলো। অন্নাভাব,বস্ত্রাভাব, আত্মহত্যা লেখার মধ্যে অনবরত ঘুরে ফিরে আসতে লাগল। সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা সময় চলছে। মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পিঠোপিঠি,বন্ধুস্থানীয় হয়েও মাণিককে এড়িয়ে তিনি অঞ্জলি ভরে রোমান্টিকতা গ্রহণ করেছেন। আর তারই ফসল নৈর্ব্যক্তিক চেতনায় ইতিহাসের পথ ধরে চলে এলেন এক নির্মোহ চেতনার লোকে। তার সেই নির্মোহ মানসিক অবস্থার একটা ধারায় এলো টেনিদা। বাঙালির বৈঠকী আড্ডার রসদের ভান্ডারে মূলধন উপচে পড়ল। আজও সে রসদ অফুরন্ত। 
টেনিদা উত্তর কলকাতার পটলডাঙায় থাকেন। প্রকৃত নাম ভজহরি মুখার্জি। পড়াশোনায় গয়ংগচ্ছ। সাতবারের চেষ্টায় মাধ্যমিক পাশ করে। দেহিক গঠন বেশ মজাদার। খাড়া নাকের জন্য বিখ্যাত। বিখ্যাত গড়ের মাঠে নাকি গোরা পিটিয়ে। তার বিখ্যাত ডায়লগ - "ডি-লা গ্রান্ডি মেফিস্টোফিলিস ইয়াক ইয়াক।" তারা চার সাঙাৎ। টেনিদা স্বয়ং,প্যালা,ক্যাবলা,হাবুল। 
টেনিদা ছাড়া বাকি তিন জনের এক দন্ডও সময় কাটত না। কেননা যেমন তার চওড়া বুক, তেমনি চওড়া মন। প্রতিবেশীদের বিপদে আপদে সম্বল টেনিদা। মাঠে ফুটবলের বাদশা, আবার ক্রিকেটে রাজা - এমন খেলোয়াড় পাওয়া দুষ্কর। প্রতি অঙ্গ নেতৃত্ব তার যেন মগজ থেকে পা পর্যন্ত নেমে আসছে। আর গল্পেরও রাজা। দু' ধরণের গল্প ‌বলে - একটি হল বীরত্বের ফলাও করে বানানো গল্প,আর একটা অ্যাডভেঞ্চার অভিযান গল্পকে রহস্যময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গল্প তৈরি করা। আর ভোজন রসিক এমন পর্বত প্রমাণ ভোজন করে এমন করে বলবে পেটে আহার পড়ল যেন সমুদ্রে শিশির বিন্দু মতো। আর মিষ্টির  হাঁড়ি একাই সাবাড় করে মনের সন্তোষবিধান কোনোদিন হতো না।
 এই টেনিদাকে নিয়ে উপন্যাস 'চারমূর্তি', 'চারমূর্তির অভিযান', 'কম্বল নিরুদ্দেশ', 'টেনিদা আর সিন্ধুঘোটক', 'ঝাউ বাংলোর রহস্য' । আর ছোটগল্প - একটি ফুটবল ম্যাচ,দধীচি,পোকা ও বিশ্ব কর্মা, খট্টাঙ্গ ও পলান্ন, মৎস্য- পুরাণ প্রভৃতি। নাটক যেমন - 'পরের উপকার করিও না' - এই নামের গল্পের নাট্যরূপ দিয়েছিলেন। এই নাটকে টেনিদা পোশাকি নাম ভজহরি মুখার্জি নামেই অভিনয় করেছে। 
  আজও বাঙালি যদি রঙিন চর্চা ও হাসির হল্লা যোগদানে ইচ্ছুক হয় তাহলে টেনিদা ও তার তিন সাঙাতের কাছে যাও। তোমাদের জন্য আছে খোস গল্পের মজলিসি আড্ডা।
                     ******
@  copyright reserved for Mridul Kumar Das 

১০টি মন্তব্য:

  1. অসাধারণ, খুব সুন্দর লাগলো স্যার ❤️🙏

    উত্তরমুছুন
  2. ধন্যবাদ আপনার ভাগ্য কে যে আপনাকে এমন এক শিক্ষকের সানিধ্য দিয়েছে👍👍👍👍

    উত্তরমুছুন
  3. মনমুগ্ধকর লেখা। প্রকৃতই শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলী।।।

    উত্তরমুছুন
  4. শিক্ষার্থীর কলমও শিক্ষকের আশীর্ব্বাদধন্য।অপূর্ব।

    উত্তরমুছুন
  5. কি অসাধারন স্মৃতিচারন দাদা। আমি মুগ্ধ দাদা 👏👏👏👏👌👌👌❤❤❤❤🌹🌹🌹🌹

    উত্তরমুছুন
  6. অপূর্ব,,,,খুব ভালো লাগলো 👌👌👌💐💐💐💐

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...