তোমার অপেক্ষায়।
পারমিতা মন্ডল।
ছোট্ট একটা বিজ্ঞাপনে চোখ আটকে যায় কনিকা রায়ের । সেখানে লেখা ছিল -"- আমি আমার আসল বাবা মাকে দেখতে চাই । আজ থেকে আনুমানিক পনেরো বছর আগে শিয়ালদহের সাউথ লাইন থেকে আমি আমার বাবা মায়ের কোল ছাড়া হয়ে যাই । এই সম্পর্কে কেউ কিছু জানলে এই নাম্বারে যোগাযোগ করবেন।" নীচে একটা ফোন নাম্বার দেওয়া আছে । কাগজটা নিয়ে কনিকাদেবী দৌড়ে গেলন স্বামীর কাছে ।তাহলে কি আমাদের হিয়া দিয়েছে বিজ্ঞাপনটা । না না , তা কি করে হয়। সে তো কীডন্যাপ হয়েছিল। আমরা টাকা সময় মতো যোগাড় করতে পারিনি ,আবার পুলিশেও খবর দিয়েছিলাম। তাইতো ওরা হিয়াকে মেরে ফেলে ছিল ।না ,না হিয়া আর বেঁচে নেই। এসব আমি কি ভাবছি! ওরা বলেছিল তো । বস্তায় ভরে নদীতে ফেলে দিয়েছে। কি নিষ্ঠুর । আর ভাবতে পারেন না কনিকাদেবী।
তবুও বিজ্ঞাপনটার উপর থেকে যেন চোখ সরাতে পারছে না কনিকা দেবী। না জানি কার বাড়ির মেয়ে , কিভাবে পাচার হয়ে গেছে ।হঠাৎ দু'চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে কনিকাদেবীর। মনে পড়ে যায় সেদিনের ঘটে যাওয়া দূর্ঘটনার কথা ।
কনিকাদেবী আর সোমনাথবাবুর দেখাশোনা করে বিয়ে ,হয়েছিল ।বিয়ের এক বছরের মধ্যে হিয়ার জন্ম হয়। যেমন দেখতে ফুটফুটে , তেমনি গায়ের রং। মনে হয় যেন কোন রাজকন্যা। হিয়ার বাবা অর্থাৎ সোমনাথ বাবু পেশায় এডভোকেট ছিলেন। অনেক রকম কেস তাকে সামলাতে হয়। তাই সবাই যে সব সময় তার উপর খুশি হয় এমন নয় । মাঝে মাঝে অনেক অন্যায় আবদার আসে । উপরি দেওয়ার লোভও দেখানো হয়। কিন্তু সোমনাথ বাবু কিছুতেই রাজি হননি কখনোই। তাই প্রাণে মেরে দেওয়ার হুমকিও শুনতে হয়েছে অনেক । কিন্তু ওরা যে এতোবড় সর্বনাস করে দেবে সেটা কল্পনার বাইরে ছিল।
এমনই একটা ঘটনা একবার ঘটেছিল সেবার। যার ফলে তিনি সারাজীবনের মতো তাঁর একমাত্র মেয়েকে হারান। একজন স্মাগলার পুলিশের জালে ধরা পড়েছিল । কিন্তু তার অপরাধ কিছুতেই প্রমান করা যাচ্ছিল না। সব কিছুই সে টাকা দিয়ে কিনে ফেলছিল ।একমাত্র সোমনাথ বাবুকে সে কিনতে পারে নি। ফলে তার দুবছরের জন্য জেল হয়ে যায় ।এই অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য সে সোমনাথবাবুর মেয়ে হিয়াকে পাচার করার ছক কষে । সেই সুযোগ ও একদিন এসে যায়।
সেদিন একটা বিয়ে বাড়ি ছিল ওদের । ঠিক হয়েছিল বাড়ির গাড়িতে করে যাবে । কিন্তু শেষ মুহূর্তে গাড়িটা খারাপ হয়ে যায় । এদিকে বিয়ে বাড়িতে তো যেতেই হবে । তাই ঠিক হলো ট্রেনেই যাওয়া হবে । অবশেষে মেয়েকে নিয়ে ক্যানিং লোকাল ধরে আত্মীয়ের বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠানে উদ্দেশ্য রওনা দিলন সোমনাথ বাবু ও তার স্ত্রী কনিকাদেবী। কিন্তু ট্রেনে প্রচণ্ড ভীড় থাকায় শেষ মুহুর্তে কনিকা দৌড়ে এসে লেডিসে উঠে যান ।
হিয়াকে নিয়ে ওর বাবা জেনারেলে ওঠে । ভীড় ঠেলে হিয়াকে জানলার কাছে দাঁড় করিয়ে দিয়ে নিজেও কোন মতে দাঁড়ায় ।দুটো স্টেশনের পর হঠাৎ ই খেয়াল হয় হিয়া জানালার কাছে নেই । হিয়াকে ডেকে এদিক ওদিক খুঁজে দেখে কোথাও নেই । কোথায় গেল মেয়েটা ? ভয় পেয়ে গেলেন সোমনাথ বাবু ।তখনই একজন বললেন "বাচ্চা মেয়েটা তো , এই যে এখানে দাঁড়িয়ে ছিল ওতো নেমে গেল বাবার হাত ধরে।" কার হাত ধরে হিয়া নেমে গেল ? দিশেহারা হয়ে যান সোমনাথ বাবু । তাহলে কি ওরা ভীড়ের মধ্যে হিয়াকে নিয়ে চলে গেল।
তারপর থেকে অনেক খুঁজেছে ওরা হিয়াকে আর পায়নি। থানা পুলিশ কিছুই বাদ রাখেননি । কিন্তু হিয়াকে পাওয়া যায়নি। তার দু'দিন পরে সোমনাথ বাবুর ফোনে একটা ফোন এসেছিল, । টাকা নিয়ে দেখা করার জন্য । এছাড়া ওরা আরো একটা শর্তও দিয়ে ছিল।ওদের বস কে ছেড়ে দিতে হবে। নাহলে হিয়াকে বেচে দেবে বলছিল । ওরা পুলিশকে জানিয়ে ছিল ব্যাপারটা । কিন্তু তবুও শেষ রক্ষা হয়নি । হিয়াকে আর ফেরত পায়নি ওরা ।হয় ওরা হিয়াকে মেরে ফেলেছে, নয়তো বাইরে কোথাও বিক্রি করে দিয়েছে ।আজ পনেরো বছর হয়ে গেল ,এখনো হিয়ার মা কনিকা দেবী আশা করে আছেন হিয়া ফিরে আসবে ।তাই ঐ বিঞ্জাপনটা দেখে উনি বড় উতলা হয়ে পড়েন। মায়ের মন তো ।
মনে মনে ভাবেন একবার ফোন করেই দেখিনা কি হয় ।কৌতুহল চেপে রাখতে না পেরে একদিন ফোন করেই ফেলেন
কনিকা দেবী। ওপার থেকে কেউ হিন্দিতে কথা বলছিল।তার অর্থ হলো--যিনি কথা বলছেন তিনি হলেন ,একজন সফল ব্যাবসায়ী। বাড়ি গুজরাটে ।তিনি ট্রাকে করে কলকাতায় মাল পাঠান ।আবার কলকাতা থেকে অনেক মাল নিয়েও আসেন । হঠাৎ একদিন মাল নিয়ে ফিরছেন ।তখন ট্রাকের মধ্যে থেকে শিশুর কান্না শুনতে পান। খুঁজে দেখে একটা ছোট্ট একটা বাচ্চা মেয়ে বছর পাঁচেক বয়স ,হবে ,গুটিসুটি মেরে বসে কাঁদছে । কে এই মেয়েটি ? কোথা থেকে এলো ? কিছুই বুঝতে পারে না ওরা। আর মেয়েটি অনবরত কেঁদে চলেছে ।কিছুই বলতে পারছে না ।একবার ওদের মনে হয়েছিল পুলিশে খবর দেওয়ার কথা । কিন্তু তখন ট্রাক কলকাতা ছেড়ে অনেক দূরে চলে এসেছে । তাছাড়া মনে হয়েছিল মেয়েটি ভয়ে এখানে এসে লুকিয়েছে। কেউ হয়তো তাড়া করেছে ।ওরা আশে পাশে থাকতে পারে । তাই পুলিশে খবর দেয়নি ওরা ।ওর মুখটা দেখে খুব মায়া হয়েছিল। সেই থেকে মেয়েটি ঐ ব্যাবসায়ী ভদ্রলোকের কাছে আছে। ওনার মেয়ের মতো । উনি বলে চলেছেন "ও আমার রাইসা বেটি । ওই এখন আমার ব্যাবসা দেখা শোনা করে । কিন্তু আজও ওর নিজের বাবা মায়ের জন্য কষ্ট পায়। তাই তাদের দেখতে চায়। কিন্তু কোথায় পাবো তাদের ?"
না ,মিললো না । এ আমাদের হিয়া নয় । হিয়াও কলকাতার থেকে হারিয়ে ছিল ঠিকই । কিন্তু সাল মিলছে না । আবার বয়স টাও যেন মিলছেনা । তবুও মন চায় একবার মেয়েটিকে দেখতে । মনে মনে ভাবে কনিকা দেবী যদি হিয়াও এখনো বেঁচে থাকে, এমন কোন বাবা মায়ের কোলে ? নাকি সে আর নেই এই পৃথিবীতে? অথবা পাচার হয়ে গেছে অন্য কোন দেশে ? ফোন টা ছেড়ে দিয়ে হিয়া বলে চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন কনিকা দেবী ------
সমাপ্ত।
মর্মস্পর্শী।। দারুন লেখা💐💐💐💐💐
উত্তরমুছুনখুব মর্মস্পর্শী। অসাধারণ ।ধন্যবাদ। 👍👍👌👌💯💯💯💫💫💥💥❤❤
উত্তরমুছুনদারুণ ।💐💐
উত্তরমুছুনমন ছুঁয়ে গেল এক মায়ের আর্তি।
উত্তরমুছুনখুব সুন্দর লেখা 👌👌👌👌💐💐💐💐
উত্তরমুছুন