শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২০

# বিষয় - 'হিন্দুধর্ম'

# বিষয় - 'হিন্দুধর্ম'
  # নাম  - 'হিন্দু-হিন্দুত্ব এবং বিবর্তন'
    ✍ মৃদুল কুমার দাস।

                  (৫ম পর্ব)
    যাজ্ঞবল্ক্য উপনিষদকার। তাঁর রচিত আদি উপনিষদ 'বৃহদারণ্যক'। জনক রাজার সভাসদ। সীতদেবীর শিক্ষা গুরু। সবসময় রসে বসে থাকেন। শুধু ব্রহ্ম জ্ঞাণী ছিলেন না,সত্যের পূজারী ও নির্লোভ ছিলেন। একদিন জনক রাজার রাজসভায় ঋষিবর যাজ্ঞবল্ক্য এসেছেন। রাজা জিজ্ঞেস করলেন ঋষিবর কী মনে করে? ধর্মতত্ত্ব আলোচনার জন্য, না পশু লাভের জন্য। তখন ঋষিবর বললেন 'উভয়েব সম্রাট'- দুটোই চাই। তারপর রাজাকে অনেক উপদেশ টুপদেশ দান করলেন। রাজা খুশি হয়ে এক হাজার গরু দিতে চাইলেন। তখন ঋষিবর যাজ্ঞবল্ক্য বললেন -''না সম্রাট আমার শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়নি। আমার পিতার নির্দেশ আছে শিক্ষা না সম্পূর্ণ করে দান গ্রহণ করতে নেই।" মনে পড়ে এই শিক্ষায় শিক্ষিত রামায়ণের বাংলায় অনুবাদক কৃত্তিবাস ওঝারও জীবনে অনুরূপ ঘটনার কথা। গৌড়েশ্বর কৃত্তিবাসের কবিত্বগুণে খুশি হয়ে কবিকে কিছু দানসামগ্রী দিতে চাইলে তখন কবি যাজ্ঞবল্ক্যের মতই বলেছিলেন - "কারো কাছে কিছু না লই করি পরিহার।/ যথায় যাই তথায় গৌরবমাত্র সার।।"
এবার আসি যাজ্ঞবল্ক্যের ব্রহ্মজ্ঞাণের কথায়।
   রাজা জনক পাঞ্চাল,কুরু রাজ্যের তাবড় তাবড় সব ব্রাহ্মণ পন্ডিতগণকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ব্রহ্মজ্ঞানে শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় নিতে। রাজসভায় জ্ঞাণী গুণী জনের চাঁদের হাট বসেছে। যিনি শ্রেষ্ঠ হবেন এক হাজার সোনা বাঁধানো শিংওয়ালা গরু উপহার পাবেন। অর্থাৎ তিনি গরুগুলি বাড়ি নিয়ে যাবেন। সকলে মুখ চাওয়াচাওয়ি যখন করছেন তখন যাজ্ঞবল্ক্য তাঁর এক শিষ্যকে বললেন গরুগুলো নিয়ে বাড়ি যেতে। আর রসিকতা করে ঋষিবর যাজ্ঞবল্ক্য বলছেন - "নমঃ বয়ং ব্রহ্মিষ্ঠায় কুর্মো,গোকামা এব বয়ং স্মঃ ইতি"- সকল ব্রহ্মিষ্ঠকে নমষ্কার করে বলছি গরুগুলি আমার খুব দরকার। সেই কথা শুনে গরুলোভী সকল ব্রহ্মিষ্ঠ রে রে করে উঠলেন। যাজ্ঞবল্ক্যের স্পর্ধা দেখে তো সকলে হতবাক। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ না করে এতো রীতিমত তঞ্চকতা!
   যাজ্ঞবল্ক্য নিশ্চিতভাবেই জানতেন যাঁরা তর্কযুদ্ধে উপস্থিত হয়েছেন তাঁরা তাঁর নখের যুগ্যি নন। সভায় যখন জোর হট্টগোল তখন ঋষিবর যাজ্ঞবল্ক্য বললেন ঠিক আছে একে একে অবতীর্ণ হন তাহলে, তর্ক যুদ্ধের জন্য এগিয়ে আসুন। একে একে আসছেন মুখ নিচু করে চলে যাচ্ছেন। যেমন প্রথমে এলেন অশ্বল। তিনি প্রশ্ন করলেন সবই যখন মৃত্যুর অধীন তাহলে মৃত্যুর হাত হতে মুক্তির উপায় কী? 
  যাজ্ঞবল্ক্য বললেন মুক্তির উপায় অগ্নি হোতা নামক ঋত্বিকের দ্বারা। অর্থাৎ যজ্ঞের হোতা অগ্নি হলেন বাক্য। এই বাক্যেই মুক্তি। ব্যর্থ হয়ে অশ্বল ফিরে গেলেন। তারপরে একে একে আর্তভাগ,ভুজ্যু,কহোল... প্রমুখগণ এলেন গেলেন।
এবার সবাইকে অবাক করে দিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন এক বিদুষিনী নারী। সবার অতি পরিচিত। তিনি অসাধারণ ধী শক্তি সম্পন্না, তেজোদীপ্তা,ব্রহ্মবাদিনী, ধর্মতত্ত্ব আলোচনায় অবলীলায় অংশগ্রহণ করেন। তর্কযুদ্ধেও। চিরকুমারী ছিলেন। বৃহদারণ্যক উপনিষদে তাঁর পরিচয় হল অসামান্য মেধাবী, আত্মবিশ্বাসী ও পূজ্যপাদে সম্মান জানানোকে বিশেষ কর্তব্যজ্ঞান  করেন। সীতাদেবীর ইনিও শিক্ষাদাত্রী। বচক্লুর কন্যা গার্গী ব্লাচক্লবী। 
গার্গী ধীরপায়ে এগিয়ে এসে ঋষিবর যাজ্ঞবল্ক্যকে প্রশ্ন করছেন - "যদি জলে সবকিছু ওতোপ্রোতোভাবে অধীষ্ঠিত থাকে তবে জল কীসে অধীষ্ঠিত?"
উত্তরে ঋষিবর বললেন - "বায়ুতে অধীষ্ঠিত।"
প্রঃ- "বায়ু কীসে অধীষ্ঠিত?"
উঃ - "অন্তরীক্ষলোকে।"
প্রঃ- "অন্তরীক্ষলোক কীসে অধীষ্ঠিত?"
উঃ:-" গন্ধর্বলোকে।"
এর পর একে একে এলো আদিত্যলোক,চন্দ্রলোক,দেবলোক- সবকিছু পেরিয়ে ব্রহ্মলোক।
তখন গার্গীর প্রশ্ন - "ব্রহ্মের পরে কোন লোক?" যাজ্ঞবল্ক্য এবার একেবারে চুপ। তিনি অবাক। বুঝতে পারলেন বিদুষী গার্গী এবার ব্রহ্ম কী, তাই নিয়ে জানতে চাইছেন। গার্গীও বুঝতে পারছেন যাজ্ঞবল্কের এই মুহূর্তে মানসিক অবস্থায় জড়তার কথা। ঋষিবর বসে ভাবছেন এই মুহূর্তে হারলে চলবে কেন! তখন যাজ্ঞবল্ক্য বললেন - "দেবতাদের নিয়ে বেশি প্রশ্ন করা উচিত নয়। তুমি অতিপ্রশ্ন করছ। তাই সাবধান আর প্রশ্ন করলে তোমার মাথা উড়ে যাবে।" 
  বহ্মজ্ঞান লাভের অধিকার মেয়েদের নেই। তাই গার্গীকে থামানোর জন্য এই সাবধান বাণী উচ্চারণ করলেন ঋষিবর। কেননা গার্গী মৈত্রেয়ীর সময় মেয়েদের যে যে অধিকার ছিল( শাস্ত্রপাঠ,বেদ অধ্যয়ন ইত্যাদি) তা থেকে মেয়েদের ধীরে ধীরে সরিয়ে দেওয়া হয়। ব্রহ্মজ্ঞান লাভের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা আর বেদ পাঠের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার শুরু যখন থেকে সমাজে নারীর অবস্থান তখন থেকে দুঃসময় গোনা শুরু। যার সবচেয়ে শোচনীয় পরিণতি নারীকে সতী সাজানোর জন্য সতীদাহ, বহুবিবাহ,অকাল বৈধব্য জীবনে কাশী, বৃন্দাবন,মথুরায় বিধবার জীবনযাপন ও আচার সর্বস্ব হয়ে বাঁচা - এসবের পরিণতি কি তা থেকে মুক্ত হওয়ার  স্মৃতি এখনো টাটকা। যাক গার্গীর কথায় আসি। 
যাইহোক গার্গী শেষে সবার সামনে বিনয়ের সঙ্গে মধুরবচনে প্রস্তাব রাখলেন তিনি আর মাত্র দুটি প্রশ্ন করতে চান - "দ্বৌ প্রশ্নৌ প্রক্ষ্যামি,তৌ চেন্মে বক্ষ্যতি,ন জাতু যুষ্মাকং কশ্মিদ্ ব্রহ্মোদ্যঃ জেতেতি..."এই দুটি প্রশ্নের উত্তর যদি ইনি দিতে পারেন তাহলে আপনারা কেউ ওনাকে ব্রহ্মবিদ্যায় পরাস্ত করতে পারবেন না। আপনারা যতই প্রশ্ন করুন না কেন এই প্রশ্নের বাইরে কোনো প্রশ্ন হয় না। এই প্রশ্নই সবার শেষ প্রশ্ন। তারপরে প্রশ্ন করা নিরর্থক। যথা - 
  ১। প্রশ্নঃ- অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ-স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল কীসে অধীষ্ঠিত? 
  উঃ- এ সমস্তই আকাশে বা অনন্তে অধীষ্ঠিত।
২। প্রশ্নঃ- আকাশ বা অনন্ত কীসে অধীষ্ঠিত?
উঃ- সমগ্র বহ্মান্ড যাতে অধীষ্ঠিত, সেই তিনিই হলেন অবাঙমানসগোচর। তাঁরই নিয়ন্ত্রণে সারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড চলমান। ইনিই দেখা, শোনা,জানার আকর - "নান্যদতোহস্তি দ্রষ্টু,নান্যদতোহস্তি বিজ্ঞাত্রেতাস্মিন" - ইনি ভিন্ন কেউ দ্রষ্টা নেই,স্রোতা নেই,বিজ্ঞাতা নেই। এইভাবে ঋষিবর যাজ্ঞবল্ক্য সমস্ত জ্ঞাণের সীমা অতিক্রম করে গেলেন। এই জ্ঞাণই প্রকৃত অনন্ত বা ভূমা। ছান্দগ্য উপনিষদে এই কথাগুলির বিস্তৃত বর্ণনা পাই। প্রমাণিত হল যাজ্ঞবল্ক্য শ্রেষ্ঠ ব্রহ্মজ্ঞাণী ও হাজার গরুর হকদার। 
এইভাবে যাজ্ঞবল্ক্য গার্গীকে ব্রহ্মজ্ঞান লাভ থেকে বিরত করলেন বটে তবে নারীর শোচনীয় অবস্থা তাঁকে খুব পীড়িত করেছিল। 
  বৈদিক যুগে নারীর কেবল সন্তান উৎপাদন করা ছাড়া কোনো গুরুত্ব ছিল না। তার উপর এক স্ত্রীর বহু স্বামী। আবার এক স্বামীর বহু স্ত্রী। কোনো নারীর দশজন স্বামী থাকলেও সে যখন ব্রাহ্মণের পত্নী হয়, ব্রাহ্মণই তার পতি বলে গণ্য হয়, বাকি রাজন্য বা বৈশ পতিরা পতি নয়। বিবাহে কন্যা দান করা হত স্বামীকে নয়, স্বামীর পরিবারকে। আর পরিবারে নারী বা স্ত্রীর মূল্য ছিল সম্পত্তি হিসেবে যে সম্পত্তির স্থান ছিল গরুর নীচে। সেই সময়ের বহুল প্রচলিত কথা - "ভাগ্যবানের বউ মরে,অভাগার গরু।" অর্থাৎ গরু কিনতে টাকা লাগে,বউ আনলে টাকা আসে। এখন সেটাই পণ প্রথা। 
  যেমন সমাজে শূদ্রের স্থান, ঠিক ততটাই নারীর। শিক্ষার সুযোগ নারীর ছিল না। ছিল না বললে ভুল হবে। নারীর শিক্ষা বলতে নৃত্যকলা, চিত্রশিল্প, সঙ্গীত, গণিকা বিদ্যা। ব্যাস! নারীর এই শিক্ষা লাভের দৈন্য দশা  কাটাতে আদি বেদব্যাসের মতো যাজ্ঞবল্ক্যও নারীর পাশে দাঁড়িয়ে নতুন দিশা দেখিয়েছিলেন। সমাজে নারীর বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী হওয়ার ক্ষমতাও নারীর মধ্যে যে আছে তার প্রমাণ গার্গী,ঋষিবর যাজ্ঞবল্ক্যের স্ত্রী মৈত্রেয়ী।
     যাজ্ঞবল্ক্যে নারী ও প্রেম সম্পর্কে নতুন বিশ্লেষণ তিনি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন স্ত্রী স্বামীর অর্ধাংশ। অর্ধাংশ এজন্য পরস্পর কামনার দ্বারা বিবাহ সম্পন্ন হয়। এই বিবাহের জন্য কামনায় থাকে পরস্পরের আত্মদান। যাজ্ঞবল্ক্য বললেন একা থাকলে কেউ সুখী হয়না বা সুখ পায়না। তাই একাকী না থেকে দ্বিতীয়ের সন্ধান করে। তাই প্রকৃতি সৃষ্টি করেছে নারী ও পুরুষ। এই নারী পুরুষ পরস্পরের দিকে আকৃষ্ট হলে বা আকর্ষণ বোধ করলে তখন একাকিত্বের বেদনা ঘোঁচে। তাই দু'য়ের কামনায় পরস্পর পরিপূরক হয়ে ওঠে। স্বামীর কামনাতে স্বামী প্রিয় হন তখনই যখন স্ত্রী স্বামীতে প্রতিস্থাপন করে, স্বামী ও স্ত্রী তখন পরস্পরের প্রিয় হয়ে ওঠে। কামনার মধ্য দিয়ে পরস্পর যখন আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয়, তখন পরস্পরের দেহ মিলনের চরম মুহুর্তে বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত হয়। ঠিক শূন্য ব্রহ্মজ্ঞানের মতো।
  আবার স্ত্রী স্বামী পুত্র বন্ধুর কাছে ততটাই প্রিয় যতটা স্ত্রী নিজেকে এদের  মধ্যে অনুভব করতে পারে। আর সেই সাথে নারীর দুর্বলতা সম্পর্কে যাজ্ঞবল্ক্য বলেছেন, যে পুরুষ নাচতে গাইতে পারে তার প্রতি নারী সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট হয়।
   নারী পুরুষের মিলনকে যাজ্ঞবল্ক্য শূন্য ব্রহ্মের সাথে যেই না তুলনা করলেন, অমনি স্বাভাবিক ভাবেই ব্রহ্মজ্ঞানের কথা এসে গেল। গার্গী যখন ব্রহ্মজ্ঞানের কথা জানতে চয়েছিলেন যাজ্ঞবল্ক্য এড়িয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু নিজ স্ত্রী মৈত্রেয়ীকে নারী পুরুষের এই সম্পর্ক বোঝাতে গিয়ে ব্রহ্মজ্ঞানের কথা এসে গেল। এই ব্রহ্মজ্ঞাণ মৈত্রেয়ীকে কখন দিতে বাধ্য হলেন ও সেই সূত্রে মৈত্রেয়ীকে আত্মা কী? এবং তার সন্ধান কীভাবে দিয়েছিলেন সেই আলোচনায় আসব পরের পর্বে।
                       (চলবে)

@ copyright reserved for Mridul Kumar Das. 
      

৯টি মন্তব্য:

  1. ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।❤❤💫💫💥💥💅💅

    উত্তরমুছুন
  2. ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।❤❤💫💫💥💥

    উত্তরমুছুন
  3. ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা। ❤❤💫💫💥💥💅💅

    উত্তরমুছুন
  4. আগ্রহ বাড়ছে।পরের পর্বের অপেক্ষায়।

    উত্তরমুছুন
  5. ভারতীয় স্ত্রী জাতির বিবর্তন।। খুব ভালো।

    উত্তরমুছুন
  6. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...