শনিবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০২০

শৈশব চুরি।

শৈশব চুরি।

পারমিতা মন্ডল।

আজ সোমবার ।রোজকার মতো সেদিনও অফিস যাওয়ার তাগিদে ছুটছি। যাওয়ার সময় ডাইনে বাঁয়ে তাকানোর সময় থাকে না ।সোজা লক্ষ্যে ছুটতে হয় রোবটের মত ।শুধু আমি না, সকাল বেলায় সবাই ছোটে আমার মতো। শিয়ালদহ থেকে বাসে করে যেতে হয় আমাকে । একটা বাস ছেড়ে দিলে পরের বাস পাওয়া খুবই কষ্টকর । তাই ইচ্ছা থাকলেও দু' মিনিট দাঁড়ানোর উপায় নেই।

শিয়ালদহ স্টেশন দিয়ে যাওয়ার সময় রোজ দেখি রাস্তায় অনেক গুলো বাচ্চা বসে । কেউ ভিক্ষা করছে, কেউ ঘুমিয়ে আছে কেউ কোথা থেকে একটা ছেড়া ফাটা বল এনে খেলছে । কেউ আবার কোথা থেকে এক টুকরো রুটি এনে ছিঁড়ে খাচ্ছে। তার খাবার আরেক টি বাচ্চা কেড়ে খাওয়ার চেষ্টা করছে ।।এটা আমাদের রোজকার দিনের পরিচিত দৃশ্য।  ঐ স্টেশন চত্বর, খোলা আকাশের তলাই ওদের বাড়ি ঘর । সুখে -দুঃখে এভাবেই চলে যায় ওদের দিনের পর দিন । এদের চাহিদা খুবই সামান্য। শুধু বেঁচে থাকার লড়াই করে চলেছে দিনের পর দিন।

   কিন্তু আজ কি হলো ? কাউকে তো দেখছি না ?কোথায় গেল ওরা ?যে ছোট্ট ছেলেটা "  বাবু একটা পয়সা দাওনা " বলে  , একটা ভাঙ্গা চোরা ,হারমোনিয়াম নিয়ে চিৎকার করে বেসুরো গলায় গান  করতো, আজ তো তাকে দেখা যাচ্ছে না ।   কোথায় গেল ছেলেটা ?  ছেলেটাকে দেখে খুব মায়া লাগতো । ওর মায়াবী চোখের দিকে তাকালে আরো দুটি চোখের ছবি ভেসে উঠতো । সে আমার সন্তানের । কতো আদর যত্নে ওকে মানুষ করছি আমি । আর একে দেখ ! মাঝে মাঝে কিছু সাহায্য দিতাম। রোজ দিতে পারতাম না । যাতায়াতের পথে রোজ ওকে দেখে ও কেমন যেন আপন হয়ে গিয়েছিল আমার কাছে। তাই আজ না দেখে  মনটা কেমন যেন করছিল।

এদিক ওদিক তাকাতে  ঐ দূরে ছোট্ট একটা ভীড়  দেখতে পেলাম । সবাই  কি  যেন  একটা ঘিরে ধরে দাঁড়িয়ে আছে । কিছুই দেখা যাচ্ছে না । কি হয়েছে  ওখানে?দাঁড়াবো একটু ? না, না অফিসে দেরী হয়ে যাবে । এখনই ছুটতে হবে । ওদিকে  আবার বায়োমেট্রিক । তবুও মনটা কেমন যেন খচখচ করছে  । কারো কাছে কি জানতে চাইবো কি হয়েছে  ?  এমন সময় দেখি একজন বয়স্ক মহিলা এদিকে আসছে । আমি তাকেই জিঞ্জাসা  করলাম "কি হয়েছে ?ওখানে ওতো ভীড় কেন  ?"  উনি বললেন "একটা আ্যকসিডেন্ট হয়েছে । ঐ ছেলেটা আরে ইকবাল ,যে রাস্তায় হারমোনিয়াম নিয়ে গান করে  ভিক্ষা করতো ,ওর মা মারা গেছে।  ওর আর কেউ রইল না গো বাবু। মাটাও শেষে মরে গেল ।"   শুনে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল । কিন্তু আমার আর দাঁড়ানোর সময় নেই। তাই কোনো দিকে না তাকিয়ে চলে এলাম অফিসে । কিন্তু মনটা বড়ই অশান্ত হয়ে  রইল। কাজে মন বসছে না ।

ভাবলাম ফেরার পথে ঠিক খোঁজ নেব । জানিনা কেন ছেলেটির প্রতি মায়া পড়ে গিয়েছিল। রোজ হয়তো ওকে পয়সা দিতে পারতাম না ।কিন্তু মাঝে মাঝে দিতাম । একটা ভাঙা হারমোনিয়াম কোথা থেকে জোগাড় করে, সেটা নিয়ে রাস্তার পাশে বসে গান করে ভিক্ষা ক‍রতো  । একদিন ওকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম "তোর নাম কি ?কোথায় থাকিস ?"বলেছিল "আমার নাম ইকবাল । ঐ বস্তিতে থাকি।আমার আব্বা কোথায় জানিনা । মার কাছে অনেক বার জানতে চেয়েছি আব্বার কথা । কিন্তু  মা বলেনি । মা আর আমি থাকি। আমার মা তো চোখে দেখতে পায়না। তাই কোন কাজও করতে পারে না । আমি তাই ভিক্ষা করি বাবু। দুটি পয়সা দাওনা বাবু ।"

   সেদিন চোখে জল চলে এসেছিল । ওর বয়সী আমার ও একটি ছেলে আছে ।তাকে কত আদর যত্নে রাখি,কোন কাজ করতে দেইনা, লেখা পড়া করে । না চাইতেই সব কিছু পেয়ে যায় ।আর ঠিক একই বয়সী আর একটা ছেলেকে পড়াশোনা না করে  অন্ধ মায়ের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে ,রোজগার করতে হচ্ছে।

ফেরার পথে দেখি ওখানে আর ভীড়টা নেই ।আগের মতোই বাচ্চা গুলো খেলছে। কিন্তু ইকবাল কোথায় গেল ?ওদের একজন কে ডেকে জিঞ্জাসা করলাম" ইকবাল কোথায় রে "? কি হয়েছিল ওর মায়ের ?
ওরা যা বলল তার মানে হল ,ওরা যখন গভীর রাতে ঝুপড়িতে ঘুমোচ্ছিল তখন একটা আট চাকার লরি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ওদের
ঝুপড়ির উপর ধাক্কা মারে । ইকবাল আর ওর মাও ঘুমোচ্ছিল। ওর মায়ের মাথায় এসে  জোরে ধাক্কা লাগে। সাথে সাথেই ওর মায়ের মৃত্যু হয়। আরো কয়েক জনকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।  তাদের অবস্থাও আশঙ্কা্ জনক । পিতৃহীন ছেলেটা এবার মাতৃহীন ও হলো। এই টুকু শিশু যার লেখা পড়া করার কথা ,তাকে এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করতে হচ্ছে।।তার না আছে থাকার জায়গা না আছে পেটে ভাত।এমন কি. এই  বিশাল পৃথিবীতে তার আর কোনো আপন জন ও ইল না।এক নিমেষে সে যেন প্রাপ্তবয়স্ক , হয়ে গেল।

মায়ের সৎকার করে , হয়তো সে আবারও রাস্তায়  বসবে ভিক্ষা করার জন্য। পেটের জ্বালা যে বড় জ্বালা।😪😪😪

(এই ভাবে প্রতি নিয়ত আমাদের শৈশব গুলো চুরি হয়ে যা।)


৫টি মন্তব্য:

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...