শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২০

বাংলার মুখ(সুদেষ্ণা দত্ত)


 


বাংলার মুখ

©সুদেষ্ণা দত্ত


রোদ্দুর কলকাতায় একটা বহুজাতিক সংস্থায় কাজ করে।প্রত্যেক সপ্তাহান্তে সুন্দরপুরের বাড়ীতে আসে সে।তার ছায়াসঙ্গিনী থুড়ি জীবনসঙ্গিনীর নাম আলো।তাদের একটি ফুটফুটে তিন বছরের ছেলে সূর্য।বাবা-মা,স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে মোটামুটি সুখী,স্বচ্ছল পরিবার রোদ্দুরের।কিন্তু আলোর মনে কোথাও একটা কাঁটা আজও খচখচ করে।ব্যাঙ্গালোরে এক বহুজাতিক সংস্থায় উচ্চপদে চাকরীর অফার পেয়েছিল রোদ্দুর।কিন্তু বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়ার সুবাদে তাঁদের আপত্তিতে সেই স্বপ্ন আর ডালপালা বিস্তার করে মহীরুহ হতে পারেনি।আলোর সবসময় মনে হয় এই পোড়া বাংলায় পড়ে থেকে না আছে সুখ,না আছে উন্নতি।বাংলার এই আবহাওয়াও তার না-পসন্দ।চরম ঠান্ডা,চরম গরম!কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেনা শ্বশুর-শাশুড়ীর প্রতি সম্মান আর স্বামীর প্রতি ভালবাসায়।চোখের জলে ভিজে যায় স্বপ্নের মহীরুহ।

এদিকে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বাজারে হটাৎ-ই চাকরী চলে যায় রোদ্দুরের।তার আলো-ঝলমলে সংসারে ঘনিয়ে আসে বিষাদের কালো মেঘ।রোদ্দুরের বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মচারী।বেশ কিছুটা জমি নিয়ে একটা মাথা-গোঁজার ঠাঁইও তিনি করেছেন সুন্দরপুরের এই মফস্বলে।কিন্তু বসে খেলে রাজার ধনও শেষ হয় আর এ তো মধ্যবিত্তের সংসার!ধীরে ধীরে মাথা চাড়া দিচ্ছে অর্থাভাব।এখন আলো আর মুখ বুজে থাকে না।সকলকে স্মরণ করিয়ে দেয় বাইরে চাকরীর সুযোগ হাতছাড়া করার দুর্গতির কথা।হায়!এই পচা বাংলায় এই বয়সে চাকরী কোথায় পাবে!স্বামী-স্ত্রীর হৃদয় আর প্রেমের জন্য তৃষিত নয়,সেখানে জায়গা নিয়েছে খরার রুক্ষতা।কিন্তু এভাবে হাত-পা গুটিয়ে বসেই বা কি করে থাকা যায়!

একদিন হঠাৎ আলোর মাথাতেই উঁকি মারে এক পরিকল্পনা।সে বাড়ীতে প্রস্তাব দেয় কিছু জমি কেনার।তাদের এই সুন্দরপুরের মফস্বলে তাদের বাড়ীর পাশেই বেশ কিছু ভাল জমি আছে।সকলে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভয়ে ভীত হলেও রোদ্দুর বাইরে চাকরীর সুযোগ ছাড়ায় আজ সকলেই অনুতপ্ত,তাই নির্বাক থাকে।মধ্যবিত্তের সঞ্চয় খরচ করে কেনা হয় জমি।প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে কিছুটা জায়গায় খনন করা হয় পুষ্করিণী-শুরু হয় মাছ চাষ।বাড়ীর ক্ষেতেই লাগানো হয় বেশ কিছু সব্জী।সারহীন শহুরে ভাষার অর্গানিক সব্জী খেয়ে সকলেই খুশি।ধীরে ধীরে চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে যোগান।আজ আলোর ঘরে সূর্য আর রোদ্দুরের খেলা।অনেকটাই কেটে গেছে কালো মেঘ।

বেশ কিছুদিন পর রোদ্দুরের মাথায় একটা পরিকল্পনা আসে।সে বাড়ীতে জানায় ধনে, হলুদ এগুলোকে মশলার কাজেও ব্যবহার করবে।বাড়ে চাষের পরিমাণ।আলোর শাশুড়ী মা ও আশে-পাশের মেয়ে -বৌদের উদ্যোগে ও ব্যাঙ্কের ঋণপ্রকল্পে গড়ে ওঠে আচার-বড়ি-আমসত্ত্ব তৈরীর স্বনির্ভর গোষ্ঠী।একদিন যে রোদ্দুরের চাকরী চলে গিয়েছিল আজ সেই রোদ্দুরের আলোয় কত ঘর আলোকিত!আলো আজ উপলব্ধি করে নিজের লোকদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকার সুখ।

এখন জীবনানন্দ,জসীমউদ্দীনের মত আলোও রূপসী বাংলার  রূপে মোহিত।বাংলার মাটিতেই জীবনের শেষে মিশে যেতে চায়।উত্তম-সুচিত্রার মত রোম্যান্টিক জুটি রোদ্দুর-আলোও তাদের দ্বি-চক্রী যানে চেপে ঘুরে দেখে বাংলার প্রত্যেক ঋতু।আমোদিত হয় তার রূপে-বর্ণে-গন্ধে।আলোর মুখও বাংলার গোধূলির আলোয় আজ দীপ্ত।বার বার ফিরে আসতে চায় সে এই বাংলায়।সে বোঝে-

                কোথায় এমন প্রকৃতির বাহার

                  কোথায় এমন স্নেহের পাহাড়!

                বার্লিন  হোক বা গুয়াতেমালা

                  সবার সেরা আমার বাংলা।।



২১টি মন্তব্য:

  1. দারুণ। যুবা শক্তি যদি সবুজ বিপ্লব ঘটায় তাহলে পাঞ্জাবের মতো প্রানবন্ত আর্থিক সচ্ছল হবে।

    উত্তরমুছুন
  2. সুন্দর ভাবে আমার বাংলাকে চেনার একটা দিক উন্মোচিত হল।অসংখ্য ধন্যবাদ । এগিয়ে যান।

    উত্তরমুছুন
  3. খুব ভালো লাগলো... উজ্জীবিত হওয়ার মতো একটা লেখা পড়লাম...👍

    উত্তরমুছুন
  4. উপস্থিত বুদ্ধি আর বিশ্বাস আর পজিটিভ ভাবনা অসাধ্য সাধন করায়। তোমার লেখায় আরও একবার প্রমাণ হল।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. শুধু লেখায় নয়,বাস্তবে যারা করছেন তাঁদের আমার কুর্নিশ।

      মুছুন
  5. পড়লাম, ভালো তো লাগলোই কিছু শিক্ষাও পেলাম, যতই হোক শিক্ষকের কলম তো!

    উত্তরমুছুন
  6. মন কে শক্ত রাখার শিক্ষা পেলাম দিদি... দেবলীনা

    উত্তরমুছুন
  7. বেঁচে থাকার লড়াই হয়তো এভাবেই বাঁচতে শেখায় । outstanding. 👍👍

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...