শনিবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০২০

অজানার পথে(সুদেষ্ণা দত্ত)

 


অজানার পথে

©সুদেষ্ণা দত্ত

        আজ দুটি ভ্রমণের রোমাঞ্চকর ও রোমহর্ষক ঘটনার কথা বলব।যদিও দুটি ঘটনাই যখন ঘটে তখন আমি সদ্য প্রাইমারি স্কুলে।তাই স্মৃতির পাতায় থেকে যাওয়া কিছু ছবি ও বহুশ্রুত এই দুটি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরলাম আপনাদের সামনে।আপনারাও আমার পথের সাথী হয়ে চলুন সেই ঘটনার মাঝে বিচরণ করে আসি।দুটি ঘটনাতেই আমার বাবা ছিলেন অকুতোভয়।

        সাল ১৯৮৬।হরিদ্বারের ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ থেকে একটি ছোট বাসে করে আমরা পবিত্র কেদারনাথের উদ্দেশ্যে রওনা হই।গৌরী কুণ্ডে বাস থেমে যায়।তারপর যেতে হয় ঘোড়া,ডুলি বা পদব্রজে।আমি মায়ের সঙ্গে ঘোড়ায় সওয়ার হই।বাবা অনেকের সঙ্গে পদব্রজেই পাড়ি দেন।ঘোড়াগুলোর বড় প্রিয় আবার খাদের ধারের ঘাস।যে ঘটনা ঘোড়াটিকে আনন্দ দিয়েছিল,তার আমার কাছে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।শিশুমনে সেই দৃশ্য যে কি ভয়ানক রেখাপাত করছিল তা আজ হয়ত আর বলে বোঝাতে পারব না।কেদারনাথ পৌঁছে ঠান্ডায় হাড় হিম হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।আমাদের রাত্রিবাস ভারত সেবাশ্রম পৌঁছে উষ্ণতার খোঁজে হতাশ হয়ে মনে হল শয্যায় কেউ ঠান্ডা জল ফেলে দিয়েছে।পরের দিন পুজো দিয়ে ফিরে আসি গৌরীকুন্ডে।ফিরতি পথে বাবার চলার সাথী হই আমিও।তার পরের দিন ভোরে অন্ধকার থাকতে থাকতে পুণ্য ভূমি বদ্রিনাথের উদ্দেশ্যে রওনা দি।থ্রি সিটার বাস—ড্রাইভারের কেবিনে ড্রাইভারের ঠিক বাঁ-দিকে মোটামুটি দেড় জনের বসার জায়গা—তাতে আমার বাবা ও বাবার আদুরে মেয়ে আমি উপবিষ্ট।প্রকৃতি তার রূপ উজাড় করে যতনে সাজিয়েছে গোটা পার্বত্যভূমিকে।চার দিকে বরফের চাদরে নিজেকে মুড়েছে পর্বতরাজি।মনে হচ্ছে রাশি রাশি তুলো যেন কেউ ঢেলে দিয়ে গেছে।নৈসর্গিক দৃশ্য দেখে চোখ—মনের মেলবন্ধন ঘটলেও প্রতিবাদ করছিল পেট তাই থামতে হল যোশীমঠে।শরীরের ইঞ্জিনে ফুয়েল ভরে রওনা হলাম আবার গন্তব্যের দিকে।বিকেলের দিকে হঠাৎ করে শুরু হয় বৃষ্টি সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া।আমাদের ছোট্ট বাহন প্রতিকূলতা ঠেলে কোন রকমে এগিয়ে চলেছে পাকদন্ডী বেয়ে।বিদ্রোহ করছিল আমাদের পাকস্থলীও এই পরিস্থিতিতে সবাই আতঙ্কিত হয়ে ওঠে।কতদূর আর কতদূর--কখন পৌঁছাব আদৌ পৌঁছাব তো!আমাদের সুদক্ষ চালক পারদর্শীতার সাথে বাহনটিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছিলেন।প্রত্যেকটি বাঁক ঘুরতে গেলেই চোখে পড়ছিল রাস্তা বেয়ে নেমে আসা সেই বিপুল জলরাশি।সন্ধ্যা সমাগতপ্রায়।অতি ক্ষিপ্রতার সঙ্গে বাঁক নেয় আমাদের বাহন যা আমাদের হৃৎযন্ত্রকেও দুলিয়ে দেয় আতঙ্কে।চালকের দক্ষতার জন্য সেই মুহূর্তে আমাদের বাহনটি খাদে পড়া থেকে রক্ষা পায়।বাহনের গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দিয়ে বাড়তে থাকে বৃষ্টি।মেঘ যেন তার সব জমা কাজ আজকে শেষ করতে বসেছে।কিছুদূর গিয়ে দেখলাম কয়েকটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।অন্য একটি যানবাহনের যাত্রীদের কথপোকথন শুনে জানা গেল প্রায় দে’ড় ক্যুইন্টাল ওজনের একটি পাথর গড়িয়ে পড়ে তাদের বাসের ছাদে।বাসটি খাদে পড়তে পড়তে বেঁচে যায়।সরু,একমুখী পাহাড়ী পথে এগিয়ে চলা প্রায় অসম্ভব।আমাদের বাসের বড়রা নেমে দেখলেন কয়েকজন মহিলা হাপুস নয়নে কান্নাকাটি করে চলেছেন—এ কান্না হচ্ছে ভয় এবং মৃত্যমুখ থেকে ফিরে আসার আনন্দের কান্না।তাঁদের কাছ থেকে জানা যায় যে,বাসের বাঁ-দিকে পাহাড় আর ডানদিকে প্রায় আড়াই হাজার ফুট নীচু খাদ।ওই পাথর পড়েছিল বাসের ছাদের ডানদিক ঘেঁষে।তারফলে বাসটা ডানদিকে কাৎ হয়ে অলৌকিকভাবে আবার সোজা হয়ে যায় পাথরটা খাদে গড়িয়ে যাওয়ার পর।যানজট কাটলে ”জয় বাবা বদ্রিনাথ” বলে আবার পাড়ি দি বদ্রিনাথের উদ্দেশ্যে।বদ্রিনাথে পৌঁছে সেখানে রাত কাটিয়ে পরেরদিন পুজো দিয়ে আবার কেদারনাথের পথে বেরিয়ে পড়ি।গতকালের বৃষ্টিতে ধ্বস নেমে রাস্তা আরো সরু হয়ে যায়।এখন আমাদের আসন খাদের দিকে।এরমধ্যে একবার আমাদের বাহনের সামনের চাকা অর্ধেক রাস্তায় অর্ধেক খাদে।পিছনের বাঁ-দিকের দুটো চাকার একটা রাস্তার বাইরে খাদের দিকে একটা ভিতরে রাস্তার উপর।সে অবস্থায় অতি দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে আমাদের চালক আমাদের প্রাণভয়কে উপেক্ষা করে তাঁর আত্মবিশ্বাসে ভর করে আমাদের সুরক্ষিত অবস্থায় পৌঁছে দেন গৌরীকুন্ডে।সেদিন একটা কথাই মনে হয়েছিল,’রাখে হরি মারে কে’।সঙ্গে উপস্থিত সকলে একবাক্যে দু’হাত জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে স্বীকার করে নেয় এসবই বাবা কেদারনাথের মহিমা।

     আজ থেকে প্রায় তেত্রিশ বছর আগের ঘটনা।মুম্বাইনিবাসী মাসীর বাড়ী থেকে এলিফ্যান্টা যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়।নির্দিষ্ট দিনে গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়ার কাছেই যে জাহাজঘাটা সেখান থেকে বেলা প্রায় দু’টোর সময় লঞ্চে চেপে রওনা দিয়েছিলাম এলিফ্যান্টা কেভের উদ্দেশ্যে।ঐতিহাসিক স্থাপত্য দেখার এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ জাগিয়েছিল মনে।যদিও এর গুরুত্ব উপলব্ধি করার বয়স তখন হয়নি।কিছু দূর যাওয়ার পর শুরু হল সমুদ্রের ঢেউ।ডেকের দুপাশে সারি দিয়ে ৬-৬০র সহযাত্রীরা বসে—এগিয়ে চলেছে লঞ্চ।প্রায় ঘন্টা খানেক চলার পর লঞ্চ যখন মাঝ সমুদ্রে তখন অপ্রত্যাশিত ভাবে ভি বেল্ট(ইঞ্জিনের সঙ্গে ফ্যানের সংযোগকারী ভি আকৃতির বেল্ট) ছিঁড়ে লঞ্চের এগিয়ে যাওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরী হয়।দ্বিতীয় কোন ভি বেল্ট লঞ্চে মজুত ছিলনা।তখন জলে যেমন মোচার খোলা এদিক—ওদিক ভাসে তেমনি ঢেউতে দুলতে লাগল আমাদের লঞ্চ।লঞ্চ ঢেউয়ের ধাক্কায় একবার ডান দিক একবার বাঁ-দিকে কাৎ হচ্ছে।ডান দিকে যখন কাৎ হচ্ছে তখন বাঁ—দিকের যাত্রীরা ডান দিকে চলে আসছে।অনুরূপ ভাবে বাঁ-দিকের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটছে।প্রাণ ভয়ে ভীত সকলেই।এই বুঝি ঢেউয়ের গ্রাসে লঞ্চ ডুবে হয় সকলের সলিল সমাধি।সকলেই নিজের আরাধ্য দেবতাকে ডাকতে থাকেন।তখন আমাদের লঞ্চের সারেংরা অন্য লঞ্চের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে এবং বার্তা পাঠাচ্ছে কারোর অতিরিক্ত ভি বেল্ট দিয়ে যদি আমাদের লঞ্চটিকে উদ্ধার করা যায়।কিছুক্ষণ পর ও.এন.জি.সি.র তৈল উত্তোলনকারী একটি লঞ্চ আমাদের বিপন্মুখ অবস্থা দেখেও সাহায্যের হাত না বাড়িয়ে চলে যায়।এই অবস্থা চলল প্রায় ৩৫ মিনিট।৩৫মিনিট পর একটি লঞ্চ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে একটা মোটা কাছি দড়ি দিয়ে আমাদের লঞ্চটিকে তার কাছে টেনে নেয় এবং প্রয়োজনীয় বেল্ট দিয়ে লঞ্চ চলার উপযোগী করে তোলা হয়।আমাদের লঞ্চে ধুতি—পাঞ্জাবী পরিহিত তখনকার দিনে এক কোটিপতি(যাঁর কথা থেকে উঠে এসেছিল)উদ্ধারকারী লঞ্চের লোককে বলতে থাকেন— যিতনা পয়সা লাগে লে লো,পর হামে উঠা লো ভাইয়া।লঞ্চের সারেঙরা দুটো লঞ্চকে খুব কাছাকাছি আনেন নি—যদি কেউ প্রাণভয়ে উদ্ধারকারী লঞ্চে উঠতে গিয়ে জলে পড়ে যান সেই কারণে।কাছি দিয়ে আমাদের লঞ্চটিকে সামনের গলুইএর পোস্টে বেধেঁ প্রায় আধঘন্টা টেনে নিয়ে যেতে থাকে যতক্ষণ না ভি বেল্ট লাগিয়ে লঞ্চ চলার উপযোগী করা হয়।

               লঞ্চের আন্দোলন আমাদের হৃদয়ে যে আশঙ্কা মিশ্রিত আন্দোলনের সঞ্চার করেছিল তা স্মৃতিচারণে আজও আন্দোলিত করে।

                         অজানা কত বিপদ –বাধা,

                          লুকিয়ে পথের খাঁজে!

                           চঞ্চল মন তবু--

                           সেথায় আশ্রয় খোঁজে।

©All copyrights are reserved by Sudeshna Dutta

২৭টি মন্তব্য:

  1. খুব সুন্দর লাগল। ধন্যবাদ। 👍👍👌👌💯💯❤❤💫💫💥💥

    উত্তরমুছুন
  2. খুব ভালো লাগলো, ভয়ে ভয়ে ছিলাম।

    উত্তরমুছুন
  3. ভ্রমন গাইড এর কাজটাও হয়ে গেলো।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. সবটা বোধহয় এখন আর হবে না।এখন আধুনিতার গ্রাসে অনেকটাই হারাতে বসেছে রোমাঞ্চ।

      মুছুন
  4. খুব ভালো লাগলো 👌👌👌💐💐💐😊😊😊

    উত্তরমুছুন
  5. A thrilling , exciting and spine chilling experience. The narration of the experience will grow the interest of the readers. I like it. I am waiting for another exciting one.

    উত্তরমুছুন
  6. খুব ভালো লাগল । ভয় লাগছিল পড়তে পড়তে । বাবারে কি ভয়ানক অভিজ্ঞতা ।🙄😳😳😳

    উত্তরমুছুন
  7. ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা । দারুণ লিখেছিস বন্ধু ।

    উত্তরমুছুন
  8. দারুন রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।।
    From Lumia Khan

    উত্তরমুছুন

  9. রোমাঞ্চক.... ভ্রমণ যাত্রার এই অভিজ্ঞতা গুলোই সেই ভ্রমণ তা স্মরণীয় করে রাখে.. অদিতি..

    উত্তরমুছুন
  10. সুন্দর রোমাঞ্চিত অভিজ্ঞতা।

    উত্তরমুছুন
  11. তোমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা দারুন লাগল ।গায়ে কাটা দিয়ে উঠলো গো।👌👌👌👌👏👏👏👏⚘⚘❤❤❤❤

    উত্তরমুছুন
  12. তোমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা দারুন লাগল ।গায়ে কাটা দিয়ে উঠলো গো।👌👌👌👌👏👏👏👏⚘⚘❤❤❤❤

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...