#বিষয় - 'হিন্দুধর্ম'
# নাম - 'হিন্দু-হিন্দুত্ব এবং বিবর্তন'
✍ - মৃদুল কুমার দাস।
(৯ম পর্ব)
উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে বঙ্কিমচন্দ্রকে হিন্দুত্ব ঘরানায় দেখার উন্মাদনা তৈরী হয়েছিল। সেই উন্মাদনার জের জাতীয় সঙ্গীত 'জনগণমন...' নাকচ করে 'বন্দেমাতরম্' করার ইচ্ছা পর্যন্ত গড়িয়েছিল।
এই প্রবণতা তৈরী হয়েছিল তাঁর 'আনন্দমঠ' উপন্যাসের নিরিখে। 'আনন্দমঠ'- এর বন্দেমাতরম সঙ্গীত প্রবল উন্মাদনা
উত্তরে সত্যানন্দ শুনেছিল - "না। এখন ইংরেজ রাজা হইবে... আর যাহা হইবে,তাহা ভালই হইবে। ইংরেজ রাজা না হইলে সনাতন ধর্মের পুনরুদ্ধার সম্ভাবনা নাই।"
বঙ্কিমচন্দ্রের এই বিশ্লেষণের মধ্যে এটাই স্পষ্ট ছিল যে পৌরাণিক যুগে তেত্রিশ কোটি দেবতা ছিল কল্পনাপ্রসূত। ব্রাহ্মণ্যশ্রেণীর স্বার্থান্বেষী মনোভাবের মূলে ছিল স্বার্থসিদ্ধির অদম্য আকাঙ্ক্ষা। তেত্রিশ কোটি দেবতার পূজা সনাতন ধর্ম নয়,সে একটা লৌকিক অপকৃষ্ট ধর্ম। ইসলামরা যাকে হিন্দু ধর্ম বলে তা আদপে আর নেই। বিধিবিধান সর্বস্ব এক প্রবল গোষ্ঠীস্বার্থ সর্বস্ব হিন্দুধর্ম।
প্রকৃত হিন্দুধর্ম জ্ঞাণাত্মক,কর্মাত্মক নয়। এই জ্ঞাণ দুই ধারার - একটি বহির্বিষয়ক, অপরটি অন্তর্বিষয়ক। ইংরেজরা বহির্বিষয়ক জ্ঞাণে অতীব সুন্দর ও পরিপক্ব। তাই ইংরেজ রাজা হোক। হিন্দুরা দেশ চালানোর একেবারেই উপযুক্ত নয়। তবে হিন্দু যদি রাজা হয় তবে সেই রাজ্যে মুসলমানের কোনো জায়গা থাকবে না। যে হিন্দু সম্প্রদায় এরূপ চাইছে এরা কোন হিন্দু সম্প্রদায়? এরাই হলেন জ্ঞাণবাদী হিন্দু। শাস্ত্রাচার,পূজাপাঠ, ভক্তির পথ ছেড়ে জ্ঞাণ চর্চার দিকে ঝুঁকলেন। জ্ঞাণ চর্চার ইংরেজ এঁদের ধ্যানজ্ঞান। তাঁরা ছিলেন ইংরেজ শাসনের পক্ষে। এই জ্ঞাণবাদী হিন্দু সম্প্রদায় শিক্ষা প্রসার থেকে একপ্রকার জাতীয়তাবাদের জন্ম হল। তৈরি হল জ্ঞাণ চর্চার আখড়া জাতীয় কংগ্রেস। এই জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম প্রজন্মের নেতারা বিশ্বাস করতেন বহুভাগ্যগুণে তাঁরা ইংরেজদের মতো শাসক পেয়েছেন। তাই কংগ্রেসের লক্ষ্য হওয়া উচিত শাসকের কাছে আবেদন ও নিবেদন করে উন্নয়নের পথে গতি আনা। আর সেই সঙ্গে লক্ষ্য রাখা এদেশীয়রা যাতে বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে।
বিপরীত ক্রমে ইসলাম সম্প্রদায়ের মধ্যেও অভিজাত শ্রেণীর মানুষের সংখ্যা কম ছিল না। তারা তাদের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য দায়িত্ব দিলেন স্যার সৈয়দ আহমেদ খানকে। আহমেদ খান ছিলেন উত্তরপ্রদেশে ব্রিটিশ কোম্পানির প্রাক্তন কর্মচারী। তিনি ছিলেন লর্ড লিটনের বন্ধু, নাইটহুড উপাধিধারী ও উত্তরপ্রদেশের আলিগড় শহরে মোহামেডান-অ্যাংলো ওরিয়েন্টাল কলেজ ( বর্তমানে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়)- এর জনক। তাদের কাছে বাঙালি অধ্যুষিত হিন্দু সংঘটন জাতীয় কংগ্রেস অস্পৃশ্য। অবশ্য জাতীয় কংগ্রেস সাম্প্রদায়িক দল এই তকমা ঘোঁচাতে মাদ্রাজ অধিবেশনে বদরুদ্দিন তোয়াবজিকে সভাপতি করা হয়। তোয়াবজী সেই অধীবেশনে সৈয়দ আহমেদের বক্তৃতা দেওয়ার আমন্ত্রণ জানালে,সৈয়দ আহমেদ সজোরে প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ স্বজাতির স্বার্থ তাঁকে বেশি ভাবিয়েছিল বলে। দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবক্তা মহম্মদ আলি জিন্নাহর কথা যে বলি তা আসলে ভুল বলি। সৈয়দ আহমেদই ছিলেন দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রথম প্রবক্তা।
১৮৮৮ খ্রীষ্টাব্দে মার্চ মাসে মেরঠের এক বক্তৃতায় বলেছিলেন - "হিন্দু ও মুসলমান শুধু দুই জাতিই নয়, দুই যুদ্ধরত জাতি। এবং ব্রিটিশরা যদি কোনো দিন ভারত ছেড়ে চলেও যায় তবে এই দুই জাতির পক্ষে একত্র রাজনৈতিক জীবন যাপন করা সম্ভব নয়।"
সৈয়দ আহমেদ কেন এই হিন্দু-বিদ্বেষী ছিলেন। কারণ অনেক। তবে প্রধান কারন সিপাহী বিদ্রোহের সময় হিন্দু অপেক্ষা মুসলমান সিপাহী বেশি অংশগ্রহণ করেছিলেন। এছাড়া ১৮৫৭ থেকে ১৮৭৮ - এর মধ্যে মাত্র ৫৭ (সাতান্ন) জন মুসলমান স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেছিলেন, সেখানে হিন্দু স্নাতকের সংখ্যা ৩,১৫৫( তিন হাজার একশ' পঞ্চান্ন) জন। একশ্রেণীর শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী হিন্দু গোষ্ঠী তৈরী হচ্ছিল যেখানে সেখানে মুসলমানেরা পরিণত হচ্ছিল শরৎচন্দ্রের 'মহেশ' গল্পের গফুর চরিত্রের মত।
সর্বোপরি সিপাহী বিদ্রোহে বাঙালীদের ইংরেজ-ভক্তি এতো বেশি প্রকাশ্যে এসেছিল,তারই জেরে তিন দশক ধরে ব্রিটিশদের সঙ্গে মুসলমানদের সম্পর্কের বড়ই অবনতি ঘটেছিল। এ গেল সৈয়দ আহমেদের সময়কালের ঘটনা।
জিন্নাহর সময়ে দ্বিতীয় ঘটনা, যেমন- খিলাফৎ আন্দোলন ব্রিটিশ বিরোধী ইসলামরা মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন। তাদের স্বার্থের পরিপন্থীর বিরুদ্ধে মুসলিম সম্প্রদায়ের এই আন্দোলন। অর্থাৎ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে ব্রিটিশরা তাদের শত্রুপক্ষীয় তুরস্কের অটোমান সুলতানকে ('খলিফা') পুনর্বার মসনদে বসাতে অস্বীকার করলে,এই ইসলামী স্বার্থ পরিপন্থী ঘটনাকে সামনে রেখে গাঁধী খিলাফৎ আন্দোলনের ডাক দেন। তাঁর নেতৃত্বে এই আন্দোলনে ভারতের সব নেতৃত্ব এক ছাতার তলায় এসেছিলেন। বিশেষ করে ইসলামীয়রা এই আন্দোলনে ব্রিটিশদের নেক নজরে ছিলেন। হঠাৎ গোরোক্ষপুরের চৌরীচৌরায় আন্দোলনকারীগণ ক্ষেপে গিয়ে পুলিশ হত্যা করে বসেন। আন্দোলন হিংসাশ্রয়ী পথ ধরে। তখনই গাঁধী মাঝপথে আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন। তিনি হিংসা-বিরোধী। এতেই জিন্নাহপন্থী দ্বিজাতিতত্ত্বের আশ্রয় জোরদার করে। তাই জিন্নাহকে দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবক্তা বলা হয়। আসলে এর আদি সূত্রকার ছিলেন সৈয়দ আহমেদ খান।
জাতীয় কংগ্রেসের এই যখন আবেদন নিবেদনের তত্ত্ব খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে, তখন বালগঙ্গাধর তিলক এই নীতির ঘোরতর বিরোধিতা করলেন। তাঁর কাছে রাজনীতির অর্থ হলো ধর্ম যুদ্ধ। ভারতীয় রাজনীতিতে আনলেন দুটি অভিনব ধারা। যার প্রথমটি হলো - প্রবল প্রতিক্রিয়াশীল হিন্দুত্ব। যার ভিত্তিস্তম্ভ হলো 'শ্রীমদ্ভাগবৎগীতা'। তাছাড়া 'Swaraj is my birth right'- অর্থাৎ স্বরাজ আমার জন্মগত অধিকার। এই উক্তি তখনকার শান্তিপ্রিয় নেতা ( সুরেন্দ্রনাথ,গোখলে,রানাডে)- দের মানসিকতার বিরুদ্ধে হাঁটার দিন ঘোষনা করলেন। আর ধর্মীয় ব্যাপারে তিলক ছিলেন অসম্ভব রকমের গোঁড়া। জাতিপ্রথা, মেয়েদের বিবাহের বয়স ইত্যাদি ব্যাপারে কোনোরকম হিন্দুর সামাজিক রীতিনীতির ক্ষেত্রে ব্রিটিশদের হস্তক্ষেপ তিনি বরদাস্ত করতেন না। এ সব কথা তিনি অকপটে বলতেন তাঁর সম্পাদিত 'কেশরী' পত্রিকায়। তিনি আসলে যা ঘোরতরভাবে অপছন্দ করতেন তা হল , হিন্দু সমাজের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে এক বিদেশী শাসক নাক গলাক।
তাঁর দ্বিতীয় ভাবনা ছিল যেহেতু রাজনীতি ধর্মযুদ্ধ, সেহেতু তিনি সহিংস রাজনীতির পোষক ছিলেন। আর এব্যাপারে গীতার ভাষ্য ছিল তাঁর প্রধান সহায়। শ্রীকৃষ্ণের অর্জুনকে উপদেশ - কর্মে অধিকার,ফলে নয়। ক্ষত্রিয় হয়ে ক্ষত্রিয়ের দায়িত্ব পালন থেকে সরে দাঁড়ানো মানে কর্তব্যের অবমাননা করা। তিলক এ থেকে কর্মযোগী হওয়ার আদর্শ প্রচার করেছিলেন। এই আদর্শে প্রভাবিত হয়েছিলেন তৎকালীন বহু বিপ্লবী। প্রভাবিত হয়েছিলেন অরবিন্দ ঘোষ। পরবর্তীকালে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুও।
তিলক হিংসার সমর্থক ছিলেন,তাবলে তিনি মোটেই মুসলমান বিদ্বেষী ছিলেন না। ছত্রপতি শিবাজিই ছিলেন তাঁর হিন্দু ভারতের জাতীয় নায়ক। স্বাধীনতা লাভের শিবাজীই ছিলেন তাঁর অনুপ্রেরণা। তবে মনে কোনো দিন এই চিন্তাও স্থান দেননি যে ভারতবর্ষ মুসলমান বিহীন হবে। বরং তিনি ১৯১৬ সালের লখনউ প্যাক্টের স্থপতি হয়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কাউন্সিল নির্বাচনে যে ক'টি আসন সংরক্ষিত তার মধ্যে চারটি আসন মুসলিম লীগকে ছেড়ে দেবেন। হয়েছিলও তাই। কিন্তু ১৯২০ সালে তিলকের মৃত্যু এই ব্যবস্থা হোচট খায়। তার ঠিক চব্বিশ বছর পরে ১৯৪০ সালে মহম্মদ আলি জিন্নাহ মুসলিমদের পৃথক রাষ্ট্র পাকিস্তান দাবি করে বসলেন। স্বাধীনতা আসন্ন দেখে সৈয়দ আহমেদ খানের ভবিষ্যৎ বাণীর রূপায়ণ ঘটান জিন্নাহ।
তিলক তাঁর এই হিন্দুত্ববাদের যোগ্য উত্তরসুরী হিসেবে পেয়েছিলেন, অর্থাৎ তিনি টেনে নিয়েছিলেন চিতপবন গোষ্ঠীরই এক তরুনকে। নাম বিনায়ক দামোদর সাভারকার। হিন্দুত্ববাদ নিয়ে দু'টি ধারা - সাভারকারের 'হিন্দুত্ব' আর মহাত্মা গাঁধীর 'হিন্দ্ স্বরাজ' কীভাবে জাতীয় আন্দোলনের অভিমুখ হয়েছিল সেই আলোচনা নিয়ে আসব পরের পর্বে।
( চলবে )
@copyright reserved for Mridul Kumar Das.
পড়িয়া মনে হইলো আপনি চরম সত্য বলিতেছেন। চলুক....
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।👌👌❤❤💫💫💥💥
মুছুনখুব সুন্দর লিখছেন।অনেক তথ্য ,চলুক
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা ❤❤💫💫🙏🙏
মুছুনবাহঃ, অপূর্ব সুন্দর লিখেছেন দাদা👌🏻👌🏻👌🏻🙏🙏🙏
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা। অনুপ্রাণিত। ❤❤❤💫💫💥💥👌👌
মুছুনসুন্দর এগোচ্ছে। 💐💐
উত্তরমুছুনআপনাকে অনেক অনেক ভালবাসা।
উত্তরমুছুনএত সুন্দর ভাবে পর্যায়ক্রমে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে রচনাটি,যে আমি পড়ে মুগ্ধ।
উত্তরমুছুনদারুণ ভাবে এগোচ্ছে।👏👏👏
উত্তরমুছুন