বৃহস্পতিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২০

বিশ্ব মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে রচিত অনু গল্প : স্বপ্ন # কলমে ~ পল্লবী



এক সকালে মায়ের প্রচন্ড চিৎকার চেঁচামেচি শুনে ঘুম ভাঙে। তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে নেমে মায়ের কাছে যেতে যেতে শুনি, কাজে সাহায্যে করা হুসনা আজকেও আসতে পারবে না জানিয়ে একটু আগেই ফোন করেছে। এ নিয়ে টানা পাঁচ দিন হলো সে কাজে আসছে না। এদিকে এক হাতে সব সামলাতে গিয়ে এই  ঠান্ডায় মায়ের বেহাল অবস্থা। এই সময় কয়েকদিনের জন্য কোন মেয়েও পাওয়া যাবে না কাজ করার। মায়ের বকবকানি শুনতে শুনতে আমি হাত বাড়ায় রুটি সেকার কাজে। রুটি বানাতে বানাতে মা বকতে থাকে," জানিস তো ওর জামাই একটা আস্ত বদমাস। ব্যাটা কুঁড়ের মহারাজা ভাবে নিজেকে। পেটে এক ফোঁটা বিদ্যা নেই, আবার সম্মান জনক চাকরি খোঁজে। দু দুটো প্রতিবন্ধী  ছেলে নিয়ে এমনিতেই ওর কষ্টের শেষ নেই, তার উপর এই নবাবজাদা বসে বসে খায় সারাক্ষণ। কাম কাজের কোন ধান্দা নেই, সারাদিন শুধু তাস পিটায়। বড়ো মেয়েটা লেখাপড়ায় এতো ভাল ছিল, ওকে পর্যন্ত বাসা বাড়ির কাজে লাগিয়ে দিয়েছে স্কুল ছাড়িয়ে!!"


শুনে আমার মনটা যেনো কেমন করে ওঠে! কি সুন্দর পরীর মতো একটা মেয়ে রেশমী। কতোই বা বয়স হতে পারে ক্লাস এইটে পড়া একটা মেয়ের?! ওই বয়সে তো সে নিজেই তেমন কোন কাজ শিখেনি, তো রেশমী কি দোষ করলো?? ওকে কেন এই খেলা - ধুলার বয়সে বইপত্র ফেলে ঝাড়ু হাতে তুলে নিতে হলো? মনটা বেদনায় ভরে যায় আমার। শেষবার যখন কক্সবাজার যাই, মা হুসনাকে দিয়ে জিজ্ঞেস করাতে বলেছিল, বার্মিজ আচার আর কাঠ বাদাম আনতে। আচার খুব ভালবাসে মেয়েটা। সাথে উপরে প্রজাপতি বসানো এক জোড়া কালারফুল থাই স্যান্ডেল ও এনেছিলাম ওর জন্য। ওর মাকে দিয়ে পাঠানোর পরে একদিন বিকেলে এসে খুশিতে জড়িয়ে ধরেছিল অনেকক্ষণ। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে শাসনের সুরে বলেছিল, "এহঃ চুল গুলোকে কেমন কাকের বাসা বানিয়ে রেখেছ! বসো তুমি। তেল গরম করে চুলে লাগিয়ে দিই।" সত্যি বলতে কি, ওর এই কচি হাতের নরম নরম ভালবাসাকে আমি প্রাণ ভরে উপভোগ করতাম। সেই রেশমী কিনা আজ সকাল সকাল অন্যর বাড়িতে বাসন মাজে??


রেশমীর মা হুসনা সেই বিয়ের আগে থেকেই আছে আমাদের সাথে। তাও ম্যালা বছর হয়ে গেলো।  রেশমীর জন্মের দুই বছরের মাথায় প্রতিবন্ধী ভাইয়ের জন্ম। তখন মা বলেওছিল স্থায়ী জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদক্ষেপ নেয়ার। বছর না ঘুরতেই আবারো প্রতিবন্ধী ছেলের জন্ম দিলো হুসনা! দু দুটো প্রতিবন্ধী ছেলের চিকিৎসা খরচ জোগাতে হিমশিম রত হুসনাকে নিয়ে একদিন সমাজ সেবা অধিদপ্তরে র আঞ্চলিক কার্যালয়ে গিয়ে নাম রেজিস্ট্রেশন করে আসি। উদ্দেশ্য..প্রতিবন্ধী শিশুদের চিকিৎসায় সরকার ঘোষিত ভাতা পাওয়া। এরপর থেকেই  বছরে দুবার পঁচিশ হাজার টাকা করে দুই ছেলের জন্য সরকারী ভাতা পায় হুসনা। অভাবের সংসারে মনে হয়না পুরো টাকাটা চিকিৎসায় খরচ করে?!  না হলে এতো ঘন ঘন তো অসুস্থ হওয়ার কথা নয়!


নাহ্,, রেশমীটাকে বাঁচাতে হবে। ওর ভবিষ্যত এভাবে নষ্ট হতে দেওয়া যাবেনা। অনেকক্ষণ চিন্তা করে এক বন্ধুকে ফোন করে সমস্ত ডিটেলস জেনে নিই। তারপর হুসনাকে ফোনে বলি যে, 'রেশমীকে যাতে পরদিন সকালে কাজ শেষে পাঠায়।' পরদিন রেশমী কে নিয়ে বাড়ি থেকে হাঁটা দূরত্বে মিশনারী স্কুলে যাই, যারা নাকি সমাজের পিছিয়ে পড়া শিশুদেরকে নাম মাত্র ফিস নিয়ে শিক্ষাদান করে, সাথে দুপুরের মিল আর বিকেলের টিফিন ফ্রি! স্কুল শুরু হবে দুপুর বারোটা থেকে। রেশমীর দিকে চেয়ে দেখি,মাথা নিচু করে চোখের পানি লুকোতে ব্যস্ত! সেই থেকে ছোট্ট রেশমীর সংগ্রামী জীবনের শুরু। সকাল বেলা দুই বাড়িতে কাজ সেরে নিজেদের ভাত রান্না করে, প্রতিবন্ধী দুই ভাইকে খাইয়ে ও স্কুলের উদ্দেশ্য রওনা দেই চোখে ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন নিয়ে। রেশমীকে আবার ওর খুশীর পাঠশালায় পাঠাতে পেরে আমরাও খুশি হই। 


সেদিনের সেই ছোট্ট রেশমী আজ মেডিক্যাল কলেজের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী! অনেক বছর হলো, এনজিওর লোনের টাকায় দেয়া হুসনার ছোট চায়ের দোকানটা কাঁচা বাজারে বেশ ভালই চলে। যদিও, ওর বড় ছেলেকে অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও বাঁচানো সম্ভব হয়নি। হুসনার অকর্মণ্য স্বামী তেমনই আছে। নিদির্ষ্ট কিছুই করেনা। বাস্তব কাহিনীকে গল্পের ঢঙে লেখার চেষ্টা করলাম।

সমাপ্ত।

Copyright©️ All rights reserved

 Pallabi Barua

৯টি মন্তব্য:

  1. খুবই সুন্দর গল্প, গ্রুপে পড়লাম।। 👍🏻💐💐💐💐

    উত্তরমুছুন
  2. দারুণ! দারুণ! ধন্যবাদ। 👌👌👍👍💯💯💯💫💫💥💥❤❤

    উত্তরমুছুন
  3. দারুণ দারুন👌👌👌👌👌👌👌🍫🍫🍫

    উত্তরমুছুন
  4. দারুণ লেখনী । অনেক শুভেচ্ছা রইলো 🤗🍫🤗🍫🤗

    উত্তরমুছুন
  5. সত্যিই বাস্তবতা গল্পকেও হার মানায় 👌👌👌👌💐💐💐💐😊😊😊

    উত্তরমুছুন
  6. বাস্তবতায় ভরপুর অনবদ্য এক গল্প। অনেক অনেক শুভকামনা তৈল।
    আপনার লেখনীর ভক্ত👏👏

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...