না পাওয়া চিঠি।
পারমিতা মন্ডল।
"আস্তে আস্তে বের কর । কোথাও যেন ধাক্কা না লাগে ।" বড় বাবু বললেন।" হ্যাঁ , গাড়িতে তোল । বডি পোস্টমর্টেমে পাঠাতে হবে ।"
নিরুপমা আজ বডি হয়ে গেল । জীবনের শেষ দিন পযর্ন্ত লড়েছিল । কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি । অনেক চেষ্টা করেছিল ঘর থেকে বেরোতে ।আজ সত্যিই সে ঘর থেকে বেরল। আজ সবাই এসেছে । কিন্তু এতদিন কেউ তার কথা শোনেনি । নিরুপমা দিনের পর দিন মায়ের জন্য কেঁদেছে । আর মাকে চিঠি লিখেছে এখান থেকে উদ্ধার করার জন্য । কিন্তু কোন চিঠিই মায়ের কাছে পৌঁছায়নি ।এটা ছিল নিরুপমার লেখা শেষ চিঠি ।
শ্রীচরনেষু মা ,,
কেমন আছো মা । বাবা , ভাই সবাই ভালো আছে তো ?মা আজ এই মোবাইল ইন্টারনেটের যুগে তোমাকে কেন চিঠি লিখছি জানো ? মনের কথা তো একমাত্র চিঠিতেই বোঝানো যায় । "মনেরকথা" । শুনে খুব অবাক লাগলো তাই না ? তোমাকে যখন আমি ফোন করি বা তোমরা যখন ফোন কর তখন আমার চারপাশে পাহারা থাকে যে । যেন একটাও বাড়তি কথা না তোমাকে বলতে পারি ! সব ভালো ভালো বলতে হয় । নাহলে কপালে জোটে অশেষ যন্ত্রণা । একবার আড়াল করে বলতে গিয়েছিলাম । ওরা বুঝে গিয়েছিল । সেবার তিন দিন খাবার না দিয়ে ঘরে আটকে রেখেছিল যে । তারপর থেকে অনেক চেষ্টা করেও তোমাদের কিছু জানাতে পারিনি । আমি যে নজরবন্দি মা ।
তোমরা অনেক খুঁজে আমার বিয়ে দিয়েছিলে বিদেশে কর্মরত বড়লোকের ছেলে অয়নের সাথে । সোনার টুকরো ছেলে হাতে পেয়েছিলে তোমরা ।আমি তখন সবে কলেজে ভর্তি হয়েছি। এতো অল্প বয়সে আমার বিয়ে করার ইচ্ছা ছিল না । আরো লেখাপড়া করার ইচ্ছা ছিল । কিন্তু এতো ভালো ছেলে তোমরা হাতছাড়া করতে চাওনি । তাই তোমাদের ইচ্ছায় আমার স্বপ্ন বলি দিয়ে হাঁড়িকাঠে মাথা দিতে হল আমায় । হ্যাঁ, ঠিক ই শুনেছো । হাড়িকাঠ ই বটে । তোমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে সায়নকে সেদিন ফিরিয়ে দিতে হয়েছিল আমাকে । ছেলেটা বড্ড ভালো বাসতো আমাকে। কিন্তু ওর তো অনেক টাকা ছিল না অয়নের মতো , তাই তোমরা ওকে মেনে নাও নি সেদিন। আমার কোন কথাতেই কান দাওনি । না লেখাপড়া করতে দিলে , না আমার ভালো বাসার মূল্য দিলে ? জানিনা সায়ন আজও আমার জন্য অপেক্ষা করে কিনা !
মাগো , একবার যদি দেখতে পেতে তোমার বড়লোক জামাই তোমার আদরের দুলালীর কি হাল করেছে ?? সেই যে বিয়ের পর এদেশে চলে এসেছি , আর তো যাওয়া হয়নি কখনোই । তোমরাও আসোনি কখনোই । যাতায়াতের খরচ যে অনেক । এদিকে অয়ন আমাকে নিয়ে যাবে না জানি । তাহলে তো ওর সব কীর্তি ফাঁস হয়ে যাবে । ও ভালো মানুষের মুখোশ পরে ঘুরে বেড়ায় । তোমাদের সাথে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে । আর তোমরা মনে কর আমি কি সুখেই না আছি !! জানো মা ওর অনেক মেয়ে বন্ধবী আছে । বেশিরভাগ রাতে ড্রিংক করে বাড়ি ফেরে । কিছু বললে , আমার উপর অকথ্য অত্যাচার করে । গায়ে ,হাত তোলে । তাই এখন আর কিছু বলি না ।সব রকমের বাজে নেশা ওর আছে ।
আমাকে বিয়ে করার জন্য ও নাকি তোমাদের কাছে যৌতুক হিসেবে পঞ্চাশ লাখ টাকা চেয়েছিল । তোমরাও নাকি দিতে রাজি হয়েছিলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুরো টাকা নাকি তোমরা দিতে পারোনি । তাই আমিও ওদের কাছে পুরো যত্ন পাইনি । তোমরা তো এসব কথা আমাকে কখনোই বলোনি মা । আমি কি তোমাদের এতটাই বোঝা হয়ে গিয়েছিলাম ? সারাদিন সংসারের সব কাজ করার পর একবার মাত্র খেতে দেয় । অনেক বার চেষ্টা করেছি এখান থেকে পালিয়ে যেতে । অথবা পুলিশে খবর দিতে । কিন্তু এখানে তো কিছুই চিনি না । তাছাড়া তোমরা আমাকে লেখা পড়াটাও শেষ করতে দাও নি । যে বেরিয়ে গিয়ে কোন কাজ করবো ।আজ আমার মৃত্যু ছাড়া আর কোন রাস্তা নেই মা ।
আমাকে বিয়ে করে অয়নের যা ক্ষতি হয়েছে সেটা সে তুলে নিতে চায় । তাই ও আমাকে সেদিন নিয়ে গিয়েছিল ওর বন্ধুদের কাছে । হোটেলে । আমি কোন বাঁধা দিতে পারিনি মা । নিজেকে রক্ষা করতেও পারিনি ।এটা নাকি আধুনিক সমাজের রীতি । সমস্ত শরীর ঘেন্নায় রি রি করে উঠলো । ঐ নর পিচাস আমাকে বন্ধুর হাতে তুলে দিয়ে পালিয়ে গেল । তারপর ভোরবেলায় ওরা গাড়িতে করে আমাকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে যায় । এর পর থেকে এমন চলতেই থাকে । আমি বাঁচার রাস্তা খুঁজছিলাম। আর পারলাম না মা । তাই নিজেকে শেষ করে দিলাম । জানি আত্মহত্যা না করে আমার লড়াই করা উচিৎ ছিল । কিন্তু আমি পারিনি । তোমাদের মতো বাবা মায়েদের কাছে একটাই অনুরোধ ,টাকা দেখে মেয়ের বিয়ে দিওনা । ছেলেকে দেখ । আর আমার মতো লেখাপড়া বন্ধ করে দিয়ে বিয়ে দিও না । বিয়ে করার থেকে মেয়েদের নিজের পায়ে দাঁড়ানো অনেক বেশি দরকার ।
তোমার সাথে আর কোন দিন আমার দেখা হবে না মা । ভালো থেকো ।
ইতি তোমার মেয়ে নিরুপমা।
আজ মা বাবা সবাই এসেছে । যখন সবকিছু শেষ হয়ে গেছে । একটু আগে যদি মেয়েকে মানিয়ে নিতে না বলে জানতে চাইতো তার অসুবিধার কথা , তাহলে হয়তো এই পরিনতি হতো না । (চিঠিটা ডাইরির মধ্যে লুকানো ছিল । পুলিশ খুঁজে বের করেছে ।)
সমাপ্ত
বাহ! বেশ সুন্দর লাগল। ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।👌💫💫💥💥💯💯💅💅
উত্তরমুছুনধন্যবাদ দাদা।
মুছুনচমৎকার লেখা।বড় মর্মান্তিক।একটা সুন্দর বার্তা সমাজকে দেওয়ার চেষ্টা করেছ।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ ।
মুছুনখুব সুন্দর এবং বড় বেদনাদায়ক লেখাটা।👏👏
উত্তরমুছুনধন্যবাদ।
মুছুন