শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২০

না পাওয়া চিঠি। (পারমিতা মন্ডল।)

না পাওয়া চিঠি।
পারমিতা মন্ডল।

"আস্তে আস্তে বের কর । কোথাও যেন ধাক্কা না লাগে ।" বড় বাবু বললেন।"  হ‍্যাঁ , গাড়িতে তোল ।   বডি পোস্টমর্টেমে পাঠাতে হবে ।"
নিরুপমা আজ বডি হয়ে গেল । জীবনের শেষ দিন পযর্ন্ত লড়েছিল । কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি । অনেক চেষ্টা করেছিল ঘর থেকে বেরোতে ।আজ সত্যিই সে ঘর থেকে বেরল।  আজ সবাই এসেছে । কিন্তু এতদিন কেউ তার কথা শোনেনি ।   নিরুপমা  দিনের পর দিন মায়ের জন্য কেঁদেছে । আর মাকে চিঠি লিখেছে এখান থেকে উদ্ধার করার জন্য ।  কিন্তু কোন চিঠিই মায়ের কাছে পৌঁছায়নি ।এটা ছিল নিরুপমার লেখা শেষ চিঠি ।

    শ্রীচরনেষু মা ,,

                কেমন আছো  মা । বাবা , ভাই সবাই ভালো আছে তো ?মা আজ এই মোবাইল ইন্টারনেটের যুগে তোমাকে কেন চিঠি লিখছি জানো ?  মনের কথা তো একমাত্র চিঠিতেই বোঝানো যায় । "মনেরকথা" । শুনে খুব অবাক লাগলো তাই না ? তোমাকে যখন আমি ফোন করি  বা তোমরা যখন ফোন কর তখন আমার চারপাশে পাহারা থাকে যে । যেন একটাও বাড়তি কথা না  তোমাকে বলতে পারি ! সব ভালো ভালো বলতে হয় । নাহলে কপালে জোটে অশেষ  যন্ত্রণা ।    একবার আড়াল করে বলতে গিয়েছিলাম ।  ওরা বুঝে গিয়েছিল । সেবার তিন দিন খাবার না দিয়ে ঘরে আটকে রেখেছিল যে ।  তারপর থেকে অনেক চেষ্টা করেও তোমাদের কিছু জানাতে পারিনি । আমি যে নজরবন্দি মা । 

         তোমরা অনেক খুঁজে আমার বিয়ে দিয়েছিলে  বিদেশে কর্মরত বড়লোকের ছেলে অয়নের সাথে ।  সোনার টুকরো  ছেলে হাতে পেয়েছিলে তোমরা ।আমি তখন সবে কলেজে ভর্তি হয়েছি।  এতো অল্প বয়সে আমার বিয়ে করার ইচ্ছা ছিল না । আরো লেখাপড়া করার ইচ্ছা ছিল । কিন্তু এতো ভালো ছেলে তোমরা হাতছাড়া করতে চাওনি ।  তাই তোমাদের ইচ্ছায় আমার স্বপ্ন বলি দিয়ে হাঁড়িকাঠে মাথা দিতে  হল আমায় ।  হ‍্যাঁ, ঠিক ই শুনেছো । হাড়িকাঠ ই বটে ।  তোমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে সায়নকে সেদিন ফিরিয়ে দিতে হয়েছিল আমাকে । ছেলেটা বড্ড ভালো বাসতো আমাকে।  কিন্তু ওর তো  অনেক টাকা ছিল না অয়নের মতো , তাই তোমরা ওকে মেনে নাও নি সেদিন। আমার কোন  কথাতেই কান দাওনি ।  না লেখাপড়া করতে দিলে , না আমার ভালো বাসার মূল্য দিলে ?  জানিনা  সায়ন আজও আমার জন্য অপেক্ষা করে কিনা !

      মাগো , একবার যদি দেখতে পেতে তোমার বড়লোক জামাই তোমার আদরের দুলালীর কি হাল করেছে ??  সেই যে বিয়ের  পর এদেশে চলে এসেছি , আর তো যাওয়া হয়নি কখনোই ।  তোমরাও আসোনি কখনোই । যাতায়াতের খরচ যে অনেক ।  এদিকে   অয়ন আমাকে নিয়ে যাবে না জানি । তাহলে তো ওর  সব কীর্তি ফাঁস হয়ে যাবে । ও ভালো মানুষের মুখোশ পরে ঘুরে বেড়ায় ।   তোমাদের সাথে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে ।  আর তোমরা মনে কর আমি কি সুখেই না আছি  !! জানো মা ওর অনেক মেয়ে বন্ধবী আছে । বেশিরভাগ রাতে  ড্রিংক করে বাড়ি ফেরে । কিছু বললে , আমার উপর অকথ্য অত‍্যাচার করে ।  গায়ে ,হাত তোলে ।  তাই এখন আর কিছু বলি না ।সব  রকমের বাজে নেশা ওর আছে ।

      আমাকে বিয়ে করার জন্য  ও নাকি তোমাদের কাছে  যৌতুক হিসেবে  পঞ্চাশ লাখ  টাকা চেয়েছিল ।  তোমরাও নাকি দিতে রাজি হয়েছিলে।   কিন্তু শেষ  পর্যন্ত পুরো টাকা নাকি তোমরা দিতে পারোনি  । তাই আমিও ওদের কাছে পুরো যত্ন পাইনি ।  তোমরা তো এসব কথা আমাকে কখনোই বলোনি মা । আমি কি তোমাদের এতটাই বোঝা হয়ে গিয়েছিলাম  ? সারাদিন সংসারের সব কাজ করার পর একবার মাত্র খেতে দেয় । অনেক বার চেষ্টা করেছি এখান থেকে পালিয়ে যেতে ।  অথবা পুলিশে খবর দিতে । কিন্তু এখানে তো কিছুই চিনি না । তাছাড়া তোমরা আমাকে লেখা পড়াটাও  শেষ করতে দাও নি ।   যে বেরিয়ে গিয়ে কোন কাজ করবো  ।আজ আমার মৃত্যু ছাড়া আর কোন রাস্তা নেই মা । 

          আমাকে বিয়ে করে অয়নের যা ক্ষতি হয়েছে সেটা সে তুলে নিতে চায় ।  তাই ও আমাকে  সেদিন নিয়ে গিয়েছিল ওর বন্ধুদের কাছে । হোটেলে । আমি কোন বাঁধা দিতে পারিনি মা ।  নিজেকে রক্ষা করতেও পারিনি  ।এটা নাকি আধুনিক সমাজের রীতি । সমস্ত  শরীর ঘেন্নায় রি রি করে উঠলো । ঐ নর পিচাস আমাকে বন্ধুর হাতে তুলে দিয়ে পালিয়ে গেল । তারপর ভোরবেলায় ওরা গাড়িতে করে আমাকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে যায় ।  এর পর থেকে এমন চলতেই থাকে । আমি বাঁচার রাস্তা খুঁজছিলাম। আর পারলাম না মা । তাই নিজেকে শেষ করে দিলাম । জানি আত্মহত্যা না করে আমার লড়াই করা উচিৎ ছিল ।  কিন্তু আমি পারিনি । তোমাদের মতো বাবা মায়েদের  কাছে একটাই অনুরোধ  ,টাকা দেখে মেয়ের বিয়ে দিওনা । ছেলেকে দেখ । আর আমার মতো লেখাপড়া বন্ধ করে দিয়ে বিয়ে দিও না । বিয়ে করার থেকে মেয়েদের নিজের পায়ে দাঁড়ানো অনেক বেশি দরকার । 
         তোমার সাথে  আর কোন দিন আমার দেখা হবে না মা ।   ভালো থেকো  ।
                                   ইতি তোমার মেয়ে নিরুপমা।

আজ মা বাবা সবাই এসেছে । যখন সবকিছু শেষ হয়ে গেছে । একটু আগে যদি মেয়েকে মানিয়ে  নিতে না বলে  জানতে চাইতো তার অসুবিধার কথা , তাহলে হয়তো এই পরিনতি হতো না । (চিঠিটা ডাইরির মধ্যে লুকানো ছিল । পুলিশ খুঁজে বের করেছে ।)

         সমাপ্ত






        


৬টি মন্তব্য:

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...