শনিবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০২০

বিষয় : বিশ্বাস ( অনুগল্প)# নাম :স্টেলা পবিত্র আলো # লেখা : শর্মিষ্ঠা ভট্ট




 

স্টেলা পবিত্র আলো

" কি ম্যাম হোটেল চাই? " কানে দুল পরা ছেলেটা অনেক্ষণ থেকে পিছনে ঘুরছে। হোটেলের দালাল। ছোট যায়গায় অনলাইনে সব হয় না। কটা চোখ সোনালী চুল , নীল ফাটা জিন্স , ওপরে ইন্ডিয়ান পাঞ্জাবি। ঘুরে দেখছে পাহাড়ি গ্রামটা। ওর মনে হয় না এখানে থাকার দরকার আছে। ভারতের পূবের কোন থেকে সে উদিত সূর্য দেখবে। ভেনিজুয়েলার অখ্যাত শহর থেকে এই উদ্দেশ্যে সে পথে পাড়ি জমিয়েছে। ওর পূর্ব নির্ধারিত স্থানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সে ছোট দর্শনীয় ভিউ পয়েন্ট গুলো ছুঁয়ে যাচ্ছে। নিজেই 🚙গাড়ী চালাচ্ছে ।  দুবার তিনবার "নো" বলার পর শুনছে না দেখে , চুপচাপ দেখে তাড়াতাড়ি জায়গাটা ছাড়তে চায়। দূরের অসাধারণ প্রকৃতি, ওকে সব ভুলিয়ে দিয়েছে। ছেলেটার প্রতি বিরক্তি সরে গেছে মন থেকে। সবুজ সমুদ্রে ছোট বোটের মতো দেখতে লাগছে বিস্তৃতি পাহাড়ের বুকে সাদা ছোট বাড়িগুলো। অবাক চোখে দেখে মানুষ আর সৃষ্টিকর্তার অসাধারণ স্থাপত্যকে।স্টেলা ব্রাউনের চোখে নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যের মাদকতা, সৌন্দর্য্যে পিপাসু সাতাশ বছরের মাক্রো বায়োর  সদ্য তরুণী প্রফেসর । নিষ্পাপ চোখ মেলে দেখে এই ইন্ডিয়া নামের দেশটির অপরূপ অনন্য রূপ। নীল আকাশ দেখে নিয়ে পরিতৃপ্ত সে চোখ ঘোরায়। আর ঠিক সামনেই ছেলেটা। মনটা খিঁচড়ে যাচ্ছে, তবু একবার ভাবলো......... গরীব দেশ ভারতের এমন যুবক  অনেক আছে। হয়ত ভাত বিতের কারনেই এমন পেছনে পড়ে আছে। সোজা তাকালো এবার। ইংরেজি ভেঙে ভেঙে বলল " নাম কি? কি চাই?  হোটেল নেব না বললাম তো। অন্য কাউকে দেখ না? "...... ছেলেটা আর ওকে হোটেলের জন্য বলেনি, তবে কেমন যেন হাসিটা! এরা কি এমন করে বিদেশি দেখে? হ্যাঁ, ওর বন্ধু পিটারসন এমন বলেছিল বটে। বিদেশি দেখলে হাঁ করে দেখে। প্রতি কাজ লক্ষ্য করে , সামান্য কারনে গায়ের কাছে সরে এসে ব্যক্তিগত বিষয়ে মাথা গলায়।অবশ্য এ সব ওদের গেঁও কৌতূহল মাত্র। বিপদে পড়লে ওরাই তোমায় সাহায্য করে দেবে। ব্যাপারটা একটু বিরক্তিকর। শান্তিতে হ্যান্ডেল করলে,ব্যাপারটায় আনন্দ নেওয়া যায়।

রাত অনেক হল ফিরেয়েই আসতে হল। লাঞ্চের পরেই ছোট পাহাড়ি গ্রাম ছেড়েছিল। কিন্তু এমন রোড ব্লক!! ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে একটু গাড়ির সারি এগোতেই পারল না। পেছন থেকে খালি হয়ে যের যার  ফেরা পথ ধরল। অগত্যা স্টেলাকে ফিরতে হল। ছেলেটা কি জানতো ও আসবে? বসে আছে পথের মোড়ে। এবার ছেলেটা আর কিছু বলল না । স্টেলা কাঁচ নীচু করে গলা চড়ালো " হেই ফ্রেন্ড , রুম পাবো?"
ছেলেটা শুনতে পাইনি নাকি....এমন একটা ভাব করল যেন সকালের শোধ তুলছে।ওখানে বসে খৈনিরগড়ায়,
স্টেলা আরও দুবার বলতেই জানলার গা ঘেসে দুটো ছেলে হঠাৎ এগিয়ে এলো। স্টেলা চমকে একটু মুখটা পিছিয়ে নিল। ছেলে দুটো ওর গাড়িতে গা এলিয়ে বলে ওঠে " মেমসাব, কেমন ঘর চাই ? সব রকম ঘর খালি আছে।" উঠে এসে দাঁড়াল এবার আগের ছেলেটা।
" এই জগদীশ, মেমসাব আমার খদ্দের। সকালে বলে রেখেছে। " " তবে এতক্ষণ কি করছিলি? মালটা ফ্রেন্ড ফ্রেন্ড করে চেঁচিয়ে মরছে। " বাজে ভাবে অট্টহাস্য করে সরে গেল ওরা। আবার চলে যাচ্ছিল ছেলেটা। স্টেলা গাড়ি থেকে তাড়াতাড়ি নেমে বলল " স্টপ! থামো, ঘর হবে? " " না নেই... রোড বন্ধ হতে সবাই নিয়ে নিয়েছে । এত রাতে আর কিছু হবে না। " " আমি কি করবো? তবে ওদের তাড়ালে কেন? "  ছেলেটা বেশ কিছুক্ষন ওকে দেখে বলল " আমার ঘর আছে যাবে? মা আর বোন থাকে। " " কতদূর? " বিশ্বাস হয় তো চলো " । " অগত্যা "....... ছেলেটার চেনা এক দোকানের সামনে গাড়ি রেখে হাঁটা লাগালো ওর পিছু পিছু। মনে খটকা নিয়ে হাঁটছে স্টেলা। নীরবতা পাহাড়ি পায়ে চলা পথে বিরক্তিকর লাগছে। তাই জিজ্ঞেস করল " নাম কি? " " মনি" আর কি বলবে? কেমন যেন লাগছে, তাই আবার বলে.. "কতটা আর" "ওই ঘরটা".. ঢালের গায়ে একটা কুঁড়ে দেখালো। ভালো করে দেখার আগেই "আঁক্" করে শব্দ হল। মনি! " স্টেলা আর্ত চিৎকার করে ওঠে। ওর মুখ চেপে ওরা ততক্ষণ গাড়িতে তুলছে ওকে। অজ্ঞানের জন্য কিছু ব্যবহার করেছে।নিদ্রালু চোখে দেখে ছিল মনি রক্তাক্ত। রাস্তায় শুয়ে ।

ওরা চার পাঁচ দিন ওর ওপর পাশবিক অত্যাচার করে ছিবড়ের মতো পাহাড় থেকে ফেলে দেবার ধান্দায় আছে। স্টেলা জানে তার দেহ রক্তাক্ত, ছেঁড়া কাঁথার মতো থেতলানো দুমড়ে মুচড়ে নোংরা করে ফেলে রেখেছে। এখনও কি কিছু বাকি! "হে শয়তান, আমায় পূবের সূর্য্য দেখতে দে একবার। " এখনো অসংলগ্ন বিড় বিড় করে চলেছে সে। কিসের চেঁচামেচি? অনেক মানুষ! সে কি স্বপ্ন দেখছে? শুয়ে থাকা চটটা টানাটানি করে দূর্বল হাতে।ও চায় না যদি আরও কেউ আসে! ওর উলঙ্গ দেহটা দেখে। ঠান্ডায় জমে গেছে তার শরীর। অনেক মানুষ আর অনেক টর্চ এগিয়ে আসছে। ও কাউকে দেখছে না অনেক টর্চের আলো ওকে দেখছে।

মনি আজ পনের দিন পরে অরুণাচলের শেষ বিন্দুতে স্টেলার পরিচিত সেই জায়গায় ওকে নিয়ে এসেছে। এখনও দুর্বল সে।তবু ফুলের মতো পবিত্র মেয়েটাকে একা ছাড়তে পারেনি ওর মা।ওকে সাথে পাঠিয়েছে। উদিয়মান সূর্য্যর দিকে হাত ছড়িয়ে শ্বাস নিচ্ছে স্টেলা। প্রচন্ড খুশি সে।তাকে দেখে বোঝা যাবে না কিছু ঘটে গেছে।প্রকৃতিকে বুক ভরে নিচ্ছে...মনের কোনায় কোনায় পূবের সূর্য্য কিরন ধৌত করছে তাকে।অপূর্ব অপার্থিব সে দৃশ্য যেন স্টেলার উপস্থিতিতে স্বর্গীয় আবেশে ভরিয়ে তুলেছে।স্টেলা বিড় বিড় করে বলছে " হে পরম সত্য, জীবন এত সুন্দর! ধন্যবাদ সব কিছুর জন্য ধন্যবাদ।  মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারাতে দাওনি।আমি বিশ্বাস করতে পারি এখনও, এখনও আশায় বুক বাঁধতে পারি। হে অপরূপ , 🌸 পৃথিবী তোমার আলোয় আলোকিত করো। আমি বাঁচতে চাই এই সুন্দর পৃথিবতে। বাঁচাতে চাই। "


১৩টি মন্তব্য:

  1. বাহ্! অসাধারণ! ধন্যবাদ। 👌👌👍👍💯💯❤❤🙏🙏

    উত্তরমুছুন
  2. ধন্য 🙏❤❤❤❤❤❤❤🍫🍫🍫🍫🍫💐💐💐💐

    উত্তরমুছুন
  3. খুব সুন্দর গল্প 👌👌👌👌💐💐💐💐💐

    উত্তরমুছুন
  4. কি অপূর্ব লিখেছ,ভীষণ ভালো লাগল 👌👌👌👏👏👏❤❤❤❤⚘⚘

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...