মঙ্গলবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০২০

বাহা উৎসব।

বাহা উৎসব।

পারমিতা মন্ডল।

গাড়ি ছুটে চলেছে হু হু করে মেঠো রাস্তা দিয়ে । শহরের কোলাহল, হৈ হুল্লোড় ছেড়ে দু'দিনের ছুটিতে চললাম নির্জনতা কাটাতে। শহর থেকে দূরে দিনাজপুরের ছোট্ট একটি গ্রাম মহেশপুরে । আমার  সাঁওতালি বন্ধু শিবু সোরেনের  ডাকে  ।  ওদের "বাহা" উৎসব দেখার জন্য । আমি  কখনো সামনে থেকে আদিবাসীদের  এই উৎসব দেখিনি। টিভিতে দেখেছি । তাই বন্ধুর ডাকে ছুটে চললাম তাদের গ্রামে মহেশপুরে ।

    শিবু সোরেন কিভাবে আমার বন্ধু হলো তাইতো ?  কলেজে পড়ার সময় ওর সাথে আমার আলাপ।  আজকাল আদিবাসীদের ছেলেমেয়েরা লেখা পড়া করে ।  কেউ এগিয়ে এলে সরকার থেকে অনেক সুযোগ সুবিধা দেয় মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের।  শিবুও খুব মেধাবী ছাত্র ছিল । কিন্তু ঐ গায়ের রং আর কথা বলার ধরন দেখে সবাই বুঝে যেত ওরা আদিবাসী। তাই তেমন কেউ ওর সাথে মিশতো না । ও নিজেও কিছুটা গুটিয়ে থাকতো  ; শহরের আদব কায়দা ঠিক ঠাক বুঝতে পারতো না বলে। মেয়েরা ওকে নিয়ে খুব হাসিঠাট্টা করতো ।ও কিছু মনে করতো না । বেঞ্চের এককোনে চুপ করে বসে নিজের মতো পড়া শুনতো, নোট নিত চলে যেত। যেন কিছুই হয়নি এমন মুখ করে । কিন্তু শিবুর ছিল প্রচণ্ড মেধা শক্তি। আর সেই মেধা শক্তি দিয়ে সে একদিন সকালের মন জয় করে নেয় ।  কলেজের ফাস্ট সেমিস্টারে  সবার থেকে বেশী নাম্বার পেয়ে শিবু নজরে চলে আসে ।  তখন সবাই একটু একটু করে ওকে ভালো বাসতে থাকে।এভাবেই ওর সাথে আমার বন্ধুত্ব  হয়। আজ সেই শিবুর ডাকে চলেছি তাদের গ্রামে "বাহা,"উৎসব দেখতে।
   
"  বাহা" হলো সাঁওতাল আদিবাসীদের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসব।" বাহা" কথার অর্থ হলো ফুল বা কুমারী কন্যা । তাই এই উৎসবকে  ফুলের উৎসব বা বসন্ত উৎসবও বলা চলে । শিবুর কাছেই শুনেছি শাল, পলাশ ফুল ফোঁটার সাথে সাথেই" বাহা" উৎসবের  আগমনী বার্তা ঘোষিত হয়ে যায়। মহুল ফুলের কুঁড়ির সাথে শাল, পিয়ালের বন যখন সেজে ওঠে তখন শুরু হয় বাহা উৎসব। ওদের এই উৎসবে প্রকৃতি পুজারীও যেন আনন্দে নেচে ওঠে। গাড়িতে যেতে যেতে শিবুর কাছে অনেক কিছু জানতে পারলাম ওদের এই উৎসব সম্পর্কে। আমার তেমন কোন ধারনাই ছিল না এ সম্পর্কে। বেশ ভালো লাগছিল । মনে মনে  উৎসব দেখার আগ্রহ  বেড়ে গেল ।ভাবলাম উৎসব দেখার আগেই কিছুটা জেনে নেই তার সম্পর্কে।

   শিবু আরো বলল," জানো তো বন্ধু এই উৎসবের সময় অর্থাৎ ফাল্গুন মাসে , প্রকৃতি যেন নতুন জীবনী শক্তি ফিরে পায় । নারীরা যেমন বয়ঃসন্ধি কাল পার করে নতুন জীবনী শক্তির অধিকারী হয়, তেমনি প্রকৃতিও যেন নতুন ভাবে জীবনী শক্তি ফিরে পায়।  এই পুজোর আগে মেয়েরা নতুন ফুল খোঁপায় দেয়না আর ছেলেরাও পুজোর আগে শিকারে যায় না ।

   আমাদের পৌঁছাতে বিকেল গড়িয়ে গেল। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে শিবুদের গ্রাম মহেশপুর । শাল, পিয়াল, মহুলের  মহুলের ছায়ায় ঘেরা  মহেশপুর গ্রাম যেন নব বধূ রূপে সেজে উঠেছে।। দূর থেকে মহুলের গন্ধ যেন নাকে ভেসে আসছে। সত্যিই এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে । গাড়ি থেকে নেমে আমরা ভ‍্যানে উঠলাম । এবড়ো- খেবড়ো রাস্তার মেঠো পথ ধরে ভ‍্যান এগিয়ে চলেছে।  কি অপরূপ প্রাকৃতিক  দৃশ্য । মন জুড়িয়ে যায় । ভ‍্যান এসে থামলো একটি মাটির বাড়ির কাছে ।  গোবর দিয়ে নিকানো উঠোন পেরিয়ে , একমাথা ঘোমটা দিয়ে বেরিয়ে এলেন এক মহিলা।  ইনি শিবুর মা ।  ওর বাবাও ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন  তাড়াহুড়ো করে । সে কি আথিতেয়তা । আমার যেন কোন অসুবিধা না হয় তার জন্য  রীতিমতো ছোটাছুটি  শুরু ক‍রে দিলেন । শহরে এমন অভর্থনা কখনোই পাইনি । খুব সহজে এরা আমাকে আপন করে নিল।
  
   কথা বলতে বলতে  পিছনে ফিরতেই হঠাৎ একটি চোখের সাথে চোখাচোখি হয়ে যায় ।  মনে হলো সে অনেকক্ষন ধরে  অপলক দৃষ্টিতে আমাকে দেখছিল। আমার চোখ পড়তেই পালিয়ে গেল । শুধু তার শাড়ির আঁচলটাই আমি দেখতে  পেলাম।  আমাকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে  শিবু বলল, "ও  আমাদের রাই, । এখানে থাকে না । উৎসব উপলক্ষে এসেছে। তোমাকে দেখে পালিয়ে  গেল। " দূর থেকে দেখলাম একটি শাড়ির আঁচল  উড়তে উড়তে যেন শাল- পিয়ালের বনে মিলিয়ে গেল ।

    সবাই মিলে দাওয়ায় বসে চা খেতে খেতে  শিবুর বাবা বললেন-"-পরের দিন  সকালে উৎসব শুরু হবে । তিন দিন ধরে এই উৎসব পালন ক‍রা হয়। কাল তার প্রথম দিন । এই উৎসবের মধ্য দিয়ে দেবতা জাহেরএরা , মরেকু  ,তুবইকর সন্তষ্টি লাভ করে । নিয়ম মেনে  "বাহা "পরবের  "আগের দিন অর্থাৎ আজ   গ্রামের "জাহের থান" ও "মাঝির থান" খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে । শিবুর বাবা  হলেন এ গ্রামের সর্দার । সবাই ওনাকে মান‍্য করে চলে। তাই কাল ওনার ও অনেক দায়িত্ব। উনি আরো বললেন, "  সাঁওতালরা মনে করে নতুন সবুজ পত্র পল্লবে সেজে ওঠা  ধরনী হলো পবিত্র কুমারী কন্যার প্রতীক। তাই পরব শুরুতেই দেবতাকে  শাল ও মহুল ফুল উৎসর্গ করা হয়। অনুষ্ঠানে সাঁওতালরা শাল ফুলকে বরণ করে নেয়, এবং এর পরেই নারীরা রং- বেরঙের ফুল পরে খোঁপায়।

   খুব উৎসাহ নিয়ে পরের দিন সকালে গেলাম উৎসব প্রাঙ্গণে । শিবু নানা  কাজে ব‍্যস্ত হয়ে পড়লো । তাই একা একা এদিকে ওদিকে ঘুরছি । ,হঠাৎ মনে হলো কাল দেখা সেই মেয়েটি  দূরে দাঁড়িয়ে আমাকে দেখছে এক মনে । গলায় ক‍্যামেরা ঝোলানো এমন সুট- বুট পরা শহরে মানুষের সাথে এদের পরিচয় খুব কম। তাই হয়তো অবাক হয়ে আমাকে দেখছে । কি নাম যেন বলেছিল শিবু?" রাই"। বাঃ বেশ সুন্দর নাম । আমি রাই বলে ডাকতেই চলে এলো আমার কাছে । না আজ তো কোন জড়তা নেই । পালিয়েও গেল না । বরং দু- চারটে কথা বলার পর বেশ ভাব হয়ে গেল ওর সাথে । আর পাঁচটা সাঁওতাল মেয়েদের থেকে রাই পুরো আলাদা।  হাঁটতে হাঁটতে আমরা উৎসব প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলাম।

    রাইয়ের কাছ থেকে  শুনলাম  এই পুজোর রীতিনীতি ।  রাই বলল --"মহেশপুর গ্রামের একটু উঁচু তিনটি ধণুক গেঁড়ে দেওয়া হয়েছে।পুজোর নিয়ম অনুযায়ী একটি কুলোর মধ্যে রাখা হয়েছে ধান, চাল, সিঁদুর,দূর্বাঘাস আর বেশ কিছু শাল ফুল। পাশেই বলি দেওয়া হবে কয়েকটি লাল মুরগি। এটি "বাহা পরবের"  নিয়ম। এই বলি দেওয়া মুরগি দিয়ে খিচুড়ি রান্না হবে। "  আমি অবাক হয়ে শুনছি । মুরগি দিয়ে খিচুড়ি । আগে কখনোই শুনিনি । রাই আরো বলল --"এই বাহা পরবের অনেক নিয়ম আছে। যে পু্রোহিত পুজো করবেন তাকে  উপোস করে আগের দিন রাত জেগে মাটিতে শুয়ে থাকতে হয়। তারপর সাঁওতাল মেয়েরা পরের দিন তাকে বাড়ি থেকে বন্দনা করে পুজাস্থলে নিয়ে আসে। পুরোহিত  পুজাস্থলে এসে উচ্চকন্ঠে মন্র উচ্চারণ করেন এবং গ্রামের কল‍্যাণের জন্য দেবতার কাছে প্রার্থনা করেন। তারপর বলি দেওয়া এই পশুর মাংসের খিচুড়ি প্রত‍্যেক বাড়ীতে পৌঁছে দেওয়া হয়। সব রান্নাই গ্রামের মেয়েরাই আনন্দের সাথে করে ।  কিছুক্ষনের মধ্যেই শুরু হয়ে গেল উৎসব।, আমিও  ওদের এই উৎসবের সামিল হয়ে গেলাম।

পুজো শেষ হলো বিকেলের দিকে । এবার ওরা পুরোহিতকে সঙ্গে নিয়ে দল বেঁধে চলল গ্রামে।  আমিও চললাম ওদের সাথে ।পুরো অনুষ্ঠান ক‍্যামেরা বন্ধি করে রাখার জন্য । নরনারীরা পুরোহিতকে ঘিরে শুরু ক‍রলো সাঁওতাল নৃত্য। পুরোহিতের মাথায় শালফুলের ডালা আর সঙ্গে একটি  যুবকের মাথায় কলসি ভরা জল। ওদের পিছে পিছে আমিও চলেছি। এক এক বাড়ির উপর দিয়ে যাওয়ার সময় গৃহস্থরা পুরোহিত ও যুবকটির পা ধুইয়ে দিচ্ছে, আর পুরোহিত তাদের পবিত্র শাল ফুল দান করছে। তাদের বিশ্বাস" বাহা পরবে" এইভাবে ফুলরূপে দেবতা তাদের ঘরে প্রবেশ করে।

শাল ফুল বিতরনের পর শুরু হলো আনন্দ নৃত্য। সাঁওতাল পুরুষেরা  বাজায় মাদল- ঢোল ,তার তালে তালে ঝুমুর নাচে মেয়েরা। সে এক অপরূপ দৃশ্য। রাইও ওদের সাথে তালে তাল মিলিয়ে নাচতে শুরু করলো । এ এক অপরূপ দৃশ্য । সাঁওতালি মেয়ে রাই, কুচকুচে কালো  গায়ের রঙ, তবুও তার ডাগর দুটি চোখে একটি মোহময়ী আবেদন আছে । যা এক নিমেষে আমাকে ভালো লাগায় ভরিয়ে দিল।

দ্বিতীয় দিনের যে উৎসব হলো তার নাম হলো "বাহা বাস্কে"।(এক রাতের বাসি) এদিন ওরা একে অপরের গায়ে জল ছিটিয়ে  অনুষ্ঠান পালন করে। তাদের বিশ্বাস এই জল ছিটানোর মধ্য দিয়ে পুরনো যত হিংসা, বিদ্বেষ, শত্রুতা আছে  তা দূর ,হয়ে যায়। ফলে পরস্পরের মধ্যে তৈরী হয় বন্ধুত্বের সেতুবন্ধন।

তৃতীয় দিনেও চলল নানা আনন্দের আয়োজন। এই আনন্দ উৎসবে গান ও নারী পুরুষের সন্মিলিত বাহা দান ও জতুর দান নাচ পরিবেশন করেন সাঁওতালরা। এই নাচ গানের মধ্য দিয়ে তৃতীয় দিনে "বাহা" উৎসবের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

   শহর থেকে দূরে, কোলাহল পেরিয়ে প্রকৃতির সান্নিধ্যে এই তিনটি দিন বেশ ভালোই কেটে গেল । এবার আমার ঘরে ফেরার পালা । সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে , মনে এক আনন্দের রেশ নিয়ে ফিরে চললাম কলকাতার উদ্দেশ্য। কিন্তু সবাইকে দেখলেও রাইকে তো কোথাও দেখলাম না । কোলাহল মুখর কলকাতায় ফিরে এলাম। আবার নিত্য দিনের ব‍্যস্ততায় ডুবে গেলাম । তবুও কাজের ফাঁকে এখনো মাঝে মাঝে  সেই ডাগর দুটি চোখ মনের মধ্যে ভেসে ওঠে। কবির ভাষায় বলতে ইচ্ছা করে ----"ও সে যতই কালো হোক , আমি দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ।"

সমাপ্ত।
কলমে----- পারমিতা মন্ডল।


১১টি মন্তব্য:

  1. বাহা উৎসবটি সম্পর্কে অনেক কিছু জানলাম।সুন্দর লিখেছ।

    উত্তরমুছুন
  2. বেশ ভালই লাগল। অসাধারণ! ধন্যবাদ। 👌👌💫💫💥💥❤❤💅💅

    উত্তরমুছুন
  3. বাহা উৎসব শুনেছি। কিন্তু এতটা জানতাম না।
    ধন্যবাদ 💕

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...