Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
করিমগঞ্জ জেলার দত্তপাড়া গ্রামের ব্যানার্জী বাড়ির ছোটমেয়ে বিদিশা | আজকে ওর উচ্চ মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরিয়েছে | প্রতিটি পরীক্ষার মতো এই পরীক্ষাতেও দুর্দান্ত রেজাল্ট করেছে ও | বাড়িতে ওর মা - বাবা - দাদা খুব খুশি |
সারা পাড়ার লোককে মিষ্টি বিতরণ করে মেয়ের গর্বে গর্বিত বিনয়বাবু বাড়ি ফিরে দেখলেন , মেয়ে মুখটাকে তেলো হাঁড়ির মতো কালো করে বসে আছে , আর বিদিশার দাদা নবেন্দু খুব আস্ফালন করছে |
বিনয়বাবু চোখের ইশারায় ওনার স্ত্রী সবিতা দেবীকে জিজ্ঞাসা করলেন কি ব্যাপার ?
সবিতাদেবী : তোমার মেয়ের কান্ডজ্ঞান বলে কিছু আছে ? এখানকার কলেজে ভর্তি না হয়ে ওনার ইচ্ছে হয়েছে শিলচর শহরে গিয়ে সেন্ট অগাস্তিন ওম্যান্স কলেজে ভর্তি হবে | নবেন্দু আমাকে বলছিলো , শিলচর শহরে চেনাজানা না থাকলে খুব মুশকিল | একেই তো বহু লোকের বসবাস , তার ওপর খুব গাড়ি- ঘোড়ার ভীড় ওখানে | এই মেয়ে ওখানে গিয়ে পড়বে বলে জেদ ধরেছে , আর দাদার সাথে মারপিট করেছে | খেয়েছেও দুটো চড় , তাই এখন মুখটা বাংলার পাঁচ করে বসে আছে |
বিদিশা এতক্ষন চুপ করে বসে সব কথা হজম করছিলো , এখন ওর বাবার সামনে উঠে এসে কান্না শুরু করে দিলো , ' বাবা , আমি সেন্ট অগাস্তিন কলেজে ফিজিক্স অনার্স নিয়ে পড়তে চাই | তুমি কারুর কথা শুনবেনা , তুমি আমাকে ওই কলেজে ভর্তি করিয়ে দাও বাবা | আমি কথা দিচ্ছি একদম রাস্তায় বেরোবোনা শিলচর গিয়ে | কলেজে পড়বো আর হোস্টেলে থাকবো | তুমি অমত কোরোনা বাবা | '
মেয়ের করুণ আবদার শুনে বিনয়বাবু আর থাকতে পারলেন না | স্ত্রী এবং ছেলের বিরুদ্ধে গিয়ে মেয়েকে কথা দিলেন , ' তুই যা চাইছিস , তাই হবে মা | তুই আর কাঁদিসনি | তোর কান্না আমি সহ্য করতে পারিনা |
বিদিশা বাবার কথা শুনে আনন্দে লাফিয়ে উঠে বাবার গলা জড়িয়ে একটা হামি দিয়ে দিলো গালে | নবেন্দু আর সবিতাদেবীও সিন দেখে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন | নিমরাজি হয়েও ওরা বিদিশার শিলচর যাত্রায় মত দিয়ে দিলেন |
এবারে আমাদের বিদিশার একটু বর্ণনা দেওয়া যাক | বেশ ফর্সা গোলগাল চেহারা (36 - 36 - 36) , চোখে সোনালী ফ্রেমের বড়োসড়ো চশমা | সাধারণত মাথার দুপাশে দুটো বিনুনি বেঁধে রাখাই ওর কাছে সুবিধাজনক | আসলে নিজের সাজপোশাক বা শরীরের মাপজোক নিয়ে ও কোনোদিনই ভেবে দেখেনি | ওর মা- ই এসব খেয়াল রাখেন |
আর আমরা সবাই জানি , মায়েরা খেয়াল রাখলে বাচ্চাদের সাধ্য নেই যে কম খেয়ে উঠে পড়বে | সেইজন্যই ছোটবেলা থেকে খাওয়া দাওয়ার দিকে ঝোঁকটা ওর বেশ বেশিই |
তাছাড়া আমাদের বিদিশা খুব ভালো গান করতে পারে | লতা - আশা থেকে শুরু করে সুনিধি চৌহান - নেহা কক্কর সবার গানই খুব ভালো তুলে নেয় কয়েকবার শোনার পরেই |
একটা অনন্য বৈশিষ্ট্য আছে ওর মুখে | মুখটা লাবণ্যময় এবং মায়াভরা চোখদুটি নিষ্পাপ শিশুদের মতো সরল |
কিন্তু আমরা জানি , এই দুনিয়া হলো কঠোর , এখানে টিকে থাকার জন্য সরল হয়ে থাকলে চলবেনা | ওই কথায় আছে না , ' নরম মাটি খুঁড়তে মজা | '
যাইহোক , সবিতাদেবী চোখের জলে ভেসে কলিজার টুকরো মেয়েকে শিলচর সেন্ট অগাস্তিন কলেজে ফিজিক্স অনার্স পড়তে পাঠালেন |
বিনয়বাবু আর নবেন্দু বিদিশাকে নিয়ে সকাল সকাল রওনা হয়ে গেলো | সন্ধ্যার ট্রেনে বাড়ি ফিরতে হবে ওদের দুজনকে | সকাল দশটা নাগাদ ওরা সেন্ট অগাস্তিন কলেজের সামনে পৌঁছলো |
আগে থেকে এডমিশন সংক্রান্ত সব নিয়মকানুন সমাধা হয়েই ছিল | কলেজের ইউনিফর্ম , রুটিন , খাতা - পেন - পেন্সিল সব গুছিয়ে নিয়ে বিদিশা হোস্টেলের দিকে রওনা হলো | সাথে ওর বিশাল বড়ো দুটো ব্যাগও রয়েছে , যার মধ্যে কাপড়-চোপড়ের থেকে খাবার-দাবারের পরিমান অনেক বেশি |
বিনয়বাবু আর নবেন্দু ওকে হোস্টেল পৌঁছে দিয়ে এলেন | তারপর এলো বিদায়পর্ব | দাদা আর বাবাকে জড়িয়ে ধরে বিদিশার সে কি কান্না | কিন্তু নিজের ভবিষৎ ও নিজেই পছন্দ করে নিয়েছে | তার দায়ও নিশ্চই ওকেই নিতে হবে |
মেয়েকে শান্ত করে , ছেলের সাথে বিনয়বাবু বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন |
সেন্ট অগাস্তিন কলেজে প্রবেশ করার সময় যে পরিমাণ উৎফুল্লতা বিদিশার মনে ছিল , তা ধীরে ধীরে ম্লান হতে আরম্ভ করলো | কেন ? আগামী পর্বে তার উত্তর পাওয়া যাবে |
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
প্রথমদিন হোস্টেলে বাবা আর দাদা বিদিশাকে ছেড়ে চলে যাবার পর ওর মনটা বেজায় খারাপ | তার মধ্যে গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো এসে জুটলো ওর রুমমেট |
রুমিটাকে দেখেই ওর মনে হলো ,মাআআগোওওওও , কি চ্যাংড়া মেয়ে রে বাবা | ঘরে ঢুকেই নিজের ব্যাগপত্র রেখে সেই মেয়ে , ' ওরে বাবা , কি গরম পড়েছে আজকে' , বলে টি - শার্ট খুলে ফ্যানের তলায় বসে সিগাটের ধরালো | ফোনেও কাকে অশ্রাব্য গালিগালাজ করছে |
সেসব দেখে-শুনে বিদিশার কান দিয়ে যেন ধোঁয়া বেরোচ্ছে | এককোণে চুপ করে দাঁড়িয়ে সেই মেয়ের কীর্তিকলাপ দেখে ওর নিজেরই লজ্জায় মাটিতে মিশে যাবার উপক্রম |
হটাৎ সেই মেয়ের দৃষ্টি পড়লো বিদিশার ওপর | থম মেরে সে খানিক্ষন চেয়ে রইলো ওর দিকে | তারপর খ্যাক খ্যাক করে বিশ্রী হেসে ওকে বললো , ' ওই , তোর নাম কি বে ? সে যাই নাম হোক না কেন , যা পাহাড়ের মতো গতর বানিয়েছিস , তোকে আমি হিমালয় / হিমু বলে ডাকবো | '
ওর কথা শুনে বিদিশার মনে হেব্বি দুঃখ হচ্ছে , তবুও ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতি জানালো |
ওই মেয়ে : আমার নাম জিজ্ঞেস করলি না তো ? আমি হলাম মেঘা | চল এখন আমার সাথে কমন রুমে , সিনিয়র দিদিরা ডেকেছে সব ফ্রেশারদেরকে |
বিদিশার কোনো আইডিয়াই নেই যে সিনিয়র দিদিরা কেন ডেকেছে ওদেরকে | মেঘা তো যাবার জন্য একপায়ে খাড়া | ওর চোখের সামনেই নির্লজ্জের মতো ড্রেস চেঞ্জ করে নিলো |
তারপর ওকে ধাক্কা দিয়ে বললো , ' চল , এখন আর বটগাছের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে হবেনা , হেব্বি মস্তি হবে এখন কমন রুমে | '
বিদিশাও একটু খুশি খুশি ভাব নিয়ে চললো মেঘার সাথে | মনে অনেক আশা , হয়তো কোনো ভালো কিছু হবে এখন কমন রুমে |
কমন রুমে তখন প্রায় সব ফ্রেশাররাই এসে গেছে | মেঘা বিদিশার সাথে ঢুকতেই ওদেরকে সবাই লরেল - হার্ডি বলে সম্বোধন করে হেসে একে অপরের ওপর গড়িয়ে পড়লো |
বিদিশা মনে মনে বুঝে নিলো ওর চাপ আসতে চলেছে | এর থেকে গ্রামের কলেজে পড়লেই ভালো হতো | কমন রুমে প্লাস্টিকের চেয়ার পাতা রয়েছে | মেঘা গিয়ে একটা চেয়ারে বসে পাশের মেয়েগুলোর সাথে এমনভাবে ঘুলে - মিলে গেলো যেন ওর জন্মের চেনা এক - এক জন |
বিদিশা তখনো চুপ করে দাঁড়িয়ে | কেউ একজন চেঁচিয়ে উঠে ওকে বললো , ' কি রে ! কলাগাছ ! তুই ওখানে মদনার মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন ? তোর নিতম্বদেশকে একটু রেস্ট দে | বসে যা একটা চেয়ারে | '
বিদিশার কান লাল হয়ে উঠছে লজ্জায় আর অপমানে | ও কমন রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যাচ্ছিলো | কিন্তু বাজখাঁই গলায় একজন সিনিয়র দিদি ওকে বললো , ' তুই বেরিয়ে যাচ্ছিস যে ! তোকে ধরে আনতে আমাদের তো ক্রেন আনতে হবে রে | '
ঘরের সব মেয়েরা অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো , আর বিদিশার মনে হলো , মাটি খুঁড়ে তার মধ্যে ঢুকে গিয়ে নিস্তার পায় এদের হাত থেকে | '
এবারে শুরু হলো পরিচয় পর্ব | সিনিয়র দিদিরা সবাই একে একে নিজেদের পরিচয় দিলো | তারা সবাই ফিজিক্স অনার্স ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী | ওদের নাম হলো কৃত্তিকা , স্নেহা , প্রজ্ঞা আর রণিতা |
বিদিশার ওদেরকে দেখে মনে হলো 'দা মোস্ট নটোরিয়াস স্টুডেন্ট অফ দা ব্যাচ' | বাঁদরামিতে এদের জুড়ি মেলা ভার হবে |
এবারে এলো ফ্রেশরেদের পরিচয় দেবার পালা | ফ্রেশাররা তো শুধু পরিচয় দিয়েই নিষ্কৃতি পাবেনা , ওদেরকে বিভিন্ন ধরণের র্যাগিং- এর সন্মুখিন হতে হবে |
কাউকে গান গাওয়ানো , কাউকে নাচানো , কাউকে আবার ক্যাট- ওয়াক করানো ইত্যাদি চলতে লাগলো |
সবাই কিন্তু বেশ সাবলীলভাবেই দিদিদের আবদার মেটাতে ব্যস্ত | মেঘার ভাগ্যে পড়েছিল , সৌরভ গাঙ্গুলির মতো টি - শার্ট ওড়ানো |
ও বিন্দাস টি - শার্ট খুলে মাথার ওপর ঘোরাতে লাগলো |
বিদিশার মনে হলো , ইসসসসস , ভাগ্য ভালো আমার ভাগে এই কাজটা পড়েনি , তাহলে লজ্জায় আজকে মরেই যেতাম হয়তো |
ভাবতে ভাবতেই বিদিশার ডাক পড়লো | দিদিগুলো ওকে দেখে নিজেদের মধ্যে কিছু একটা আলোচনা করে নিলো | তারপর ওকে বললো , ' তুই স্ট্রিপ করে দেখা | '
বিদিশা বেচারি জানেও না স্ট্রিপ মানে কি ! সবাই কোলাহল আর বিশ্রী হাসিতে ওকে আরো জর্জরিত করে তুললো |
ও জিজ্ঞাসা করলো , ' স্ট্রিপ কি ? '
ব্যাস , আর যায় কোথায় ! সবাই এমন একটা ভাব দেখালো , যেন "স্ট্রিপ" শব্দের মানে না জানা মহাপাপ |
দিদিগুলোর মধ্যে দুজন উঠে এলো ওর সামনে | প্রজ্ঞা দিদি বললো , ' আপনার ভেতরে বাহিরে কি কি দর্শনীয় স্থান আছে , সেগুলোর ভ্রমণ করানোর নামই হলো স্ট্রিপ | এখন আশা করি বুঝে গেছিস | নাও স্টার্ট | '
মোবাইলে ইংলিশ গান চালিয়ে দিয়ে সবাই বিদিশাকে চিয়ার আপ করছে আর হাসছে | কি যে হবে এখন !
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
লজ্জায় বিদিশার মুখ লাল হয়ে যাচ্ছে | ও কিছুতেই করবেনা স্ট্রিপ | কিন্তু দিদিগুলো ভয় দেখাতে লাগলো যদি না করে তাহলে সারাবছর জ্বালিয়ে খাবে ওকে |
কমন রুমের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে ওরা বিদিশার দিকে চেয়ে চোখ টিপে ইশারা করলো , ' কাম অন , ডু ইট | '
বিদিশা বুঝে নিলো যে , এদের হাত থেকে পরিত্রান পাওয়া সম্ভব নয় | বেচারি কাঁদতে কাঁদতে প্রথমে ওড়না খুলে ফেললো , তারপর যেই না কামিজ খুলেছে , সঙ্গে সঙ্গে কমন রুমে থাকা সব মেয়েদের মধ্যে হাসির যেন ঢেউ উঠলো |
কেউ বলতে লাগলো , ' একি রে ! এ তো পুরো চর্বির পাহাড় | '
কেউ বললো , ' বাবা , পেটটা দেখ , এম .আর .এফ টায়ারও হার মেনে যাবে | দেখি তো গুনে কটা টায়ার জমা করেছিস ! এক - দুই - তিন ...
আরেকজন বলে উঠলো , ' আরে ভাই , টায়ার তো লাগবেই বল , এই বুলডোজার টেনে নিয়ে যাবার জন্য | '
প্রজ্ঞা দিদি বলে উঠলো , ' থেমে গেলে কেন শিল্পা শেট্টি , দেখাও..... দেখি তোমার জলবা |'
বিদিশা রাগে , অপমানে , লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়েও সালোয়ার খুলতে বাধ্য হলো , তা নাহলে এরা ছাড়বেনা |
সালোয়ার খুলতে হাসির রোল আরো দ্বিগুন আকার ধারণ করলো |
প্রজ্ঞা দিদি বলে উঠলো , ' একি রে ! পা , নাকি কলাগাছ ! শুধু কলাটাই নেই আর কি | '
বিদিশা কান্না শুরু করলো এবারে | অনুরোধ করতে লাগলো ওকে ছেড়ে দেবার জন্য | কিন্তু ওদের মতো নির্দয়ের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করা আর মোষের সামনে বাঁশি বাজানো একই ব্যাপার |
মানুষের মন তো ওরা বুঝবেনা ওরা শুধুই মজা চায় ...শুধুই মজা...| বিদিশার হাজার অনুরোধ উপরোধ , কান্না কাটিতেও ওদের পাথর মন অনড় রইলো |
বাধ্য হয়ে কুঁকড়ে গিয়ে যেই না ও অন্তর্বাস খুলেছে , সবাই হাসতে হাসতে একে অপরের ওপর পড়ে গেলো |
প্রজ্ঞা দিদিটাই সবচেয়ে নির্মম আর পাজী | ও বলে উঠলো , ' ওবাবা , এ তো পুরো দশ কেজির ডাম্বেল রে | এগুলো নিয়ে চলিস কিভাবে ? তা , এগুলো নিয়ে এক্সারসাইজ করিস নাকি ! এত হৃষ্টপুষ্ট !!! '
বিদিশা হাউহাউ করে কাঁদতে লাগলো , ' আমি আর পারবোনা , দয়া করে আমাকে ছেড়ে দাও , এবারে আমি মরে যাবো | দয়া করো তোমরা আমার ওপরে | '
ওর হাহাকার আর কান্না দেখে হয়তো দয়া হয়েছিলো সিনিয়র দিদিগুলোর মনে |
কৃত্তিকা আর স্নেহা দিদি বিদিশার সামনে এসে বললো , ' আরে , তুই এত কান্না কাটি করছিস কেন ! এখানে তো আমরা সবাই মেয়ে | নে , তাড়াতাড়ি সব পরে নে , আমরা আড়াল করছি | '
বিদিশা অন্ধকারের মধ্যেও যেন হালকা আলোর দিশা খুঁজে পেলো | ওর অনুরোধে অন্তত শেষ লজ্জাটুকু তো বাঁচলো |
বিদিশার কান্না দেখে ঘরের সবাই খুব অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো | সত্যিই তো , এতটা বাড়াবাড়ি করা উচিত হয়নি ওদের |
মেঘা চুপ করে বসে এতক্ষন সব কিছু হজম করছিলো | এবারে ও উঠে এসে বিদিশাকে সাহায্য করতে লাগলো | সবার সহযোগিতায় বিদিশার লজ্জা ভাবটা একটু কেটেছে | রাগিং পর্ব এখানেই সমাপ্ত |
এবারে সিনিয়র দিদিরা ওদেরকে স্নাক্স- এর প্যাকেট আর কোল্ড ড্রিঙ্কস খাওয়ানোর পরে সবাই মিলে বসে একসাথে গল্প করছে |
বিদিশা একটা চেয়ার টেনে যেই বসলো , বেচারা পলকা প্লাস্টিকের চেয়ারটা ওর ভার সহ্য করতে না পেরে , চেয়ার টার পা - গুলো বেঁকে গিয়ে যেন পদ্মফুলের মতো ছড়িয়ে গেলো , আর বিদিশা মাটিতে ধপাস | আবার বেইজ্জতি সবার সামনে , আবার হাসির রোল পড়ে গেলো নতুন করে |
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
চূড়ান্ত অপমানিত হয়ে হোস্টেলের রুমে ফিরে বিদিশা বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে | আজকের অপমান , লাঞ্ছনা , যন্ত্রনা ওর মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করলো , যা কোনোদিনও ওর মন থেকে মোছা যাবেনা |
বাড়িতেও ফোন করে যে কিছু জানাবে , তারও উপায় নেই | নিজের জীবন ও নিজেই বেছে নিয়েছে | প্রচুর টাকা খরচ করে ওর বাবা ওকে আকাঙ্খিত কলেজে ভর্তি করিয়েছেন | এখন যদি ফোন করে বাড়িতে এইসব কথা জানায় , তাহলে ওর কলেজ ছাড়িয়ে বাবা নিয়ে চলে যাবে | এতে যেমন আর্থিক অপচয় তেমনই মানসিক অশান্তির সৃষ্টি |
তাই নিজের সাথে হওয়া এই অপমানগুলোকে হজম করে এই কলেজেই পড়তে হবে ওকে |
ক্লান্ত শরীরে কাঁদতে কাঁদতে বিদিশা ঘুমিয়ে পড়েছিলো | হটাৎ মেঘা কোথা থেকে ঝড়ের বেগে ঘরে এসে ঢুকলো | ওকে ঘুমোতে দেখে একটা ধাক্কা মেরে উঠিয়ে দিলো | ও ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে মেঘার দিকে |
মেঘা : এই যে , ভিজে কাঁথা , এতো কান্ড হয়ে গেলো আর তুই শালা মোষের মতো পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিস ? এতো ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই তো এই বিশাল বপু খানা বানিয়েছো বাবা |
বিদিশা : মেঘা , প্লিজ এরকম বোলোনা , আমি মানসিকভাবে খুব ভেঙে পড়ছি | আমার মতো মেয়ের শহরের কলেজে এসে পড়ার ইচ্ছেটাই ভুল ছিল | এখন না গিলতে পারছি , না উগরাতে |
মেঘা : তোর শরীর শুধু মোটা নয় , মাথাটাও দেখছি মোটা | লজ্জা করেনা ! এতো কান্ড করলো ওরা তোর সাথে , এর জবাব দেবার ইচ্ছে করেনা ! আমি হলে তো এমন জবাব দিতাম যে ওরা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারতোনা |
বিদিশা : আমি তোমার মতো এতো স্ট্রং নয় | কোনোদিন শহুরে জীবনযাপন করিনি , গ্রামের মেয়ে আমি , আমার কি এরকমটাই হওয়া স্বাভাবিক নয় ?
মেঘা : ফার্স্ট অফ অল তুই আমাকে তুমি...তুমি... লাগিয়েছিস কেন বলতো ! আমি কি তোর লাভার নাকি ওয়ারা !
বিদিশা : আমি হুট্ করে কাউকে তুই বলে ডাকতে পারিনা |
মেঘা : ওই তো !!! এই পারিনা , সেই পারিনা , পারিস টা কি তাহলে ! এখনকার দিনের মেয়ে হয়ে এরকম ন্যাকা*দা হয়ে থাকলে হবে ! তোর সিরিয়াস মেক ওভারের দরকার আছে |
বিদিশা : মেকওভার মানে ! কি করতে হবে আমাকে !
মেঘা : তোর চিন্তা নেই রে , তোকে ঘাড়ে দশ কেজি ওজন নিয়ে মিলিটারি মার্চ করবো না | জাস্ট একটু বডি ল্যাঙ্গুয়েজে চেঞ্জ করলেই হবে | আর হ্যাঁ , একটু আধটু শরীরের যত্ন নে | এরকম চর্বির পাহাড় হয়ে গেছিস , সেটাও তো খুব আনহেলদি |
বিদিশা : আসলে ছোটবেলা থেকেই মা খাইয়ে খাইয়ে আমার স্বভাবটা একদম পেটুক বানিয়ে দিয়েছে | এখন আর চেষ্টা করলেও কমাতে পারছিনা |
মেঘা : খাওয়া কমাতে হবেনা , ব্যাস একটু একটু এক্সারসাইজ স্টার্ট কর কাল থেকে | আমি এতক্ষন তোর জন্যেই কলেজের জিমটা ভালো করে দেখে এলাম | তোকে তো আর দীপিকা পাডুকোন বানাতে পারবোনা | জাস্ট বডি ল্যাঙ্গুয়েজ চেঞ্জ করার জন্য যতটা হয় করবি জিম |
বিদিশা চুপচাপ রইলো | মেঘার কথা অগ্রাহ্য করার কোনো উপায়ই নেই | যা বাঁদর মেয়ে , কি করে বসবে বলা যায়না | তবে হ্যাঁ , মেয়েটার মনটা ভালো বলেই মনে হয় |
মেঘা : কি রে ! হাঁ করে চেয়ে কি ভাবছিস ! যা বললাম মনে থাকে যেন | আর তোর মধ্যে পড়াশুনো ছাড়া অন্য কোনো গুন আছে ? মানে ধর , নাচ , গান , বাজনা , অভিনয় এনিথিং?
বিদিশা : একটু একটু গান গাইতে পারি |
মেঘা : আচ্ছা , দেখা যাক কি করা যায় তোর জন্য |
বিদিশার সাথে কথা বলে মেঘা সিগারেট খেতে খেতে ওর বয় ফ্রেন্ডকে ফোন করে অশ্রাব্য ভাষায় কথা শুরু করলো |
আর বিদিশা ভাবলো কাল থেকে কি যে হবে ! বাবারে .....জিম গিয়ে নাজানি কি করতে হবে ! ভয়ে ওর অন্তরাত্মা কুঁকড়ে গেলো |
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
গায়ের চাদরটা টেনে নিয়ে কুঁকড়ে ঘুমিয়ে আছে বিদিশা | তখন ভোর পাঁচটা | মেঘা ঘুম থেকে উঠে জিম যাবার জন্য রেডি | বিদিশাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতে ওর খারাপ লাগছিলো | গতকাল ওর ওপর দিয়ে যা ঝড় গেছে , হয়তো সারারাত ভালো করে ঘুমোতে পারেনি |
কিন্তু এখন দয়া দেখানোর সময় নয় | বিদিশার ভালোর জন্যেই ওর ওপর একটু অত্যাচার করা এখন বাঞ্চনীয় |
সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে মেঘা বিদিশার চাদরটা একটানে সরিয়ে ওর পিঠে চাপড় মেরে মেরে ওকে ঘুম থেকে ডেকে তুললো |
বিদিশা : উফফফ ! মা ! জ্বালিয়োনা তো , বলে আবার ঘুমোতে যাচ্ছিলো | হটাৎ সম্বিৎ ফিরে চোখ পিটপিট করে দেখলো সামনে মেঘা দাঁড়িয়ে | মেঘাকে দেখে ও ধড়মড় করে বিছানার ওপর উঠে বসল |
মেঘা : কি মহারানী ! পড়ে পড়ে ভোঁসভোঁস করে ঘুমোচ্ছেন ! পনেরো মিনিট টাইম দিলাম , এক্ষুনি রেডি হয়ে নে , নাহলে কিন্তু হেব্বি কেলাবো |
বিদিশা : ওরে বাবা , পনেরো মিনিট মাত্র ! বলে তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে নেমে ফ্রেশ হতে বাথরুম চলে গেলো |
বিছানা থেকে নামার সময় বেচারা দুর্বল সিঙ্গেল খাট টা ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে প্রায় জবাব দিতে বসেছিল আর কি | মেঘা ফিক করে হেসেও সিরিয়াস হয়ে গেলো | মনে মনে ভাবলো , বডি শেমিং মোটেই ভালো কাজ নয় |
বিদিশা জিম যাবার জন্য সালোয়ার কামিজ পরে রেডি হয়ে এসেছে |
মেঘা : একি রে !!! তুই এইসব কুর্তি ফুর্তি পরে জিম করবি ! শালা , একটা ট্রাকপ্যান্ট বা মিনিমাম একটা লেগিন্স আর টি - শার্ট জুটলোনা তোর ?
বিদিশা : ( মুখটা কালো করে ) আমি কি করে জানবো , এই কলেজে ভর্তি হয়ে আমাকে জিম করতে হবে ! জানলে ঠিক নিয়ে আসতাম |
মেঘা : তাহলে আর কি করা ! অগত্যা , চল , কোনো ছুতো করে ট্রেনিং মিস করা চলবেনা |
বিদিশাকে সঙ্গে করে ও পৌঁছলো জিমে | আরো অন্তত জনা পাঁচেক মেয়ে বিভিন্ন ইন্সট্রুমেন্টে ট্রেনিং করছিলো | বিদিশাকে দেখে সবাই মোটামুটি চিনে নিলো , এই সেই মেয়ে যাকে গতকাল সিনিয়র দিদিরা স্ট্রিপ করিয়েছে | সবাইকার মুখেই একটা চাপা হাসি লক্ষ্য করলো বিদিশা |
ট্রেনার খুব কড়া স্বভাবের মহিলা , সেই জন্য কেউ বিদিশার ওপর খোলাখুলি খিল্লি ওড়াতে পারলোনা | ট্রেনার বিদিশাকে ডায়েট চার্ট রেডি করে দিয়ে , ওয়েট মেপে , বডি ফ্যাট ইনডেক্স মেপে , ওর জন্য একটা ট্রেনিং গাইডলাইন ঠিক করলো |
ট্রেনারের কথামতো ওকে ট্রেডমিলে হাঁটা দিয়ে শুরু করতে হবে | স্পিড লিমিট 2 km/h রেখে ও হাঁটা শুরু করলো |
কয়েক মিনিট পরে ট্রেনার এসে যেই স্পিডটা 2 থেকে 3 km/h করেছে , এই সামান্য তারতম্যের জন্য বিদিশা হড়কে , হামাগুড়ি দিয়ে , গড়িয়ে ট্রেডমিল থেকে মেঝেতে এসে ধড়াস |
এবারে হাসির রোল পড়ে গেলো পুরো জিমে | যাইহোক , খাবি খেতে খেতে কোনোমতে ট্রেনিং শেষ করতে না করতেই বিদিশার খিদেয় পেটের মধ্যে ছুঁচোয় ডন বৈঠক মারতে লেগেছে |
ও এদিক ওদিক চেয়ে মেঘাকে বললো , ' আচ্ছা , আমরা ব্রেকফাস্ট করবো কখন ? '
মেঘা : ( মনে মনে মায়া জন্মেছে বিদিশার ওপর , তাও ছদ্ম রাগ দেখিয়ে ) ওরে , এক্ষুনি এক্সারসাইজ শেষ করে এক্ষুনি খেয়ে নিবি ! তাহলে তো দ্বিগুন বেগে মোটা হবি রে !
মেঘার কথায় বিদিশা বুঝে নিলো , এই জিম ওর জীবনে কাল হয়ে এসেছে | একেই তো গড়িয়ে পড়ে হাঁটুতে লাগলো , তার ওপর বলছে এখন খাবারও দেবেনা | ধুর , কাল থেকে আর এসব জিম - ফিম করবোনা বাবা | না খেয়ে মরবো নাকি ! হুউউহহহ !
বিদিশার চোখমুখ দেখে মেঘা সব বুঝতে পারলো যে ওর মনে কি চলছে |
মেঘা : তোর রাগ হয়না নিজের ওপরে ! একটা জড়ভরতের মতো থাকিস ! তোকে তো বলেছি , তুই দীপিকা পাডুকোন হবিনা , কিন্তু মিনিমাম একটা পার্সোনালিটি যদি ডেভেলপ না করিস তাহলে আজকালকার সমাজে তোকে ছাগলেও মুড়িয়ে খাবে |
কথাটা খুব রূঢ় হলেও , কঠিন বাস্তব | নিজের ভালো পাগলেও বোঝে | বিদিশা বুঝতে পারলো , গতকাল ওর সাথে হওয়া অপমানটা শুধু ওরই গায়ে লাগেনি , গায়ে লেগেছে এই ভালো মনের বাঁদর মেয়েটার গায়েও | মনে মনে ও মেঘাকে বন্ধু মানতে শুরু করলো |
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
প্রথম দিন ক্লাসে ঢুকতেই বিদিশাকে দেখে সবাই জঘন্য হাসি শুরু করলো | ও মন খারাপ করে একটা পছন্দমতো ডেস্কে বসতেই সেটা খচমচ করে উঠলো | হাসির স্রোত আরো বেড়ে গেলো |
প্রথম দিন , প্রথম ক্লাসটাই ভাইস প্রিন্সিপাল স্যারের | থার্মোডাইনামিক্স এর ক্লাস শুরু হলো | প্রত্যেকেই যথেষ্ট মনোযোগ সহকারে ক্লাস করলো , কারণ ভাইস প্রিন্সিপাল স্যার খুব কড়া স্বভাবের |
এবারে এলো প্রশ্ন - উত্তরের পর্ব | স্যারের প্রত্যেকটা প্রশ্নেই বিদিশা হাত তুলছে এবং সঠিক উত্তরও দিয়ে দিচ্ছে | ব্যাপারটা স্যার খেয়াল করলেন | ক্লাসের শেষে উনি বিদিশার উদ্দেশ্যে "ভেরি গুড" বলে বেরিয়ে গেলেন |
মেঘা খুব খুশি হলো ওর এই ভোলিভালি বন্ধুটার জন্য | আর বাকিদের মুখগুলো তখন দেখার মতো , সব এক একটা বাংলার পাঁচ হয়ে , নিমপাতা গেলার মতো মুখ করে বসে আছে |
সেদিনকার সবকটা ক্লাসেই বিদিশা যাকে বলে , ' 'জাস্ট ফাটিয়ে দিলো ' | ক্লাসের মেয়েগুলো মুখ চুন করে বসে রইলো আর সুযোগ খুঁজতে লাগলো কিভাবে বিদিশাকে অপমানিত করা যায় |
বেচারি বিদিশা সেই সুযোগ দিয়েও দিলো | সেদিনকার মতো সব ক্লাস শেষ | এখন লাঞ্চ টাইম | বিদিশার তো কখন থেকে পেটে ছুঁচোয় ডন মারছে | ব্রেকফাস্টও তো ঠিক করে হয়নি |
খাবার দেখে বিদিশা যেন হামলে পড়লো | অন্যদের খাওয়া শুরু হতে না হতেই ওর অলরেডি এক প্লেট ভাত শেষ | উঠে গিয়ে ও আবার ভাত নিতে লাগলো | তখনি শুরু হলো টোন - টিটকিরি |
কেউ বলছে , ' মানুষের সাথে হাতি বসে খাচ্ছে ' ,
কেউ বলছে , ' তোর কি তিন- চারখানা স্টমাক নাকি রে ' ?
কেউ আবার নিজের থালার যত খাবার ওর পাতে ঢেলে দিয়ে বললো , তোকে খাওয়াতে তো হোস্টেল ফেল মেরে যাবে রে ! যা ডাইনোসরের মতো গিলছিস ! হ্যাঁ রে , মাংস খাবার সময় কি তোর আস্ত একটা খাসি লাগবে ?
এত অপমান সহ্য করে কি খাওয়া যায় ! বিদিশা খাবারের প্লেট ফেলে উঠে নিজের রুমে চলে গেলো |
কিছুক্ষন পরে মেঘা এসে বললো , ' আচ্ছা , তোর খিদে পেয়েছে মানলাম , কিন্তু একটু ধীরে - সুস্থে খেতে পারলিনা ? মেয়েরা ওরকম গোগ্রাসে গিললে সবারই তো চোখে লাগবে বল ! মনে রাখিস , তোর টোটাল বডি ল্যাঙ্গুয়েজে চেঞ্জ করতে হবে |
বিদিশা : খিদে পেলে আমার মাথার ঠিক থাকেনা |
মেঘা : থাকেনা বললে তো চলবেনা কাকা ! একটু চেঞ্জ করো নিজের চলন - বলন | নাহলে এরকমই প্রতি পদক্ষেপে সবাই তোকে চেটে ছাড়বে |
বিদিশা : সকালেও তো কিছু খেতে দিলে না সেভাবে ! ঐটুকু কর্ন - ফ্লেক্স আর একটু দুধ খেয়ে কি কারুর পেট ভরে !
মেঘা : ঐটুকুই যথেষ্ট , আস্তে আস্তে এইটুকুতে এডজাস্ট হয়ে যাবে দেখিস | আর তাছাড়া , নিজের ডাম্বেল গুলোর দিকেও নজর দাও বোকাহাঁদা | ওগুলো তো এবারে চাঁদ - সূর্যকেও ঢেকে দেবে , এমন বড়ো বড়ো পাহাড় হয়ে উঠছে !
বিদিশা : তুমিও এরকমভাবে বলছো ! তুমি না আমার বন্ধু ! আমার মেন্টর !
মেঘা : আমি কেউ নই , এখনো তুই আমাকে ' তুমি 'করে ডাকিস |
বিদিশা : আচ্ছা বাবা , আজ থেকে তোমাকে' তুই ' করে বলবো , এখন শান্তি !
মেঘা : দেখি , আগেই ফ্রি হ-তো আমার সাথে | তবে বুঝবো | আচ্ছা , আমার এখন এত ভাটানোর সময় নেই | ওদিকে আমার গাধা বয় - ফ্রেন্ড টা হাঁ করে আমার ফোনের অপেক্ষায় বসে আছে |
বলে মেঘা একটা সিগারেটে ধরিয়ে ওর বয় - ফ্রেন্ডকে ফোন করলো |
ওদের দরজায় কেউ নক করছে | বিদিশা দরজা খুলে দেখলো ইউনিয়নের চার - পাঁচটা মেয়ে দাঁড়িয়ে | ওরা বলে গেলো , আগামীকাল সকাল দশটার সময় কলেজ অডিটোরিয়ামে পৌঁছে যেতে | নবীন বরণ উৎসব আছে কাল |
বিদিশা খুব খুশি | কালকে নিশ্চই খুব মজাদার ফাংশন দেখা যাবে |
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
সকাল সকাল উঠে জিম টিম করে বিদিশা পুরো ফিট , নবীন বরণ দেখতে যাবে বলে |
মেঘার মনে কোনো তাপ - উত্তাপ নেই , বরং বিদিশার জন্য ওর চিন্তা হচ্ছে | মেয়েটা এত আশা করে আছে , না জানি আবার কোন অপমান ওর জন্য অপেক্ষা করছে |
অডিটোরিয়াম যাবার আগে মেঘা সাবধান করে দিলো বিদিশাকে , ' শোন , তুই নবীন বরণ দেখার জন্য যা লাফালাফি করছিস , নিজেকে একটু সামলে রাখিস বাবা , নাহলে তুই হয়তো পরে আবার ধাক্কা খেতে পারিস , আর তখন আমার কাছে এসে ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে কাঁদলে তোকে তার ওপরেই কেলাবো বলে রাখলাম | '
বিদিশা : এই , তোর মুখে এত জঘন্য ভাষা কেন রে ! ভালো কথায় বলতে পারিসনা কিছু ?
মেঘা : ভালো কথাই তো বলছি রে বোকাগাধা | আমি খারাপ কথা বলতে শুরু করলে প্যান্টে মুতে দিবি |
বিদিশা : ছিঃ ....অসভ্য মেয়ে কোথাকার | তোর বেচারা বয় - ফ্রেন্ডটার জন্য আমার দুঃখ হয় | কোন জংলীর হাতে পড়লো সে বেচারা !
মেঘা : ওসব তুই বুঝবিনা রে , ওকে দুবেলা পেটভরে গালাগাল না দিলে , না ও শান্তি পাবে না আমি |
বিদিশা : প্রেম অতি জটিল বস্তু , আমার বুঝে কাজ নেই বাবা |
মেঘা : আচ্ছা , সে সময় এলেই সব বুঝবি ওয়াড়া | এখন চল | যা বললাম , মনে থাকে যেন |
মেঘার কথায় বিদিশার এখন একটু একটু ভয় লাগছে | যদি আবার কেউ অপমান করে ওকে !
যাই হোক , সবাই মোটামুটি অডিটোরিয়ামে এসে জড়ো হয়েছে | ফাংশনটার আয়োজন করেছে সিনিয়র দিদিরা আর ইউনিয়নের মেয়েরা মিলে |
স্টেজে এঙ্কর- এর দিকে চোখ পড়তেই বিদিশা ভয়ে কাঁটা | ওটা তো সেই সবচেয়ে দুষ্টু প্রজ্ঞা দিদিটা বলে মনে হচ্ছে | হায় ভগবান ! যেখানে বাঘের ভয় , সেখানেই সন্ধ্যে হয় ! আজকের ফাংশানেও প্রজ্ঞা দিদি !
হাতে মাইক নিয়ে সেই বাজখাঁই গলায় চেঁচিয়ে উঠলো প্রজ্ঞা , ' হ্যালো এভরিওয়ান ! আমাকে তো তোরা আগেও দেখেছিস , সেই যেদিন তোদের খিঁচাই করেছিলাম কমন রুমে ! '
সবাই চেঁচিয়ে উঠলো , হ্যালো প্রজ্ঞাদিদি |
প্রজ্ঞা : তা , আজকের ফাংশন শুরু করা যাক একটা আইটেম ড্যান্স দিয়ে |
যেহেতু এই অনুষ্ঠানে কোনো স্যার বা গুরুজন স্থানীয় কেউ উপস্থিত নয় , সবাই ফুলটু মস্তির মুডে | থার্ড ইয়ারের একটা দিদির "চিটিয়া কলাইয়া ভে" দিয়ে ফাংশন শুরু হলো |
সব বাঁদর মেয়েগুলো নিজেদের সিটে উঠেই নাচতে শুরু করেছে | বিদিশা ভয়ে ভয়ে চুপ করে বসে আছে | কেউ ওর দিকে খেয়াল করলেই চাপ কেস |
যাক , এই গানটা ভালোয় ভালোয় কেটে গেলো | বিদিশা ঠাকুরের নাম জপ করছে মনে মনে , ' জয় মা বিপত্তারিণী , রক্ষা করো মা | '
তারপর একটা দিদি গিটার বাজাবে আর অন্য একজন গান গাইবে বলে স্টেজে উঠলো | ওরা ' 'তুহি ইয়ে মুঝকো বতাদে , চাহু ম্যা ইয়া না ' দুজনে মিলে খুব সুন্দরভাবে উপস্থাপন করলো | ওদের গান শেষ হতে সবাই হাততালিতে ফেটে পড়লো |
এরপরে ৫ জন দিদি মিলে একটা কমেডি শো করলো | সেটাও দারুন ভালো লাগলো সবার | তারপর আরো কয়েকজন গান গাইলো , নাচলো , ইত্যাদি ইত্যাদি |
দেখতে দেখতে ফাংশনের শেষ পর্ব এসে উপস্থিত | ফ্যাশন শো | পনেরোজন ব্যাপক ফিগারের দিদিরা সেই শো- তে অংশগ্রহণ করেছে | কিন্তু গোল বাঁধলো কে শো - স্টপার হবে সেই নিয়ে |
হটাৎ ভীড়ের মধ্যে বসে থাকা গাব্দুগুব্দু বিদিশার কথা মনে পড়ে গেলো প্রজ্ঞার , ' বেশ ভালো জমেছিলো মালটাকে নিয়ে সেদিন কমন রুমে | আজকেও সবাইমিলে একটু আনন্দ করা যাক | ' এই ভেবে প্রজ্ঞা আবার স্টেজে উঠে এলো |
হাতে মাইক নিয়ে এনাউন্স করলো , ' বিদিশা , ফার্স্ট ইয়ার ফিজিক্স অনার্স , যেখানেই থাকিস না কেন , এই মুহূর্তে স্টেজের সামনে চলে আয় | ' এনাউন্স শুনে বিদিশার হাত পা কাঁপতে লাগলো |
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
কথায় আছে না , ' একা রামে রক্ষা নেই , সুগ্রীব দোসর | ' বিদিশার ক্ষেত্রে প্রজ্ঞাদিদির অনেকগুলো সুগ্রীব জুটে গিয়ে লুকিয়ে বসে থাকা বিদিশাকে অডিটোরিয়ামের মাঝখান থেকে টেনে নিয়ে গেলো স্টেজের সামনে |
ভয়ে বেচারার হাত- পা যেন পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে গেছে | ওকে দেখে ব্যাপক ফিগারের দিদিগুলোর কি হাসি ! 'এ হবে আজকের শো- স্টপার ! এ তো পুরো গন্ধমাদন পর্বত তুলে এনেছিস প্রজ্ঞা ! চলতে গেলে তো এর নাজুক কোমর লছকে যাবে | '
এত অপমান কিছুতেই সহ্য করা যায়না | বিদিশা রাগ চেপে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো | দিদিগুলোর মধ্যে একজন ওর সামনে এসে পেটে আঙুল দিয়ে খোঁচা মেরে মেরে জিজ্ঞাসা করলো , ' আপকি ইয়ে সুপার সেক্সি ফিগার কে রাজ ক্যা হ্যায় ! '
বিদিশা সাংঘাতিক চটে গেলো | It's enough..কলেজ থেকে যদি ওকে তাড়িয়েও দেওয়া হয় , কুছ পরোয়া নেহি , ভেবে বিদিশা মারলো একটা টেনে ঘুসি সেই দিদিটার মুখের ডান - দিকে | আর চেঁচিয়ে বলে উঠলো , ' অনেক বাঁদরামো করেছিস তোরা | এবারে আমার পেছনে লাগার আগে দুবার ভাববি | '
ঘটনার আকস্মিকতায় পুরো অডিটোরিয়াম স্তব্ধ | মেঘা বুঝে নিলো , কেস কেলো হয়ে গেছে | ও তাড়াতাড়ি ভিড় ঠেলে বিদিশার পাশে এসে দাঁড়ালো |
মার খেয়ে ওই হাড়গিলগিলে দিদি তো পুরো কেঁদেকেটে একসা | সব সিনিয়র দিদিরা মিলে বিদিশাকে ঘিরে ধরলো | মেঘা দেখলো বেগতিক |
ও চেঁচিয়ে উঠে বললো , ' প্লিজ , তোমরা ওকে ছেড়ে দাও , ও না বুঝে হাত চালিয়ে ফেলেছে | দয়া করে ছাড়ো ওকে তোমরা | '
প্রজ্ঞা বিদিশার একদম সামনে এগিয়ে এলো , ' খুব হাত চালানোর শখ না তোর ? বড়দেরকে সন্মান দিতে জানিসনা ! মুখে মুখে কথা হচ্ছিলো , তুই কোন সাহসে ওর গায়ে হাত তুললি ! '
বিদিশা একদম দৃঢ়ভাবে জবাব দিলো , ' মুখে মুখে কথা হচ্ছিলো ! তাই নাকি ! ও এসে আমার পেটে আঙুল দিয়ে জোরে জোরে খোঁচা মারছিলো | আমি মোটা বলে কি আমার ব্যাথা পাওয়াও বারণ ? আর সম্মানের কথা বলছো ! প্রথম দিন থেকে তোমরা আমার সাথে যে অসভ্যতা করে চলেছো , তার পরেও তোমাদেরকে সন্মান করতে বলছো ! সন্মান দিলে তবেই অর্জন করা যায় | দাঁড়িয়ে আছো কেন ! আমাকে মারো , মারো আমাকে , তোমাদের সেই সৎসাহসটুকুও নেই যে আমায় মারবে | কেন জানো ! তোমরা নিজেরাই জানো যে কি কি করেছো আমার সাথে আজ পর্যন্ত , সেই কথা যদি আমি প্রিন্সিপাল স্যারকে গিয়ে বলি , ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষার আগেই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তোমাদের বের করে দেবে কলেজ থেকে | '
প্রজ্ঞা : এটা তুই ভালো করলিনা , এর ফল ভোগ করতে হবে তোকে |
মেঘা এবারে চেঁচিয়ে উঠলো , ' যা করার করে নাও , আমি বিদিশার সাথে আছি | প্রিন্সিপাল স্যারকে যদি জানাতেই হয় , তাহলে দুজনে মিলে গিয়ে জানাবো | তোমাদের শয়তানি অনেক সহ্য করেছে আমার নিরীহ গোবেচারা বন্ধুটা | এখন আর নয় | আমি আছি ওর পাশে | দেখি কি করতে পারো তোমরা | '
বলে মেঘা বিদিশার হাত ধরে টেনে নিয়ে বেরিয়ে গেলো অডিটোরিয়াম থেকে | আর সিনিয়র দিদিগুলো দাঁড়িয়ে রইলো স্থবিরের মতো |
বাইরে বেরিয়ে মেঘা বিদিশাকে বললো , ' আরে বস , কোথায় ছিল তোমার এই উগ্রমূর্তি ভাই ! জিয়ো কাকা , আমি হেব্বি খুশি তোর আজকের মাইক টাইসনের মতো ঘুসিটার জন্য | এই নাহলে আমার বন্ধু ! চল আজকে তোকে পার্টি দেবো ক্যান্টিনে | কি খাবি বল ! '
বিদিশা চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে , চোখে জল |
মেঘা : ওই , কাঁদছিস কেন বে !
বিদিশা : আমার অনেক জন্মের ভাগ্য যে তোর মতো একজন বন্ধুকে পাশে পেয়েছি |
মেঘা : ওরে না না , পুরো সেন্টি হয়ে গেছিস রে | আর কাঁদতে হবেনা , চল , খুব খিদে পাচ্ছে | '
বিদিশা : কি খাওয়াবি !
মেঘা : আরে , ঐদিন দ্বিতীয় পুরুষ সিনেমাটা দেখলাম | ওতে খোকা বলে যে চরিত্র , তার ফ্যাভ হলো চিকেন চাউমিন আর চিলি ফিশ | আমি না , পুরো খোকার ফ্যান হয়ে গেছি | আজকে ওই মেনুই খাবো আমরা |
বিদিশা মনে মনে ভাবলো , ' কি সরল , বাচ্চাদের মতো মন এই বাঁদর মেয়েটার | থ্যাংক গড যে ও আমার রুম পার্টনার | '
দুজনে হাসতে হাসতে হাত ধরাধরি করে চলে গেলো ক্যান্টিনের দিকে |
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
প্রজ্ঞা আর ওর দলবল বিদিশাকে অপদস্থ করার সুযোগ খুঁজতে লাগলো | ওকে মেরে-ধরে বা বডি শেমিং করে কোনো লাভ হবেনা | অন্য কোনো উপায় খুঁজে বের করতে হবে | ওরা তক্কে তক্কে রইলো সেরকম সুযোগের আশায় |
-----------------------------------------------
ওদিকে বেশ কয়েকমাস কেটে গেছে | ভালো মতো থিওরি এবং প্রাকটিক্যাল ক্লাস চলছে , তার সাথে সাথে সমানতালে চলছে বিদিশার পার্সোনালিটি ডেভেলপমেন্টের ক্লাস মেঘার কাছে |
সামনেই ফার্স্ট সেমেস্টারের পরীক্ষা | সবাই পড়াশুনো নিয়ে খুব ব্যস্ত | বিদিশা রাত - দিন এক করে পড়াশুনো করছে | আর মেঘা পড়াশুনোর সাথে সাথে ওর রাজ্যের বাঁদরামিও সমান তালে চালিয়ে যাচ্ছে |
দেখতে দেখতে পরীক্ষার দিনটা এসে গেলো | বিদিশার প্রিপারেশন খুব ভালো | মেঘা আর বিদিশা ব্রেকফাস্ট করে নিয়ে একসাথে পরীক্ষা হলে পৌঁছলো |
স্যার এসে খাতা , কোয়েশ্চেন পেপার দিয়ে দিলেন | আর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই পরীক্ষা শুরু | বেল পড়লো | স্যার এনাউন্স করলেন , ' স্টুডেন্টস , ইউ ক্যান স্টার্ট রাইটিং | '
সবাই লিখতে শুরু করে দিলো | হটাৎ , মিনিট পনেরো পরে , বিদিশার পেটের মধ্যে সাংঘাতিক মোচড় দিয়ে উঠলো | প্রচন্ড জোরে পটির প্রেশার অনুভব করলো ও | আর যেন সহ্য করা যাচ্ছেনা | তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে স্যারকে বললো , ' মে আই গো টু ওয়াশরুম ? '
স্যার : ইউ মে |
বিদিশা একদৌড়ে চলে গেলো ওয়াশরুমে | তাড়াতাড়ি করে পটি সেরে দৌড়োতে দৌড়োতে ফিরলো এক্সাম হলে | এতে ওর প্রায় 25 মিনিট মতো সময় নষ্ট হলো | খুব টেনশনে পড়ে গেলো বেচারি |
ও ফিরতে মেঘা চোখের ইশারায় ওকে জিজ্ঞাসা করলো , ' কি হয়েছে ! ' ও ইশারায় বুঝিয়ে দিলো |
আবার মিনিট কয়েক পর বিদিশার খুব জোরে পেটব্যাথা শুরু হলো | ওর আর তখন স্যারের থেকে পারমিশন নেবার সময় নেই | ঘামতে ঘামতে দৌড়ে ওয়াশরুম পৌঁছনোর আগেই ও নিজের জামাকাপড় নোংরা করে ফেলেছে |
ওয়াশরুমে গিয়ে নিজেকে পরিষ্কার করতে করতে ওর প্রায় আধ - ঘন্টা সময় নষ্ট হয়ে গেলো | তাড়াতাড়ি করে বাইরে বেরিয়ে এক্সাম হলের দিকে যেতে গিয়ে আবার শুরু হলো পেটব্যাথা .....তারপর আবার .....আবার......আবার..... সবমিলিয়ে পাঁচ - ছয়বার ও যাওয়া - আসা করতে লাগলো |
ততক্ষনে পরীক্ষা শেষ হতে আর মাত্র মিনিট কুড়ি বাকি | কান্নায় ভেঙে পড়ে বিদিশা দৌড় লাগলো এক্সাম হলের দিকে |
ওদিকে বিদিশা এতোক্ষণেও হলে না ফেরায় মেঘার টেনশন শুরু হয়েছিল | বিদিশাকে কাঁদতে কাঁদতে ফিরতে দেখে , তাও ও খানিকটা নিশ্চিন্ত হলো | কিন্তু সময় তো আর বেশি বাকি নেই | ও কোয়েশ্চেন পেপার শেষ করবে কিকরে ?
১০০ নম্বরের মধ্যে মাত্র ২৮ নম্বরের উত্তর লিখতে না লিখতেই এক্সাম ওভার হবার বেল পড়লো | স্যার এসে সবার কাছ থেকে খাতা জমা নিয়ে চলে গেলেন |
ক্লাসের বাকি স্টুডেন্টরা বিদিশাকে ঘিরে ধরলো | মেঘা এসে ক্রন্দনতত বিদিশাকে জিজ্ঞাসা করলো , ' কোথায় ছিলিস এতক্ষন ? ফেল করে যাবি তো এই পেপারটায় | '
বিদিশা কাঁদতে কাঁদতে সব ঘটনা বললো | বাকি স্টুডেন্টরা শুনে টিপ্পনি কাটলো , ' অতো রাক্ষসের মতো খেলে পেট খারাপ হবেনা ! পরীক্ষার দিন সকালেও এতো খেতে পারে ! '
যে যার মতো হল থেকে বেরিয়ে গেলো | ক্লাসে তখন শুধু মেঘা আর বিদিশা | দরজা দিয়ে প্রজ্ঞা আর সেই বিদিশার হাতে ঘুষি খাওয়া দিদিটা এসে ঢুকলো |
প্রজ্ঞা : ( বিদিশাকে উদ্দেশ্য করে ) কি রে ! ফার্স্ট সেমের ফার্স্ট এক্সাম কেমন হলো তোর ? বলে বাঁকা হাসি হাসতে লাগলো |
বিদিশা আর মেঘা সব বুঝে গেলো | এরাই ! এরাই বিদিশার ব্রেকফাস্টে কোনো ভাবে এমন কিছু মিশিয়ে দিয়েছিলো যার জন্য ওর এই অবস্থা হলো |
বিদিশা তখন আর কিছু বলা বা শোনার মতো পরিস্থিতিতে নেই | কাউকে দোষারোপ করতেও পারবেনা , কারণ সবাই ওই একই খাবার খেয়েছিলো | কারুর কিছু হলোনা , শুধু ওরই হলো , এটা যদি স্যারদের কাছে কমপ্লেইন করা হায় , তাতে কিচ্ছু প্রমান করা যাবেনা |
প্রজ্ঞা : জলে নেমে তোরা কুমীরের সাথে বিবাদ করে নিলি ! এতবড়ো সাহস তোদের ? ইয়ে তো সির্ফ ট্রেইলার থা , পিকচার অভি বাকি হ্যায় | বলে প্রজ্ঞা বীরদর্পে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলো |
মেঘা : তুই চিন্তা করিসনা রে , তুই যে কত ভালো স্টুডেন্ট সব স্যারেরা জানেন | চল , আমরা দুজনে মিলে প্রিন্সিপাল স্যারকে গিয়ে আবার তোর পরীক্ষা দেওয়ানোর ব্যবস্থা করার অনুরোধ করি |
বিদিশা চুপ করে কেঁদেই চলেছে | কে জানে কি আছে ওর কপালে |
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
স্তব্ধ বিদিশাকে সঙ্গে নিয়ে মেঘা ছুটলো প্রিন্সিপাল স্যারের কেবিনে | বেশ কিচ্ছুক্ষন অপেক্ষার পর ওরা ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি পেলো | স্যারের সামনে বিদিশা কান্নায় ভেঙে পড়লো | কোনো কথা বেরোচ্ছেনা ওর মুখ দিয়ে |
মেঘাই শুরু করলো , ' স্যার , ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড বিদিশা | আজকে আমাদের ফার্স্ট সেমের পরীক্ষা শুরু হয়েছে | পরীক্ষা চলাকালীন ও খুব অসুস্হ হয়ে পড়ে | বার বার ওয়াশরুমে যেতে বাধ্য হয় | পুরো সময়টাই ওর নষ্ট হয়ে যায় | ১০০ নম্বরের মধ্যে মাত্র ২৮ নম্বরের উত্তর লিখতে সমর্থ হয় ও | কিন্তু আপনি বিশ্বাস করুন স্যার , ও খুব ভালো স্টুডেন্ট | আপনি আমাদের ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের সব স্যার আর মাডামদেরকে জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারেন যে ও পড়াশুনোয় কতটা মনোযোগী | দয়া করে ওর রি- টেস্টের ব্যবস্থা করে দিন স্যার , নাহলে ওর মার্কশীটে লাল কালির দাগ থেকে যাবে | খুব নরম মনের মেয়ে ও , কিছুতেই তা সহ্য করতে পারবেনা | '
বিদিশা ততক্ষনে চোখের জল চাপতে মুখটা ওড়না দিয়ে ঢেকে রেখেছে |
প্রিন্সিপাল স্যার : বিদিশা , আমি চেষ্টা করে দেখছি , তোমার জন্য কি করা যেতে পারে | একদম ভেঙে পড়োনা | আমি ডিপার্টমেন্টের টিচারদের সাথে কথা বলে তোমাকে আজকেই জানাচ্ছি | আর বাকি পেপার গুলোর জন্য ভালো করে রিভাইস করো |
প্রিন্সিপাল স্যারের কথায় বিদিশা আশার আলো খুঁজে পেলো |
কাঁদতে কাঁদতে ও বললো , ' দয়া করুন স্যার , আমার জন্য সর্বাপেক্ষা কঠিন প্রশ্নপত্র তৈরী করতে বলুন , একটা সুযোগ দিন আমাকে , নিজেকে প্রমাণিত করার |
স্যার : ঠিক আছে , আমি দেখছি কি করা যায় | তোমরা এখন আসতে পারো | আমি ডিপার্টমেন্টের সাথে কথা বলে জানাচ্ছি আজকেই |
ওরা স্যারের কেবিন থেকে বেরিয়ে যেতেই , বিদিশাদের পরীক্ষা হলে কর্তব্যরত স্যারকে প্রিন্সিপাল ডেকে পাঠালেন | ওনার মুখ থেকে শোনা কথার ভিত্তিতে উনি সিসিটিভি ক্যামেরা দেখে , সম্পূর্ণ ঘটনাটা বুঝতে পারলেন | সিসিটিভি তে পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে বিদিশা বরংবার ওয়াশরুমে যাচ্ছে - আসছে | উনি বুঝতে পারলেন যে বিদিশার সত্যিই শরীর খারাপ করেছিল |
ফিজিক্স এর ডিপার্টমেন্টাল হেড এবং ভাইস প্রিন্সিপাল স্যারকে ডেকে , ওনাদের সাথে কথা বলে উনি বুঝতে পারলেন বিদিশা সত্যিই খুব ভালো ছাত্রী |
সবার সাথে কথা বলে উনি ঠিক করলেন , বিদিশাকে রি - টেস্টের সুযোগ অবশ্যই দেওয়া উচিত |
কলেজের এডমিশন লিস্ট চেক করে বিদিশার ফোন নম্বর খুঁজে পেলেন | তৎক্ষণাৎ উনি বিদিশাকে ফোন করে ওনার ডিসিশান জানিয়ে দেওয়া সমীচীন বলে মনে করলেন , কারণ মেয়েটা একেই অসুস্থ , তার ওপর খুব টেনশনে আছে | দেরি করা ঠিক হবেনা |
বিদিশা নিজের রুমে পায়চারি করছে | টেনশনে মনে হচ্ছে হৃদপিন্ডটা লাফ মেরে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসবে | মেঘা ওকে স্বান্তনা দিয়েই চলেছে | এমন সময় ঘরের নিস্তব্ধতা ভেদ করে বিদিশার ফোনটা বেজে উঠলো | আননোন নম্বর |
বিদিশা ফোন ধরে , ' হ্যালো ' বলতেই প্রিন্সিপাল স্যার বলে উঠলেন , ' আমরা সমস্ত দিক বিচার করে , এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে ,......
এতটুকু শুনেই বিদিশা কাঁদতে শুরু করলো , ভয়ে ফোনটা ওর হাত থেকে পড়ে যাবার উপক্রম |
প্রিন্সিপাল স্যার: কেঁদোনা বিদিশা , আমরা সবাই মিলে ঠিক করেছি , আগামী রবিবার তোমার রি - টেস্টের ব্যবস্থা করা হবে | '
হুররেএএএএ..... বিদিশা স্যারের সাথে কথা বলতে বলতেই চেঁচিয়ে উঠলো | কান্নাজড়ানো গলায় বিদিশার উল্লাস প্রিন্সিপাল স্যারকেও প্রসন্নতায় ভরিয়ে তুললো |
মেঘা সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এসে বিদিশাকে জড়িয়ে ধরলো | এই প্রথমবার বিদিশা মেঘার চোখে জল দেখলো , সে শুধু ওর বন্ধুর জন্য ভালোলাগায় ভরা |
মেঘা ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে চেঁচামেচি শুরু করে দিলো , ' শুনছো , সবাই শোনো , বিদিশার আবার রি - টেস্ট হবে | আমার বন্ধু ফেল করবেনা | চরম খুশি আজকে মেঘা |
খবরটা ছড়িয়ে পড়তে বেশিক্ষন সময় লাগলোনা |
বিদিশার সুখবরটা প্রজ্ঞার মনে তীরের মতো এসে বিঁধলো , ' এভাবে হলোনা , এখন অন্য পন্থা অবলম্বন করতে হবে দেখছি | পরীক্ষাটা শেষ হোক , তারপরই তো কলেজ সোশ্যাল আছে | ঐদিন মজা টের পাওয়াব বাছাধনকে | সবার সামনে যদি অপদস্থ করতে না পারি , আমার নাম প্রজ্ঞা নয় |
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
দেখতে দেখতে পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলো | সামনেই কলেজ সোশ্যালে | সাজো সাজো রব পুরো ক্যাম্পাসে |
সোশ্যালে আসছেন বলিউডের বিখ্যাত , জনপ্রিয় গায়ক তথা সংগীত পরিচালক হিমু রেশম | পুরো কলেজ ওনার আতিথেয়তা করার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে |
বিদিশা আর মেঘা বেশ চিন্তায় আছে | প্রজ্ঞা এবারেও না কোনো গন্ডগোল পাকায় |
দুর্দান্ত সব প্রোগ্রামের আয়োজন করা হচ্ছে সোশ্যালে | সাথে থাকবে হিমু রেশমের গান | ওফফ .....পুরো ফাটাফাটি |
সন্ধ্যা আগতপ্রায় | একটু পরেই শুরু হবে প্রোগ্রাম | একটা ঝাঁ চকচকে কালো রঙের মার্সেডিস এসে ঢুকল কলেজের গেট দিয়ে | সবাই দৌড়ে গিয়ে ভীড় জমালো সেই গাড়ি ঘিরে | হিমু রেশম এসে গেছেন | প্রিন্সিপাল স্যার নিজে গিয়ে ওনাকে স্বাগতম জানালেন |
কিছুক্ষনের মধ্যেই প্রোগ্রাম শুরু হয়ে গেলো | সঞ্চালক হলেন শিলচর শহরের সবার প্রিয় দেবদীপ | প্রোগ্রাম শুরু হলো জাতীয় সঙ্গীত দিয়ে | তারপর একের পর এক নামকরা শিল্পীরা স্টেজ অলংকৃত করে কেউ গান , কেউ নাচের মধ্যে দিয়ে বিনোদনের অন্য মাত্রা এনে দিলেন |
এবারে এলো কলেজ স্টুডেন্টদের কৃতিত্ব দেখানোর পালা | প্রজ্ঞা নড়েচড়ে বসলো | এবারেই ওই পাহাড়ের মতো বিদিশাকে শেষ করতে হবে | ভীষণ বাড় বেড়েছে তাই না !
একে একে কলেজ স্টুডেন্টরা স্টেজে উঠে কেউ নাচ , কেউ গান , কেউ আবৃত্তি করে শোনাতে লাগলো | দেবদীপ পর পর নাম এনাউন্স করে চলেছে , আর পর পর স্টুডেন্টরা যে যার পারফরমেন্স খুব সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করছে |
হটাৎ নাম ডাকা হলো , ' বিদিশা ব্যানার্জী , স্টেজে চলে এসো | ' বিদিশার তো থরহরি কম্প শুরু হলো | ও তো কোনো পারফরমেন্সেই নিজের নাম দেয়নি | ওর নাম ধরে ডাকা হলো কেন ? '
ভাবতে ভাবতে প্রজ্ঞা আর ওর দলবল বিদিশার সামনে এসে দাঁড়ালো | আর ওকে জোর করে ঠেলে ঠুলে নিয়ে গেলো স্টেজের দিকে |
স্টেজের সামনে গিয়ে ও দিশাহারা হয়ে পড়লো | আবার সঞ্চালক ওর নাম ধরে ডাকতে , ও স্টেজে উঠতে বাধ্য হলো |
দেবদীপ ওর হাতে একটা মাইক্রোফোন ধরিয়ে দিলো | বিদিশার এখনো কোনো আইডিয়াই নেই , যে ওকে ঠিক কি করতে হবে ?
দেবদীপ চিৎকার করে বলে উঠলো , এখন একটি গান পরিবেশন করবেন , আপনাদেরই কলেজের ফিজিক্স অনার্সের প্রথম বর্ষের ছাত্রী বিদিশা ব্যানার্জী |
মেঘার এখন শান্তি | কারণ ও জানে , ওর বন্ধুটি একটি যথেষ্ট গুণবতী গায়িকা | বিদিশার হাত-পা কাঁপা ধীরে ধীরে কম হয়ে এলো |
ও শুরু করলো আজকের সন্ধ্যায় গাওয়া ওর প্রথম গান , হুবহু আশা ভোঁসলের কণ্ঠের অনুকরণে , ' ঝুমকা গিরা রে , বরেলি কে বাজার মে | '
প্রজ্ঞা যে কোথায় লুকোবে , কোথায় পালাবে বুঝে উঠতে পারছেনা | ওর এখন মনে হচ্ছে ভূমি ফেটে ভাগ হয়ে যাক , আমি একটু মুখ লুকিয়ে বাঁচি |
গানটি শেষ হবার পর হাততালিতে ফেটে পড়লো পুরো অডিটোরিয়াম | হিমু রেশম উঠে দাঁড়িয়ে বিদিশাকে কুর্নিশ জানালেন এবং আরো কয়েকটি গান গাইবার অনুরোধ করলেন |
বিদিশা শুরু করলো ওর দ্বিতীয় গান , ' সুন রাহা হ্যায় না তু , রো রহি হুঁ ম্যায় | ' হুবহু শ্রেয়া ঘোষালের কণ্ঠে |
তৃতীয় গান আর কোনো শিল্পীর কণ্ঠস্বরে নয় , সম্পূর্ণ নিজের কণ্ঠে গাইলো বিদিশা , লগ যা গলে , কে ফির ইয়ে হাসি রাত হো না হো | '
গানের শেষে সবাই এতটাই মুগ্ধ যেন হাততালি দিতেও ভুলে গেছে |
হিমু স্যার বিদিশার সামনে এসে ওর মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলো , ' বাচ্চি , তুনে দিল জিত লিয়া | মেরে নেক্সট অ্যালবাম মে লিডিং সিঙ্গার বনেগি ? '
বিদিশা আপ্লুত , আনন্দাশ্রু বয়ে চলেছে ওর চোখ দিয়ে | ও পায়ে হাত দিয়ে হিমু স্যারকে প্রণাম করলো |
মেঘা আনন্দে চেয়ারে উঠে নাচতে শুরু করে দিয়েছে |
প্রজ্ঞা আর ওর দলবলকে কেউ কোত্থাও খুঁজে পেলোনা সেই সন্ধ্যায় | প্রজ্ঞার প্রতিশোধ বিদিশার কাছে শাপে বর হয়ে উঠলো |
বিদিশা সেই দিন সেই সন্ধ্যায় খুঁজে পেলো নিজের দিশা |
সবাই হয়তো স্মার্ট , সুন্দরী , শিক্ষিতা , ধনী হয়না | কিন্তু প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যেই ভগবান এমন কিছু গুন দিয়ে আমাদেরকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন , যা কদরের যোগ্য | তাই কোনসময় কাউকে ছোট করা , মনে আঘাত দেওয়া , বডি শেমিং , এইধরণের ক্রিয়াকলাপ করার আগে আমাদের ভেবে দেখা উচিত যে , এরজন্য হয়তো সেই মানুষটির অন্তরাত্মা কাঁদতে পারে | আর আমরা জানি , আত্মা হলো পরমাত্মার অংশ | তাই মানুষকে কষ্ট দেওয়া মানে ঈশ্বরকে কষ্ট দেবার সমান | কাউকে ভালোবাসতে না পারি , অকারণে কাউকে ঘৃণা করার কোনো অধিকার আমাদের নেই 🙏
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
🌹 🌹🌹🌹🌹সমাপ্ত🌹🌹🌹🌹🌹

এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।
উত্তরমুছুনTouch kore gelo story ta..khub sundor hoeche
উত্তরমুছুনঅনেক ধন্যবাদ আপনাকে🙏
মুছুন