শনিবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২০

#বিষয় - 'হিন্দুধর্ম'- (ষষ্ঠ পর্ব)

# বিষয় - 'হিন্দুধর্ম'
   # নাম - 'হিন্দু-হিন্দুত্ব এবং বিবর্তন'
      ✍মৃদুল কুমার দাস।

                ( ৬ষ্ঠ পর্ব )
পরম ব্রহ্মজ্ঞানী মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্যের মন বড়ই অস্থির। গৃহাশ্রমে মনের চাঞ্চল্য থেকে মুক্তির জন্য তিনি উচ্চতর সাধনায় ব্রতী হতে চান। গৃহত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গার্গী তাঁর মনে এমনিতেই একটা প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছেন। গার্গীর প্রতি অবিচার হয়েছে। ব্রহ্ম জ্ঞান লাভের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। যে ব্রহ্মের স্বরূপ নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে তার ভেতর অবশ্যই এ সম্পর্কে বোধি লাভ নিশ্চয় ঘটবে, নতুবা এমন প্রশ্ন তাঁর দ্বারা হয়ই বা কি প্রকারে! দেবতা সম্পর্কে অতিপ্রশ্ন করা থেকে বিরত হতে বলা, নতুবা মাথা উড়ে যাবে - এসব গার্গীর মতো ব্রহ্মবাদিনীকে বলে নীতি ও আদর্শের পরিপন্থী আচরণ করেছেন। ন্যায় অন্যায়ের দ্বন্দ্বে তিনি বড়ই ক্ষতবিক্ষত। কিছুতেই সংসার আশ্রমে মন থিতু করতে পারছেন না। তাই দরকার উচ্চতর সাধনা। ব্রহ্মোপলব্ধির জন্য চাই তাই আরো উচ্চ সাধনা। 
   গুরুদেবের এই সংসার ত্যাগের কথা শুনে শিষ্য সম্প্রদায় পড়ল মহা ফাঁপরে। তাদের শিক্ষার কি হবে! তাদের কোনো অনুরোধ উপরোধ ঋষিবরের সংসার ত্যাগ থেকে বিরত করতে শিষ্য সম্প্রদায় অক্ষম। বাকি রইল দুই স্ত্রী - কাত্যায়নী ও মৈত্রেয়ী। তাদের ডাকলেন তাঁর সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য। তাঁরা উপস্থিত হলে তাঁদেরকে সেই সঙ্গে এও জানালেন - " হে প্রিয়তমে! আমার যাবতীয় জাগতিক সম্পদ ( সমস্ত গোধন,সমূহ ধনরত্ন ) আমি তোমাদের দু'জনের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে দিয়ে বৃহত্তর সাধনায় সংসার ত্যাগ করতে চাই।"
দুই স্ত্রী চোখ তুলে চাইলেন। সম্পত্তির অর্ধাংশ লাভ করে কাত্যায়নী খুশি। কিন্তু গোল বাঁধল মৈত্রেয়ীকে নিয়ে। কেননা মৈত্রেয়ীর মন তখন জাগতিক যাবতীয় বন্ধনের ওপারে। অমৃতের সন্ধানে আকুল। বিত্তবাসনা আর টানে না,তা অতি তুচ্ছ,মায়া ছাড়া কিছুই নয়। তখন মৈত্রেয়ী মহর্ষিকে জিজ্ঞেস করলেন - "হে ঋষিবর যা দিয়ে যাচ্ছেন তাকে নিয়ে কী অমরত্ব লাভ করা যাবে? কিংবা আমি যদি পৃথিবীর সব সম্পদের অধিকারী হই তাহলে কি আমি অমৃতের অধিকারী হব?" এই প্রশ্ন শুনেই যাজ্ঞবল্ক্য চমকে উঠলেন। গার্গীর মত মৈত্রেয়ীও ব্রহ্মের স্বরূপ জানতে ইচ্ছুক। ব্রহ্মজ্ঞান লাভের অধিকারিনী। গার্গীকে নাহয় এড়ানো গেছে। আপন স্ত্রীকেই বা কি প্রকারে এড়াবেন। অগত্যা কোনো উপায়ন্তর না দেখতে পেয়ে বরং ব্রহ্মজ্ঞান দেওয়াই শ্রেয় মনে করলেন। মৈত্রেয়ীকে ব্রহ্মবিদ্যা দানের কথা পাই 'বৃহদারণ্যক' উপনিষদে।
মৈত্রেয়ীর প্রশ্নের উত্তরে ঋষিবর যাজ্ঞবল্ক্য বললেন - "ধন সম্পদ, সম্পত্তিতে অমরতা লাভের বিদুমাত্র সম্ভাবনা নেই (অমৃতস্য তু নাশান্তি বিত্তেন ইতি)।"
তখন মৈত্রেয়ী বললেন - "যাতে অমৃতত্বের লেশমাত্র নেই তা নিয়ে আমি কী করব(যেনাহং নামৃতা স্যাং কিমহং তেন কুর্যাহং)?" তখন ঋষিবর যাজ্ঞবল্ক্য ব্রহ্মতত্ত্ব নিয়ে আলোচনায় প্রবৃত্ত হলেন। আর তাই নিয়ে তাঁর উপনিষদ হল ব্রহ্ম তত্ত্বের আকর গ্রন্থ।
   আত্মার স্বরূপ বোঝাতে গিয়ে যাজ্ঞবল্ক্য মৈত্রেয়ীকে তিনটি সূত্র দিলেন -
  ১। প্রাণ দ্বারা প্রাণিত যে হচ্ছে সেই  'আত্মা'। সকল কিছুরই সে অন্তর্বর্তী। তাকে চোখে দেখা যায় না।
   ২। পুত্রের চেয়ে প্রিয়,বিত্তের চেয়ে প্রিয়,অন্যসব কিছুরই অন্তরতর যা তাই আত্মা।
  ৩। পৃথিবীতে থেকেও পৃথিবীর অন্তরালে, পৃথিবী যার শরীর, যে পৃথিবীর অভ্যন্তরে থেকে পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করছে সেই তোমার আত্মা - সেই হলো অন্তর্যামী ও অমৃত।
   এই আত্মাই হলো ব্রহ্ম। ব্রহ্ম মানে বৃহৎ। এই আত্মা সর্বজীবে সর্বজড়ে বিদ্যমান। এখানে একটা প্রশ্ন স্বাভাবিক ভাবেই এসে যায় সর্বজীবে ও সর্বজড়ে যদি আত্মা বিরাজমান থাকে তাহলে মানুষে মানুষে,জড়ে জড়ে এত পার্থক্য কেন?
  পার্থক্য এ কারণেই প্রত্যেকেই চৈত্য শক্তির (Psychic Being) জন্য আলাদা। 
সহজ উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যাক। যেমন বস্তুর সঙ্গে বস্তুর পার্থক্য - বিজ্ঞান বলে বস্তুর গঠনের মূল ভিত্তি প্রোটন,নিউট্রণ ও ইলেকট্রন নিয়ে অনু-পরমানু। আত্মাকে যেমন চোখে দেখা যায় না তেমনি প্রোটন নিউট্রন ও ইলেক্ট্রনকেও চোখে দেখা যায় না। বস্তুর মতো মানুষে মানুষে পার্থক্যের মূল ভিত্তি চৈত্য শক্তি। বস্তুতে প্রোটন নিউট্রন ও ইলেক্ট্রনের ভর সংখ্যার তারতম্যের জন্য বস্তু সব আলাদা আলাদা রূপে গন্য হয়। মানুষের ক্ষেত্রেও তাই চৈত্য শক্তির গুণে আলাদা আলাদা। বিজ্ঞান যাকে পরমানুর নিউক্লিয়াস বলে, ধর্ম তাকে চৈত্য শক্তি বলে।
আত্মা যখন একা তখন তিনি ব্রহ্মাণ্ড। তিনি অনন্ত। অনন্ত কখনো একা থাকতে পারেনা বলেই নিজেকে সর্বজীবে ও সর্বজড়ে ছড়িয়ে দেন।
   আত্মা এক ও অবিনশ্বর। সর্বজীবে ও সর্বজড়ে তিনি বিরাজমান। এই আত্মা সম্পর্কে জানার জ্ঞানই হল ব্রহ্ম জ্ঞান। ব্রহ্মজ্ঞানই ধর্মের ভাষ্যে আধ্যাত্মিক জ্ঞান। আর আধ্যাত্মিক জ্ঞানের মধ্যে চৈত্যস্বরূপের জ্ঞান হল মূল্যবোধ। অর্থাৎ আত্মারই চৈত্যশক্তি হল মূল্যবোধ।
আত্মা এক বলে,তা থেকে সৃষ্ট জীবের নিয়মও একটাই। একটি কোশ হয় বহুকোশীয়।একটি মানুষ ছড়িয়ে পড়ে বহু মানুষে।
বিজ্ঞানে 'ফিশন' ও 'ফিউশন'- এর প্রক্রিয়ার কথা একই। জীববিজ্ঞানে কোশ বিভাজন,আর পদার্থবিজ্ঞানে পরমানু বিভাজন একই। জড়ের এক থেকে বহুর প্রক্রিয়া আর জীবেও কোশ বিভাজন একই প্রক্রিয়া। যাক যাজ্ঞবল্ক্য এবার কী বলছেন দেখি।
  যাজ্ঞবল্ক্য বলেছেন দু'টি সত্ত্বা। ব্যষ্টি ও সমষ্টি। ব্যষ্টি যখন সে তখন নিজের জন্য বাঁচে। আর সমষ্টি যখন সে তখন বাঁচে সমাজের জন্য, দেশের জন্য। ব্যক্তি সত্ত্বা সদাই সমষ্টি সত্ত্বার অভিমুখে গমন করবে। সমষ্টি সত্ত্বার মধ্যে নিজেকে বিলিয়ে দেবে। এই সমষ্টি সত্ত্বাই হলো বিশ্বসত্ত্বা। বিশ্বসত্ত্বা অক্ষয় ও অমর। যে বিশ্বসত্ত্বার স্বরূপ না জেনে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেয় সে কৃপার পাত্র। আর যে এই বৃহৎ বিশ্বসত্ত্বার স্বরূপ ব্রহ্মাকে জেনেছে সেই অমর। অর্থাৎ সেই অমরত্ব লাভ করবে যে ব্রহ্মের স্বরূপ জানতে পারবে। সেই আত্মার প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে পারবে। আত্মার বাইরে সব কিছুই আর্ত। এই আর্ত অর্থাৎ বাইরের শক্তি আনে বিচ্ছিন্নতা বোধ। সেই হয় খন্ডিত যে কেবল ব্যক্তি সত্ত্বার অধিকারী। তাহলে এই একক সত্ত্বা কি বৃথা! আদৌ নয়। বলা হয় এ ধরনের সত্ত্বা অসম্পূর্ণ - মৃত্যুতেও শান্তি পায় না।
  আত্মা একা নয় - আত্মার সঙ্গে আত্মা মিলনে তৃপ্তি লাভ করে। আত্মার মৃত্যু নেই। মৃত্যু আছে নশ্বর দেহের। এই আত্মা যখন বিশ্বসত্ত্বার সঙ্গে মিলনের পথ পেয়ে যায় তখন মৃত্যু ভয় দূর হয়। আর মৃত্যু ভয় তাকেই গ্রাস করে যে ব্যক্তিসত্ত্বার বিলোপ ঘটাতে পারে না। তাকেই একপ্রকার পরাজয়ের গ্লানি ভর করে। আর যিনি বিশ্বসত্ত্বার সঙ্গে মিলিত হতে পারেন তিনিই তো বলতে পারেন মৃত্যুতে সব শেষ নয়। ব্রহ্মজ্ঞানী হলে এই বোধের উদয় হয়। ব্যক্তি মানুষের মৃত্যু আছে - মনুষ্য শ্রেণী ও মনুষ্যত্বের লয় নেই। কোনো বিশেষ শ্রেণীর মানুষ না থাকতে পারে, মনুষ্য শ্রেণী থাকবেই। একেই রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তি আমিকে বলেছেন 'ছোট আমি', - ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ। আর 'বড় আমি' যেখানে কবি স্রষ্টা। এই 'বড় আমি'ই তো কবিকে বিশ্ব সাথে যোগসাধনে সাহায্য করছে। যাজ্ঞবল্ক্যের এই ভাষ্যের প্রতিধ্বনি রবীন্দ্রনাথের মধ্যে পাই যখন কবি বলেছেন - "... বিশ্বভরা প্রাণ/ তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান।"
এইভাবে যাজ্ঞবল্ক্য মৈত্রেয়ীকে অমরত্ব লাভের উপায় বললেন। আত্মার মধ্যে এই যে চৈত্যপুরুষের কথা বললেন,তার স্বরূপ কী? তাই নিয়ে আসব পরের পর্বে।
              (চলবে)
  @copyright reserved for Mridul Kumar Das 
  
  
    
    

৮টি মন্তব্য:

  1. খুব ভালো লাগলো । অনেক ধন্যবাদ দাদা🙏

    উত্তরমুছুন
  2. খুব সুন্দর হয়েছে,,, অনেক কিছুই শিখলাম ও জানলাম,,,,

    উত্তরমুছুন
  3. দারুণ। পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।👏👏

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...