হিন্দু-হিন্দুত্ব এবং বিবর্তন'
___ মৃদুল কুমার দাস।
( ৭ম পর্ব )
আত্মার মধ্যে চৈত্যশক্তির কথা সম্পর্কে যাজ্ঞবল্ক্য কি বলেছেন এবার সেই কথায় আসি।
চৈত্যশক্তি একপ্রকার পুরুষ শক্তি। সেই পুরুষে একপ্রকার জ্যোতির প্রকাশ ঘটে। সেই হল চৈত্যজ্যোতি। এই চৈতপুরুষের জ্যোতি সম্পর্কে জানতে রাজাধিরাজ জনক একদিন ঋষিবর যাজ্ঞবল্ক্যকে প্রশ্ন করলেন কী সেই চৈত্যপুরুষের জ্যোতি?
উত্তরে ঋষিবর যাজ্ঞবল্ক্য বলছিলেন - "পুরুষের জ্যোতি সূর্য।"
রাজা- "সেই সূর্য অস্ত্য গেলে?"
ঋষিবর - "থাকে চন্দ্রমা।"
রাজা- "চন্দ্রমা না থাকলে?"
ঋষিবর - "থাকে অগ্নি।"
রাজা - "অগ্নি না থাকলে?"
ঋষিবর - "থাকে বাক্।"
রাজা - " তাও নীরব হয়ে গেলে, তখন?"
তখন যাজ্ঞবল্ক্য বললেন তখন থাকেন পুরুষের জ্যোতিস্বরূপ আত্মা। ব্রহ্মজ্ঞানের শক্তি আত্মা যখন লাভ করে তখন আত্মা নীরব হয়। আত্মার নীরবতা প্রাপ্তি ঘটলে তখন ব্রহ্মের সাধনায় সম্বোধি আসে। এই সম্বোধি লাভের জন্য চৈত্যশক্তি (Psychic Being) আত্মার মধ্যে তিন অবস্থায় থাকে। তিন অবস্থায় যার যেমন গতি সে তেমনি ফল লাভ করে। অবস্থার এই ত্রিবিধ রূপের জন্য মানুষে মানুষে এতো পার্থক্য সূচিত হয়। এই তিন অবস্থা যেমন -
১। সাত্ত্বিক - নিজেকে ধার্মিক রূপে প্রতিষ্ঠা করে। ধর্মের পথে আত্মাকে চালিত করে আত্মাকে শুদ্ধ ও পবিত্র জ্ঞাণ করে।
২। রাজসিক - নিজের ব্যক্তিত্বকে মহিমাময় করে গৌরব দান করে। আপন ওজস্বিতায় ভাবে যা কিছু অর্জন করেছে তা নিজের দক্ষতায়। একটা তেজস্বী, বীরত্বভাব সবসময় ব্যক্তিত্বকে ঘিরে থাকে। এই ব্যক্তিত্ব চৈত্যশক্তির ভেতরকার একটা আবেগ।
৩। তামসিক - এই শ্রেনীর মানুষ ভাবে তার দ্বারা কিছুই হবে না। অপরের কৃপা প্রার্থী হয়ে বেঁচে থাকাকে শ্রেয় জ্ঞাণ করে। পদে পদে নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করে।
এই হল তিনের স্বরূপ। এর মধ্যে রাজসিক ভাবের পূজারী ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। কারণ ভারতমাতা পরিধীনতার শৃঙ্খলে বন্দি ছিলেন বলে। দেশের মানুষগুলো যে নিজেদের দেশ বলে ভাবার কোনো অবশিষ্টাংশও রাখেনি। যেন একটা ঘুমন্ত জাত। এই ঘুমন্ত জাতিকে জাগাতে হলে রাজসিক ভাবের প্রয়োজন খুব জরুরি। তার জন্য চাই আত্মশক্তির জাগরণের মন্ত্র। নতুবা সাহস অবলম্বন করে বলতে পারবে না ভারতবাসী আমার ভাই। স্বাধীন ভারতের প্রথম গভর্ণর জেনারেল সি. রাজা গোপালাচারী বলেছিলেন - "তিনিই( স্বামীজী) ভারতীয় স্বাধীনতার জনক - আমাদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক স্বাধীনতার তিনি পিতা।" তিনিই স্বাধীনতা আন্দোলনের যুব শক্তির প্রেরণা। এক হাতে গীতা, অন্যহাতে তাঁর অগ্নিবাণী। শরৎচন্দ্র চক্রবর্তীকে বলতেন - "শরীরটাকে খুব মজবুত করতে তোকে শিখতে হবে ও সকলকে শেখাতে হবে। দেখছিসনে এখনো রোজ আমি ডাম্বেল কষি। রোজ সকালে সন্ধ্যায় বেড়াবি। শারীরিক পরিশ্রম করবি। দেহ ও মন সমানভাবে উন্নত হওয়া চাই।" তাই বলতেন দেশের শক্তিই হলো মানুষের শক্তি - "যাঁদের পেশী লোহার মত দৃঢ় ও স্নায়ু ইস্পাত দিয়ে তৈরি,আর তার মধ্যে থাকবে এমন একটা মন,যা বজ্রের উপাদানে গঠিত। বীর্য,মনুষ্যত্ব - ক্ষাত্রবীর্য,ব্রহ্মতেজ।" সিংহগর্জনে অভয় দান করে বলেছেন - "উত্তিষ্ঠিত জাগ্রত প্রাপ্য বরান নিবোধত"- উঠো জাগো। লক্ষে না পৌঁছনো পর্যন্ত থেমো না।
এ হল যাজ্ঞবল্কীয় উপনিষদিক ভাবধারা যা স্বামীজীর মধ্যে মূর্ত হয়ে উঠেছিল। যখন বললেন আমাদের ধর্ম কোনো গিরিগুহায় আটকে নেই। সর্বত্রে বিরাজমান - চলমান বিচারালয়ে,ভজনালয়ে, দরিদ্রের কুটীরে,মৎস্যজীবীর গৃহে,ছাত্রের অধ্যয়নাগারে। যে যে কাজ করুক না কেন,যে যে অবস্থায় থাকুক না কেন সর্বত্রে একটা চলমানতা (চরৈবেতি,চরৈবেতি...) বিপুল উদ্যম থাকতে হবে। প্রত্যেকে এক বলিষ্ঠ আত্মচেতনা নিয়ে এগিয়ে চলবে। তার উপর ভর করে ভালো বিদ্যার্থী হওয়া, ভালো উকিল হওয়া, ভালো চাষি, ডাক্তার, শিক্ষক হওয়া চাই। তাঁতি তাঁত বুনবে,জেলে জাল ফেলবে - সমস্ত বিশ্ব সংসার হল এদেরই নিয়ে।
সকলের মধ্যে উপাসনা বল। যার বলে শুদ্ধ চিত্ত হওয়া যায়। তা থেকে আসে দেবত্বভাব। এই ভাবের শক্তিতে পশু মানুষ হয়, মানুষ দেবতা হয়। জীবের মধ্যে শিব ভাব বিরাজ করে - "জীব সেবা শিব সেবা।" জাগে আধ্যাত্মিক ভাব। তখনই আত্মার উপলব্ধি হয়। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ নিজের মধ্যে আধ্যাত্মিক ভাব জাগ্রত করে বিশ্বসংসারের মধ্যে নিজেকে নিয়ে গেছেন। ভক্তের ঠেলা সালেছেন। সেই বিশ্বসংসারকে মা ভবতারিণীর রূপে দেখেছিলেন। ভবতারিণীর উপাসনায় নিজেকে নিবেদন করে ছিলেন। সেই উপাসনায় জগতে তিনি আর তাঁর মা সর্বজীবে ও সর্বজড়ে বিরাজিত ছিলেন।
ঠাকুর পেলেন শিষ্য স্বামীজীকে। স্বামীজী পেলেন শিষ্যা মার্গারেটকে। মার্গারেটই যেন এ যুগের গার্গী- মৈত্রেয়ী। ব্রহ্মজ্ঞানের অধিকারিণী হয়ে 'দ্য কালি মাদার' লিখে ফেললেন। বিশ্ব সংসারে নিজেকে নিবেদন করে মার্গারেট হয়ে গেলেন নিবেদিতা। বিশ্ব সংসারের দায়িত্ব বুঝে নিলেন নিবেদিতা।
যুগ ঋষি শ্রীঅরবিন্দের যোগসাধনার ভিত্তিও বিশ্ব সংসার। তিনি বলেছেন - "আমি যোগ করি আমার নিজের জন্য নয়, নিজের জন্য কিছুই চাই না। তা করি পার্থিব চেতনাতে একটা পরিবর্তন আনার জন্য।" তাঁর মতে যোগ ছাড়া জীবন হতে পারেনা। যোগে সাফল্য এলে জীবনে ও জগতে রূপান্তর আসবে। ঐহিক জীবন থেকে পালিয়ে বেড়ালে তাকে জীবনের পরাজয় বলে মেনে নিতে হবে। গৃহী জীবনের মধ্যে থেকেই বিশ্ব সংসারে যুক্ত হতে পারলে জীবনের রূপান্তর ঘটবে। আর এই বিশ্ব সংসারে যুক্ত হতে চৈত শক্তি পথ দেখাবে। এই চৈত্য শক্তি থেকে আসবে মানসিক শক্তি, শারীরিক শক্তি ও নৈতিক শক্তি। এই শক্তিগুলির মিলিত শক্তি হল চিন্তা শক্তি। তাই চৈতন্য। তাই চৈত্য। এই চৈত্য শক্তিই বিশ্ব শক্তিকে তলিয়ে দেখতে সাহায্য করবে। সেই বিশ্ব শক্তি তখন জ্ঞানের স্তরে এসে ধরা দেবে। আর তাই দিয়ে বিশ্বসত্ত্বার অভিমুখে তখন যাত্রা সম্ভব হবে। সাথে সাথে জীবনের রূপান্তর ধরা দেবে। এই কথাগুলিই যাজ্ঞবল্ক্যের মৈত্রেয়ীকে উপদেশ ছিল। অর্থাৎ উপনিষদের কথা। তখন জীবন অমরত্ব লাভের একেবারে কাছাকাছি চলে আসে। উপনিষদিক ভাবনার দ্বারা প্রভাবিত রবীন্দ্রনাথের ভাষ্যে সহজেই বুঝতে পারি জীবনের আনন্দ অমৃতত্ত্ব কি! তাঁর কথায় -
"আপনারে দিয়ে রচিলি কি/ আপনারি আবরণ!/ খুলে দেখ দ্বার,অন্তরে তার/ আনন্দ নিকেতন।" তখন তো বলার অপেক্ষা রাখে না -
"আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া,/বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া।/এই যে বিপুল ঢেউ লেগেছে/ তোর মাঝেতে উঠুক নেচে/ সকল পরাণ দিক না নাড়া।"
কিংবা -
"ত্রিভূবনেশ্বর আমায় নইলে তোমার প্রেম যে হতো মিছে।" বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তাঁর সমগ্র জীবনকে উপনিষদের ভাবধারার দ্বারা চালিত করেছেন। সমগ্র জীবনটাই ছিল উপনিষদের বলয়ে আবৃত। উপনিষদের ভাবধারায় সমগ্র জীবনকে বিবর্তনের পটভূমিতে দেখেছেন। ব্যক্তি থেকে নৈর্ব্যত্তিকতায়, ঐহিক থেকে পারত্রিকতায়, সীমা থেকে অসীমে যাত্রার জন্য জীবনভর সাধনার পেছনে উপনিষদ। 'গীতাঞ্জলি' তারই ফলশ্রুতি। যাজ্ঞবল্ক্যীয় উপনিষদ কবিকে সদাই ঘিরে থাকত।
এই হল যাজ্ঞবল্ক্যের ভারতবর্ষ। বর্তমান পর্যন্ত তার প্রভাব কতখানি বুঝতে পারলাম। স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, নিবেদিতা,শ্রীঅরবিন্দ, গাঁধী পর্যন্ত সকলেই উপনিষদকে আশ্রয় করে যোগ্য উত্তরসূরী।
আর গাঁধীও বললেন - "আমি কিছুতেই ধর্মপথে চলতে পারিনা, যদি না আমি সমগ্র মানবসমাজের সঙ্গে একাত্ম হতে পারি, সমগ্র মানবসমাজের সঙ্গে একাত্ম হওয়া সম্ভব নয়, যদি না আমি রাজনীতিতে অংশ না নিই... জীবনের কাজকর্ম থেকে আলাদা কোনও ধর্মের অস্তিত্ব আমি দেখতে পাই না...।" উপনিষদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনিও নিজেকে পর্যন্ত 'purely religious man' বলে ঘোষনা করে বিশ্বজগত ও তার রাজনৈতিক ঘরানার গতিপ্রকৃতি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। এভাবে বিশ্বের সাথে যোগসাধনের পথে নেমেছিলেন।
এ তো গেল হিন্দু ধর্মের উপনিষদ দিয়ে বর্তমান পর্যন্ত ভারতবর্ষকে পাওয়া। আবার বৈদিক যুগের পরে যে পৌরাণিক যুগ এসেছিল,তার কথা পরে আসব বলেছিলাম। এবার সেই আলোচনা পরের পর্বে।
( চলবে )
@copyright reserved for Mridul Kumar Das
দারুণ লিখেছেন দাদা 👌🏻🙏
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা। অনেক অনেক ভালবাসা।❤❤💫💫💥💥💅💅
মুছুনদারুন দাদা 🌸💮🌼💐
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা। অনুপ্রাণিত। ❤❤💫💫💥💥
মুছুনঅসাধারণ 🌼
উত্তরমুছুনপরের পর্বের অপেক্ষায়।
উত্তরমুছুনসত্যিই, অগাধ জ্ঞান। আমার গুরুদেব ডাক যেন সার্থক মনে হচ্ছে। 🙏
উত্তরমুছুনঅসাধারণ ব্যাখ্যা 🙏
উত্তরমুছুন