নাম : শান্তাবাঈ
বিষয় : অনুগল্প
লেখেনে : শর্মিষ্ঠা ভট্ট
রজত কুলকার্নি আমার কলিগ। মুম্বাই এ জমিয়ে বসেছি আমরা প্রায় দশ বছর হল। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অফিস পার্টিতে জমিয়ে আড্ডা চলে। আমাদের বেঙ্গলী সোসাইটির দূর্গাপূজায় টেনে নিয়ে যাই ওকে।ও আনন্দে আপ্লুত হয়ে বাঙলা শেখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাঙালী অবিবাহিত মেয়েদের ঝাড়ি মারে। অত সুন্দর চেহারার উঁচু পোস্টের ছেলে জামাই করতে অনেক বাঙালী মা লালায়িত। আমার কাছে অনুরোধ আসে, " অমল একটু দেখো না প্লিজ। আমার ঋতুর বায়োডাটা তোমার হোয়াটসঅ্যাপ এ পাঠাই ?" রজত আমাকে ওর আইয়ের হাতের পম্পপ্লেটের অসাধারণ পদ খাইয়ে কৃতজ্ঞতা জানায়।
এমন অবস্থায় দেওয়ালীর এক অনুষ্ঠানে এক অতিব সুশ্রী তরুণী বগলদাবা করে সুসজ্জিত রজত পার্টিতে ঢুকল। পার্টির মূল আকর্ষণ ছিল ওরা দুই দৃষ্টি মুগ্ধ জোড়ি। মেয়েরা তো হৈ হৈ করে রজতের এই গোপন ব্যবহারের প্রতিবাদ করল । কত অবিবাহিত মেয়ে নীরবে সরে গেল। আমার বৌ ক্ষুব্ধ গলায় বলল,
" রজত এটা কিন্তু ঠিক নয় , প্রেম করলে আর জানতে পর্যন্ত দিলে না। এখন বলছো এন্গেজ করেছো। " রজত ভাঙা বাংলায় বলল " আরে বৌদি রাগ করবেন না , ছোটবেলা থেকে ওদের আই কথা দিয়ে রেখে ছিল , তাই হঠাৎ.....।" সবাই চেপে ধরল পার্টি চাই। রজত পোলাইটলি বলল " তাতে কি! এই রবিবার আমার ফ্ল্যাটে চলে আসুন। স্বপ্নম্ নিজের হাতে খাওয়াবে। কি তাই না স্বপ্নম্? " পঁচিশ বছরের মেয়েটা উচ্ছসিত হয়ে বলল - " অফ কোর্স, আমি একেবারে স্টার ট্রিটমেন্ট দেব। আসুন রজতের ঘরে।" বাচ্ছা মেয়েটাকে দিয়ে কাজ করানোর ইচ্ছা ছিল না। তবু মেয়েটার আত্মবিশ্বাসে আঘাত করতে পারলাম না। বুঝলাম রবিবার আধুনিক তরুণী কি যে রাঁধবে কে জানে, ভালো তো হবেই না। আবার সেই অনলাইন অর্ডার। রজতকে অফিসে বললাম আগে থাকতে অর্ডার করে দিতে। রজত হেসে বলল " চিল দাদা । " নতুন প্রেমে গদগদ পুরুষদের কিছু বলো, শুনবে না জেনে চুপ থাকলাম। আর গাঁই গুঁই করে রবিবার খেতে গেলাম রজতের কোলাবার ফ্ল্যাটে। ও মা বাবা দাদার পরিবারের সাথে দাদরে থাকে, কিন্তু এই পার্টি হলে কিছুক্ষন একা থাকার মন করলে ও এখানে চলে আসে। এন্গেজ হবার পর থেকে ও নাকি স্বপ্নম্এর সাথে এখানে থাকছে, লিভ ইন বলা যায়। দারুন খেলাম। তা প্রায় পঁচিশ ত্রিশ জনের রান্না ও দিব্বি করেছে। মেয়েটা বেশ মিষ্টি। তবে কথাগুলোয় ওদের মধ্যে এখনও দূরত্ব আছে বোঝা যায়।সেদিন যেমন বলেছিল "রজতের ফ্ল্যাট" । আজ বলল " রজতের লাইব্রেরিতে আমি থাকি। " বাবা এত সংযম! আধুনিক ছেলে মেয়েরা লিভ ইনে এত মানে! আমার বৌ বলল, এত দূরে থাকতে হবে না এই অগ্রহায়ণে বিয়ে করে ফেলো। রজত বেশ থতমত খেয়ে বলল - " "একটু অসুবিধা আছে বৌদি। আর কটা মাস যেতে দিন। " " কি অসুবিধা? আমি তোমার আইকে ফোন করছি। " আমাদের সবচেয়ে সিনিয়র বৌদি রেহানা বললেন। রজত প্রায় কেঁদে ফেলার মতো হাত জোড় করল। ওর মাকে না বলতে। এ নিয়ে বাড়িতে নাকি অশান্তি আছে। কারো ব্যক্তিগত ব্যাপারে আমরা যাই না। ঘটনাটা এখানে শেষ করলাম।
কিভাবে রজতের মা মানে আই জানতে পেরেছে রজত একটা অবিবাহিত মেয়ের সাথে থাকে। তেড়ে এসেছে অফিসেই। দলের কোন পেট পাতলা মহিলা হলি আসার আগেই জানিয়েছে নিশ্চয়ই। রজত আমার কেবিনে হন্তদন্ত হয়ে এসে সব বলল। ওর কাজগুলো একটু দেখতে বলে, অফিসের বসকে পটিয়ে মাকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। তারপর রাতে ফোন করে যা জানলাম স্বপ্নম্এর আদরে ওর মা গলে ঘরে গেছে। বিয়ে দু সপ্তাহ পরে নিশ্চিত। কিন্তু ডিটেকটিভ আমার বৌ বলল " রজত তো বলেছিল ওর মা কথা দিয়েছিল আগে থেকে.... তবে? কফি কাপ এগিয়ে ডিটেকটিভ দৃষ্টি মেললো। " বললাম পাঁচ কান না করতে, নিশ্চয়ই কিছু আছে রজতের প্রিয় দাদা কলিগ আমিই, সময় হলে বলবে একটু সবুর করো।
হলির অনুষ্ঠান তুঙ্গে। রজত এল। স্বপ্নম্ ছাড়াই। সে নাকি একটু অসুস্থ। দেখতে যাব, রজত ঠিক যেন ইচ্ছা নয়। এবার কেমন যেন সন্দেহ আমার মনে বীজ পুঁতছে । এ দিকে দেখলাম তানিয়া, ব্যানার্জীদার মেয়ে, আমাদের অফিসে রিসেন্ট জয়েন করেছে তার সঙ্গে আরামে রঙ মাখামাখি করছে। আর পারলাম না মন তেতো হয়ে গেল। রজতের এত চেন্জ! ভাবতে পারি না হাসিখুশি রজত এমন প্লে বয় হবে। হলির সান্ধ্যকালীন পার্টিতে দেখি সেই তানিয়াকে নিয়ে বারান্দায়।কোলাবাতেই ব্যানার্জী ভিলায় পার্টি হচ্ছে। গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলাম। কাছেই রজতের ফ্ল্যাট। বেল বাজালাম। স্বপ্নম্ বেরিয়ে এল। সব বললাম। ও যেন একটু করুন হল, বললাম "চলো"। বলল " আর গিয়ে কি হবে? " "আমি মিথ্যা তো বলতে পারি।" বলল " মিথ্যা ধরার ক্ষমতা আমার মধ্যে ফিট করা আছে। " বাক্যটি একটু খটমটো। তবু ওর ধৈর্য্যকে সেলাম জানালাম। লোকের সামনে তামাশা করতে চায় না। কম বয়সী মেয়েটির প্রতি বড়ো মায়া হল। তেমনি রজতের প্রতি ঘৃনা।
পরের দিন কেবিনে হতাশ রজতকে বসে থাকতে দেখে, মনে মনে খুব খুশি হলাম। মেয়েটা টাইট মেরেছে তবে। ব্যানার্জীদার মেয়ে তানিয়া আমার কেবিনে ঢুকে বলল - "অমল কাকু একটা কথা বলবো? রজতের সাথে এটা আপনি ঠিক করেননি। আপনি রজতের ফ্ল্যাটে দশটা আঠারো মিনিট বাহান্ন সেকেন্ডে রাতে গিয়ে ছিলেন,পারলে রজতের সাথে দেখা করুন। ওর মনের অবস্থা খুব খারাপ।" শান্ত ভাবে বেরিয়ে গেল মেয়েটা। আমি বিদ্যুৎ তাড়িতের মতো ছুটলাম দীর্ঘদিনের বন্ধু রজতের কেবিনে। আমাকে ঝড়ের বেগে ঢুকতে দেখে ও উঠে দাঁড়িয়ে বলল -" বসো দাদা। " ও যে এটুকু আপ্যায়ন করবে ভাবিনি। বললাম " কি হয়েছে? " আমার মতো রজতের গলা কাঁপছিল বলল " সি ইজ নো মোর " । আঁৎকে উঠলাম। আমার একটা অন্যায় ওদের জীবন এমন ছারখার করবে স্বপ্নেও ভাবিনি। আমি তো ভালো করতে চেয়ে ছিলাম। " কখন? " ভাঙ্গা গলায় বললাম। " তুমি বেরিয়ে আসার আধা ঘন্টা পরে "। আমার চোখ দিয়ে জল পড়ছে, এত অপরাধ বোধ মাথা নীচু করে নিঃশব্দে ওর কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলাম।
ছুটির সময় প্রায় জোর করে রজত ওর ফ্ল্যাটে নিয়ে গেল। অটমেটিক দরজায় ছবি থেকে বায়োডাটা আছে, স্ক্যান করে তবেই দরজা ঢুকতে দেয়। আমার আসা যাওয়া তাই এই বাড়িতে বাঁধা নেই। অপরিচিত হলে 🚨সাইরেন বাজবে। তারপর ওর বেডরুমে যেখানে স্বপ্নম্ ..... এখানে সুইচে নিজের কড ঢুকিয়ে একে একে সব সার্কিট নষ্ট করেছে। তবু ব্ল্যাক বক্সে যা পাওয়া গেছে। তাতে আমাদের কথোপকথন আছে। আছে ওর ভেতরে চলা তরঙ্গের রেটিং। তাতে টেলিগ্রাফের মতো ভাষা উঠে আসে।যাকে বলে সাইকো গ্র্যাফিক্স। ভালবাসে রজতকে, তানিয়া মানুষ তবে ওর প্রয়োজন কি? তারপরেই বিদায় নিয়েছে। নিজেকে ধ্বংস করা ,ওর সুরক্ষা আর বিজ্ঞানকে বাঁচাতে প্রোগ্রাম করেছিল রজত। সে যে এমন ব্যাবহার করবে কে জানত? রজতকে "সরি" বলতে পারলাম না, মুখ নেই। বারান্দায় খোলা হাওয়ায় গিয়ে বসলাম। রজত দুকাপ বড়ো মগ কফি এনে বলল, " জানো দাদা, যা হয়েছে ভালো হয়েছে। আমিও ওকে ডিস মেটাল করতে পারতাম না। ওর মুখটা আমার বাচ্ছা বয়সের প্রেম রিনার মুখ। ও নিজেকে এত ডেভেলপমেন্ট করেছিল মনে হত সত্যিই আমার সাথে ওর কিছু হৃদয় বৃত্তি আছে। কেবল সৃষ্টির প্রতি টান নয়, ওর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছিলাম। তানিয়াকে একদিন এনেছিলাম, ওকে সব বলেছিলাম। ওই বুদ্ধি দিল এন্গেজ বলতে। অন্য মেয়েদের হাত থেকে বাঁচতে। কিন্তু আমি স্বপ্নম্ এর সামনে কখনও সহজ হতে পারছিলাম না তানিয়ার সাথে। স্বপ্নম্ আমার নিত্যদিনের মনের সঙ্গিনী হয়ে উঠছে। এই অনুভূতি আমি তানিয়াকে বললাম, ও হেসে উড়িয়ে দিল। মজাও করে বলে "রোবট বৌ"। কালরাতে তানিয়াকে নিয়ে ঢুকে এসব দেখে কেঁদে ফেলেছি। তানিয়া সব বোঝে, সব সামলে নেবে ও। বুদ্ধিমতী। থ্যাংকস দাদা। তোমার জন্য আমি আগে বাড়তে পারছি। বুকে জড়িয়ে ধরলাম। অপরাধ কে ঢাকা দিল ছেলেটা, আমায় লজ্জা মুক্ত করল। আসার সময় দেখলাম বিকৃত চেহারার বিকল স্বপ্নম্ পুতুল তার লোহালক্কড় বেরকরা দেহ নিয়ে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড় করানো।
রজত তানিয়ার সেই নির্দিষ্ট দিনে বিয়ে হয়ে গেছে। মারাঠি ছেলে, এখানকার বাঙালিরা খুব মজা করেছি। হানিমুন থেকে ফিরে পার্টি রেখেছে। ঘরেই খাবার রেঁধেছে শান্তা বাই। সার্ভ ও ওই করছে। আমাকে কাবাবের একটুকরো তুলে দিল মাঝ বয়সী সামান্য শ্যামলা কাজের মহিলা, শান্তাবাঈ। ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল " আর একটু দি অমল দাদা"। চমকে তাকালাম। স্বপ্নম্ এমন উচ্চারণ করত ..... আর ও তো আজ প্রথম দেখল আমায়, চিনল কি করে? যদিও এবারে রজত আগেই বলেছে শান্তাবাঈ রবট, স্বপ্নম্ এর বডি পার্টস থেকে বানানো। তবে কি সে এখনও মনে রেখেছে? মানে ওর মেমোরি তে অমল দাদা আছে!!

দারুণ👌👌
উত্তরমুছুনঅসংখ্য ধন্যবাদ🙏
মুছুনবাহ্! দারুণ লাগল। ধন্যবাদ। 👌👌💫💫💥💥🙏🙏
উত্তরমুছুনঅনেক ধন্যবাদ দাদা🙏🙏
মুছুনব্যাপক ভালো লাগলো👌👌👌👌
উত্তরমুছুনঅনেক ধন্যবাদ 🍫🍫🍫🍫🌷🌷🌷🌷🌷
মুছুনদুর্দান্ত,দুর্দান্ত 👌👌👌👌
উত্তরমুছুনখুব ভালো লাগলো 👌👌👌💐💐💐💐😊😊😊😊
উত্তরমুছুনঅসাধারণ 👌👌
উত্তরমুছুনরোবোট বৌ!!!🤩