# বিষয় - 'শিক্ষানীতি'
#নাম- 'জাতীয় শিক্ষানীতি ও শিক্ষায় বেসরকারিকরণ'
✍ মৃদুল কুমার দাস।
ভারতবর্ষে বর্তমান সরকারের সদ্য ঘোষিত জাতীয় শিক্ষানীতি চৌত্রিশ বছরের ( ১৯৮৬ পর এই ২০২০) পর আবার নতুনভবে নাকি এলো। এই নতুন নাকি পুরাতনের অনেক ফাঁকফোকর তথা অনেক অভাব অভিযোগের ফয়সালা করে দুর্দান্ত প্রতিশ্রুতি পূরণের দাবি রাখে। আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ এনে দিল বলে ঢাক গুড় গুড়ের ঐ শব্দ শোনা যায়। আসলে ১৯৬৮ সালের জাতীয় শিক্ষানীতির পুনঃপ্রচার ছাড়া বাড়তি খুব একটা বেশি পেয়েছি বলে মনে হয় না,তা সম্মানীয় শেখর মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে সহমত পোষণ করলে মনে খুব একটা ভুল হবে না। একটু আধটু স্রেফ অদলবদল ছাড়া কিছুই নেই। আহামরি কিছু আছে কিনা সময় বলবে।
অদল বদলটা কোথায়? না শিক্ষা লাভের সঙ্গে পেশার একটা সম্পর্ক রক্ষিত হয়েছে। স্কুল জীবন থেকেই পেশার চাহিদা তৈরির দিশা আছে। বৃত্তিমূলক শিক্ষার বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আর শিক্ষার্থীর মনে শিক্ষার ডিভিশন মনোভাব- বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী মানে প্রথম সারির, বাণিজ্য শাখার শিক্ষার্থী মানে মধ্যম সারির,আর কলা বিভাগের ছাত্র মানে নীচের সারির - এই বৈষম্যের হীনমন্যতা কাটানোর উদ্যোগ আছে।
শিক্ষার আসল লক্ষ্য শিক্ষার্থী। তার শিক্ষাদান সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পাঠক্রম ও তাকে কার্যকরী করতে প্রশাসনিক পদক্ষেপের নীতি নির্ধারিত হয় শিক্ষানীতিতে।
যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় শিক্ষা কেন্দ্র ও রাজ্যের যুগ্ম তালিকার অন্তর্ভুক্ত। এই জন্য কেন্দ্র ও রাজ্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে পৃথক পৃথক নীতি প্রণয়ণ করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলে,যা আজ পর্যন্ত হয়ে আসছে। এ থেকেই তো শিক্ষায় রাজনীতির বেনোজল প্রবেশ করে শিক্ষাকে বেশ বিড়ম্বিত ও কলুষিত করে। এই শিক্ষানীতিতে নাকি সেটি আর চলছে না বলে,তারই কড়াকড়ি নিদান আছে। দেখা যাক। সময় বলবে।
এই জাতীয় শিক্ষানীতিতে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় সাধনের সুষ্ঠু মীমাংসার এবারেও অধরা। অর্থাৎ শিক্ষা বেসরকারি হাতে ব্যায়বাহূল্য যেই তিমিরে ছিল নতুন শিক্ষা নীতি তাই কতটা মোচন করতে পেরেছে? সেই প্রশ্নের মীমাংসা খুব একটা দেখতে পাচ্ছি না। সরকার এই প্রাইভেট স্কুলগুলো থেকে ভালই ট্যাক্স আদায় করে থাকে। শিক্ষায় বেসরকারিকরণ নিয়ে এমনিতেই সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়। সেই পরিমন্ডলে তাদের প্রতি সরকারী নিয়ন্ত্রণ এবারে ততটা নেই,বরং বেশি করে উৎসাহের দিক আছে। তবে কিসের এই শিক্ষানীতির নতুন কিছু পাওয়া বলতে পারি!
জি ডি পি র ছ' শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যায়ের কথা বলা হয়েছে। ১৯৬৮ তে তাই ছিল। এই বাহান্ন বছর পরে একই। তাই বলতে দ্বিধা নেই, এ তো একপ্রকার আবার ভাবের ঘরে চুরি। যেখানে করোনা পরিস্থিতি কালীন জি ডি পি তলানিতে,ছ' শতাংশ মানে জাতীয় শিক্ষানীতি পরিকাঠামো নির্ভর বলে যে ফলাও প্রচার করা হচ্ছে, সেই শিক্ষার পরিকাঠামো উন্নয়ণের সুষ্ঠু রূপায়ণে সন্দেহ থেকেই যায়। কেননা জি ডি পি তলানিতে যখন এই পরিকাঠামো নির্ভর শিক্ষানীতি কতটা লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারবে?
সরকার তার আয়ের সঙ্গে ব্যায়ের সামঞ্জস্যে শিক্ষায় বাজেটের ছ' শতাংশের হিসেবে যে জল মেশাতে পারে তার পূর্ণ আশংকা আছেই। আজ পর্যন্ত এটা প্রমাণিত সত্য যে শিক্ষায় বাজেটের যতটা খরচ করার কথা কোনো সরকার সেই কথা রাখেনি। এও তেমনি একটা লোক দেখানো না হয়ে যায়।
কলেজ স্তরে চার বছরের পাঠক্রমের পর গবেষণা, মাষ্টার ডিগ্রি এক বছর কমানো, মাষ্টার ডিগ্রির ঐ একবছর এম ফিল এর জন্য থাকলে মনে হয় ভালো হতো। বিশেষ করে কলেজ স্তরে রিসার্চের যোগ্যতার জন্য শিক্ষকের যোগ্যতার মান কোন পর্যায়ে থাকা জরুরি তা খুব সন্দেহ জাগায়, যেখানে ছাত্রের শিক্ষা লাভের ঐচ্ছিক প্রবণতার উপর সংশাপত্র লাভের কথা আছে। এই আউট-কামিং পদ্ধতি, এতে পিছিয়ে পড়া ছাত্রদের নিয়ে স্পেশাল ক্লাস না জানি স্কুল শিক্ষায় বর্তমানে যেমন আছে,ঠিক তেমনি উচ্চ শিক্ষায় আসতে বাধ্য। এই পদ্ধতি উচ্চ শিক্ষায় কতটা মানানসই হবে তাও ভাবার বিষয়!
সর্বোপরি কোভিদ-১৯ পরিস্থিতিতে আর্থিক মন্দায় দেশ যেখানে টালমাটাল,এমন পরিকাঠামো নির্ভর জাতীয় শিক্ষানীতি আরো কিছুটা দেরিতে এলে ভালো হত মনে হয়। যদিও চৌত্রিশ বছর শুনলে চোখ কপালে ওঠে,কি করা যাবে কোভিদ-১৯ যে দেশ শুধু নয় বিশ্বকে ওলটপালট করে দিয়েছে!
বিগত শিক্ষানীতির সাফল্য নিয়ে আমাদের ততটা গর্ব করার মতো কিছুই ঘটেনি,তা বলতে দ্বিধা নেই। আর সদ্য ঘোষিত জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়ে গর্বিত হওয়ার ব্যাপার সময় বলবে।
বর্তমানে প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির রমরমা অবস্থা দেখছি, মধ্যবিত্তের বেশি পছন্দ প্রাইভেট স্কুলের পক্ষে, কেননা শৃঙ্খলা, পঠনপাঠনে ধারাবাহিকতার জন্য। আর সরকারী ক্ষেত্রে স্কুল-ছুট, পিছিয়ে পড়া- এই সমস্ত নির্ভর পঠন পাঠনে মেধা সম্পন্ন শিক্ষার্থীদের অভিভাবকগণের না পসন্দ্। এন. সি. এফ.-২০০৫ এর নীতি যেমন- অর্থের অভাবে অনেক কিছু লাগুই করা যায়নি। সরকার ও সরকার পোষিত বিদ্যলয়ে ত্রিশ শিক্ষার্থী পিছু এক জন শিক্ষক নিয়োগের স্বপ্ন অধরা থেকে গেছে আজও, এছাড়া আরো অনেক কিছু তো আছেই, অভাবের ফর্দ বিরাট।
জি ডি পি মোটামুটি অবস্থানে থেকেও যখন সরকার তার নীতি রূপায়ণে ব্যর্থ হয়,আর কোভিদ-১৯ এর কবলে পড়ে বর্তমানে অর্থনীতির বেহাল অবস্থা যেখানে, সেখানে সরকার কথা রাখতে পারবে কিনা দেখা যাক!
বিগত জাতীয় শিক্ষানীতির ভিত্তি ছিল সংসদে আলোচনা,আর ঘোষিত শিক্ষানীতির পরিচয় হলো সংসদ এড়িয়ে, সংসদীয় গণতন্ত্রের এও একপ্রকার অবমাননা হলো! সংসদে আলোচনা না করে বর্তমানের জাতীয় শিক্ষানীতি প্রকাশিত হয়েছে বলে বিরোধীদের সমালোচনায় সরকার মুখরক্ষা করতে বিভিন্ন সূত্রে লাগাতার আলোচনা চাইছে। জাতীয় শিক্ষানীতির এও এক অনন্য নজির! তাই অহরহ বিতর্ক দানা বাঁধছে।
ভাষার উপর গুরুত্ব দিয়ে এই জাতীয় শিক্ষানীতি আশার আলোর মাঝেও যেন কোথাও খামতির আশংকা উগরে দিচ্ছে বিরুদ্ধ মতাবলম্বী গোষ্ঠী। হিন্দি ভাষার গুরুত্ব ঘুরিয়ে নাক দেখানো দক্ষিনের রাজ্যগুলি ভালো মনে নিচ্ছে না। নানা ভাষার মধ্যে কার গুরুত্ব বেশি, তাই নিয়ে জোর চর্চা চলতেই থাকবে। উত্তরের সঙ্গে দক্ষিণের লড়াই আজন্ম। আর উত্তর-পূর্ব আগেও যেমন উপেক্ষার পাত্র ছিল এবারেও তাই। শুধু আশ্বাসের ম্যানেজ আছে আঞ্চলিক ভাষার উপর গুরুত্বের কথা বলে!
তাই দেখা যাক কার্যক্ষেত্রে এই জাতীয় শিক্ষানীতি কতটা ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মধ্যে মেলবন্ধন ঘটাতে পারে। সময়ই বলবে।
নমস্কার। 🙏🙏🙏🙏
বাস্তবতার আলোকে অনবদ্য একটা লেখনী
উত্তরমুছুনদুর্দান্ত লেখনী 👌👌👌👌👌
উত্তরমুছুন