# বিষয় - 'জীবনানন্দ দাশ।'
# নাম- 'আমাদের জীবনানন্দ'
@ ✍️ - মৃদুল কুমার দাস।
নেপোলিয়ন গ্যেটেকে দেখে বলেছিলেন- "এই একটি মানুষ"। আর আমরা বলি - "এই একজন কবি।"
বাঙালির যেমন রবীন্দ্রনাথ ছাড়া হয় না, তেমনি জীবনানন্দ দাশ(১৮৯৯-১৯৫৪) ছাড়াও। কেন না প্রকৃতিপ্রেম ও মানব প্রেমে রবীন্দ্রনাথ যেখানে শেষ জীবনানন্দ সেখানে থেকে শুরু।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি। আর জীবনানন্দ বলেই চলেন - " বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি তাই আমি পৃথিবীর রূপ দেখিতে চাই না আর।" মৃত্যুচেতনায় উভয়েই জীবনবাদী। জীবনকে যে যত ভালোবাসে মৃত্যুকেও অনুরূপভাবে ভালোবাসতে হয়, নতুবা জীবনের বৃত্ত, কাব্য দর্শনের বৃত্ত সম্পূর্ণ হয় না।
অনেকেই বলেন জীবনানন্দ রবীন্দ্র বিরোধী। যাঁরা বলেন তাঁরা ভুল বলেন। কথাটা হবে রবীন্দ্র- পথত্যাগী। সপক্ষে যুক্তি - কালিদাস,ম্যাথু আর্নল্ডের মতো বর্ষার বিরহের বাসনায় রবীন্দ্রনাথও বড়ই ব্যাকুল। সেখান থেকে এঁদের উত্তরসুরী হয়ে টি.এস.এলিয়টের মত নিজেকে আধুনিক বলে প্রমাণ দিতে এলিয়ট যেভাবে শীত দিয়ে আধুনিক মনন গড়েছিলেন, জীবনানন্দ দাশ তেমনি শীতের আগে হেমন্তের কবি হয়ে পথ চলা শুরু করেছেন। এখানে রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতার জন্য নয়,ঋতু-মননে আলাদা হবেন বলে। আরো আলাদা,যেমন - রবীন্দ্রনাথ যেখানে বললেন কাব্যের উপাদান মোরগ নয় ময়ূর,কাক নয় কোকিল, জীবনানন্দ দাশ সেখানে বললেন কাক,অন্ধ থুরথুরে পেঁচা,বুড়ো বট, ইঁদুর, পঁচা চালকুমড়া,লাসকাটা ঘর, মশারীর ক্ষমাহীন বিরুদ্ধতায় মশার সারারাত ধরে লড়াইয়ে হেরে না যাওয়া মানুষের কাছে প্রেরণা। কিংবা শিশুর হাতের মুঠোয় বন্দী ফড়িং কি লড়াই না করে চলে, একটু ফাঁক পেলেই ডানা মেলে পালাবে। হেরে যাওয়া মানুষের বোধ ও বোধির কাছে এ দৃষ্টান্ত দেখিয়ে আধুনিক সভ্যতার জটিল মানসিকতার কাছে মানুষকে হারতে দেখে সেই চিরন্তন বাণীর মত তাঁর কথাগুলো লাগে- " অর্থ নয় কীর্তি নয় স্বচ্ছলতা নয়,আরো এক বিপন্ন বিস্ময় আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে, আমাদের ক্লান্ত করে ..." তাই নিয়ে আমরা চলি বলে আমরা মরেও বেঁচে থাকি। লাশকাটা ঘরে শুয়ে থাকলে সে জীবন যন্ত্রণা আর থাকে না। কিংবা "স্বপ্ন নয় - শান্তি নয় - কোনো এক বোধ কাজ করে/ মাথার ভিতরে।" এই মানসিকতার গোড়ায় আঘাত দিতেই তো তিনি মশা,ফড়িং এর লড়াইয়ের কথা দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপিত করেছেন। আর এসবের মধ্যে সকলে তাঁকে নিঃসঙ্গ কবির তকমা দেন। তাই তাঁর সম্পর্কে ঠিক বলা হলো না। নেরভালের মতোই কবিরও নীরব মন্তব্য ছিল- "আমার যা দরকার তা ঠিক নিঃসঙ্গতা নয়,কিন্তু এলোমেলো হেঁটে বেড়ানোর স্বাধীনতা।"
প্রথম কাব্য 'ঝরা পালক'(১৯২৭),'ধূসর পান্ডুলিপি'(১৯৩৬), 'বনলতা সেন'(১৯৪২), 'মহাপৃথিবী'(১৯৪৬), 'সাতটি তারার তিমির'(১৯৪৮)। কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয় 'রূপসী বাংলা'(১৯৫৭), 'বেলা অবেলা কালবেলা'(১৯৬১।
নিঃসঙ্গতা এযুগের ব্যাধি। এই ব্যাধির দংশনে - "সকল লোকের মাঝে বসে/ আমার নিজের মুদ্রাদোষে/ আমি একা হতেছি আলাদা?/ আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?/আমার পথেই শুধু বাধা?" এই আমি থেকে এসেছে যন্ত্রণা কতটা তারই মাত্রা নির্ণয় ছিল খুব দুরুহ।
তবুও কবি দৃঢ় গলায় বলেন - "আমি ঝরে যাবো - তবু জীবন অগাধ।" কিংবা - "নতুন আকাঙ্খা আসে- চলে আসে নতুন সময়/ পুরনো সে-নক্ষত্র দিন শেষ হয়/ নতুনেরা আসিতেছে বলে;"
আর নগর জীবন তাঁকে শুধু ক্লান্তি ও নৈরাশ্য ছাড়া কিছুই দেয়নি। জন কিটসের মতো মনে হয়েছে- "The weariness,the fever and the fret." - এখানে তার কিছুই স্থির নয়। মানুষ বড়ই যান্ত্রিক। 'শিকার','ক্যাম্পে' কবিতায় বললেন নাগরিক জীবন অসারতা ছাড়া কিছুই দেয়নি। প্রেম,স্বপ্ন, সৌন্দর্য, সংগতি,মানবিক মূল্যবোধ সব যেন ধূসর লাগে। এ জন্যই পল্লী প্রকৃতি তার আত্মার আত্মীয় হয়ে ওঠে বলেই না বলতে পারেন আত্ম কথনের ঢঙে -
" যখন ঝরিছে ধান বাংলার ক্ষেতে ক্ষেতে ম্লান চোখ বুজে,/যখন চড়াই পাখি কাঁঠালী চাঁপার নীচে ঠোঁট আছে গুঁজে/ যখন হলুদ পাতা মিশিতেছে উঠোনের খয়েরী পাতায়/ যখন পুকুরে হাঁস সোঁদা জলে শিশিরের গন্ধ শুধু পায়।" - এই কাব্য কথা প্রমান করে কবি কোনো বিশেষ কাল সীমায় আবদ্ধ নন। চিরকাল ও একালের সমন্বয় সাধক।
আর এই থেকে আমরা অনায়াসেই বলতে পারি কবির কথা দিয়ে -
"আমরা কি তিমির বিলাসী?
আমরা তো তিমির বিনাশী
হতে চাই
আমরা তো তিমির বিনাশী।"
অন্ধকার দেখেন বলে তাকে পারেন না এড়াতে বলেই তিনি তিমির নাশের বিশ্বাসের সুর ধরেন। নগর জীবনের কুশ্রীতা প্রাণপনে ঠেলে মানুষ তার প্রাণময় জীবনের উচ্ছ্বাসে নগরও একদিন সুন্দরী হবে এই বিশ্বাস দিতেই বলেন -
" কোলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে।"
তাই শেষ করি এই কথা দিয়ে - "রবীন্দ্রনাথকে যদি সমগ্র বিংশ শতাব্দীর কাব্য প্রতিনিধি বলা যায় তাহলে জীবনানন্দকে বলতে হয় শেষ অর্ধ শতাব্দীর প্রতিনিধি অভিনয় কবি।
অসাধারন বিস্লেশন দাদার। সত্যিই অভিভুত
উত্তরমুছুনঅসাধারন 👌👌💫⚡✨
উত্তরমুছুন