রবিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২০

সিজোফ্রেনিয়া~পর্ব-৬ ও শেষ (✍©অনিশা কুমার)




সিজোফ্রেনিয়া (পর্ব-৬)


সোমালী গল্প করেছিল, ওর কাকা বুলেট চালাতে খুব ভালোবাসত। কাকু  কাকীমাকে নিয়ে প্রতি রবিবার কোথাও বেরিয়ে পড়ত। আর ফিরে আসতো সেই সন্ধ্যার আগে।কাকীমা বুলেট চড়তে খুব ভালোবাসে।সেই বুলেট নিয়ে একদিন একটা দুর্ঘটনায় ঘটে। তিন দিন হাসপাতালে থাকার পর ওর কাকা মারা যান। স্নিগ্ধা বুলেট চড়তে ভালোবাসে? আমায় তো তাহলে বুলেট কিনতেই হবে। কিন্তু অত টাকা কোথায় পাব? 


আমি একদিন কোমল কে নিয়ে আমার জমিতে গেলাম। কাউকেই বলি নি। শুধু মা জানে আমি জমি কিনেছি। আজ কোমলকে নিয়ে গিয়ে অবাক করে দেব।  ওকে বলেছি এক জায়গায় নিয়ে যাব। ও এখন মন্ত্র মুগ্ধের মতো আমার কথা শোনে। ওর আমার প্রতি এই মুগ্ধতা আমায় পাগল করে দেয়। আরও কাছে টেনে নিতে ইচ্ছে করে। এখন মনে প্রাণে ওর কথাই ভাবি। বাস স্ট্যান্ড থেকে একটু হেঁটে আমার জমিতে আসতে হয়। অনেকটা ভালোলাগা নিয়ে হাঁটছি। ওর একটু চেনা লাগছে, কারণ আগে ফটো পাঠিয়েছি। কোথায় সেটা বলিনি। একটু অবাক, কোথায় যাচ্ছি আমরা? অবশেষে আমার জায়গায় পৌঁছালাম। বললাম, "তুমি আমার ঘরের লক্ষ্মী হবে। তুমি আগে পা রাখো আমার জমিতে। তারপর তুমি আমায় হাত ধরে ডাকো। আমি যাব।" সে যেন নিমেষে বুঝে নিলো আমার অনুভূতি। লজ্জাবতী বধূর মতো গায়ে কাপড় জড়িয়ে মাথা নিচু করে আমার লক্ষী আমার জমিতে পা রাখলো। তারপর দুহাত বাড়িয়ে আমায় ডাকলো, "এসো"। আমি ওর হাত দুটি ধরে আমার ভবিষ্যতের সংসারে প্রবেশ করলাম। স্বপ্নেও কল্পনা করি নি কখনো আমি সংসারী হবো। আজ একরাশ স্বপ্ন আমার মনে ভিড় করে এলো। আমি আবেশে কোমলকে জড়িয়ে ধরলাম।  জমির কাছে ছোট্ট একটা পুকুর। আমি ওকে বললাম, "এখানেই হবে আমাদের সংসার। আমি ঘর বানাবো। কোনো রকমে একটা ঘরের ব্যবস্থা হলেই আমরা চলে আসবো। এইখানে তুলসী মঞ্চ থাকবে। ওইখানে একচিলতে বাগান করবো। পুকুরে যাওয়ার একটা জন্য একটা খিড়কি দরজা থাকবে।" আমি কখনো এসব ভাবিও নি। আমারা দুজনেই কলকাতায় থাকি। হঠাৎ মাথায় এলো কি করে জানি না। কিন্তু ভবিষ্যতের কল্পনা আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠছে। তারপর, তারপর....ডুবে গেলাম কোমলের নরম পাপড়ির মতো দুটি ঠোঁটে।  দুজনে পাশাপাশি বসে রইলাম অনন্তকাল। আকাশে অস্তরাগের লাল আভা। সেই আভা এসে পড়েছে আমার কোমলের গালে। আমারা কি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম?


কেউ কিছু বলেই চলেছে, আমার কানের কাছে। "অমিয় বাবু, শুনছেন? কি হলো, উত্তর দিচ্ছেন না কেন? শুনুন। আপনি তো বাইক চালাতে ভালোবাসতেন , তাই না ? কত কোম্পানির বাইক আছে। হঠাৎ বুলেট কিনতে গেলেন কেন?" কি বলল? কি বলল ওরা? আমার সারা গায়ে কেউ জ্বালা ধরিয়ে দিলো। বুলেট!! উফ্, আমার কোমল অন্য কারুর কথা ভেবে আমার বুলট চড়বে না?  চিৎকার করে উঠলাম।সহ্য করতে পারছি না। পৃথিবীটা ঘুরছে না কি আমার মাথাটাই? কেউ আমাকে চেপে ধরলো। মাথাটা কি বিছানায়? কিছুই বুঝতে পারছি না। 


মায়ের ভয়ার্ত গলার আওয়াজ পেলাম। "আর বলবেন না ডাক্তারবাবু। ওইখানেই তো সব সমস্যা।"  কি হয়েছে মায়ের? এত কথা কেন বলছে। আমি তো ঘুমোতে চাই। মা কি বুঝতে পারছে না। আমি কিছু বলব না। মা নিজেই কেন বুঝতে পারছে না আমি কারুর কথা শুনতে চাই না। আমি শুধু ঘুমোতে চাই। 

কিসব বলে চলেছে। বাবু অনেক কষ্টে, ধার দেনা করে নতুন বুলেটটা নিয়ে ওকে অবাক করে দিতে চেয়েছিল।  ভেবেছিল মেয়েটি খুব খুশী হবে আর দুজনে মিলে অনেক দূরে কোথাও ঘুরে আসবে। ওদিকে মেয়েটির স্বামীর দুর্ঘটনার পর থেকেই বুলেটের ওপর আতঙ্ক এসে গেছে। সে কিছুতেই চড়তে পারবে না।  তখন বাবুর মনে হয় ভালোবাসায় হেরে গেছে ওর প্রাক্তন মৃত স্বামীর কাছে। তাই ও চড়তে অস্বীকার করছে। প্রথম জীবনে একবার হেরে গিয়ে অস্বাভাবিক আচরণ করত। আবার নতুন করে পাওয়া ভালোবাসার কাছে হেরে যেতে সে পাগলের মত ব্যবহার করে। মেয়েটিকে খুব খারাপ ভাবে কথা বলতে শুরু করে। সে ও সহ্য করতে না পেরে বাবুর কাছ থেকে পালাতে রাস্তার মাঝখানে দৌড়াতে শুরু করে। একটি ট্রাক এসে পড়ে সেই মুহূর্তে। আর নিমেষের মধ্যে সব শেষ। বাবুর চোখের সামনে সব হলেও ও কিছুতেই মনে করতে পারছে না বা মেনে নিতে পারছে না।


মা প্লিজ্ , আমার খুব ঘুম পাচ্ছে, একটু চুপ করো। কি যে বকবক করো। তুমি কেনো আমায় বুঝতে পারো না। অভিমানে আমার দু'চোখ দিয়ে জল পড়ছে। মা চোখ মুছিয়ে দিতে দিতে কাঁদছেন আর বলছেন, "বাবু, আপন মনে বিড়বিড় করিস না। কি হয়েছে বল?  তুই কথা বল বাবু, কথা বল।"


(সমাপ্ত)







৩টি মন্তব্য:

  1. দুর্দান্ত লেখনী । অনেক শুভেচ্ছা রইলো তোমার জন্য ❤️❤️❤️❤️❤️🍫🍫🍫🍫🤗🤗🤗🤗🤗

    উত্তরমুছুন
  2. অসাধারণ লেখনী,,,,,, খুব ভালো লাগলো👌👌👌💐💐💐💐😊😊😊😊

    উত্তরমুছুন
  3. সম্পূর্ণ গল্পটিতে সাবলীলতা স্পষ্ট।চালিয়ে যাও বন্ধু।

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...