বুধবার, ২ ডিসেম্বর, ২০২০

মায়ের পরশ (পিয়ালী চক্রবর্তী)

 


ছোট্ট রিয়া । মায়ের সাথে থাকে । দুবছর আগে একটা গাড়ি দুর্ঘটনায় ওর বাবার মৃত্যু হয় । সংসারে নেমে আসে চরম দুর্গতি । 


মা - মেয়ের সংসার । মা মীরা দেবীর পেটে অত বিদ্যা নেই যে, তিনি কোনো অফিসে কাজ করতে পারবেন । লোকের বাড়ি বাড়ি ঘুরে পরিচারিকার কাজ করেন তিনি । ওনার একটা চোখ নেই । বহু কষ্টে সারাদিন পরিশ্রমের ফলে যে অর্থ উপার্জন হয়, তা দিয়ে তিনি মেয়েকে ভালো স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন । 


প্রথমদিন স্কুল থেকে ফিরেই রিয়ার মন খারাপ । স্কুলের কজন বাচ্চারা ওকে নিয়ে হাসাহাসি করেছে । তারা ওকে "কানিবুড়ির মেয়ে" বলে বলে উত্যক্ত করে তুলেছে সারাদিন । মায়ের প্রতি বিতৃষ্ণায় ওর মনটা ভরে উঠেছে । কি বিশ্রী আর ভয়ঙ্কর দেখতে লাগে ওর মা কে । এরকম মা থাকার চেয়ে না থাকা ভালো ।


দিন গড়িয়ে মাস, মাস গড়িয়ে বছর । সময়ের সাথে সাথে ওর মায়ের প্রতি ঘৃণা আরো বেড়ে চলে ।


একদিন বাড়ি ফিরে মাকে অসময়ে বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখে ও ভাবে, "মহারাণীর আবার হলো টা কি! পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছে ।" অশ্রদ্ধা ভরে মা কে ডাকে, "উঠে খেতে দাও । এতো ঘুম ভালো নয় ।" 


মায়ের শরীরও যে খারাপ থাকতে পারে, তা যেনো ওর মাথাতেই এলো না । মীরা দেবী কোনমতে শরীরটা টেনে বিছানা থেকে তুলে নিয়ে গেলেন রান্নাঘরের দিকে । মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন তিনি ।  রিয়া দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলো, মা কে ধরলোও না সে । উল্টে চরম বাক্যটা তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো সেদিন, "মরতে পারো না? তোমার জন্য স্কুলে আমি হাসির পাত্রী । একচোখো কানিবুড়ি কোথাকার ।" 


মীরা দেবী সব শুনেও কিচ্ছু বললেন না । ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে ভাত বেড়ে থালাটা সুন্দর করে সাজিয়ে , জলের গ্লাস পাশে রেখে আবার শুয়ে পড়লেন । মা কে শুয়ে পড়তে দেখে রিয়া মুখ বাঁকালো । আর মনে মনে ঠিক করলো এই কানিবুড়ির কাছ থেকে যত সম্ভব তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যেতে হবে । নাহলে সমাজে আর মুখ দেখানো যাচ্ছে না । 


দেখতে দেখতে কেটে গেল বেশ কয়েকটি বছর । রিয়া ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছে । মীরা দেবী যথাসাধ্য পরিশ্রম করে ওকে পড়িয়েছেন মনের মতো করে । চাকরি পেয়েই মা কে একা ফেলে রেখে চলে গেল রিয়া । সেই যে গেলো, তার পরে মায়ের সাথে সমস্তরকমের যোগাযোগ বন্ধ করে দিলো । অফিসের এক সহকর্মীর সাথে প্রণয় ও পরিণয়ে আবদ্ধ হলো সে । বছর দুয়েক পরে কোল আলো করে এলো ওর পুত্র । 


এভাবে সুখে শান্তিতে মায়ের ছত্রছায়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কেটে গেল আরও পাঁচ বছর ।  পুত্র ঋষির পাঁচ বছরের জন্মদিনের দিন সকালে কলিং বেলের আওয়াজ পেয়ে দরজা খুলে রিয়া দেখে, সামনে ওর মা দাঁড়িয়ে আছে । বয়সের ভারে মা আরও ভয়ানক ও কুৎসিত হয়ে উঠেছে । রিয়ার আঁচল ধরে থাকা ঋষি ওই রূপ দেখে ভয়ে কেঁদে উঠলো । রিয়ার ধৈর্য্চ্যুতি ঘটলো । মায়ের গালে সশব্দে একটা চপেটাঘাত করে বলে উঠলো,  "জন্মদিনের দিন ছেলেকে ভয় দেখাতে এসেছি কানিবুড়ি । ভেবেছিলাম মরে গেছিস । এখনো বেঁচে আছিস তুই? আমার বাড়ির ত্রিসীমানায় তোকে আর কোনোদিনও দেখলে, চোর বদনাম দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেবো ।" সশব্দে দরজাটা মায়ের মুখের ওপর বন্ধ করে দিলো সে ।


কেটে গেল বেশ কটা দিন । একদিন ওর নামে একটা চিঠি এলো । চিঠিটা খুলে দেখলো ওর মায়ের চিঠি । পড়তে শুরু করলো ।


সোনা, 

ছোটোবেলা থেকেই আমার রূপের জন্য অনেক কষ্ট সয়েছিস তুই । তোকে হাসির খোরাক বানিয়েছে তোর বন্ধুরা । বিশ্বাস কর, যেদিন তুই আমাকে বলেছিলিস সেই কথা, সেদিন থেকে আমি মরমে মরে আছি । সেদিনই নিজেকে শেষ করে দিতাম যদি তোর দ্বায়িত্ব আমার মাথার ওপরে না থাকতো । কিন্তু, জন্ম দিয়েছি তোকে । তোর বাবা চলে গেছে আমাদেরকে একা করে দিয়ে । আমিও যদি চলে যেতাম তাহলে এই বিশাল পৃথিবীতে একা মেয়ের পক্ষে বাঁচা খুবই মুশকিল । আমি চাইনি তোর জীবনটাও আমার মতো লোকের বাড়ি কাজ করে কাটুক । তাই ছেড়ে যেতে পারিনি সেদিন । আমার চোখটা এরকম ছিল না রে । যেদিন তোর বাবার গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটে, সেদিন আমার অল্প চোট লাগলেও, তোর একটা চোখে সাংঘাতিক আঘাত লেগেছিল । তোর বাবার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের টাকা দিয়ে আমি তোর চোখ অপারেশন করাই । নিজের একটা চোখ সেদিন দিয়ে দিয়েছিলাম যাতে, আমার বাচ্চা দুচোখ ভরে পৃথিবীটাকে দেখতে পারে । দূরে থাকলেও সব সময় তোর খোঁজ রাখতাম আমি । নাতিটাকে জন্মদিনের দিন আশীর্বাদ করতে গেছিলাম । ভাবতে পারিনি ও আমাকে দেখে ভয় পেয়ে যাবে । ছেলের ভয় পাওয়া দেখে একজন মায়ের যা কর্তব্য তুই সেটাই করেছিস আমাকে চড় মেরে । সেই জন্য আমার কোনো দুঃখ নেই রে । আসলে এই জীবনের বোঝা আমি আর বইতে পারছিনা । ক্ষমা করে দে আমায়, আজকে চিরবিদায় নিলাম তোর জীবন থেকে । এই চিঠি পেয়ে আমার খোঁজ করতে আসিসনা আর । আমি আর কোত্থাও নেই । সুখে থাকিস, ভালো থাকিস সোনা । 


ইতি

কানিবুড়ি


রিয়ার হাতেধরা চিঠি চোখের জলে ভিজে গেল । মায়ের প্রতি করা প্রতিটাদিনের সমস্ত ভুল-অন্যায়-অত্যাচার-পাপগুলো মনে পড়তে লাগলো ওর । আত্মগ্লানিতে বিষাক্ত হয়ে উঠলো ওর মন - প্রাণ । সত্যি মায়েরা কি এমনই হয়?

Copyright © All Rights Reserved

Piyali Chakravorty

১৪টি মন্তব্য:

  1. অসাধারণ।মা মা'ই হয়।মায়ের কোন বিকল্প হয় না।

    উত্তরমুছুন
  2. কুসন্তান যদি বা হয়,কুমাতা কখনো নয়....মাতৃস্নেহ ভরা এক বেদনাবিধুর কাহিনী😔😔😔😞😞😞😞....খুব যত্ন নিয়ে মায়ের অফুরান ভালোবাসার কাহিনী ব্যক্ত করেছো....

    উত্তরমুছুন
  3. অসাধারণ! মন ভরে গেল। কোনো কথা নয়।👌💫💫💥💥💅💅❤❤

    উত্তরমুছুন
  4. অসাধারন লেখনী...💐💐💐💐💐💐❤❤❤❤❤❤🍫🍫🍫🍫

    উত্তরমুছুন
  5. অসাধারণ লেখনী দিয়ে মাতৃস্নেহের বর্ণনা।
    খুব ভালো লাগলো 👌👌

    উত্তরমুছুন
  6. ভাষা নেই বলার,,,এত সুন্দর করে তুমি সবকিছু ফুটিয়ে তোলো 👌👌👌👌🤗🤗🤗🤗😘😘😘😘😘😘😘

    উত্তরমুছুন
  7. Khub sundor likhe6o go didi...chokhe jol ese gelo...sotti ma to ma e hoi... _ Haimanti.

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...