রবিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২০

সিজোফ্রেনিয়া~পর্ব-৩ (✍©অনিশা কুমার)


 সিজোফ্রেনিয়া (পর্ব-৩)


তারপর, তারপর, তারপর নাম গুলো তো মনেই পড়ছে না। আস্তে আস্তে অনেক বন্ধুরই বান্ধবী বিয়োগ হলো। কিন্তু আমার একটাই সমস্যা শুরু হলো, মেয়েগুলোকে প্রথম প্রথম যতটা গুরুত্ব দিতাম, পরের টার্গেট ঠিক করে ফেললে আর ওদের সহ্যই করতে পারতাম না। আর মেয়েগুলোও আমার সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য প্রথমে মান-অভিমান, তারপর কান্নাকাটি শুরু করে দিত। এইসময়টাই সবচেয়ে কঠিন হতো আমার।  একদিকে বিবেক বোধ আর অন্য দিকে প্রতিশোধ স্পৃহা। আমার যেন পাগল হয়ে যাওয়ার উপক্রম। ধীরে ধীরে বন্ধুর সংখ্যা কমতে লাগলো। এদিকে কলেজ ও শেষ। কোনো রকমে পাশ করলাম।

চাকরির চেষ্টা করা আর প্রাইভেট টিউশন করা ছাড়া আর কিছুই করার রইলো না আমার। প্রথম প্রথম খুব ছোট্ট বাচ্চাদের পড়ানোর ডাক পেতাম। কিন্তু এদের পড়ানোর একটাই সমস্যা, মায়েরা বড্ড বেশী রকমের বাচ্চাদের পড়ানোর ব্যাপারে খোঁজ খবর নেয়। স্বাধীন ভাবে পড়ানো যায় না। ধীরে ধীরে বাচ্চাদের মায়েদের সাথে কথা বলতে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। দেখলাম অনেকেই পড়ার বাইরেও অনেক কথা বলে। যেমন দোলাবৌদি, তিনি ছোট্ট বেলায় দোলনা চড়তে ভালোবাসতেন থেকে শুরু করে স্কুলে আচার খাওয়ার গল্প জমিয়ে করলেন। আমি ও পড়ানো ছেড়ে গল্পে মন দিলাম। উপহার স্বরূপ পরের দিনে চায়ের সাথে "টা" মানে কিছু সান্ধ্য আহারের ব্যবস্থা হলো। 
এবার শুরু হলো এই বৌদিদের নিয়ে নতুন গল্প। এরা নিজেদের সংসার নিয়ে কেউ সুখী নয়। দুঃখের বর্ণনায় আমার সহানুভূতি যেন ওদের কাছে দুঃখের ওপর সুখের প্রলেপ বলেই মনে হতো। তারপর আস্তে আস্তে আমার ব্রহ্মাস্ত্র ছাড়তে শুরু করতাম। এখানে আর মিষ্টি গলা, গানের কথা বলে বিশেষ লাভ হতো না। তখন কলেজ জীবনের ভালো লাগা, সিনেমা দেখা, নাটক দেখার কথা নিয়ে গল্প শুরু করতাম। আস্তে আস্তে ওদের মন নরম হতে শুরু করেছে বুঝে একদিন বাইরে কোথাও দেখা করতে বলতাম। এইসময় টাই একটা বুক ঢিপঢিপ করা কি হয়, কি হয় মনে হতো। তারপর একবার বের করতে পারলেই বাকি কাজ খুব সহজ হয়ে যেত। যেমন শুভশ্রী বৌদি ‌। নাটকের নামে অজ্ঞান। দাদার ইচ্ছে ও নেই, সময় ও নেই। প্রথম প্রথম আমার সাথে বেরিয়ে ও একটা দূরত্ব বজায় রাখতো। আমি ও কিছু বলতাম না। মনে মনে ভাবতাম শুধু সময়ের অপেক্ষা।  এখানে ও একটা অনাবিল আনন্দ উপভোগ করতাম। ওনার স্বামীর কাছ থেকে ওনাকে ছিনিয়ে নিতে পেরেছি, যেমন করে কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে করতাম ‌। 
ওখানে পড়ানো শেষ হয়ে গেলে শুভশ্রী বৌদির সাথে ও দূরত্ব শুরু হয়ে গেল। সেই অভিমান, কান্নাকাটি। এ যেন আর সহ্য হতো না। ফোনে ব্লক করে দিতাম।  আবার নতুন ছাত্র বা ছাত্রী। আবার নতুন গল্প। অকৃতদার হওয়ার অনেক সুবিধা। কাউকে কৈফিয়ত দেওয়া বা অপরাধ বোধে ভুগতে হয় না।

সুস্মিতা বৌদির দুর্বলতার দিকটা কিছুতেই ধরতে পারছিলাম না। অবশেষে একদিন ডায়েরী লেখার কথা গল্প করতে করতে বলেই ফেললেন, ওনার ছোট্ট বেলা থেকেই খুব কবিতা লেখার শখ। অনেক কবিতা লিখে ফেলেছেন। পড়বার কেউ নেই। আমি সাগ্রহে তাঁর সেই কবিতা ভরা ডায়েরী বাড়ি নিয়ে এলাম পড়ব বলে। এমনিতে কবিতা ভালোই লাগে, কিন্তু ওনার কবিতা কয়েকটি পড়ে আর ভালো লাগলো না। কয়েকদিন রেখে ডায়েরীটা ফেরত দিলাম। কবিতাগুলোর খুব প্রশংসা করে আরও লেখার জন্য উৎসাহিত করলাম। ব্যাস্, আমার কাজ শেষ এবার। উনি নিজেই কবিতা লেখেন, আমায় পড়তে দেন। বছর শেষে টিউশনের বেতন বাড়ে। চায়ের সঙ্গে প্রায়ই জল যোগের আয়োজন থাকে। ছাত্রকে বিশেষ কাজে দোকানে পাঠান। তখন শুধু বাড়িতে আমারা দুজন। সুতরাং সুযোগের সম্পূর্ণ সদ্ ব্যাবহার করি আমরা।  কত বৌদি এল, আর কতজন যে গেল। বেশ মজায়, আমেজে দিনগুলো কাটছিল। কোন মেয়ের দায়িত্ব না নিয়েও পুরোপুরি উপভোগ করছিলাম জীবনটা। কিন্তু আমার "কোমল", কেমন সব ওলট্ পালট্ করে দিয়ে চলে গেল। 
"সে যে চলে গেল, বলে গেল না, কোথায় গেল , ফিরে এল না।" 
"ওরে বাব্বা, এ তে হেঁড়ে গলায় গান শুরু হলো। " সেই মহিলার কন্ঠ। তীক্ষ্ম স্বরে চেঁচাচ্ছেন। আমি অবাক হয়ে চুপ করে গেলাম। আমি অমিয় চৌধুরী, আমার গান শোনার জন্য কলেজের অনুষ্ঠানে মেয়েরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকত। ছাত্র, ছাত্রী, অধিকাংশ অধ্যাপকরা আমার গানের ভক্ত ছিলেন। আমায় কেউ এমন কথা বলতে পারে ?





৩টি মন্তব্য:

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...