নাম - 'হিন্দু-হিন্দুত্ব এবং বিবর্তন।'
✍ মৃদুল কুমার দাস।
( ২য় পর্ব )
ভারতবর্ষের অধিবাসী ভারতীয়। হিন্দু নামকরণ বিদেশীদের দেওয়া। ভারতীয় কারা ছিল, হিন্দু পরিচয় এলো কীভাবে এবার ফিরে দেখার পালা।
নৃতাত্ত্বিকগণের মতে ভারতীয় জনসমূহের আদি স্তর নিগ্রোবটু বা নেগ্রিটো। অবশ্য এনিয়ে একটা বিতর্ক রয়েই গেছে। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে ভারতের প্রথম অধিবাসী আদি অস্ত্রাল( Proto- Australoid)। তথা মূলবাসী। প্রত্যেক দেশের মূলবাসী থাকে যেমন - আমেরিকার আদিম অধিবাসী,আফ্রিকায়,তেমনি ভারতেরও।
এই অস্ত্রাল জাতিই ত্রিশ হাজার বছর আগে ভারত থেকে সিংহল, ইন্দোনেশিয়া,মেলানেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের ইস্টার দ্বীপ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে ছিল। এরা কালো, বেঁটে, মাথা লম্বা থেকে মাঝারি। নাক চ্যাপ্টা। চুল তামাটে ও ঢেউ খেলানো। এরাই ভারতবর্ষের আদিম জাতি। এরাই হল কোল,ভিল,মুন্ডা,কুরুব, সাঁওতাল প্রভৃতি গোষ্ঠীর লোক।
এদের সঙ্গে প্রথমে বাইরে থেকে এসে যুক্ত হল ভূমধ্য নরগোষ্ঠী, যাদের ভাষা হলো দ্রাবিড়। এদের ভাষা দ্রাবিড় বলে এদের বলা হয় দ্রাবিড় জাতি।
এই দ্রাবিড় জাতি ভারতবর্ষে প্রথম নাগরিক সভ্যতা গড়ে তোলে। যার নিদর্শন উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো সভ্যতা। আর এই সভ্যতা সিন্ধু নদের তীরে অবস্থিত ছিল বলে এর নাম সিন্ধু সভ্যতা। আবার সিন্ধু সভ্যতাকেও বলা হয় দ্রাবিড়ীয় সভ্যতা। এই দ্রাবিড়রা দৈহিক আকৃতিতে মাঝারি। মাথা লম্বা। পাতলা গড়ন। নাক ছোটো। রং কালো।
এই দ্রাবিড়দের অনুসরণ করে ভারতবর্ষে এসেছিল আলপীয়রা(Alpinoid)। একটি শাখা ইরাণে, আরেকটি ভারতে আসে। ইরানের শাখাকে ইরাণীয় আর্য। আর ভারতীয় শাখাকে বলে ভারতীয় আর্য। এদের ভাষাকে বলে আর্য ভাষা। এরাই ভারতবর্ষে আর্য সভ্যতার প্রতিষ্ঠাতা।
ভারতীয় আর্যদের গায়ের রং ফর্সা। মাথা গোল ও বিস্তৃত। চুল ও চোখ কালো। দেহ মাঝারি ও দীর্ঘ। নৃতাত্ত্বিকণণের অনুমান আলপীয়রা তথা আর্যদের জন্ম মধ্য এশিয়ার পার্বত্য অঞ্চলে। এদের ভারতে অনুপ্রবেশের সময়কাল ধরা হয় আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ - অবশ্য তারও আগে নিশ্চয়ই প্রস্তুতি ছিল, ভারতবর্ষে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য।
আর্যদের আধিপত্য বিস্তারের ফলে দ্রাবিড়রা উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের দিকে বিতাড়িত হতে শুরু করেন। তাঁরা বিন্ধ্য পর্বতের দক্ষিণে এসে হাজির হন। এই বিন্ধ্যের দক্ষিণে দ্রাবিড়রা, আর উত্তরে আর্যরা বসবাস করতে থাকেন। বর্তমানে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলির ভাষা দ্রাবিড় ভাষা বংশজাত। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে দ্রাবিড় জাতির গৌরবময় অধ্যায় শুরু হয়েছিল। রাষ্ট্রকূট, বিজয়নগর,পূর্ব-পশ্চিম চালুক্য,পহ্লব,সাতবাহন,মাইসর প্রভৃতি এঁরা দ্রাবিড় জাতির রাজন্যবর্গ ছিলেন। নিজেদেরকে এঁরা 'হিন্দু' রাজা বলে মনে করতেন। সর্বাগ্রে বিজয়নগরের রাজা 'হিন্দু রায়' নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। এই পাঁচটি রাজ্য নিজেদের ব্রাহ্মণ জাতির বলে অভিহিত করেছিলেন, এঁদের বলা হতো 'পঞ্চ দ্রাবিড়'। আর উত্তরাংশের আর্যরা 'পঞ্চ গৌড়া' আখ্যায় ভূষিত হন।
দ্রাবিড় ভাষা বংশের প্রধান ভাষা একেবারে দক্ষিণের রাজ্যগুলির ভাষা, যেমন- তমিল,মালয়ালম, তেলেগু কন্নড়। তামিলনাডুর তামিল,কেরালার মালয়ালম( শঙ্করাচার্য কেরালার অধিবাসী ছিলেন বলে সংস্কৃত ভাষার প্রধান্য বেশী ছিল), কর্ণাটকের কন্নড়,অন্ধ্রের তেলেগু। উত্তর মধ্যদেশীয় ভাষাগুলি যেমন ওরাঁও,কুরুখ,মালতো। আর্যদের তাড়া খেয়ে দ্রাবিড়দের একটা ক্ষুদ্র গোষ্ঠী বিচ্ছিন্ন হয়ে পশ্চিম দিকে চলে যায়। এদের ভাষা 'ব্রাহুই'। বর্তমানে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে এই ব্রাহুই ভাষার নিদর্শন মেলে। এই ব্রাহুই ভাষার নিদর্শন থেকে প্রমাণিত হয় সিন্ধু সভ্যতা আসলে দ্রাবিড়ীয় সভ্যতা।
আর্যরা ক্রমেই বৃহত্তর ভারতবর্ষের ( সিন্ধুর পূর্ব অববাহিকা) চালিকা শক্তি হয়ে ওঠেন। তাঁরাই আর্য সভ্যতার বীজ বপন করলেন।
তাহলে বোঝাই যাচ্ছে আর্যরা বহিরাগত শক্তি। ক্রমে ভারতবর্ষে শৌর্য বীর্যবত্তায় তাঁরা এমনই আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন তাঁদের দেখাদেখি সিন্ধুর পশ্চিম অববাহিকায় ইসলাম শাসকগণ বারবার চেষ্টা করেও হাজার দেড়েক বছরের চেষ্টাতেও সিন্ধুর পূর্ব অববাহিকাকে দখলে আনতে সফল হননি। আর্যদের সঙ্গে পেরে না ওঠা,আচার আচরণে সম্পূর্ণ পার্থক্য বোঝাতে ইসলামদেরই এই হিন্দু নামের আমদানি।
আর ভারতীয়রা জাতিগত পরিচয়ে একটি মিশ্র জাতি। কেননা অস্ট্রিক, দ্রাবিড় ও আর্যদের মিশ্রণে একটি মিশ্র জাতি বলে।
আর আর্যদের বর্ণশ্রেষ্ঠ হলেন ব্রাহ্মণ্য সম্প্রদায়। দেশ রক্ষার জন্য ক্ষত্রিয়, বাণিজ্যের জন্য বৈশ্য,আর এই তিন সম্প্রদায়কে সেবা করার জন্য শূদ্র - এই চতুরাশ্রম দিয়ে সমাজের পরিকাঠামো নির্মাণ করলেন তাঁরা। আর শূদ্রদের চেয়েও সমাজে নারীর অবস্থান ছিল সবচেয়ে সঙ্গীন।
ব্রাহ্মণ সবার উপরে। তারাই বিধান দিলেন কেন তাঁরা শ্রেষ্ঠ! তাঁদের পরম পুরুষের মুখ হতে জন্ম বলে। তাঁরাই অগ্নিহোত্রী। যাগযজ্ঞের তাঁরাই প্রধান নিয়ামক- যজ্ঞকুন্ড বানানো, তাতে আগুন জ্বালিয়ে ঘৃতাহূতি দান, দেবদেবীর ভোজের জন্য যজ্ঞে পশুমাংস উৎসর্গ করা, সেই মাংস যাজক ও যজমানদের মধ্যে বিতরণ করা, সঙ্গে সোমরস পান - এইসব ছাড়াও অধ্যয়ন,নিজ নিজ বর্ণের বিহিত নির্ধারণ সংস্কার প্রতিপাদন করার প্রধান হোতা হলেন ব্রাহ্মন।
আর স্রষ্টার বাহু হতে জন্ম রাজন্যবর্গের। নাম ক্ষত্রিয়। কাজ হবে দেশ রক্ষা ও যুদ্ধবিগ্রহে সামিল হওয়া,প্রজাপালন,অসাধু নিগ্রহ করা। আর বৈশ্যের জন্ম পরমপুরুষের উরুদ্বয় থেকে। কৃষি, পশুপালন, ক্রয়-বিক্রয়ের বাণিজ্য হবে তাঁদের পেশা। শূদ্রের জন্ম পরমপুরুষের পা থেকে। তাই তার কর্তব্য হবে- 'পূর্ববর্ণপরতন্ত্রা' অর্থাৎ এই তিন বর্ণের সে হবে সেবক। এর প্রমাণ রয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ সালে রচিত ঋক্ বেদের দশম মন্ডলে।
এই শূদ্র কারা? এদেশের অস্ট্রিক সম্প্রদায়ের মানুষ যাঁরা, যাঁদেরই পদানত করে এই আর্যসভ্যতার অভ্যুদয় ঘটেছিল। এই আর্যসভ্যতার ব্রাহ্মণ্যশ্রেনী ছিলেন সমাজের শিরোমণি। তাদের তৈরি চতুর্বেদ, বেদান্ত, নীতিশাস্ত্র, মহাকাব্য, মোক্ষ শাস্ত্র, কামশাস্ত্র... সে সৃষ্টির প্রলয়োল্লাস কীভাবে ঘটেছিল, তাঁদের তৈরি বিধিবিধান, বিশেষ করে নীতি শাস্ত্র ( ষড় দর্শন - কপিলের সাংখ্য, পতঞ্জলির যোগশাস্ত্র, গৌতমের ন্যায়, কণাদের বৈশেষিক,জৈমিনীর পূর্ব মীমাংসা এবং ব্যাসের বেদান্ত) প্রণেতা গণের দ্বারা সমাজে কীভাবে মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল - এই দু'হাজার বছরের ইতিহাসে পাই কেবল বিবর্তনের চিহ্ন। তার উপর আবার বিভিন্ন প্রবক্তা ও তাঁদের রচিত একের পর এক গ্রন্থও যা ৬০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত - এই দু'হাজার বছরের সময়সীমা ধরে এতো রাশি রাশি গ্রন্থ রচিত হল অথচ একটিকে অন্তত ধর্মগ্রন্থ বলে চিহ্নিত করা যেতে পরত। কিন্তু করা যায়নি কেন আগে বলেছি। ধর্মগ্রন্থ বলে চিহ্নিত না করতে পারার মধ্যে অসুবিধার চেয়ে সুবিধা হয়েছিল অনেক বেশি। বলতে গেলে শাপে বর হয়েছিল কীভাবে ও তা থেকে তৎকালীন হিন্দুত্বের পরিচয় কী ছিল, মূল্যবোধ ভিত্তিক জীবন কীভাবে গড়ে উঠেছিল, নীতি শাস্ত্রগুলির বিষয় কী ছিল, তাই নিয়ে আলোচনা পরের পর্বে।
(চলবে)
বিজ্ঞান, বিশ্বাস, ও আস্থা হচ্ছে হিন্দু সম্প্রদায়। দারুন দাদা।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা। অনুপ্রাণিত।❤❤💫💫💥💥
মুছুনখুব ভালো লাগলো দাদা🙏
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।অনুপ্রাণিত। ❤💫💫💥💥💅💅
উত্তরমুছুনখুব ভালো লাগলো।🖤❤️🙏
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা। 💫💫💥💥
মুছুনহিন্দুসম্প্রদায়ের একেবারে গভীরে নিয়ে গেলেন দাদা।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ।শুভেচ্ছা।💫💫💥💥
মুছুনঠিক✅ চলছে। দেখি আরও ।খননকার্য শুরু হয়েছে সবে।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।💫💫💥💥
উত্তরমুছুন