বুধবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০২০

শুচিতা(সুদেষ্ণা দত্ত)

 শুচিতা

©সুদেষ্ণা দত্ত

(গভীরভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য)


                 


  অষ্টাদশী মীরা মেয়েবেলা থেকেই ঈশ্বরভক্ত।সে নিত্য মন্দিরে পুজো দিতে যায়।মীরার ঈশ্বরভক্তি তাকে সকলের চোখে করে তুলেছে অনন্যা।মীরা আজও শুচিস্নিগ্ধ হয়ে মন্দিরে গেছে।পুজোর সময় আরতি চলাকালীন হঠাৎ এক মহিলা মীরার পোশাক দেখে আবিস্কার করেন মীরা রজস্বলা।এই ঘটনায় মন্দিরে শোরগোল পড়ে যায়।এরমধ্যে আরতি করতে গিয়ে পঞ্চপ্রদীপের একটি অংশ খুলে পড়ে নারায়ণ শিলার উপর।সকলের মনে বেজে ওঠে সম্ভাব্য অশনি সংকেত।মীরাকে অপমান করে মন্দির থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।উপস্থিত মহিলারা ঘটি ঘটি দুধ গঙ্গাজল ঢেলে মন্দির পরিষ্কারে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

            এই ঘটনা মীরার মনে গভীর রেখাপাত করে।সে হয়ে পড়ে হতাশাগ্রস্ত।কারণ দেবালয়,ঠাকুরঘর ই ছিল তার কাছে মুক্তির আকাশ।তার মনে হয় প্রত্যেক মাসের এই স্বাভাবিক ঘটনা তার ডানা দুটো কেটে দেয়।সে ওই বিশেষ দিনগুলো গৃহবন্দী থাকতে বাধ্য হয়।রান্নাঘরে মায়ের বাসনের শব্দ তার মনে হয় মন্দিরের ঘন্টাধনিকে ব্যঙ্গ করছে।অপরিণত বুদ্ধির আবেগতাড়িত হয়ে এক হটকারী সিদ্ধান্ত নেয় মীরা।এরপর সে বাড়ীর কাউকে না জানিয়ে অনেক খোঁজ খবর নিয়ে এক স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞর দ্বারস্থ হয়।সে ডাক্তারবাবুকে জানায় যে প্রত্যেক মাসের এই প্রক্রিয়া থেকে সে মুক্তি চায়।ডাক্তারবাবু কোনোভাবেই তার এমন আচরণে সম্মত হতে পারেন না এবং তাকে সম্ভাব্য শারীরিক জটিলতার বিষয়েও অবগত করেন।কিন্তু নাছোড়বান্দা মীরার অনুরোধ উপরোধে শেষ পর্যন্ত ডাক্তারবাবু তাকে নিয়মিত রজস্রাব বন্ধের হরমোনাল ওষুধ দেন।বাড়ীতে ধামাচাপা দিয়ে চলতে থাকে সে এবং মাসের বিশেষ দিনগুলোর কথা মাথায় রেখে কখনও বন্ধুর বাড়ী, কখনও দোকান-বাজার করার ছলে মন্দিরে যায়।তার মনে আনন্দের সীমা নেই।

         সেই ঘটনার বছর পাঁচেক পর স্বাভাবিক নিয়মে মীরার বিয়ের কথাবার্তা চলতে থাকে এবং বিয়ে স্থির হয়।নির্দিষ্ট দিনে তার বিয়ে সম্পন্ন হয়।সুশ্রী,গুণবতী,ধার্মিক মীরা শ্বশুরবাড়ীতে সকলের চোখের মণি হয়ে ওঠে।কিন্তু বিয়ের বছর চারেক পরেও যখন মীরার সন্তান হয় না তখন শুরু হয় ফিসফাস।নানা ডাক্তার দেখিয়েও কোন কাজ হয়না।পাশাপাশি চলতে থাকে কবচ-তাবিজ -মাদুলি-জ্যোতিষ।শেষে একদিন শাশুড়ী মা নিজে এক নামি স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে মীরাকে নিয়ে যান এবং তিনি জানান দীর্ঘদিন হরমোনাল ওষুধ খেয়ে রজস্রাব বন্ধ রাখার ফলে সন্তানধারণে সমস্যা হচ্ছে মীরার।এর চিকিৎসা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।এই ঘটনায় যারপরনাই আহত হয় তার পরিবারের লোকজন।সবাই মীরাকে নানা অকথ্য কথা বলতে থাকে।মীরা তখন তার খুড় শাশুড়ী যিনি সেদিন মন্দিরে উপস্থিত ছিলেন তাঁকে পাঁচ বছর আগের সেই ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে অবিরত চোখের জল ফেলতে ফেলতে মীরা জানায় সেদিন তো এক নারী হয়েও আর এক নারীত্বকে অপমান করে দুধ গঙ্গাজলে মন্দির ধুয়ে সূচিতা ফেরাতে ব্যস্ত ছিলে।আমি যে একমুহূর্ত ঠাকুরের থেকে দূরে থাকতে পারিনা।আজ তবে বল সকলে দোষ কার আমার না সমাজের?

বসুন্ধরা যেথায় হয়

কর্ষণ যোগ্য,

মা কামাখ্যা হয়ে ওঠেন

 সকলের পূজ্য,

সেই শোনিতধারা অপবিত্র 

পবিত্র প্রাঙ্গনে!

আর্তব  শুধু শুচিশুদ্ধ 

সন্তানধারণে!

        ছবি সৌজন্য--সামাজিক মাধ্যম       

All copyrights are reserved for Sudeshna Dutta

২৮টি মন্তব্য:

  1. সুন্দর ভাবে গল্পের মাধ্যমে একটি বাস্তব সত্য তুলে ধরেছ।
    অসাধারণ 👌👌

    উত্তরমুছুন
  2. অপূর্ব লাগলো বন্ধু👌🏻👌🏻👌🏻👌🏻👌🏻

    উত্তরমুছুন
  3. আমি পিয়াসা পাঁজা
    অসাধারণ।খুব ভালো লাগল। আরো লেখা চাই।

    উত্তরমুছুন
  4. ধন্যবাদ তোমায়।এভাবে সঙ্গে থেকো।

    উত্তরমুছুন
  5. অসাধারণ একটা উপস্থাপনা দিলি। ধন্যবাদ। 👌👌💫💫💥💥💅💅🤚❤❤

    উত্তরমুছুন
  6. অসাধারণ বর্ণনা দিলে। 👏👏❤️🖤❤️🖤
    কেউ কোনো কথা বললে একটা প্রশ্নই আগে করি,যে এই সময় মেয়েদেরকে
    মন্দিরে যেতে দেয়া হয় না,রান্নাঘরে যেতে দেওয়া হয় না।
    কিন্তু আমরা যে গৃহ খানিতে থাকি সেখানেও তো অনেক
    ঠাকুরের ছবি থাকে।ঘর টাও তো মন্দির সরূপ তাহলে তো এই সময় গৃহে থাকাও বারন।
    এসব নিয়মের তোয়াক্কা আমরা করবো না কখনও।মুখের
    উপর জবাব দিতে প্রস্তুত হতে হবে আমাদের।
    মন পবিত্র থাকলে সব পবিত্র।

    উত্তরমুছুন
  7. আজ ও বাস্তব .. একটা সুন্দর লেখনীর মাধ্যমে সামনে তুলে ধরা হয়েছে.. খুব ভালো লাগলো...অদিতি।

    উত্তরমুছুন
  8. মানুষের মাথায় ছুঁই ছুঁই ব্যাপার টা এমন ভাবে ঢুকে গেছে যে তারা বেরোতেই পারছে না এখনও..... লেখা টা অসাধারন ❤️

    উত্তরমুছুন
  9. যতদিন পর্যন্ত দেহের শুচিতা নিয়ে মাথাব্যাথা থাকবে আর মন থেকে যাবে কুয়োর ব্যাঙ হয়ে ততদিন পর্যন্ত এই মীরাদের মানসিক নির্যাতন এর শিকার হতেই হবে।

    উত্তরমুছুন
  10. Very nice story. While reading the story I feel that Bengali women are coming out of the taboo relating the matter. Excellent. Excellent. Good thinking.

    উত্তরমুছুন
  11. সমাজের চিরাচরিত ধারণার মূলে আঘাত করে খুব ভালো করেছো ...তোমার লেখনীর তীক্ষ্মতায় ভ্রান্ত ধারণার অবসান ঘটুক....

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...