সোমবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২০

একাকীত্ব। ( ছোট গল্প । পারমিতা মন্ডল।)

গল্পের নাম--- একাকীত্ব।

লেখিকার নাম ---পারমিতা মন্ডল।

আমি মৃনালীনি । মফস্বলের মেয়ে ছিলাম । ওখানেই স্কুলে পড়াশোনা করেছি । কলেজও মফস্বলেই। গ্রামের মেয়ে । তাই কলেজের পড়া শেষ হতে না হতেই বাবা বিয়ে দিয়ে দিলেন।  গ্রামের সবাই বলতো মেয়েদের  বেশি লেখাপড়া শিখিয়ে কি হবে ? বিয়ে দিয়ে দাও  ।কিন্তু আমার বাবা শোনেনি । আমাকে কলেজে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। কলেজে পড়তে পড়তেই আমার বিয়ে হয়ে যায়। আমার স্বামী ডাক্তার ছিলেন । এতো ভালো পাত্র বাবা হাত ছাড়া করতে চাননি । তাই দূর হলেও বিয়ে দিয়ে দিলেন।

    আমার স্বামীর পৈত্রিক বাড়ি কিন্তু গ্রামেই ছিল । কিন্তু কর্মসূত্রে উনি কলকাতায় থাকতেন। বিয়ের পর কিছুদিন গ্রামের বাড়িতে থাকার পর আমাকেও নিয়ে গেলেন কলকাতার ভাড়া বাড়িতে। একুশ বছর বয়সে কলকাতায় এলাম  স্বামীর সাথে সংসার করতে।গ্রামের মেয়ে । শহরের আদব কায়দা কিছুই জানি না । তারপর ভাড়া বাড়ি। আগে কখনোই থাকিনি । কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই আমরা একটা দোতলা  পুরনো  বাড়ি  কিনি। বাড়ওয়ালা কি কারণে যেন বিক্রি  বিক্রি করে দিচ্ছিল । আমরা কিনে নিলাম। একটু সারাই টারাই করে, রং করে নতুন  বাড়ি হয়ে গেল। আজ পঁয়ত্রিশ বছর হয়ে গেল, আজও আমি সেই বাড়িতেই বসবাস করছি। কত সুখ দুঃখের স্মৃতি জড়ানো আছে এই বাড়িতে। এই বিশাল বড় বাড়িতে আজ আর কেউ নেই। আমি একা ।
   
স্বামী মারা গেছেন আজ পাঁচ বছর হলো । একমাত্র ছেলে বিদেশে চাকরি করে ।  ছেলে আমার খারাপ নয় । সব সময় খোঁজ খবর নেয়।  ওদের সাথে নিয়ে যেতেও চেয়েছিল । কিন্তু আমি যাইনি। কি করবো ওখানে গিয়ে ? ওদের ভাষা তো বুঝবো না । কথা বলতে পারবো না । আর ছেলে বৌমা সব সময় ব‍্যস্ত  । আমার আরো বেশী একা লাগতো ।  তার চেয়ে এই ভলো ।কত স্মৃতি জড়ানো এই বাড়ি ছেড়ে  কোথাও যেতে ইচ্ছা করে না ।  কলমি আমার দেখা শোনা করে । বড় ভালো  মেয়ে সে। সারাদিন থাকে ।  সন্ধ্যা হলে বাড়িতে চলে যায়। আমার সব কিছু হাতের কাছে গুছিয়ে দিয়ে যায়। এমনিতে কোন অসুবিধা নেই।

  ভাবতে  ভাবতে  কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিলাম । কলমির ডাকে সম্বিৎ ফিরে এলো। কলমির যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।ডাক দিয়ে বলল ", দিদা আমি আসছি গো । টেবিলে তোমার  খাবার ঢাকা দেওয়া আছে । সময় মতো খেয়ে নিও ।," বলেই ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে গেল । ওর ও  বসার সময় নেই। খুব ব‍্যস্ত। আরো এক  বাড়িতে বিকেলে রান্না করে। তারপর বাড়ি যায় । শুধু আমারই অনন্ত অবসর । আজ আর কোন কাজ নেই । দিন কাটলেও রাত যেন কিছুতেই কাটতে চায়না।  দেওয়াল গুলো মনে হয় যেন গিলতে আসছে । আজ সেই মাসিমার কথা বড্ড মনে পড়ছে ।. পরিবারের একটু সঙ্গ পাওয়ার জন্য মানুষ কতো  কিছুই  না করে ? তবুও ছেলে মেয়েরা তা বোঝে না ।

  তখন আমার নতুন নতুন বিয়ে হয়েছে । বরের সাথে বাসা বাড়িতে এসে উঠেছি । শহরের কোন কিছুই তেমন জানিনা । স্বামী বেরিয়ে গেলে সারাদিন একা ।  উনি তো ডাক্তার ছিলেন। সেভাবে কখনোই সময় দিতে পারতেন না । গ্রামে লোকজনের  মধ্য থেকে এসে , এখানে সম্পূর্ণ একা । কথা বলারও কোন লোক নেই। সবাই যেন খুব ব‍্যস্ত। তাছাড়া যেহেতু আমি গ্রামের মেয়ে , শহরের তেমন কিছু বুঝি না ,  তাই আমার স্বামী বার বার বল দিয়েছিলেন , সেলসম্যান বা অন্য কেউ এলে যেন দরজা না খুলি । এখানে নাকি এভাবে চুরি হয়। সেই ভয়ে আরো  কারো সাথে কথাই বলতাম না। গুটিয়ে থাকতাম নিজের মধ্যে।

  এমনই একদিন দুপুরবেলায় সব কাজ সেরে স্নান করে এসেছি। এমন সময় শুনি কলিং বেলের আওয়াজ। ভাবলাম উনি মনে হয় এসেছেন। অনেক সময় ম‍্যানেজ করে  সুযোগ পেলেই বাড়িতে চলে আসতেন , আমকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য । দৌড়ে ছুট্টে গিয়ে দরজা খুলতে গেলাম।  কিন্তু মনে পড়ে গেল  ;  "না দেখে দরজা খোলা যাবে না। "  স্বামীর সাবধান বানী  ।  তাই আইহোল দিয়ে উঁকি দিলাম। কাউকে দেখা গেলনা। আবার বেলের আওয়াজ। এবার দরজাটা একটু ফাঁক করে দেখি একজন বয়স্ক মহিলা ।  এই আমার মায়ের মতো বয়স হবে দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে একটি পুঁটুলি। খুব ঘেমে আছে। দরজা খুলতে গিয়ে আবার মনে পড়ে গেল। এরকম সেজে আসে  কলকাতা শহরে চুরি করতে ।

বর অনেক বার সাবধান করে দিয়েছে। দরজা খোলা যাবে না।

আমি একটু ফাঁক করেই বললাম  ;"কে ? কি চাই?"

উনি বললেন ,; মা একটু জল হবে ? খুব জল পিপাসা পেয়েছে । "

আমি দরজা না খুলেই ফাঁকা দিয়ে এক গ্লাস জল এগিয়ে দিলাম।

উনি এগিয়ে এসে জলটা নিয়ে এক নিমেষে শেষ করে ফেললেন।

আহা রে ! বুড়ো মানুষ। রোদে রোদে ঘুরছে। খুব কষ্ট হচ্ছে মনে হয়।

আমি বললাম ; "মাসিমা তোমার বাড়ি কোথায় গো ? এদিকে কোথায় যাচ্ছো ? "

উনি বললেন;  " বাড়িটাই তো খুঁজে বেড়াচ্ছি মা । পাচ্ছি না তো ? কোথায় যেন বাড়িটা ছিল ?"

তার মানে  ?  তুমি পথ হারিয়ে ফেলেছো ? বাড়ি চিনতে পারছো না ? সেকি ? এবার তাহলে কি হবে ?

উনি বললেন  ; " আমাকে একটু সাহায্য করবে ?  আমি সব ভুলে গেছি । কোথায় বাড়ি ? কি নাম আমার ?"

বললাম দাঁড়াও আমার বর তো ডাক্তার, অনেক কিছু জানে।অনেক লোককে চেনেও। দেখি তোমার বাড়ি খুঁজে দিতে পারে কিনা ?
 

এই বলে মাসিমাকে বসতে বলে আমি ভিতরে এসে আমার বরকে ফোন করলাম। এখনকার মতো তখন এতো মোবাইলের চল ছিল না। ল‍্যান্ডফোনে ফোন করতে হতো। ব‍্যস্ত থাকলে ধরতে পারতো না।কিন্তু আমার কপাল ভালো একবারেই ফোনটা ধরলো। আমার সব কথা শুনে উনি বললেন কোন ভাবেই যেন আমি দরজা না খুলি । ওদের নাকি গ‍্যং থাকে। এভাবেই ওরা চুরি করে। উনি বললেন চেষ্টা করছেন যতো তাড়াতাড়ি পারেন বাড়িতে আসতে। আরো বললেন আমি যেন ওনার ছেলের  ফোন নাম্বার নিয়ে নেই।  কিন্তু উনি তো কিছুই মনে করতে পারছেন না।

ফিরে এসে দরজা ফাঁক করে দেখি মাসিমা কেমন যেন নেতিয়ে পড়েছে। ক্ষিদে পেয়েছে মনে হয়। যতোই আমার বর বলুক না কেন আমার কেমন যেন মায়া হলো

বললাম , "মাসিমা , কিছু খাবে ?
 
"উনি ক্লান্ত শরীরে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন;" ক্ষিদে তো পেয়েছে মা । কিন্তু তুমি তো আমাকে বিশ্বাস করতে পারছো না?"

ওনার কথায় লজ্জা পেয়ে গেলাম। সত্যিই আমি ওনাকে বিশ্বাস করতে পারছি না। এটা উনি বুঝে গেছেন।  আসলে মাসিমাকে দেখে কোন ভিখারী বলেও মনে হচ্ছে না । পরনে জামা কাপড়, চেহারায় বেশ আভিজাত্য আছে । গরীব ঘরের বলেও মনে হচ্ছে না । সত্যিই হয়তো বাড়ি খুঁজে পাচ্ছেন না ।

কি করি এখন  ?  মনে মনে ভাবি  ;উনি বাড়িতে এলে না হয় দেখা যাবে। এখন ওনাকে কিছু বলার দরকার নেই   ।  অন্য ঘর গুলোতে তালা দিয়ে এই বসার ঘরে বসিয়ে মাসিমাকে একটু খাবার দিয়ে তাড়াতাড়ি উনি আসার আগেই বিদায় করে দেই। ততক্ষণে নিশ্চয় ওনার বাড়ির কথা মনে পড়ে যাবে।

এই ভেবে দরজা খুলে দিলাম।  উনি ভিতরে এসে বসলন । পাখা চালিয়ে দিলাম। একটু যেন স্বস্থি  পেলেন। 

দেয়ালে আমার বরের  ছবি দেখে  উনি বললেন " এই বুঝি তোমার বর ? খুব সুন্দর দেখতে তো !  তুমি আর তোমার বর  থাক এখানে ? ভারি মিষ্টি মেয়ে তুমি ।
  
বললাম ;হ‍্যাঁ ,আমরা দুজনেই এখানে থাকি । আমি সারাদিন একা থাকি । একটুও ভালো লাগে না । ওর তো সময় নেই। খুব একা লাগে। তবে আজকে একটু ভালো লাগছে। তুমি এসেছো। একটু কথা বলতে পারছি।

হঠাৎ মনে পড়ে গেল ,কেন এসব কথা বলছি আমি ? এরা তো ইনফর্মার হয় । এভাবেই খবর যোগাড় করে । আমার বর কতো সাবধান করে দিয়েছিলো আমাকে । আর আমি কিনা সব বলে দিচ্ছি ? কি বোকা আমি !  ধ‍্যাৎ !

একে তো ঘরে ঢুকিয়েছি । ও জানতে পারলে রাগ করবে । ঠিক এই সময় ফোনটা বেজে উঠলো ।

" হ‍্যালো ? কি খবর ? তোমার ঐ বুড়িটা গেছে তো ?"
 
  আমি আমতা আমতা করে বললাম ; " না মানে বসার ঘরে একটু বসতে দিয়েছি । একটু খাবার দেবো। এখনই চলে যাব।"

"সেকি ? তুমি ঘরে ঢোকালে ? বিপদ না বাড়িয়ে ছাড়বে না দেখছি ।এতো করে  সাবধান করলাম তাও ?  এদিকে আমার আজ একটা অপারেশন পড়ে গেছে । তাড়াতাড়ি আসতেও পারছি না । দেখো বাড়ির ঠিকানা বা ফোন নাম্বার কিছু বলে কিনা ? ছেলের নাম জিজ্ঞেস করো । নাহলে পুলিশে জানাতে হবে ।  খুব সাবধানে থাকো। আমি আসছি। "

আমারও যে ভয়  লাগছিল না তা নয়। তবে বেশ ভালোও লাগছিল। একজনের সাথে অন্তত কথা বলতে পারছিলাম। বললাম ;"  মাসিমা তোমার কয়টি ছেলেমেয়ে ? তাদের করো নাম মনে পড়ছে না ?  কিকরে তুমি বাড়িতে ফিরবে ? ওরা হয়তো তোমাকে খুঁজছে । "

"আচ্ছা তুমি কি আমাকে চলে যেতে বলছো ?  কিন্তু আমার তো কিছুই মনে পড়ছে না ? তাছাড়া বাইরে যা রোদ ! একটু রোদটা কমলেই আমি চলে যাবো । তুমি খেয়ে নাও । কোন ভয় নেই তোমার । আমি চোর না।  "

"না, না মাসিমা , সেকি ? আমি সে কথা বলছি না ।"-- তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম । আসলে কোথায় যেন আমার ও ভালো লাগছিল এই নির্জন দুপুরে , অচেনা এই মাসিমার সঙ্গে কথা বলতে । আমিও তো সারাদিন একা থাকি ।

  না, মাসিমাকে আমার ও খারাপ বলে মনে হচ্ছে না । তবুও সাবধানের মার নেই । ঘরে তালা দিয়ে আমি স্নান করতে গেলাম।ফিরে এসে দেখি  অবাক কান্ড। মাসিমা রান্নাঘরে ঢুকে সুন্দর করে থালা বাসন ধুয়ে খাবার বেড়ে ফেলেছেন। আমি তো অবাক। হঠাৎ যেন মায়ের কথা মনে পড়ে গেল। মাও তো এভাবেই খাবার বেড়ে দিতো । কতদিন কেউ এভাবে খাবার বেড়ে দেয়নি। চোখে জল চলে এলো। দুজনে মিলে বেশ গল্প করতে করতে খেলাম।

কিছুক্ষন বাদেই বরের ফোন এলো । বলছে; " কিগো তোমার মাসিমা চলে গেছে ? নাকি এখনো আছে ?"

বললাম , না যায়নি । এই মাত্র খেয়ে উঠলাম আমরা।"

" তার মানে ?" তুমি ঘরে ঢুকিয়ে নিলে নাকি ? বাড়ির কথা কিছু বললো ? ইচ্ছা করে ভুলভাল বলছে নাতো ? তুমি সাবধানে থেকো। আমি কিছুক্ষনের মধ্যেই আসছি।" বলে ফোনটা কেটে দিল।

আজ চারটে বাজতে না বাজতেই ডাক্তার বাবু মানে আমার বর চলে এলো।  বেল বাজাতেই তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দিলাম। উদ্বিগ্ন মুখে বলল ; "কোথায় তিনি ? " আমি বললাম , আস্তে বলো, শুনতে পাবে। রান্না ঘরে আছে। সেকি ! তুমি রান্না ঘরে ঢুকিয়ে নিয়েছো ? চিনি না শুনি না ।

আমি তাড়াতাড়ি বললাম ; "রাগ করোনা । হাত মুখ ধুয়ে নাও। তারপর খেতে খেতে কথা বলো ।"

হাতমুখ ধুয়ে বসার ঘরে এলেই গরম গরম চা আর বড়া ভাজা দিলাম। বললাম মাসিমা বানিয়েছে । "খেয়ে দেখ । কি সুন্দর। সারাদিন তো আমাকে কোন কাজই করতে দিলো না । সব নিজে করলো ।" উনি কিছু বলতে যাচ্ছিলেন । এমন সময় মাসিমা চলে এলো । বললাম ; মাসিমা এই আমার বর । ডাক্তার । তুমি বলো ; তোমার কি হয়েছে ?  চেষ্টা করো সব কিছু মনে করতে । তোমার ছেলের নাম, বাড়ি কোথায় ?  আমরা তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসবো।"

  উনি কেমন যেন একটু আনমোনা হয়ে পড়লেন। মুখটা ফ‍্যাকাসে হয়ে গেল।  আমার বর চুপিচুপি বলল  ; "এখনই পুলিশে খবর দিতে হবে। নাহলে রাত হলে বিপদ হতে পারে।"

এমন সময় মাসিমা বললেন ; "তোমাদের পুলিশে খবর দিতে হবে না। আমার সব মনে পড়ে গেছে । আমি চলে যেতে পারবো। "

কিন্তু কেমন যেন মায়া পড়ে গেছিল ওনার উপর।  তাই বললাম চলো গাড়িতে করে তোমাকে আমরা বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসি। না হলে আবার যদি রাস্তা হারিয়ে যায় ? আর ছেলেকেও আচ্ছা মতো একটু বকে আসি । মাকে দেখে রাখতে পারে না? যদি কোন খারাপ লোকের পাল্লায় পড়তো ? "

মাসিমা রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে গেল । গাড়ি এসে থামলো "আনন্দ আশ্রমে"। আমি বললাম  ; "এটা তো বৃদ্ধাশ্রম । এখানে তোমার বাড়ি ?  "

মাসিমা বললেন;  -- "বাড়ির ঠিকানা অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছি। এখন এটাই আমার ঠিকানা। আমার সব মনে ছিল। কিছুই ভুলিনি। ছেলে আমার বিদেশে চাকরি করে । বড় অফিসার। ওদের কাছে আমার জায়গা হয়নি। কিন্তু মন চায় তোমাদের মতো পরিবারে ছেলে, বৌ , নাতি, নাতনি নিয়ে থাকতে। তাই মাঝে মাঝে এভাবে বেরিয়ে পড়ি।  তোমাদের খুব টেনশন দিলাম সারাদিন। পারলে এই বুড়িটাকে ক্ষমা করো । " এই বলে  উনি গেট খুলে  আস্ত আস্ত ভিতরে চলে  গেলেন।  নিজের অজান্তে চোখ দিয়ে দু'ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো।

আজ সেই মাসিমার মতো আমিও একা ।  দিন কাটে তো রাত কাটে না । দুপুর হলে আমিও বেরিয়ে পড়ি একাকীত্ব দূর করতে  কোন পরিবারের খোঁজে   ------–---।

সমাপ্ত।

 
 


আবার (অনুগল্প)


ঠান্ডা চলেছে, অসম্ভব হালকা বৃষ্টি ঘিরে ধরেছে শহরটাকে। বড়ো একা নিঃসঙ্গ লাগে স্যাৎ স্যাতে ভিজে দিনগুলোতে। কারো উষ্ণ আলিঙ্গন খোঁজে মন। মিলি, মিলি ফার্নান্দো গত মাসেই হারিয়েছে জিমিকে। ওর সন্তানের পিতা। ওর হাম সফর, জীবন সাথী, হাজব্যান্ড। ওদের নবনির্মিত বাড়ির কাঁচে শহরটাকে গলে পড়তে দেখছে , হাতে উদাসী কফির ধোঁয়া সুগন্ধ নিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। বড়ো একা লাগে। বড়ো একা। 


আসলে জিমির হাত ধরে যখন ঘর বসিয়েছিল তখন ও রাবেয়া ছিল, ছিল ঘর ভর্তি আত্মীয় আপনজন। তখন মনে হয়নি একদিন এসবের দরকার হতে পারে। কিন্তু মিলি ফার্নান্দো হারিয়ে ফেলেছে ফিরে যাবার দরজা🚪। সব ছিল হঠাৎ উবে গেল। দুবছরের ছেলেটা পায়ের কাছে টলতে টলতে এসে ওকে ধরতেই মিলির খেয়াল হল। বুকে তুলে নিল ছেলেকে। আবার নতুন লড়াই, বাঁচতে হবে ।ভালবাসা জীবনে বারবার আসে। ছেলে পেত্রো ডাকে - মাম্মা । হাসে মিলি। 


মিলি জানে না অনেক দূরে একটা ফ্ল্যাট থেকে তার কাঁচ ভিজে অবয়ব দেখছে কোন জানলায় বসা দুই চোখ। রোজ দেখে, আরও দেখে আজকাল জিমির বন্ধু সায়ন। গিটারে ধূন বাজে ....রেন অন দ্যা ফ্লোর।। 

*********************

শর্মিষ্ঠা ভট্ট🖋

যদি আবার দেখা হতো------?

বিষয়---  অণুগল্প  ।(জীবনে প্রেম আসে বার বার।)
#নাম--- যদি আবার দেখা হতো---- ?
#কলমে-- পারমিতা মন্ডল।


আজ মনে হয় আর ট্রেনটা পাবো না । অনেক দেরী হয়ে গেল। তবে এখনো একটু সময় আছে । অটো করে গেলে পেয়েও যেতে পারি। এই মনে করে ছুট লাগালো শিউলি। ট্রেনটা তাকে ধরতেই হবে । রোজ শিয়ালদহ থেকে ছ'টা পাঁচের নৈহাটি লোকাল ধরে বাড়িতে আসে শিউলি। ব‍্যাগের  কোম্পানিতে কাজ করে সে। 

বাড়িতে যৌথ পরিবার ছিল। অনেক অভাবের সংসার । তারপর বরটাও ভালো না। যা রোজগার করে মদ খেয়ে উড়িয়ে দেয়। আর মদ কেনার পয়সা না পেলে শিউলিকে ধরে পেটাতো ।একদিন তো ছেলের দুধের টাকা কেড়ে নিয়ে মদ কিনে এনেছিল। সেদিন ছেলেটাকে কিছুই খেতে দিতে পারেনি। অথচ একে ভালোবেসেই বিয়ে করেছিল শিউলি । বাড়ির সবার অমতে। দুজনে একসাথে ঘর বেঁধেছিল। সুখেই ছিল। কিন্তু বাইরে কাজ করতে গিয়ে বাজে লোকদের পাল্লায় পড়ে মদের নেশা ধরে যায়। আস্তে আস্তে দুজনের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয়।একসময় অত‍্যাচার সহ‍্য করতে না পেরে শিউলি রমেশকে ছেড়ে,  ছেলেকে নিয়ে চলে আসে , মায়ের কাছে। তারপর হন‍্যে হয়ে শুরু হয় কাজের খোঁজা। অবশেষে সেন কাকুর চেনাশোনা এই ব‍্যাগের কারখানায় কাজ পায় শিউলি।তারপর থেকে চলে জীবনের নতুন পর্যায় । ছেলেকে মানুষ করতে হবে।মায়ের কাছে ছেলেকে রেখে সকালে বেরিয়ে আসে শিউলি।সারাদিন কাজ করে  ছ'টা পাঁচের নৈহাটি লোকাল ধরে রাতে বাড়িতে ফেরে। এভাবেই চলছিল জীবন।


   প্রথম দিকে লেডিসেই উঠতো শিউলি। কিন্তু নেমে অনেকটা হাঁটতে হয় বলে এখন জেনারেলেই ওঠে। ওখানেই আলাপ হয় চিন্ময়ের সাথে। মধ্যবয়সী চিন্ময় খুব ধীর স্থির। কম কথা বলে । প্রচন্ড ভীড় ট্রেনে একদিন অনেক কষ্ট করে দাঁড়িয়ে ছিল শিউলি। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে পায়ে ব‍্যাথা হয়ে যাচ্ছিল। তখনই চিন্ময় নিজের জায়গা ছেড়ে দিয়ে বসতে দেয় শিউলিকে।ব‍্যারাকপুর এলে ভীড়টা একটু ফাঁকা হলে ,শিউলি আবার জায়গা ছেড়ে চিন্ময়কে বসতে বলে , ।তখন চিন্ময় না বসে শিউলিকেই বসতে বলে।তারপর শুরু হয় দুজনের মধ্যে কথাবার্তা। শিউলি জানতে পারে উনি নৈহাটির আগের স্টেশনে নামবেন। 

সেদিনের পর থেকে রোজই প্রায় দেখা হয়। আস্তে আস্তে দুজনের মধ্যে একটা বন্ধত্ব গড়ে ওঠে। এভাবেই চলে তাদের একসাথে পথ চলা।যে আগে এসে যায় সে নির্দিষ্ট জায়গায় আরেকজনের জন্য জায়গা রাখে । দুজনে গল্প করতে করতে চলে যায় । সংসারের সব কিছু তারা ঐ সময় টুকুতে ভুলে থাকে।  মাঝে মাঝে শিউলি এটা ওটা বানিয়ে নিয়ে আসে চিন্ময়ের জন্য। পরম তৃপ্তিতে সেগুলো খায় চিন্ময়। আর শিউলি মনে মনে আনন্দ পায়। সেদিন ঘুগনি বানিয়ে এনেছিল। সারাদিনের কাজের শেষে পরম যত্নে শিউলি যখন চিন্ময়কে দিকে এগিয়ে দেয় ,তখন সেও পরম তৃপ্তি অনুভব করে। তাহলে শিউলিকে কি সে ভালো বেসে ফেলেছে। তা কি করে সম্ভব? তার তো বৌ আছে। রাধিকা। তাকে তো চিন্ময় ভালো বাসে। তাহলে ? কেন এতো ভালো লাগে শিউলির সঙ্গ  ? তাহলে কি প্রেম জীবনে বার বার আসে ?  একসাথে কি দুজনকে ভালোবাসা যায় ? নাকি এ প্রেম  পরকীয়া ,  অবৈধ  ? তবে সত্যিই কি প্রেম কখনোই অবৈধ হয় ? প্রেম তো পবিত্র বন্ধন । তা কি কখনোই পরকীয়া হয় ?

  ছুটতে ছুটতে ট্রেনে উঠলো শিউলি। দেরী হয়ে গেছে , তাই ভীড় হয়ে গেছে। ভীড় ঠেলে নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে দেখে জানলার ধারে অন্য লোক বসে আছে। চিন্ময় নেই। মনে ভাবলো অন্য জায়গায় হয়তো বসেছে। ভীড়ে হয়তো জায়গা পায়নি। না তন্ন তন্ন করে কোথাও খুঁজে পেলনা চিন্ময়কে । তাহলে কি আজ আসেনি ?   কি হলো ?শরীর খারাপ ? হঠাৎ মনে হলো ফোন করে দেখি তো ? ফোন করে শিউলি । ফোন বেজে যায়। ও প্রান্ত থেকে কোন সাড়া নেই।  একটা অস্থিরতা নিয়ে সারা  রাস্তা কেটে যায় শিউলির ।ট্রেন এসে থামলো নৈহাটি জংশনে। সবাই নেমে গেল। ফাঁকা ট্রেন । হঠাৎ গলার মধ্যে দলা পাকানো কান্নাটা এবার বেরিয়ে এলো অশ্রুধারা হয়ে। সত্যিই কি সে চলে গেল ? কোন ঠিকানা না রেখে ? কেন এতো কষ্ট হচ্ছে ? তাহলে সেও কি ভালো বেসে ফেলেছে চিন্ময়কে ?এভাবেই   কি নিজের অজান্তে প্রেম আসে বার বার ?


 সমাপ্ত।

ভুল !? (পিয়ালী চক্রবর্তী)



আমার মুখের ওপরে বিন্যস্ত 

তোমার খোলা চুল,

গোপন আবেগে ভেসেছি সেই রাত্রে,

ভুল! সবই কি ভুল?


সেই সন্ধ্যায় তোমাতে আমাতে,

উদ্দেশ্য হীন চলেছি একসাথে,

ভুল! সবই ভুল?


সেই যখন চোট লাগলো তোমার,

আমার ঘুম উড়লো রাতে ।

পাগলের মত অবস্থা আমার,

সবই ভুল তাইনা? 


শত কষ্ট দুঃখ যন্ত্রণা অত্যাচার সয়ে,

আজও আছি তোমারই হয়ে,

তোমার কাছে তার নেই কোনো দাম, 

সব সব সব ভুল, কেবলই ভুল আজ জানলাম ।


একদিন আসবে এমন, 

যেদিন বুঝবে তুমি,

সেদিন হয়তোবা,

তারার ভীড়ে হারিয়ে যাবো আমি ।

Copyright © All Rights Reserved

Piyali Chakravorty

কবিতা : ২০ কাটা

 # কবিতা 


বিষকাঁটা

কলমে -- ছন্নছাড়া 




দিয়েছ গোলাপ প্রেমের নামে

                            রঙিন মোড়ক আঁটা, 

ভাবি নি তখন গোলাপ মাঝে 

                               তীব্র বিষের কাটা ।


রেখেছি গোলাপ যতন করে

                                হৃদয় অন্তঃপুরে ,

একফালি চাঁদ দেখবো বলে 

                            স্বপ্ন আকাশ জুড়ে ।


ছড়িয়ে সুবাস  মন উঠোনে 

                           শিশির পড়বে ঝরে, 

সেই আশাতেই বুক বেঁধেছি

                         ভালোবাসার ডোরে ।


তোমার হাতেই হাত রেখেছি 

                         তোমার চোখে চোখ , 

তোমার মাঝেই আমার আমি 

                         সবটা বিলীন হোক । 


আশাগুলোই আজ দুরাশা 

                           পৌনঃপুনিক ভুল ,

কোমল গোলাপ-পাপড়ি তলে

                            তীক্ষ্ণ কাটার শূল ।


সেই কাটাতেই বিদ্ধ হৃদয় 

                             ছিন্ন প্রেম-শরীর 

অঝোর ধারায় রক্তক্ষরণ 

                               স্বপ্নেরা অস্থির  ।


নিজের বলে নেইতো কিছু 

                               সব হয়েছে পর, 

আজ আমি যে বড় ই একা 

                             নিঃসঙ্গ যাযাবর  ।


                            ----------------

             

ভালোবাসার পুনর্জন্ম (Black Panther-জিৎ)_Subhrajit Chakravorty

ভালোবাসার পুনর্জন্ম



কলমে: Black Panther (জিৎ)_শুভ্রজিত চক্রবর্তী

All rights reserved ©Subhrajit Chakravorty
সোমনাথ যখনই ওর নিজের নাম টা লেখে, তানিয়ার কথা মনে পড়ে যায়। তানিয়া ওর নাম টা Somnath না লিখে সবসময় Somenath করে লিখতো, একটা এক্সট্রা E যোগ করতো। ও অনেকবার বারণ করেছিলো, তানিয়া বলতো "সোম" লিখতে গেলে "Some" করে লিখতে হয়।

আজ প্রায় দশ বছর হতে চললো। কলেজে ভর্তির কয়েকদিনের মাথায় স্যার জানালেন যে এসকার্শনে যেতে হবে। সবাই সবাইকে ঠিক মতন চেনেও না। সবার নাম লেখার দায়িত্ব পড়েছিলো একটা মিষ্টি মেয়ের হাতে। সোমনাথ যখন নিজের নাম টা বললো, মেয়েটা Somenath করে লেখায় সোমনাথ আপত্তি জানিয়েছিলো। তানিয়া ঠিক করে নিতে যাবে, ঠিক সেই সময় সোমনাথের মুখের দিকে তাকালো, কিছু একটা ভাবলো, তারপর চূড়ান্ত অধিকার নিয়ে বললো, তোর নামের সঠিক বানান এটাই। তখনই সোমনাথ অর্ধেক কাহিল হয়ে পড়লো।

তারপর এসকার্শনে গিয়ে বন্ধুত্ব, আর ৫ বছর কলেজ জীবনে ভালোবাসা। একজন আরেকজনকে ছাড়া এক মুহূর্তও ভাবতে পারতো না। তানিয়া কলেজ শেষ করে বাড়ি পৌঁছতে না পৌঁছতেই সোমনাথ ফোন করে খোঁজ নিতো ঠিক ঠাক পৌঁছেছে কি না। গাঢ়, গভীর ও পবিত্র ভালোবাসা যাকে বলে।

কলেজ শেষ করতে না করতেই সোমনাথ চাকরি পেয়ে গেলো। ঠিক করে রেখেছিলো ২ বছর চাকরি করে টাকা জমিয়ে ওরা বিয়ে করবে। সব কিছুই ঠিক হয়ে রয়েছে। দুজনের বাড়ি থেকেই রাজি।

এর মধ্যেই তানিয়ার GRE র ফল বেরোলো আর ও পেয়ে গেল আমেরিকার নামি বিশ্ববিদ্যালয়ে MS করার সুযোগ, সাথে মোটা টাকা বৃত্তি। সোমনাথ কিছুতেই মানতে চায় না। তানিয়া বোঝায়, আমাদের প্ল্যানিং তো দু বছরের। এই দু বছরের মধ্যেই আমি ফিরে আসবো, সাথে নিয়ে বিশাল ডিগ্রী আর বৃত্তির বিশাল অংকের টাকা। সোমনাথ নিমরাজি হয়ে অনুমতি দেয়। শর্ত রাখে রোজ রাতে এক ঘন্টা করে ভিডিও কল করতে হবে। আমেরিকার সময় আর ভারতীয় সময় হিসেব করে ওরা একটা সাধারণ সময় নির্ধারিত করে। সেই সময় রোজ চলতে থাকে ভিডিও কলিং।

এভাবেই চলছিল ওদের একান্ত অথচ দূরত্বের প্রেম। কিছুদিনের অপেক্ষা, তারপরেই মিলন।

সেদিন তানিয়ারা সব বন্ধু মিলে ঘুরতে বেড়িয়েছিলো। বরফের চাদরে মোড়া আমেরিকাকে দেখাচ্ছিলো ভিডিও কলের মাধ্যমে সোমনাথে কে। তীব্র গতিতে গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছে, চারদিকে বরফ ই বরফ। হঠাৎ ঘটে গেলো সেই দুর্ঘটনা, যেটা নিয়ে এসেছিলো সোমনাথের জীবনে অন্ধকারের ছায়া। বরফের রাস্তায় স্কিড করে দুর্ঘটনাটি ঘটে। মোবাইলের স্ক্রিন অফ হয়ে যায়। ১৫ দিনের মাথায় তানিয়ার দেহ পৌঁছায় কলকাতা। এখনো ভুলতে পারছে না সোমনাথ। তানিয়ার সাথে কাটানো এক একটা মুহূর্ত স্পষ্ট মনে পড়ছে ওর। আজ দশ বছর হয়ে যাচ্ছে। সেদিন হঠাৎ email এর chatbox টা ঘাট তে গিয়ে পেয়ে গেছিলো তানিয়ার সাথে করা চ্যাটিং এর ব্যাকআপ। চোখের জল আটকাতে পারে নি "Somenath" বানান টা দেখে।

অফিসের এই ডেস্কে বসেই তানিয়ার সাথে চ্যাটিং করতো সোমনাথ। প্রতিটা কোনার সাথে যেনো তানিয়ার স্মৃতি জড়িয়ে। আজকাল যেনো কাজেও মন বসছে না। ঠিক এরকম সময়েই এক নামী কোম্পানি থেকে চাকরির সুযোগ নিয়ে ঢুকলো একটা ইমেইল। সোমনাথের কি মনে হলো, ভাবলো, সুযোগ টা নিয়েই দেখা যাক। পরের দিন চলে গেলো ইন্টারভিউ দিতে।

অফিসে ঢুকে রিসেপশনে গিয়ে থমকে গেলো সোমনাথ। রিসেপশনে তানিয়া বসে রয়েছে। একমনে মাথা নিচু করে কাজ করছে। অজান্তেই সোমনাথ "তানিয়া?" বলে উঠলো। মেয়েটা মুখ তুলে তাকিয়ে মিষ্টি হাসলো।
"স্যার আমি পূর্বা, How May I help you?"

সোমনাথ: আমি ইন্টার্ভিই দিতে এসেছি।
পূর্বা: ও আচ্ছা।

বলে একটা ফর্ম বের করলো।

পূর্বা:আপনার নাম টা বলবেন স্যার।

সোমনাথ: আমার নাম সোমনাথ গাঙ্গুলী

পূর্বা ফর্মে লিখলো "Somenath"

সোমনাথ আপত্তি জানায়, বলে ওই "e" হবে না।

পূর্বা মুখ তুলে তাকায়, চুড়ান্ত অধিকার নিয়ে বলে, "সোম" লিখতে গেলে "Some" করে লিখতে হয়।

সোমনাথ নির্বাক হয়ে শোনে, কিছু বলতে পারেনা। শুধু ভাবে, " ভালোবাসা কি জীবনে বার বার আসতে পারে?"
---------সমাপ্ত-------------
All rights reserved ©Subhrajit Chakravorty

নারী এবং প্রকৃতি

 

#কলমে:_ সৌগত*



যে লালন করে,যে ধারণ করে,যে স্নেহ করে,যে খাদ্য দেয় বস্ত্র দেয় নিদ্রা দেয় তিনি মা।ধরিত্রী সেই ভাবেই তার কোলে আমাদের স্থান দিয়ে রেখেছেন,আর সুন্দর এই প্রকৃতি তাঁর বসন,যে আঁচলে আমরা দুঃখ বেদনা ভুলতে মুখ লুকাই শান্তি খুঁজি,নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারি।আর নারী ,বহুদিন আগে আমার লেখা একটা কবিতা আবার তুলে ধরছি

             আমি নারী

হে পুরুষ তুমি সবলের মাঝে দুর্বল,
তুমি জন্ম ঋণে ঋণী চিরকাল
তুমি অর্ধ আমাতে হও পূর্ন
তুমি দুর্বার,তোমার জয়ের পিছে
লেখা থাকে মোদের ভালোবাসার অঙ্গীকার
আমি দুর্বল নই, তোমাতে সঁপে
মোর সহস্র বল,আমি কখনও হয়েছি
মাতা, ভগিনী, জায়া
বিনিদ্র রজনী পরে যবে তুমি একা
আমি রোহি নিয়ে আপন ছায়া কায়া ।
তোমার জয়ের পথ কান্ডারী
আমি সে আমিই সেই নারী।।


ফিরে দেখা(অনুগল্প)


#কলমে:_সৌগত*


  জগদিশের তিনকুলে কেউ ছিলো না।আদর করে কেউ কোনোদিন খাওয়ায় নেই,তবুও রতনের বউ চম্পা বৌদি যখন টিফিনে রতনকে সোহাগ করে ইটখোলার পাশে ভাত বেড়ে দিতো, ইঁটের পাঁজারে বসে মুড়ি কাঁচালঙ্কা খেতে খেতে জগদীশ অপলক দৃষ্টিতে দেখতো আর ভাবতো এটাই বোধহয় ভালোবাসা।দিল্লীর চাঁদনী চক বাজারের পাশের বস্তিতে রতন দা পরিবার নিয়ে থাকতো।দুটো বাচ্ছা নিয়ে রতন দার সংসার।জগদীশ মাঝে মধ্যে ওঁদের ওখানে যেতো।ওঁদের সুখ দুঃখের কখন ও নিজে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিল।2020 মার্চ মাসে ইঁট খোলা বন্ধ হয়ে গেলো সারা দিল্লী মহামারিতে ছেয়ে গেলো।সবার মত জগদীশ ও ঘর বন্দী, বে রোজগার।সবাই দেশে ফিরতে চায়,কিন্তু জগদীশ কোথায় যাবে ওর তো দেশ নেই।জন্মেছিল বেগুসরাই কিন্তু সেখানে এক দূর সম্পর্কের কাকা ছাড়া আর কেউ নেই।শ্যাম খবর দিলো রতন দা পরিবার নিয়ে অনাহারে রয়েছে, সোনারপুরে ওর গ্রামে ফিরে যেতে চায় কিন্তু যেতে পারছে না।জ্বর শরীর খারাপ কাশিতে শয্যাশায়ী।জগদীশ আর ঘরে চুপ করে থাকতে পারে না।সব কার্ফিউ উপেক্ষা করে রতনের বাড়ী যাবার মনস্থির করে।

   একি চেহারা চম্পা বৌদির ,সেই রঙিন শাড়ি,মাথা ভর্তি সিঁদুর,কপালে টিপ কিছু নেই।সাদা থানে একটা পাথর বসে আছে দুটো বাচ্ছা খিদের জ্বালায় কাঁদতে কাঁদতে সেই পাথর মূর্তিকে আঁকড়ে ধরে আছে।রতন দা গতকাল করোনায় মারা গেছে।

  ঘরের পাশে গাঁট বাঁধা দুটো পুটলি জগদীশ কাঁধে তুলে নেয়।একটা বাচ্ছা কাঁধে আর একটা কোলে তুলে নেয়।চম্পার কাঁধে হাত দেয়,চম্পার জমে থাকা কান্নাটা বুক ঠেলে বেরিয়ে আসে।অসহায় চম্পা সহায় সম্বলহীন জগদীশের হাত ধরে বাঁচার আশ্রয়ে পরিযায়ী অনির্দিষ্ট পথে জীবনের খোঁজে পাড়ি জমায়।

     💐💐সমাপ্ত💐💐

#বিষয় - অনুগল্প

#বিষয় - *অনুগল্প* 
  # নাম - *'ভালবাসা কারে কয়'*
     ✍ মৃদুল কুমার দাস। 

  রমেশ বাবু। রমেশ দত্ত। অফিসে দত্ত বাবু। বড় বাবুর চেয়ে দত্ত বাবু নামে বেশী হাঁক ডাক। 
  বয়স এখন সবে অবসরে সদ্য সদ্য। ঐ আর কি ষাট ছুঁয়ে সপ্তাহ খানেক। মাইনে এখন হাফ হয়ে গেছে। দত্ত বাবুর কাছে পেনশন বেশ রোগাটে লাগে। পেনশন চিরকাল ঐ রকম রোগাপানাই হয়। কে না জানে। জেনেও মনটা তবে এমন করে কেন! মোটা থেকে রোগা না হলে তার নাম পেনশন হবে কেন এ কথা বুঝেও অবুঝ মন শুকনো শুকনো লাগে। 
 ক'টা দিন প্রথম প্রথম কেন,বছর খানেক আগে থেকেই কতটা রোগা হতে পারে তারই হিসেব মন ফুরসৎ পেলেই করিয়ে নিত। দুঃখটা বছর খানেক হল কমতে কমতে এই কটা দিন মানানসই  লাগছে দত্তবাবুর। এই বছরখানেক থেকেই গিন্নি একটু বাজার হাট মন খুলে বললেই বলতেন - "নবাবীটা একটু কমাও। আর বছরখানেক মাত্র ..."
রমলা দেবীর প্রথম প্রথম খুব রাগ হতো। ঝগড়া বাঁধিয়ে দিতেন। বলতেন - "সাজগোজের পেছনে কোনো খরচ নেই। একটু ভাল খাব তাতেই এতো গা খুবলে খাচ্ছে!"
 দত্তবাবুর দাপট বাইরে যতই  চলুক গিন্নির কাছে সিকি মূল্যও নেই। কেননা খাওয়ার কার্পণ্য  করলেই তেড়ে ওঠেন। আর দত্তবাবু ভোজন রসিক বলে মাথা নিচু করে গিন্নির সঙ্গে সন্ধি করে থাকতে বাধ্য হন। রমলা দেবীও কম যান  না। বলতে ছাড়বেন কেন - "ভালো খেতে হলে ভালো বাজার  করতে হয়। ...।"
  ফুল মাইনে দিয়ে গেছে তার পেনশন পার্টনারকে। মৃত্যু পর্যন্ত সাথে থাকবে। মৃত্যুর পর রমলার জন্য পেনশন বাকি অর্ধেক শরীর নিয়ে থাকবে। এমন ভাবতে ভাবতে মনটা বেশ বশে আসে ধীরে ধীরে।
কিন্তু রমলা বাজারের আর সেই  ফরমায়েস দেয় না। আগের ব্যাগ সব পুরনো হয়ে গেছে বলে বাদ। নিজে সব নতুন ব্যাগ কিনেছে। সাইজে সব ছোটো। বলে - "বাজার মেপে করবে। রিক চাকরি পান আবার বড় ব্যাগ কিনব।"
ছেলে রাকেশ। ডিজাইন নিয়ে পড়ছে। চাকরি পেতে না বললেও এখনও বছর তিনেক বাকি। দত্ত বাবু বললেন- "গিন্নি তোমার হলোটা কী? অত ভাবছ কেন! অন্যান্য সব খরচের কাট ছাট করে দিচ্ছি,খাওয়া খরচ যেমন ছিল থাক।"
 রমলা দেবীর উত্তর-"সবেতেই কাট ছাট। পেনশন মানে তাই। এবার রোগকে দূরে রাখতে নোলায় রাশ টানো।"
 দত্তবাবুর জবাব- "এতো দিনের  অভ্যাস পারবে সহ্য করতে।"
 রমলার ছোট্ট উত্তর- "পারব।" বলে বাজারের ব্যাগ বাড়িয়ে কি কি আনতে হবে বলে দ্রুত চলে যায় ভেতরে।
  এক গ্রীষ্মেরে রাতে ডালের বড়া দিয়ে জল ঢালা ভাত খেয়ে শুয়েছেন। সকালে উঠতে এতো দেরি তো করে না রমলা। দত্তবাবুবিরক্ত হন। বিরক্তির সুরে বলেন - " কই গো বাজারের ব্যাগ দাও। একটু দেরি হলেই ভাল ভাল সব অন্যের দখলে চলে যাবে।  একটু বাজার খারাপ  হলেই গিন্নি তুমি তো রাগে গরগর কর।" তাই  ডাকতে ডাকতে কাছে গিয়ে গায়ে হাত দিয়ে ঠেলা দিতেই মানুষটা বুঝিয়ে দিল দত্তবাবু আপনি বিপত্নীক হলেন। 
 ছেলের চাকরি হল। রিকু বউ আনল। কিন্তু রমলা...
   বউমা ঋষিতা হয়েছে ঠিক শাশুড়ি মতই। ছেলে রিকু বাবার মতই  ভোজন রসিক। সব ঠিকঠাক  চলছে আগের মতই। শুধু রমলা নেই। রমলা পাশে আছে ধরে রাখতেই রমলার কেনা নতুন বাজারের ব্যাগ সরিয়ে রেখে আগের  পুরনো বাজারের  ব্যাগ হাতে দত্তবাবু বাজারে যান। ছেলে হাজার বার বলেও বাজারের ব্যাগ হাতে পায় না। কারণ দত্তবাবুর মনে হয় রমলা যে বাজারের ব্যাগ নিয়ে আজও পাশে পাশে বাজারে গিয়ে বলেন  এটা কেন, ওটা কেন ....
               ********

রবিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২০

অনু গল্পঃ"পুনরাবৃত্তি" #কলমে~পল্লবী





দুপুর গড়িয়ে ক্রমশঃ বিকেলের দিকে এগুচ্ছে। ছেলেটি ধীরে ধীরে এগিয়ে শহরের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা বড়ো সবুজ উদ্যানটির ভিতরে ঢুকে একপাশে রাখা বেঞ্চে বসে পড়ে ক্লান্ত শরীরকে মেলে দিয়ে। সকাল থেকেই মাথাটা প্রচন্ডভাবে ধরে আছে। কপালের দুপাশের রগ এমন ভাবে লাফাচ্ছে, যেনো জালে সদ্যতোলা মাছ মুক্তির জন্য ছটফট করছে। জাল ই বটে! সেতো নিজেই ওই 'ভালবাসা' নামক জালের পাতা ফাঁদে পা দিয়েছিল! আর সবকিছু জেনে শুনে যে ফাঁদটি পেতে ছিলো, সে কেনো তবে আজ মুক্তি চায়? সেতো জানতো, ওর এই সংগ্রামী জীবনের কথা, বেকারত্বের কথা, বাড়িতে দু -দুটো আইবুড়ো বোন থাকার কথা! সর্বোপরি ওর আর্থিক অসচ্ছলতার কথা, নিম্নবিত্ত পরিবারের কথা, যেখানে তৃতীয় শ্রেণির চাকুরীরত বাবার সামান্য আয়ে পাঁচজনের পরিবারটা ধুঁকে ধুঁকে কোন রকমে চলে!

ভাবতে ভাবতে সে তিন -চার কদম এগিয়ে সামনে একটি শতবর্ষী গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া টং এর পাশে দাঁড়িয়ে চায়ের অর্ডার করে। ওপাশ থেকে চা বানাতে বানাতে শ্যামলা বর্ণের কিশোর একটি মুখ এদিক - ওদিক চেয়ে কোমল কণ্ঠে বলে ওঠে, "আফার আজ এতো দেরী ক্যান ভাই? আবারো কি কাজিয়া করছেন নি"?? বলতে বলতে কিশোর মুখটি বিপরীত দিকের একজোড়া রক্তবর্ণ চোখের দিকে তাকিয়ে থেমে যায় নিমেষেই।

ছয় বছর আগে এক বন্ধুর অনুরোধে টিউশন পড়াতে গিয়ে ওর সাথে প্রথম পরিচয়। তারপর ধীরে ধীরে সেই পরিচয় যে কখন প্রণয়ে পরিণত হয়েছে, কখন যে ওর গুটিয়ে রাখা আঙ্গুল, সে তার হাতের তালুতে জড়িয়ে নিয়েছে বুঝতেই পারেনি। যখন বুঝলো, পিছু হটার সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে গেছে। 'ভালবাসা' নামক 'হলুদ'ব্যাধিতে সমস্ত দেহ, মন তার আক্রান্ত! দীর্ঘ এই সম্পর্কের আজ একটা চুড়ান্ত পরিণতি হয়েই যাবে! কয়েক মাস ধরেই বন্ধুরা কানাঘুষো করে বেরাচ্ছিল, ওর সাথে অন্য এক ছেলেকে নিয়ে। প্রায়ই নাকি দুজনকে দেখা যাচ্ছে একসাথে।

চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে বিলটা মেটায়। রশিতে ঝুলানো সস্তা দামী নিকোটিনের প্যাকেট থেকে সরু জিনিসটা বের করে দু ঠোঁটের ফাঁকে রেখে জ্বালিয়ে একটা চরম সুখটান দেয়। আহ্,, বুকের ভিতরটা যেনো জ্বলে,পুড়ে ছাই হয়ে গেলো! হ্যাঁ...সেতো আজ কয়েক মাস ধরে ছাই ই হচ্ছে প্রতিনিয়ত! সোশ্যাল সব সাইটে একের পর এক ব্লক দিলো। জিজ্ঞেস করতেই উত্তর এলো," পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটছে, তাই ডিএক্টিভেট করে রেখেছে! কল দিলে পিক করেনা। কারণ, তাও পড়াশোনা! মোবাইল সাইলেন্ট মোডে থাকে আজকাল! ছেলেটি মনে মনে হাসে আর ভাবে," আজকের এই লেখাপড়ায় ভীষণ মনোযোগী মেয়েটিই কোন এক পূর্ণিমা রাতে এক কাপড়ে ওর হাত ধরে গৃহত্যাগ করতে চেয়েছিলো, ভালবাসার সুখের নীড় বাঁধবে বলে"! হায় প্রেম! অবেলার ভাংচুরের প্রেম!?!

"এ হাওয়ায় কান পেতে শোন
তোকে মনে পড়ছে ভীষণ"!

উদাস নয়নে উদ্যানের প্রবেশ পথের দিকে তাকিয়ে আবারো আস্তে আস্তে সেই বেঞ্চে এসে বসে।চেয়ে থাকে যতদূর দৃষ্টি যায়! যদি ক্ষনিকের তরে হলেও তার দেখা পায়?! অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকা ছেলেটা খেয়ালই করেনা যে, কখন বৈকালিক ভ্রমণে আগতদের কোলাহলে মুখরিত হয়ে উঠেছে চারিদিক!হঠাৎ পাশে ধপাস করে কারো বসার শব্দে তাকিয়ে দেখে,অনিন্দ্যসুন্দরী এক তরুণী হাঁপাতে হাঁপাতে কানের দুপাশ থেকে হেডফোন সরাচ্ছে। পরনের ট্র্যাকস্যুট ঘামে ভিজে জবজবে অবস্থা!

ছেলেটির দিকে তাকিয়ে মিষ্টি কণ্ঠে বলে ওঠে, "আজ কি গরম তাই না"! "ভাদ্র মাস.."! পাশ থেকে নির্লিপ্ত উত্তর আসে। মেয়েটি অবাক হয়ে কতক্ষন তাকিয়ে থেকে বলে ওঠে," আচ্ছা বলতে চাচ্ছেন ভাদ্রমাস, তাই গরম বেশী পড়ছে?! তাইতো", বলে খিলখিলিয়ে হাসতে থাকে। মেয়েটির ঐ রিনরিনে স্বচ্ছ হাসি আর কাজল কালো চোখের পানে চেয়ে ছেলেটি মনে মনে আওড়াতে থাকে কবি সাদাত হোসাইনের কবিতার দু লাইন...
 

"অমন কাজল চোখে তুমি চেয়ো রোজ,
ঐ চোখে জীবনের হিসেব সহজ"।
 

(সমাপ্ত)।।
Copyright©️ All rights reserved
 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার: কবি সাদাত হোসাইন🙏🙏

 

যেতে দেবো না (পিয়ালী চক্রবর্তী)





তার আঁচলের প্রতিটি ভাঁজে, লুন্ঠিত হৃদয়ে স্পৃহাহীন আমি  সজল চোখে দেখি তার নীরবে চেয়ে থাকা । মনে পড়ে সেদিনের কথা, যেদিন ওই পদ্মফুলের পাপড়ির মত ওই কাজল কালো চোখ মেলে প্রথমবার তাকিয়েছিল আমার দিকে । 


সকাল আটটার বাসেও কি ভীড় । শরীরটাও খুব দুর্বল স্নেহাশিষের । সবেমাত্র টাইফয়েড থেকে উঠেছে । কিন্তু, বসের জরুরী তলব । অফিস যেতেই হবে আজকে ।  ভীড় ঠেলে বাসে উঠে কোনোমতে ওপরের রডটা ধরে দাঁড়িয়ে রীতিমতো হাঁপাচ্ছে বেচারা । এমনসময় সামনের লেডিস সিটে বসা একটি মেয়ে তার উদ্দেশ্যে বলে উঠলো, "আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে? এখানে বসুন ।" 

স্নেহাশিষ : না, না, আপনি বসুন ম্যাডাম । আমি ঠিক আছি ।

মেয়েটি : বসতে বলছি চুপচাপ বসে পড়ুন, অতো কথার দরকার নেই । আমার সিট, আমি বসতে বলছি, এতে কারোর আপত্তি থাকলে আমি বুঝে নেবো । 

এই প্রথমবার এক অজানা, অচেনা মেয়ে এত আপন করে কথা বললো । মা - বাবা হারানো স্নেহাশিষ দূর সম্পর্কের কাকার কাছে মানুষ । কেউ কোনোদিন ওর ওপরে এতটা অধিকার দেখিয়ে কথা বলেনি । এক লহমায় মনটা যেন ভালো হয়ে গেল তার । সিটে বসে ভালো করে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে দেখলো, বেশ সুন্দরী, একমাথা বাদামী খোলা চুল ও কাজল কালো চোখ । দেখেই ভালোবাসতে ইচ্ছে করে এমন এক রূপের অধিকারিণী । মেয়েটির নাম রূপসা । স্নেহাশিষকেও দেখতে যথেষ্ট  সুপুরুষ । চওড়া বুক ও কাঁধ । পেশীবহুল চেহারা । 

রোজই একই বাসের সহযাত্রী তারা । দুজনের মধ্যে শুরু হলো কথা । ধীরে ধীরে কথা থেকে ভালো লাগা এবং ভালোলাগা কোনদিন তাদের অজান্তেই ভালোবাসার রূপ নিলো । অফিস সেরে একে অপরের জন্য অপেক্ষা এবং এক এক দিন গঙ্গার ধার, বোটানিক্যাল গার্ডেন, ভিক্টরিয়া মেমোরিয়াল ঘুরে যে যার বাড়ি ফিরে যেতো । একে অপরের হাতে, কাঁধে, ঠোঁটে, বুকে হারিয়ে যেতো তারা । পরস্পরের উষ্ণ সান্নিধ্য উপভোগ করে ভরে থাকতো তাদের মন প্রাণ । 

একদিন, স্নেহাশিষ বাসে উঠে দেখলো রূপসা আসেনি । মনটা খারাপ হলো । তৎক্ষণাৎ ফোন করে সুইচ অফ পেলো । চিন্তিত হয়ে পড়লো ও । তড়িঘড়ি বাস থেকে নেমে সোজা রূপসার বাড়ি গিয়ে পৌঁছলো । দরজা খুলে দিল রূপসার বাবা । যেন  তিনি আগে থেকেই জানতেন যে, স্নেহাশিষ আসবে । উনি স্নেহাশিষকে ভিতরে আসতে বললেন না । ওনার রাগত দৃষ্টিতে ওর প্রতি অবহেলা ও ঘৃণা ঝরে পড়ছে । উনি বললেন, "রূপসার আগামীমাসে বিয়ের ঠিক হয়েছে । তোমার মত অনাথ, নামগোত্রহীন ছেলেকে যেন আর কোনোদিন ওর ধারেবাড়ে না দেখি । কেটে পড়ো ভালোয় ভালোয়, নাহলে আমার অন্য উপায় জানা আছে ।" রূপসা ঘরের ভিতরে দাঁড়িয়ে ওর বাবার সব কথা শুনছে, কিন্তু সামান্য প্রতিবাদটুকুও করলো না । মাথা নীচু করে চলে গেল স্নেহাশিষ । আজ প্রায় পনেরো দিন হয়ে গেছে, সে না গেছে অফিস, না আছে খাওয়া দাওয়ার ঠিক, না রাত্রে ঘুমোতে পারে । যন্ত্রনা দিন দিন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছে । 

আগামীকাল বিয়ে রূপসার । ওকে তো কিছু উপহার দিতেই হবে । প্রাণের চেয়ে দামী আর কি হতে পারে!!! সন্ধ্যেবেলা, নির্জন গঙ্গার ঘাট । সাঁতার জানেনা স্নেহাশিষ । ধীরপায়ে নেমে যাচ্ছে একটা একটা করে সিঁড়ি । শেষ ধাপে এসে পৌঁছলো । মোবাইলটা বের করে রূপসার ছবিটা বুকে আঁকড়ে ধরে ঝাঁপ দিতে যাবে,  দুটো হাত শক্ত করে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো ওকে । রূপসার গলা, "আমি তোমার ছিলাম, আছি, থাকবো । যেতে পারবেনা তুমি ।"

Copyright © All Rights Reserved

Piyali Chakravorty

জানি সে ফিরবে না আর--- (পারমিতা মন্ডল।,)

জানি সে ফিরবে না আর।( ছোট গল্প)


পারমিতা মন্ডল। 


আজ বারো বছর হলো আমাদের বিয়ে হয়েছে ।ছোট স‌ংসার ।আমার বাবা নেই ।মা ,আমি, আমার ছেলে ও স্ত্রী --এই নিয়ে আমাদের ছোট সংসার।আমি মোটামুটি একটি সরকারি চাকরি করি ।পয়সা কড়িও ভালো পাই ।সচ্ছল পরিবার । কোনো অভাব নেই ।


আমার স্ত্রী আমাকে খুব ই যত্ন করে, পরিবারের সবার প্রতি ওর খুব খেলাল । আমাদের দেখা শোনা করে বিয়ে হয়েছে।এই বিয়েতে দিয়া রাজি ছিল না ।সে অন্য কাউকে ভালো বাসতো । একথা আমি বিয়ের পর ওর কাছেই শুনেছি ।তবুও বিয়ের পরে  ও আমার সাথে কোন খারাপ ব‍্যাবহার করেনি । কোন কাজে বাধা দেয়নি, খুব সহজেই আমাকে মেনে নিয়েছে ।


কিন্তু ওর মনে যে একটা না পাওয়ার কষ্ট ছিল সেটা আমি বুঝতে পারতাম । অনেক দিন দেখেছি গভীর রাতে না ঘুমিয়ে সারা রাত ধরে কেঁদে বালিশ ভিজিয়েছে ।আমি ওকে কাঁদতে দিয়েছি । ওকে কাঁদতে দেখে আমার খুব খারাপ লাগতো ।কিন্তু সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোন ভাষা আমার জানা ছিল না । প্রিয় জনকে হারানোর যন্ত্রণা পৃথিবীর সব যন্ত্রণাকে হার মানায় । তাই কিছু বলিনি ।অপেক্ষা করেছি । জীবনের প্রথম ভালো বাসা ভোলা সত্যিই কষ্টকর। তাই ওকে স্বান্তনা দিয়ে কিছু বলা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আমি ওকে সময় দিয়েছি। তাই আস্তে আস্তে দিয়াও স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।


যাইহোক আমাদের বাড়িতে আসার পর সেদিন ছিল ওর প্রথম জন্ম দিন । আমার মা ওকে খুব ভালো বাসে। নিজের মেয়ে নেই বলে হয়তো একটু বেশিই ভালো বাসে । তাই দিয়ার জন্য পায়েস বানিয়েছিল । আমার সাধ‍্য মতো আমিও ছোট খাটো অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলাম ।বড় একটা কেক আনা হয়েছিল ,কাটা হবে ।কিন্তু যার জন্য এই আয়োজন তার মুখে একটা বিষন্নতার ছাপ ।হাসছিল, ছোটাছুটি করছিল ,সবাইকে আপ‍্যায়ন করছিল  --তাও কোথায় যেন মাঝে মাঝে হারিয়ে যাচ্ছিল দিয়া । তবে আমার প্রতি ওর কোন অভিযোগ নেই আজও । আমাকে বুঝতে ও দেয়না ওর মনের কষ্ট। কিন্তু এই কয়দিনে আমি ওকে খুব ভালোবেসে ফেলেছি ।তাই ওর বিষন্ন ভরা মুখটা দেখলে আমার খুব কষ্ট হয়।


জন্ম দিনের অনুষ্ঠান, তাই দিনের বেলাতেই হচ্ছিলো । হঠাৎ বাইরে সাইকেলের কিড়ি‌ং কিড়ি‌ং আওয়াজ পেলাম । পিয়ন


চিঠি ,চিঠি বলে ডাকাডাকি করছিল । বেরিয়ে দেখি নীল খামের উপর গোটা গোটা অক্ষরে দিয়ার নাম লেখা একটি চিঠি। কিন্তু কে পাঠিয়েছে, তার কোন নাম ঠিকানা লেখা নেই ।দিয়াকে ডেকে ওর হাতে দিলাম চিঠিটা । দিয়া চিঠিটা দেখে বুঝতে পারলো না কে পাঠিয়েছে ।তাই পড়ার জন্য ঘরে নিয়ে চলে গেল । ও যখন ফিরে এলো তখন যেন উচ্ছল একরাশ ঝরনা । এতোদিন কখনো ওকে এতো হাসিখুশী দেখিনি । ঐ চিঠিটা পাওয়ার পর কি ও আজ এতো খুশি ? কার চিঠি ছিল ওটা ? না, দিয়াও কখনো বলেনি আর আমিও কখনোই জানতে চাইনি ঐ নামহীন চিঠিটার ব‍্যাপারে ।তারপ‍র থেকে প্রতি বছর দিয়ার জন্মদিনে ঐ নীল খামআলা নামহীন  চিঠিটা আসে ।আর দিয়া খুব খুশি হয়ে যায়।


এখন দিয়া আর আগের মতো গভীর রাতে বালিশ ভেজায় না ,আগের মতো মন খারাপ করেও  থাকে না।আমরা খুব ভালো ভাবে সং সার করছি । বছর দুই বাদে আমাদের কোল আলো করে এলো আমাদের ছেলে সায়ন ।ব‍্যাস্ততা  বেড়ে গেল অনেক দিয়ার ।ছেলের এখন নয় বছর বয়স ।আমার সাথে প্লান হয়েছে, এবার তার  মায়ের জন্ম দিন  সে পালন করবে । মাকে সারপ্রাইজ দেবে । তাই আজ সকাল থেকে তোড়জোড়। দিয়া আমাকে বলল ,," তুমিও কি সায়নের মতো বাচ্চা হয়ে গেলে নাকি ?"বুড়ি , হয়ে গেছি ,কেন এসব করছো ? " আমি মুচকি হাসি ।মনে মনে বলি "আমি তোমার প্রথম ভালো বাসা নই তা জানি । তবুও আমি জানি তুমি আমাকে ভালো বাসো। আর তুমি তো আমার প্রথম ভালো বাসা ।তাই তোমার মুখে হাসি ফোটাতে আমি সব করতে পারি ।একটু পরেই তো তোমার নামহীন চিঠিটা চলে আসবে ।তবুও আমার একটু ও হিংসা হয়না তোমার উপর। আমি যে তোমাকে ভালোবাসি।"


ঠিক যথা সময়ে পিয়ন চিঠি নিয়ে হাজির হলো । আমার হাতে দিল চিঠিটা । সেদিন আর কৌতুহল চেপে রাখতে পারলাম না ।ভাবলাম খুলে পড়েই দেখি একবার চিঠিটা । ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়ে নামহীন  চিঠিটা খুললাম।লেখা আছে ---


কল‍্যানেষু,


আপনি আমাকে চিনবেন না । আমি সুকমোলের বন্ধু।ওর কাছে আপনার কথা অনেক শুনেছি। জানি আপনার বাবা সেনাবাহিনীতে চাকরি করা ছেলের সাথে বিয়ে দিতে চাননি। কারণ যারা দেশের সুরক্ষা ক‍রে তারা প‍রিবারের জন্য সময় দিতে পারে না । তাদের জীবন বড় অনিশ্চিত। যেকোনো সময় মৃত্যু হাত ছানি দেয়। আপনার বাবা হয়তো ঠিক কাজই ক‍রেছিলেন। তাই আজ আপনি বিধবা  হওয়ার হাত থেকে বেঁচে গেলেন। বর্ডার সীমান্তে ঝামেলা লেগেছিল দুই পক্ষের সেনাবাহিনীর সাথে । তারই একটি গুলি এসে সুকোমলকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দেয়। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে সুকোমল ।আজ জাতীয় পতাকায় মুড়ে গান সেলুট দিয়ে ওর বডি বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর ওর ঘর থেকে আপনার ঠিকানা পেয়ে ,আপনাকে জানালাম ।সুকোমল আপনাকে খুব ভালো বাসতো।


ইতি


আপনার সুভ‍্যানুধায়ী।


চিঠিটা এক নিমেষে পড়ে ফেললাম আমি ।নিজের অজান্তে দু'চোখ দিয়ে জল ঝরে পড়লো ।এ চিঠি দিয়াকে দেখানো যাবে না । ওকে এতো কষ্ট আমি কিছুতেই পেতে দেব না ।তাই আমি চিঠিটা ছিঁড়ে ফেললাম ।তার পরিবর্তে আমি নিজেই সুকোমল হয়ে একটি চিঠি লিখে (টাইপ করে) ডাকবাস্কে ফেলে এলাম। ঐ দিন আর নামহীন চিঠিটা দিয়ার কাছে এলো না । সারাদিন ও অন‍্যমনষ্ক হয়ে । রইল । আমি সব বুঝেও চুপ করে  রইলাম। দুদিন পরে চিঠিটা এলো । চিঠিটা পড়ে ও খুব খুশি হলো ।


সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত প্রতি বছর দিয়ার জন্ম দিনে নামহীন চিঠিটা আমিই পাঠাই । জানিনা আমি ঠিক করছি  না ভুল করছি । কিন্তু আমার ভালোবাসার মানুষকে একটু খুশী দেখতে, একটু ভালো রাখতে আমি এই অন‍্যায় টুকু  করতে রাজি আছি ।

সমাপ্ত।
কলমে--পারমিতা।


তুমি আছো তাই (পিয়ালী চক্রবর্তী)

 


তুমি আছো তাই সকালটা প্রেমময় ।

তুমি আছো তাই বিকেলটা রঙীন ।

তুমি আছো তাই এই মনের,

স্বপ্নগুলো হয়না অমলিন ।


তুমি আছো বলে এই হৃদয়ে স্পন্দন,

তুমি আছো তাই অন্তরে এ অনল ।

তুমি আছো তাই প্রাণে জাগে শিহরণ,

তুমি আছো বলে হারাই আমার মন ।


তুমি শুধু তুমি আমার প্রেমের কথা,

তুমি শুধু তুমি প্রণয়ের গাথা,

তুমি আছো তাই হৃদয় চঞ্চল,

ছুটে যাই তোমা পানে অনর্গল ।


তোমার আগুনে মন পুড়ে ছারখার,

তোমাতে শীতল আনন্দ অপার,

তোমার মাঝে শান্তি স্বস্তি সুখ,

হরণ করেছো যত আছে মোর দুখ ।

Copyright © All Rights Reserved

Piyali Chakravorty

অনু গল্প: "আরেক বসন্ত"

 



মোবাইলে সেট করা অ্যালার্মের কর্কশ শব্দে ঘুমটা ভেঙে যায়। গতকাল রাত জেগে এসাইনমেন্ট পেপার রেডি করে সাড়ে চারটায় শুয়েছিলাম। এখন বাজে ছটা!পাশ ফিরে শুয়ে নতুন করে টাইম সেট করে আবার একটু ঘুমানোর চেষ্টা করি।আজ সোয়া সাতটায় প্রথম ক্লাসটি পি.কে.সি. স্যারের ম্যানেজম্যান্ট একাউন্টিং এর। এই সাবজেক্টে এমনিতেই বেশ দুর্বলতা আছে , তার উপর ক্লাস এটেন্ড না করলে কপালে জুটবে স্যারের শনি দৃষ্টি! ম্যানেজ করা যাবে, মনকে এই সান্ত্বনা দিয়ে ভাবতে ভাবতে চোখে আবারো ঘুম নেমে আসে।নাহ্‌, এবার শুধুমাত্র অ্যালার্মের কর্কশ আওয়াজ ই নয় সাথে মায়ের তারস্বরে চিৎকারও শুরু হয়েছে। আগের দিনই বলে রেখেছিলাম সকালের ক্লাসের কথা, যাতে ডেকে দেয়। চটজলদি উঠে রেডি হতে হতে একবার পরিচিত রিকশাচালক কে ফোন করে নিশ্চিত হই উপস্থিতি নিয়ে।গায়ে গলাবন্ধ সোয়েটার আর মাথায় কান ঢাকা টুপি পড়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে হঠাৎ করেই যেনো কে এসে উঁকি দিয়ে যায় মনের করিডোরে! উজ্জ্বল,ভাসা,ভাসা সেই গভীর দুটি কালো চোখ! যেন সাগরের অতল আহ্বান! মনে মনে বলি..হারামী!

হাড় কাঁপানো শীতের শীতল পরশ মেখে ব্যাটারি চালিত রিকশা কুয়াশা ভেদ করে তীব্রবেগে ছুটে চলেছে রাজপথ ধরে। রিকশার ব্যাটারির সেই একটানা ঘো ঘো শব্দে মনটা যেন আজ বারবার হারাচ্ছে অচিনপানে! কি করে হারামী টা এখন?! একটা দীর্ঘশ্বাস যেন অজান্তেই বেড়িয়ে আসে। কানে ইয়ার ফোন গুঁজে দিয়ে এফএম রেডিও চালু করি। গান শুনে যদি মনের ভাবালুতা একটু হলেও কাটে!? এই মুহুর্তে বাজছে ন্যান্সির সেই বিখ্যাত " ঝরা পাতা ঝরে যায়! আহারে কি মায়ায়..!" গানটি! সাড়ে চার বছর আগে, এমনই এক পাতা ঝরার দিনে, বিবিএ অনার্স উইন্টার সেশনের, ফার্স্ট সেমিস্টারের প্রথম ক্লাস ছিলো সেদিন। লাজুক আমি ক্লাসে ঢুকেই জড়োসড়ো হয়ে বসে ছিলাম থার্ড রোতে একদম দেয়াল ঘেঁষা সাইড টেবিল লাগানো চেয়ারে। পাশের সিট গুলো খালি পড়ে আছে দেখে মনে মনে খুশিও হয়েছিলাম। যাক,পাশে এসে কেউ বসবে না এটলিস্ট! প্রচণ্ড হাসির শব্দে পিছনে তাকিয়ে দেখি,কর্নারে দাঁড়িয়ে অন্য অনেকের মাঝে শিরোমনি হয়ে থাকা উজ্জ্বল কালো টলটলে দুটি চোখ আমার পানে চেয়ে হেসে চলেছে। একটু অবাক হয়ে দৃষ্টি ক্ষনিকের তরে ফিরিয়ে আবার তাকাতেই দেখি, সেই গভীর চাহনি! এবার হাস্যোজ্জ্বল নয়, কেমন যেন উদাসীন! তাকিয়ে আছে আমার দিকেই অপলক!

বাইরে ঘণ্টার শব্দে সজাগ হতেই দেখি পাশে এসে বসলো সে। কাঁধ পর্যন্ত বেয়ে নামা ঘন কোকড়াঁনো চুলে ভর্তি মাথাটা অদ্ভুত ভঙ্গীতে নেড়ে বলেছিল,"ফ্রেন্ড আজ থেকে। এক্ষেত্রে তোমার কোন চয়েজ নেই"। পাগল নাকি?! বন্ধু বললেই হলো?! এতো সহজ বন্ধুত্ব! সেই থেকে আঠার মতো লেগে থাকার শুরু। ক্যাম্পাসে যতক্ষণ থাকতাম সারাক্ষণ জ্বালাতো!কখনো ক্লাস মিস করলে বাড়িতে এসে হাজির হতো আর শুরু হতো আমার না যেতে পারার কারণ ব্যাখ্যা র ! ছুটির দিনে ওর স্কুটিতে চড়ে ঘোরাঘুরি করেই কাটতো অলস বিকেলের মুহুর্ত গুলি! জোড়া শালিক হয়ে ঘুরে বেড়াতাম এই শহরের যতো অচেনা অলি - গলি! প্রতিবার রাইডের আগে এক ঠোঙা বাদাম কিনে হাতে ধরিয়ে দিতো। সেই বাদাম খোঁসা ছাড়িয়ে মুঠোয় নিয়ে তার মুখে পুরে দেওয়া ছিলো আমার কাজ। রাগ করে বলতাম," ধুর! শুধুই এতো খাটাস! আর ঘুরবো না তোর সাথে"। এক দৃষ্টে চেয়ে হেসে বলতো, " ওটাতো হট সিট রে! জানিস না, ওই সিটে বসার লাইন কতো লম্বা"! সত্যিই তাই। সবকিছু উপেক্ষা করে সে শুধু আমার দিকেই ধাবিত হতো। সব বুঝেও না বোঝার ভান করতাম। কষ্ট বাড়িয়ে লাভ কি! দুজনের সবকিছুই যে বিপরীত ছিলো!

উত্তুরে হাওয়ায় রাস্তার দুধারে সারিবদ্ধভাবে লাগানো গাছের পাতারা সোনালী বর্ণ ধারণ করে কেমন যেন ঝরে ঝরে পড়ছে আর বাতাসে হালকা হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে আনমনে ব্যস্ত রাস্তার বুকে!ফাইনাল সেমিস্টার শেষে ব্যাচের সবাই মিলে গেছিলাম পাহাড়ী এলাকার এক রিসোর্টে দুদিনের জন্য।উদ্দেশ্য ট্রেকিং। রুম শেয়ার করতে হবে হারামীটার সাথে! চিন্তিত মনে রুমে ঢুকে দেখি, যা ভেবেছিলাম তাই। দিয়েছে ডাবল বেড। সেপারেট করার কোন চান্স নেই। ওর দিকে চেয়ে দেখি মুচকি হাসি নিয়ে দেখছে আমায়। রেগে বললাম, " তুই এক্ষুনি রুম চেঞ্জ কর। যা বানরের স্বভাব!হুটহাট ঘুমের ঘোরে গায়ের উপর এসে পড়িস, নয়তো নিজেই নিচে পড়ে চিতপটাং হয়ে থাকিস। গত তিনবারের অভিজ্ঞতা থেকে অনেক শিক্ষা হয়েছে। তোর লাথি - গুঁতো খাওয়ার কোন শখ নেই এবার"।

ক্যাম্পাসের প্রবেশ মুখটা বড়োই মনোমুগ্ধকর। দুপাশে সারি বেঁধে লাগানো দেবদারু, মেহঘনি, জারুল, শীল কড়ই আর ফাঁকে ফাঁকে থাকা রাধাচূড়া! পাতা ঝরার দিনে,এই পথ আজ ঝরা পাতার মর্মর ধ্বনিতে বিরহে কাতর যেন! ঘাড়ের কাছে ছয়মাসের পুরনো ক্ষতে আনমনে আঙ্গুল ছুইয়ে ধীরলয়ে পা বাড়ায় সামনে। ক্যাম্পাসে সবাই জেনে গেছে জোড়া শালিকের বিচ্ছেদের খবর!সে রাতে ওই পাহাড়ী রিসোর্টে, কেনো করলি এ রকম বল?! ভালই তো ছিলাম বন্ধু বেশে, সাথী হয়ে সর্বক্ষণ! আমার আধ খাওয়া সমুচা কিংবা কাটলেট, বেশী ঠান্ডায় খেতে না পেরে পাশে রাখা কোকের ক্যান তুই যে উদাসীনতার ভান করে খেয়ে ফেলতিস, তা দেখেও না দেখার ভান আমিও করতাম, ঠিক তোর মতো! ভালোই ছিলাম রে পরস্পরকে ফাঁকি দেয়ার এই খেলায়! কেন সে রাতে সারা জীবনের মতো ক্ষত উপহার দিলি?! হ্যাঁ,, ক্ষনিকের রাগে বলেছিলাম সম্পৰ্ক ছিন্নের কথা! তাই বলে তুই এভাবেই শেষ বিদায় বলে উড়াল দিবি দূর দেশে?! বৃক্ষরাজি গা থেকে পুরনো পাতা ঝরিয়ে ফেলছে, আগামী বসন্তে ফুলে - ফলে নব রূপে সাজবে বলে! তুই কি আসবি তবে ফিরে এই বসন্তে?! একবার এসেই দেখ!!!

সমাপ্ত।।

কবিতা : মানব ধর্ম

                              মানব ধর্ম 

                        কলমে--ছন্নছাড়া 

           ------------------------------------------------


মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ গড়ো

                          মসজিদ ভেঙে মন্দির ,

বলতে কি পারো, বিশ্বাস কারো

                              কোথায় ধ্রুব স্হির ?


মন্দিরে এক ভগবান থাকে 

                                    গির্জাতে ঈশ্বর ,

মসজিদে সে ই আল্লাহ নামেই 

                                  পূজিত নিরন্তর ।


তবে কেন ভাই নিজ মতটাই 

                                 চাপাও ভিন্নমতে ?

কেন এত ক্লেশ ,ঘৃণা বিদ্বেষ 

                                চলে যে ভিন্নপথে ?


সব পথ এসে মেশে অবশেষে 

                                  একটাই প্রাঙ্গণে ,

সব স্রোতস্বিনী ছুটে চলে জানি 

                                   সমুদ্রের সঙ্গমে ।


নিজের কাছে নিজেই যদি 

                                 রয়ে যাই অচেনা ;

কার কাছে আর প্রশ্ন আবার ?

                              কারে যে বলি চেনা !


                               -------------

অনু কবিতা : ব্যাকুল জীবনের তীব্র আকুলতা

            ব্যাকুলতা 

       কলমে----ছন্নছাড়া

--------------------------------------


শীতের কুহেলিকা বহিছে ধরায় 

ক্লান্তি-শ্রান্তিতে, নিঃস্বতায় ;

করোনার জলস্রোত, শৈত্য-প্রবাহ ,

মৃত্যু-থাবা তার হিংস্রতায় ।


ব্যাকুল হৃদয়ের কী যে স্পর্ধা !

স্বপ্ন-শরীর বাড়ে, ছোটে শতধা ;

সহাস্যে অধর চুমে মন্থিত-বিষ 

খুঁজিছে প্রণয়-সুখ, সে অহর্নিশ ।


                ---------------


অনু কবিতা : "প্রতীক্ষা"

 


বসে আছি ঝিলের পাড়ে একা
জড়িয়ে হাতে বকুল ফুলের মালা
অসীম অসহ্য এই প্রতীক্ষায়
সাথী আমার হাজারো জোনাকী পোকা!
 
মাছরাঙা,সারসের অবিরত খুনসুটিতে
সদ্য ফোঁটা পদ্ম যেন লুকায় মুখ লাজে
পদ্মের সেই লাজুক রূপ দেখে
ভ্রমর এসে গুন গুনিয়ে হাসে।
 
উর্ধ্বাকাশে ভরা সন্ধ্যা তারা
মনের গহীনে রাশি রাশি মেঘমালা
চেয়ে রই অধীর নয়নে, পথ পানে
মেখে প্রেমের সুগন্ধি সাঁঝেরবেলা
কবে জড়াব তার দীঘল কালো চুলে
ভালবাসায় গাঁথা বকুলের মালা!
 
ফাগুনের কোন এক ভর সন্ধ্যায়
জোছনায় দেখে সেই লাবন্যময় রূপ
নেশাতুর ঘোর লাগা চোখের চাহনিতে
প্রথম তো এসেছিলাম আমিই কাছে
দিয়েছিলাম সঁপে তারে উষ্ণ এই হৃদয়!
অন্তহীন এ প্রতীক্ষা! কভু যেন ফুরোবার নয়।
 
হে প্রেম!! যদি নাইবা এলে আজ এই সাঁঝে
ঝরা বকুলের কাব্য হয়েই না হয় থেকো
প্রেমিকের এই মানস সরোবরে
নতুন কোন গান,গল্প কিংবা কবিতা হয়ে
অনন্ত আকাশে অব্যক্ত ব্যাকুলতার মাঝে।
 
তবুও আছি প্রতীক্ষায় বসে
যদি সে ভুল করে হলেও একটিবার আসে!!
 
Copyright©️ All rights reserved
Pallabi Barua

সুখ নীড়।

সুখ নীড় "

পারমিতা মন্ডল ।

"মা তোমার ব‍্যাগপত্র ঠিক ঠাক করে গুছিয়েছো তো ?  তাড়াতাড়ি করো । বেশী দেরী করা যাবে না । সবাই অপেক্ষা করছে।"  বলেই ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল  অশোক ।মৈত্রী দেবীর একমাত্র  সন্তান ।খুব বড় পোস্টে চাকরি করে । অনেক দিন হলো বাড়ি থেকে যাতায়াত করেছে । এবার প্রমোশন দিয়ে কলকাতায় পাঠিয়ে দিয়েছে । এখন এতদূর থেকে যাতায়াত করা অসুবিধা হচ্ছে ।  তাছাড়া এতদিন ওর বাবা বেঁচে ছিলেন ।তিনি মোটামুটি আমাদের অথাৎ বৌমা নাতি বাপনের দেখা শোনা করতেন । তাই খুব একটা অসুবিধা হতো না । কিন্তু আজ প্রায় এক বছর হলো উনি আর নেই ।  অনেক অসুবিধা হচ্ছিল খোকার ।তাই কলকাতায় ফ্ল্যাট কিনেছে । আজ তার গৃহপ্রবেশ।

মনে মনে ভাবে মৈত্রীদেবী । আজ ছেলের গৃহপ্রবেশ, আর আজ ই তাকে গৃহ ছাড়তে হবে । যেতে হবে বৃদ্ধাশ্রমে । একে কলকাতা তার উপর  ফ্ল্যাট বাড়ি । সেখানে বাবা মায়ের জন্য জায়গা হয়না । মৈত্রীদেবী ভাবে , খোকাকে কি আর একবার বলবে , আর কিছু দিন না হয় ওদের সাথে থাকতাম ।অন্তত আজকের দিনটা ।  না ,থাক । নিজের কাছে নিজেকে আজ খুব ছোট লাগছে ।  ছেলেকে তিনি নিজেই ঠিক ঠাক মানুষ করতে পারেন নি । তাই আজ তার জায়গা হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে।

বয়স হয়ে গেছে তো ।সংসারের   প্রয়োজন ও  আজ ফুরিয়ে গেছে ।তাই আবর্জনার মতো দূরে ফেলে দিচ্ছে এরা । অথচ এই ছেলেকে মানুষ করতে গিয়ে চাকরি ছেড়েছে মৈত্রী দেবী  । ওর বাবার ছিল ট্রান্সফারের চাকরি  ।সব সময় বাইরে বাইরে থাকতে হতো।এদিকে ছেলে হওয়ার পর  চাকরি করা খুব অসুবিধা হচ্ছিলো । ছেলেকে দেখার মতো কেউই  ছিল না। আয়া মাসির কাছে রেখে যেতে হতো ।খোকার ঠিক মতো খাওয়া ঘুম  হতোনা ।তাই একদিন চাকরি টাই ছেড়ে দেন মৈত্রী দেবী । তখন অনেকেই বারন করেছিল চাকরি ছাড়তে । ওর  বাবাও বারন করেছিল । "বলেছিল ছেলে বড় হয়ে যাবে কিছু দিনের মধ্যে ।তখন তোমার একা লাগবে । না না মৈত্রী দেবীর কখনোই একা লাগে নি ।ছেলেকে লেখা পড়া শেখানোর জন্য সব সময় তার সাথে সাথে দৌড়েছেন । যখন যা প্রয়োজন মিটিয়েছেন।।তাইতো খোকা এতো ভালো রেজাল্ট করেছে । আর পড়াশোনা শেষ করে সাথে সাথেই চাকরিও পেয়ে গেছে ।

হঠাৎ বৌমার ডাকে চিন্তা সূত্র ছিড়ে গেল ।""মা আপনার ঘরে যে পালঙ্ক টা আছে ওটা খুলতে লোক এসেছে । এতো বড় খাট কি জানি ফ্ল্যাটে ঢুকবে কিনা ?"  তাছাড়া সব জিনিস পত্র তো সরাতে হবে । আপনি সব গুছিয়ে নিয়েছেন তো ?"দেরী হয়ে গেলে ওদিকে আবার অসুবিধা হবে । একবার মনে হলো বৌমাকে বলতে যে আর কিছু দিন কি তোমাদের সাথে থাকতে পারতাম না ? আসলে এই বাড়িতে তো একদিন বৌ হয়ে এসেছিল মৈত্রী দেবী । তার শাশুড়ি তাকে বরণ করে ঘরে তুলেছিলেন ।মনে হয় এই তো সেদিনের  কথা । এটা অনেক দিনের পুরনো বাড়ি । সেই  খোকার ঠাকুরদার আমলের বাড়ি । খোকার বাবাও একমাত্র সন্তান ছিলেন । তাই শ্বশুর শাশুড়ি সবাই একসাথে থেকেছেন এই বাড়িতে ।কখনোই কোন অসুবিধা  হয়নি ।যদিও বাড়িটা এখন অনেকটা ভেঙে গেছে । তাই খোকা প্রমোটারকে দিয়ে দিয়েছে  ফ্ল্যাট করার জন্য । মৈত্রী দেবীর অনুমতি নিয়েই করেছে ।অনুমতি না দিয়েই বা কি করতেন ।

তবে মৈত্রী দেবী বৌমাকে খুব ভালো বাসতেন । তার চেয়েও বেশি ভালোবাসেন নাতিকে ।ওকে রেখে কিভাবে থাকবেন? একথা মনে করেই চোখের কোনে জল চলে এলো । না না কাঁদলে  হবেনা।ছেলের অমঙ্গল হবে । যেতে যখন হবে ই তখন আর দেরী করে লাভ নেই । তাড়াতাড়ি গুছিয়ে নিতে লাগলেন সব ।  হঠাৎ একটা ছবিতে চোখ আটকে গেল । ওনার স্বামীর ছবি ।ছেলে মাঝখানে ।আর ওনারা দুজন দুদিকে । মনে হয় যেন এই তো সেদিনের কথা । এর মধ্যেই ছেলে বড় হয়ে গেল। ছেলের বিয়ে দিলেন। ছোট্ট নাতি তৃষিতের জন্ম হলো । কত ভালো বাসতেন মানুষ টা তার নাতিকে । হঠাৎ একদিন কি যে হলো ? বাজার থেকে এসে শরীর ভালো লাগেছে না বলে শুয়ে পড়লেন। আর উঠলন  না । স্ট্রোক করে গেছিল । বাঁচানো গেল না । আর তার এক বছরের মধ্যেই তাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে। কিন্তু ওনার  ছেলে ,বৌ , নাতি সবাই তো  তাকে খুব ভালো বাসতো ।তিনি ও কখনোই বৌমার সাথে খারাপ ব‍্যাবহার করেন নি ।আজ সত্যিই তার প্রয়োজন ফুরিয়েছে ।

বৌমা নাতিকে নিয়ে চলে গেল । ফ্ল্যাটে পুজো হবে তো গোছগাছ করতে হবে । মৈত্রী দেবীকে তার খোকা পৌঁছে দেবে বৃদ্ধাশ্রমে ,তারপর ফ্ল্যাটে যাবে । ছোট একটা ব‍্যাগের মধ্যে এতো দিনের স্‌ংসারকে পুরে নিয়ে , চোখের জলে বিদায় জানালেন মৈত্রী দেবী শ্বশুর স্বামী র ভিটেকে।
। আর হয়তো কোনো দিন দেখা হবে না এই তুলষীতলা ,  বাড়ির পিছনে সেই আম, জামে কাঁঠাল গাছের সাথে । দেখা হবে না পাড়ার রায়দি ,সরকার দির সাথে ।  পোষা পাখি টাকে খাঁচা খুলে উড়িয়ে দিলেন মুক্ত আকাশে । সে জানেনা খোকা তাকে আর কোন দিন বাড়িতে আনবে কিনা ?

গাড়ি চলছে হু হু গতিতে । মৈত্রী দেবী মনে মনে ভাবে খোকাকে আর একবার বলিনা , ওদের সাথে এক কোনে আমাকে যদি একটু জায়গা দেয় । না, থাক ।ওদের সত্যিই  হয়তো অসুবিধা  হচ্ছে । চোখ দিয়ে দুফো়ঁটা জল গড়িয়ে পড়ল । হঠাৎ ছেলে তাকিয়ে দেখে মা কাঁদছে ।  ছেলে বলে "মা কেন কাঁদছো ? এখানে তুমি অনেক ভালো থাকবে । বাড়িটার সামনে একটা পার্ক আছে ।ওখানে তোমার মতো আরো অনেকে বিকেলে হাঁটতে আসে । এখানে তুমিও যাবে ।অনেক নতুন নতুন বন্ধু হবে । দেখবে খুব ভালো লাগবে ।"   হয়তো তাই ।তবে মায়ের মন তো । তোদের ছেড়ে কখনোই কি ভালো থাকতে পারবো ?  মনে মনে ভাবে মৈত্রী দেবী।

বিশাল বড় একটা বাড়ির সামনে গাড়িটা এসে দাঁড়ালো । এটাই তাহলে সেই বৃদ্ধাশ্রম। গাড়ির দরজা খুলে মাকে নামালেন অশোক বাবু ।  মা বললেন "বাবা আমাকে মাঝে মাঝে নিয়ে যাবি তো তোদের কাছে ।? তোদের ছেড়ে থাকতে আমার যে খুব কষ্ট হবে বাবা ।"  "মা তুমি কিছু চিন্তা করোনা । তুমি ঠিক আমাদের কাছে থাকবে। "বলে ছেলে এগিয়ে গেল । দোতলায় যেতে হবে । হঠাৎ একটা নেমপ্লেটের দিকে মৈত্রী দেবীর চোখ আটকে গেল । লেখা আছে "মৈত্রী ভবন"। এতো তার ই নামে আশ্রমের নাম ।  কলিং বেল বাজাতে একজন মাঝবয়সী লোক বেরিয়ে এলো । তিনি গেট খুলে দিয়ে সরে দাঁড়ালেন । "এটাই তোমার ঘর মা "ছেলে বলল। কিন্তু ঘরটা তো অন্ধকার। কিছুই দেখা যাচ্ছে না । লাইট জ্বালা হোক । হঠাৎই লাইট জ্বলে উঠল। আর চারিদিক থেকে ফুল এসে পড়লো মৈত্রী দেবীর মাথায়। এরা কোথা থেকে এলো ? বৌমা , নাতি ? অবাক হয়ে যায় মৈত্রী দেবী ।

ছেলে কাছে এসে মায়ের হাতে একটা চাবির গোছা , আর একটা কাগজ হাতে দিয়ে বলে মা এ ফ্ল্যাট আজ থেকে তোমার । এই নাও বাড়ির চাবি আর দলিল । আমি তোমার এতোটা অকৃতজ্ঞ ছেলে নয় যে তোমাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে আমি আরামে থাকবো । মা বাবার ঋণ কখনোই শোধ করা যায় না ঠিক ই কিন্তু তাদের তো আমারা একটু ভালো রাখতে পারি ।"

মৈত্রী দেবী জড়িয়ে ধরে ছেলেকে । না আমার শিক্ষা বিফলে যায়নি । আমি তোর এই দলিল, চাবি কিছুই চাই না ।শুধু নাতিকে আর বৌমাকে নিয়ে একসাথে থাকতে চাই ।

(পৃথিবীর সব ছেলে যেন মৈত্রী দেবীর ছেলের মত হয় , এই প্রার্থনা করি।)
সমাপ্ত।


অনু গল্প: মধ্য রাতের দুঃখ গুলো

একেক টি রাত যেন আমি মনের খেয়ালে, তমশার তীরে দাঁড়িয়ে ঘনঘোর অন্ধকারে কিছু একটা খুঁজে বেড়ায়। কি?? সেটা আমি নিজেও জানিনা! খুব..খুব অস্থির লাগে তখন! ভাবি, দুরের ঐ সুউচ্চ বাতিঘর থেকে যদি কোন আলোকবর্তিকা
ভেসে আসে অসহায় এই আমাকে পথ দেখানোর জন্য!

এমনিতেই ভাদ্রর আকাশে শ্রাবনের মেঘের ঘনঘটা... আমার মনের আকাশেও বজ্রসহ মেঘ জমতে শুরু করেছে। শুধু বৃষ্টি হয়ে চোখের কোণ বেয়ে ঝরে পড়ার অপেক্ষায়! আর, এমন সব দিনে উনি আবার শীত নিদ্রাই থাকেন! গুগল সার্চ দিয়েও পাওয়া যায় না তাকে! সে এক বিরল প্রজাতির 'দুই পা' বিশিষ্ট জীব! ওর কোন লেখার রিভিউ যদি আমি ভাব সম্প্রসারণে দিই... রিপ্লাই পাবো ঠিক গুনে গুনে দুই অক্ষর, নয়তো গাল ফুলে থাকা কোন ইমোজির মাধ্যমে!! ভাবা যায়?? 
 
এই মন খারাপের রাতে ... যখন পুরোপুরি হতাশ আমি বুঝতে পারছিলাম না কিভাবে একটু খানি শান্তি পাওয়া যায়..?? দেখি কি উজবুক!..না..না..মহাকবি!? আজ কি যেন পোস্ট করেছে। অভিমানে কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলাম। নাহ! আজকে আর পাজিটার কোন কিছুই দেখবো না!! রিভিউও দেবো না ঠিক করলাম। কিন্তু, কেমন যেন লাগছে!! বুকের ভিতর ধুক পুকানি শুরু হয়ে গেছে। বেশ কিছু সময় ডিলেমা করতে করতে শেষ পর্যন্ত খুলেই ফেললাম পোস্ট টা! এএমা! বলদটা আজকে কি লিখেছে.. কি?! শেষ পর্যন্ত কিনা এই মেলানকলিক প্যাচি রেইনের মধ্যরাতে গাঁজাখুড়ি পিচ টা উপহার দিল??
 
এহ! ভালবাসা মানে কি সব বালতি ভরা জল,, কম্পাংক,, শব্দতরঙ্গ,, ভরের আপেক্ষিকতা,, রাসায়নিক বিক্রিয়া,, সেট আর লগারিদম!?! কি চায় সে? এতো রাতে কি প্রুফ করতে চায়?! ঢেঁড়স টার কাছে ভালবাসার পরিমাপ যোগ্য বিষয় বস্তু তাহলে এই রকম! এবার শোন মহাকবি.. আমি বলি কি..আজকে ভালবাসার যে ব্যাখ্যা দিয়েছিস...তা পুরোপুরি ভুল ধারণা রে। আমার কাছে ভালবাসার প্রথম এবং প্রধান শর্তই হল মানসিক আকর্ষণ বা মনের মিল! দুটি ভিন্ন নদীর স্রোত যখন একই ধারায় প্রবাহিত হয়ে বিশাল সমুদ্রের বুকে মিলিত হয়, একে অপরের মাঝে হারিয়ে যায়.. সেটাই ভালোবাসা!! কিন্তু তুই কি করে বুঝবি রে সেসব গবেট! যন্ত্র নিয়ে কাজ করে করে নিজেও যে আস্ত রোবোটে পরিণত হয়েছিস!
 
তবে, আজকাল কেনো জানি আমারও তোর মতো খুব ভাবতে ইচ্ছে করে যে, ভালবাসায় আসলেই "বুকের বাম পাশ" বলে কিছুই নেই। ভালোবাসা মানে শুধুই মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসের খেলা..তার সিগন্যালের তালে তালে বুকের বাম পাশে থেমে থেমে যে রক্ত ছলকিয়ে উঠে... সেটাই আমি প্রেম, ভালবাসা মনে করে ভুল করি..ভুল লোককে ভালবাসি!? ভালবাসা কখনো পদার্থের ভরের আপেক্ষিকতায়, রসায়নের বিক্রিয়ায়, কিংবা ম্যাথস এর লগারিদমের এর মাঝে মেলে না। তাই তো আমার কাছে ভালবাসা মানেই মস্তিষ্কের পিটুইটারি....গ্রন্থির নিঃসরণ! ভালবাসায় "বুকের বাম পাশ" বলে কিছুই নেই!!
সমাপ্ত।।
 
Copyright©️ All rights reserved
Pallabi barua

শুধু তুমি (পিয়ালী চক্রবর্তী)

 




কতটা ভালোবাসি,
নিজেই বুঝিনা, জানিনা,
কিন্তু, বেঁচে থাকা মুশকিল,
তুমি ছাড়া ।

তোমার অপেক্ষায় আজীবন,
কত দিনের অপেক্ষা তা জানিনা,
কিন্তু, বেঁচে থাকা মুশকিল,
তুমি ছাড়া ।

চাই তোমায়, শুধুই তোমায়,
কতটা যে চাই তা নিজেই জানিনা,
কিন্তু, বেঁচে থাকা মুশকিল,
তুমি ছাড়া ।

তোমার রাগ, কষ্ট, দুঃখ, অভিমান,
সব আমায় ঘিরে,
কতটা কষ্ট তা আমি সত্যিই বুঝিনা,
কিন্তু , বেঁচে থাকা মুশকিল,
তুমি ছাড়া ।

তোমার প্রেম, ভালোবাসা, আশা, নিরাশা
সব আমার জন্য,
কতটা ভালোবাসো আমায় তা বুঝিনা,
কিন্তু, বেঁচে থাকা মুশকিল,
তুমি ছাড়া ।

আমার সন্মান, অপমান, আকর্ষণ, বিকর্ষণ,
সব তোমার জন্য ।
কতটা আকর্ষণ তা আমি নিজেই বুঝিনা,
কিন্তু, বেঁচে থাকা মুশকিল,
তুমি ছাড়া ।

তোমায় ছেড়ে যাবো কোথায়,
তোমার লাগি জন্ম,
এত ভালোবাসা পাবো কোথায়,
তোমায় ভালোবাসাই আমার পরম ধর্ম ।
Copyright © All Rights Reserved
Piyali Chakravorty


অনু _কবিতা: #স্মৃতির_পাতায়


চক্ষু বুজলেই ভেসে উঠে মনে 

সবুজ, শ্যামল সেই সুফলা ভূমি

নদীর কুলকুল ধ্বনি, জেগে উঠা চর

কৃষকের মাথা বোঝায় ফসলের ভার

শিউলির গন্ধ ছড়ানো শীতের সকাল।


যেথায় সারস ও মাছরাঙা ডানা মেলে উড়ে

নদীর শান্ত বুকে,অবিরত কোলাহলে

মন কেমনের বিকেলে নদী তীরে বসে

রাখালিয়া বাজায় বাঁশি আপন সেই সুরে।


শৈশবের প্রথম রবির কিরণে দেখা সেই 

 শিশিরে ভেজা ধান কিংবা পাট ক্ষেতে

যেখানে খেলতো সুখে চড়ুই আর শালিক

কাদা মাটির গন্ধে ভরা রাঙা সে পথে।


অতীতের দুয়ার মেলে ব্যথিত নয়নে

খুঁজে ফিরি আজো ছোট্ট সেই গাঁও

স্মৃতির ছেঁড়া পাতায় জেগে ওঠে আনমনে।।

Copyright©️All rights reserved

Pallabi Barua

28.11.20

ওরা কারা (পিয়ালী চক্রবর্তী)


Copyright©️All rights reserved 

Piyali Chakravorty
কলকাতার ভবানীপুরের বর্ধিষ্ণু ভট্টাচার্য্য বাড়ির বড়ছেলে বাণীব্রত | বুদ্ধি - বিদ্যা - মেধা কোনোদিক দিয়েই বাণীব্রতর জুড়ি মেলা ভার | সাথে ফার্স্ট ডিভিশনে ক্রিকেট খেলে ওর বেশ নামডাক আছে পাড়াতে | বন্ধুবান্ধবও প্রচুর | পাড়ার দুর্গাপুজোর চাঁদা তোলা থেকে শুরু করে রক্তদান শিবির পর্যন্ত সবজায়গাতেই ওর ডাক পড়ে |

দুধর্ষ , নির্ভয় , ডাকাবুকো এই ছেলেটিও হটাৎ একদিন বদলে যেতে শুরু করলো | কলেজ যায়না , বাড়িতে একা একা নিজের ঘরে চুপ করে বসে থাকে | মাঝে মধ্যে কিসব যেন বিড়বিড় করে বলতে থাকে আপন মনে |

দু - তিন দিন দেখে ওর বাবা পরাশর বাবু ঠিক করলেন ওকে ভালো মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাবেন | ওরকম একজন প্রতিভাবান ছেলের হটাৎ কি হলো তা নিয়ে ওর মা অনিমা দেবীও খুব চিন্তিত |

যথারীতি ওনারা বাণীব্রতকে নামকরা মানসিক ডাক্তার , ডাক্তার অমিতাভ ঘোষের কাছে নিয়ে গেলেন | অনেক্ষন ধরে বিভিন্ন ধরণের পরীক্ষা নিরীক্ষার পরও অতোবড়ো অভিজ্ঞ ডাক্তার ওর মানসিক বিকৃতির কোনো কারণই খুঁজে পেলেন না |

রিক্তহাতে ডাক্তারের কাছ থেকে ফিরে এলেন ওনারা | ছেলেকে নিয়ে সত্যিই মহা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছেন | এখন কি উপায় কিছুই ভেবে পাচ্ছেন না |

প্রত্যেকদিনের মতো পরাশর বাবু সেদিনও সন্ধ্যায় পাড়ার দোকানে চা খেতে বেরিয়েছেন | চায়ের দোকানে ওই সময় ওনার আরো চার - পাঁচজন বন্ধুও এসে জড়ো হন |

পরাশর বাবুকে আজকে বিমর্ষ দেখে ওনার বন্ধুরা জিজ্ঞাসা করলেন , ' হ্যাঁ রে ? তোকে আজকে কিরকম অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে | সব ঠিক আছে তো ? '

পরাশর বাবু ভেঙে পড়লেন বন্ধুদের কাছে | উনি বাণীব্রতর সব সমস্যার কথা ওনাদের কাছে ব্যক্ত করলেন |

ওনাদের আলোচনা শুনে চায়ের দোকানদার ছেলেটা বলে উঠল , ' ভটচাজ দা , আমি একটা কথা বলছি শুনুন | আপনার ছেলের কয়েকজন বন্ধু আছে | তারমধ্যে একজনের সাথে ওর খুব মেলামেশা | ছেলেটার নাম প্রিয়ঙ্কর | বড়রাস্তার মোড়ে ওদের বাড়ি | আপনার ছেলের ওদের বাড়িতে খুব যাতায়াত আছে | আমি যতদূর জানি ওই প্রিয়ঙ্করদের বাড়িটা ঠিক সুবিধার নয় | গোলমেলে ব্যাপার আছে ওই বাড়িতে |

পরাশর বাবু : গোলমেলে ব্যাপার ? কোন ধরণের গোলমেলে ব্যাপারের কথা বলছো পল্টু ?

পল্টুর চোখমুখ যেন কিরকম ফ্যাকাশে হয়ে গেলো | খুব আস্তে আস্তে ভয়ার্ত কণ্ঠে ও বললো , ' অপদেবতা ' |

পরাশর বাবু : কি ? কি সব আজেবাজে বকছো ? অপদেবতা ? মানে ভূত ? তাতে কি হলো ? তার সাথে আমার ছেলেরই বা সম্পর্ক কোথায় ?

পল্টু : আমি হলফ করে বলতে পারি আপনার ছেলে নিশ্চই কিছু একটা দেখেছে ওই বাড়িতে | যার জন্য ভালো ছেলেটা হটাৎ মনোরোগী হয়ে উঠেছে |

পল্টুর কথাটা পরাশর বাবুকে নাড়া দিয়ে গেলো | সেই জন্যেই কি ডাক্তার ঘোষ কিচ্ছু বুঝতে পারলেন না যে কেন এরকম হয়েছে ! তাহলে কি পল্টু যা বলছে সব ঠিক ! ওফফ ....কিছু ভাবতে পারছিনা | এর খোঁজ পেতে গেলে আমাকে যেতে হবে প্রিয়ঙ্করদের বাড়িতে | আজকেই , এখনই , আর দেরি করা যাবেনা |

পরাশর বাবু হাঁটা লাগালেন | ওনার বন্ধুরা ওনার সাথে যেতে চাইলেও , উনি সাথে আর কারোকে নিতে রাজি নন | ছেলের জন্য যা করার নিজেই করবেন , মনে মনে শপথ করে শুরু হলো তাঁর এক অতি ভয়াবহ অলৌকিক রহস্যময় পথে পাড়ি দেওয়া |
Copyright©️All rights reserved
Piyali Chakravorty

Copyright©️All rights reserved
Piyali Chakravorty
পরাশর বাবু প্রিয়ঙ্করদের বাড়ি পৌঁছে ডোরবেল বাজালেন | সন্ধ্যার অন্ধকারে বাড়ির ঠিক পাশের ছাতিম ফুলের গাছটা দেখে কেমন গা ছমছম করছে ওনার |

কিছুক্ষন পরে প্রিয়ঙ্কর এসে দরজা খুললো | পরাশর বাবুকে দেখে ও যেন কিরকম চমকে উঠলো | 

পরাশর বাবু : তুমি বাণীব্রতর বন্ধু প্রিয়ঙ্কর তো ?

প্রিয়ঙ্কর ভয়ার্ত কণ্ঠে বললো , ' হ্যাঁ , বাণী ঠিক আছে তো ? '

পরাশর বাবু : হটাৎ এ প্রশ্ন করলে যে ? প্রিয়ঙ্কর : কাকু , আপনি ভেতরে আসুন , আপনার সাথে কথা আছে |

পরাশর বাবু প্রিয়ঙ্করের পেছনে পেছনে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে লাগলেন | কিরকম একটা অজানা ভয় এসে যেন গ্রাস করছে ওনার অন্তরাত্মাকে |

দোতলায় উঠে প্রথম ঘরটাই বৈঠকখানা | লম্বা টানা বারান্দায় পর পর সারিবদ্ধ ঘর | একদম শেষের দিকে একটা বড়ো ঘর , তাতে লোহার দরজা লাগানো | সেই দরজাটা বাইরে থেকে তালা দেওয়া |

একটা বিশ্রী হিমশীতল বাতাস এসে পরাশর বাবুর মুখে ঝাপ্টা মারলো | আর তারসাথে একটা অদ্ভুত গন্ধ | পচা লাশের সাথে ইথার , আর ওষুধ মেশানো থাকলে যেমন গন্ধ বেরোয় ঠিক সেরকম গন্ধ |

উনি আর কালবিলম্ব না করে বৈঠকখানায় গিয়ে বসলেন | সারাশরীর ঝিমঝিম করছে ওনার |

সেটা লক্ষ্য করে প্রিয়ঙ্কর বললো , ' কাকু , আপনি ঠিক আছেন তো ? আপনাকে একটু জল এনে দিই ? '

পরাশর বাবু : হ্যাঁ , একটু জল দাও , গলাটা হটাৎ খুব শুকিয়ে গেছে |

প্রিয়ঙ্কর সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেলো , রান্নাঘর থেকে জল আনার জন্য | পরাশর বাবুর চোখ দরজার দিকেই নিবদ্ধ |

হটাৎ উনি দেখলেন একজন নারী অবয়ব ঝট করে বারান্দার পেছনের দিকটায় চলে গেলো | ব্যাপার কি দেখার জন্য উনিও ওই নারী অবয়বের পিছু নিলেন |

টিমটিমে সিঁড়ির আলোয় উনি স্পষ্ট দেখতে পেলেন , ওই নারীটি লোহার দরজাওয়ালা ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলেন | তার পরেই পরাশর বাবুর হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেলো | কারণ লোহার দরজাটা তখোনো বাইরে থেকে তালাবন্ধ |

ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলেন উনি | প্রিয়ঙ্কর জল নিয়ে এসে ওনার এই অবস্থা দেখে ওনাকে সোফায় বসালো , চোখে মুখে জলের ছিটে দিয়ে ওনাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করতে লাগলো |

খানিকটা ধাতস্থ হয়ে উনি জিজ্ঞাসা করলেন , ' কে ছিল ওটা ? বন্ধ দরজা দিয়েও ভেতরে চলে গেলো ? বলো প্রিয়ঙ্কর চুপ করে থেকোনা | '

প্রিয়ঙ্করের হাত থেকে জলের গ্লাসটা নিয়ে এক নিঃশ্বাসে শেষ করেও যেন গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে ওনার |

প্রিয়ঙ্কর : কাকু , আগে বলুন বাণী কেমন আছে ? পরাশর বাবু বাণীব্রতর ব্যাপারে সব কথা প্রিয়ঙ্করকে বললেন |

সব শুনে প্রিয়ঙ্কর বললো , ' বাণী গত রবিবার ক্রিকেট খেলে সন্ধ্যের সময় আমাদের বাড়ি এসেছিলো | খুব ক্লান্ত ছিল ও |

আমি ওকে বললাম ' তুই কি একটু রেস্ট নিবি ? আমার এখন একটা টিউশন পড়ানোর আছে | আমি নিচের তলায় আছি | তুই একটু ঘুমিয়ে নে | আমি পড়িয়ে এসে একসাথে বসে চা খাবো |

বাণীও আমার ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলো | কিছুক্ষন পরে আমি একটা আর্তনাদ শুনতে পাই | তাড়াতাড়ি ওপরে উঠে আমার ঘরে গিয়ে দেখি , বাণী উপুড় হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে |

আমার বাবার তো এন্টিবায়োটিকের ফ্যাক্টরি আছে নিচের তলায় , আমি বাবাকে চিৎকার করে ডাকি | বাবা ছুটে আসে | তখন আমি আর বাবা মিলে ওকে ধরাধরি করে বিছানায় শুইয়ে দিই | জলের ঝাপ্টা দিতে দিতে বেশ কিছুক্ষন পরে ওর জ্ঞান ফেরে |

বিস্ফারিত চোখে আমাদের দিকে চেয়ে ও বলে ওঠে , ' ওরা কারা ? ' তারপরেই আমাকে একধাক্কায় মাটিতে ফেলে দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় |

আমি গত তিন দিন ধরে ওর কথাই চিন্তা করছিলাম | পরাশর বাবুর ভীষণ ভয় করতে লাগলো ছেলের জন্য |

উনি জিজ্ঞাসা করলেন , ' আমিও আজকে এক নারী অবয়ব দেখেছি , লোহার দরজার মধ্যে দিয়ে মিলিয়ে গেলেন , তুমি কি বলতে পারো ? কে ছিলেন উনি ?

প্রিয়ঙ্কর : আমাকে মাফ করবেন কাকু , আমার বলা বারণ আছে | আপনি কালকে সকালে আসুন | যা প্রশ্ন আমার বাবাকেই করবেন |

পরাশরবাবু : আচ্ছা , নাহয় কাল সকালেই আসবো |

ধীরপায়ে বেরিয়ে যেতে যেতে ঘুরে একবার বারান্দার শেষ ঘরটার দিকে ফিরে দেখলেন উনি | যেন মনে হলো জ্বলজ্বলে চোখে কেউ ওনার দিকে তাকিয়ে আছে |
Copyright©️All rights reserved
Piyali Chakravorty

Copyright©️All rights reserved
Piyali Chakravorty
সেই রাত্রে বাড়ি ফিরে পরাশর বাবুর প্রচন্ড জ্বর এলো | জ্বরের ঘোরে উনি বলতে লাগলেন , ' ছেড়ে দে , আমার ছেলেকে ছেড়ে দে | ও তো কোনো দোষ করেনি | ওকে ছাড় তোরা | '

অনিমাদেবী একদিকে ছেলে আর অপরদিকে স্বামীকে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লেন | বাণীব্রতরও অবস্থা খুব একটা ভালো নয় | সারাদিন ঘরে বসে বিড়বিড় করে কি বলতে থাকে আর মাঝে মাঝে দেওয়ালে মাথা ঠুকে ঠুকে কাঁদতে থাকে |

রাত তখন কাঁটায় কাঁটায় বারোটা বাজে | বাণীব্রতর ঘরে একটা টিমটিমে নাইট বাল্ব জ্বলছে | কিন্তু ওর চোখে ঘুম নেই |

ও খাটের ওপরে বসে বসে হটাৎ খুব জোরে জোরে হাসতে লাগলো আর বলতে লাগলো , ' কাউকে ছাড়বোনা , সবে তো শুরু , দেখ , কি অবস্থা করি তোদের | যত কষ্ট আমরা পেয়েছি , তার থেকে হাজার গুন কষ্ট দিয়ে মারবো এক একটা কে' 

- এই বলে ছুটে গিয়ে সামনের টেবিলে রাখা কাচের ফুলদানিটা আছাড় মেরে ভেঙে , একটা কাচের টুকরো হাতে তুলে নিলো | তারপর সেটা দিয়ে নিজের হাত কেটে কিছু একটা লেখার চেষ্টা করতে লাগলো |

অনিমা দেবী ফুলদানি ভাঙার শব্দে ঘরে এসে এই কান্ড দেখে কান্না কাটি শুরু করে দিলেন |

বাণীব্রত একটা পৈশাচিক দৃষ্টিতে অনিমাদেবীর দিকে তাকালো | নিজের ছেলের চোখ দেখে তখন ওনার ওনার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠছে | বাণীব্রতর চোখটা টকটকে লাল , এক অদ্ভুত জিঘাংসা ফুটে উঠেছে ওর চোখে |

চিৎকার করে অনিমাদেবী বাড়ির পুরোনো কাজের লোক শক্তি কে ডাকলেন | শক্তির নামই শুধু শক্তি নয় , ওর শরীরেও অসুরের বল | ও তাড়াতাড়ি গিয়ে বাণীব্রতকে জাপ্টে ধরে ওর হাত থেকে কাচের টুকরোটা ফেলে দিলো |

এই রাত্রিবেলা তো ডাক্তারকে কল দিলেও আসবেননা | শক্তি বাণীব্রতর হাতদুটো নিজের গামছা দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিলো | তারপর অনিমাদেবীর উদ্দেশ্যে বললো , ' বৌদিমনি , আপনি দাদাবাবুর দেখাশুনো করুন , আমি আছি এখানে , কোনো চিন্তা নেই | '

অনিমাদেবী পরাশর বাবুর কাছে গিয়ে বসলেন | উনি তখন গভীর ঘুমে অচেতন | সারারাত দুই ঘরে দুজন বিনিদ্র কাটালো , বাণীব্রতর ঘোরে শক্তি আর পরাশর বাবুর কাছে অনিমাদেবী |

ভোরের দিকে অনিমাদেবীর চোখটা লেগে গিয়েছিলো | ওনার ঘুম ভাঙলো তখন সকাল নয়টা বেজে গেছে | বিছানার দিকে চেয়ে দেখলেন পরাশর বাবু নেই | সারাবাড়ি খুঁজে কোত্থাও ওনাকে পাওয়া গেলোনা |

ওদিকে শক্তিও সারারাত জেগে , এখন বসে ঢুলছে | বনব্রতর চোখে কোনো ঘুমই নেই | স্থির দৃষ্টিতে ও চেয়ে আছে সিলিং ফ্যান এর দিকে |

অনিমাদেবী শক্তিকে ডাক দিলেন , ' ওরে শক্তি , তোর দাদাবাবুকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছিনা | অসুস্থ মানুষটা গেলো কোথায় রে | ' বলে চিৎকার ককরে কাঁদতে লাগলেন |

ওদিকে ধুম জ্বর আর উস্কোখুস্কো চুল নিয়ে পরাশর বাবু গিয়ে হাজির হলেন প্রিয়ঙ্করদের বাড়িতে | দিনের বেলাতেও বাড়িটাতে কিরকম একটা অশুভ শক্তির ছাপ রয়েছে | প্রিয়ঙ্করের বাবা পরাশর বাবুকে নিয়ে গিয়ে ওনার ঘরে বসালেন |

চোখেমুখে উদ্বেগ , ক্লান্তি আর অসুস্থতা ফুটে উঠেছে পরাশর বাবুর | রীতিমতো হাঁপাচ্ছিলেন উনি | ওনাকে জল খেতে দিয়ে প্রিয়ঙ্করের বাবা প্রীতমবাবু ওনার সামনে বসলেন |

একটু ধাতস্হ হতে উনি পরাশর বাবুকে জিজ্ঞাসা করলেন , ' বাণীব্রতর খবরটা শুনে খুব খারাপ লাগছে | ঐদিন সন্ধ্যেবেলায় ঘটনা নিশ্চই প্রিয়ঙ্কর আপনাকে বলেছে | '

পরাশর বাবু : আচ্ছা , কালকে আমি একজন নারী অবয়বকে দোতলার ওই লোহার দরজাওয়ালা বন্ধ ঘরটার মধ্যে মিলিয়ে যেতে দেখেছি |

প্রীতমবাবু : আপনাকে আমি সব কথা বলতে পারবোনা | তবে এইটুকু জেনে রাখুন , বাণীকে ওদের মধ্যেই একজন ভর করেছে | এর আগেও আরেকজনকে ভর করেছিল | তাকে বাঁচানো যায়নি | এই বাড়িতে কিছু একটা এমন ঘটনা ঘটেছিলো , যার ফলে এই বাড়ির দুজন সদস্যের আত্মার এখোনো মুক্তি হয়নি | আমরা অনেক চেষ্টা করেছিলাম | কিন্তু শেষরক্ষা করতে পারিনি , ওদের দুজনকে বাঁচাতে পারিনি | ওরা আমাদের বাড়ির লোকের কোনো ক্ষতি করেনা , কিন্তু বাইরের কেউ এলে , ওদের হাত থেকে পরিত্রান পাওয়া খুবই মুশকিল |

পরাশর বাবু : এরকমই যখন ব্যাপার ! তখন আমার ছেলেকে একা ওপরের ঘরে ছেড়ে দিলো কেন প্রিয়ঙ্কর ?

প্রীতমবাবু : ও ঠিক বুঝতে পারেনি যে এরকমটা হতে পারে | ওকে ক্ষমা করে দিন |

পরাশর বাবু : আপনারা কোনো তান্ত্রিক এনে যজ্ঞ করাতে পারতেন , শুনেছি ওরা অতৃপ্ত আত্মাদেরকে বশ করতে পারে |

প্রীতমবাবু : আমি এর বেশি কিছু বলতে পারবোনা , আমাকে মাফ করুন |

পরাশর বাবু : আচ্ছা , ওই লোহার দরজাওয়ালা ঘরটা কি একবার খোলা যাবে ? আমি দেখতে চাই |

প্রীতমবাবু : দেখতে পারি ঘরটা , কিন্তু আগে থেকেই আপনাকে সাবধান করে রাখি , ওই ঘরে কোনো জিনিসে হাত দেবেন না | আর আমি ভেতরে যাবোনা , আপনাকে একই যেতে হবে ওই ঘরের মধ্যে |

একটা বড়ো চাবি হাতে নিয়ে প্রীতমবাবু পরাশর বাবুকে নিয়ে চললেন ওই ঘরের দিকে | ঘরটার সামনে পৌঁছে পরাশর বাবুর হাত পা ঠান্ডা হয়ে এলো | প্রীতমবাবু আগেই বলে দিলেন যে , ওই ঘরে আলো জ্বালানো নিষেধ আছে |

চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুলতেই একটা ভ্যাপসা গন্ধ নাকে এসে লাগলো ওনার নাকে | ঘরের দরজাটা খুলে দিয়েই প্রীতমবাবু দ্রুতপদে নিচে নেমে গেলেন | ঘরের ভেতরটা দিনের বেলাতেও অন্ধকার |

ভেতরে চামচিকের বাসা , ইঁদুর আরশোলার বিশ্রী গন্ধের সাথে সেই গন্ধটাও ভেসে এলো , যেটা আগেরদিন সন্ধ্যেবেলা পরাশর বাবু পেয়েছিলেন | সেই পচা মৃতদেহের সাথে ইথার আর ওষুধ মেশানো গন্ধ | হটাৎ একটা দমকা হাওয়া এসে চোখেমুখে ঝাপ্টা মেরে গেলো ওনার | একটা চাপা কান্নার আওয়াজ যেন ঘরের কোণ থেকে ভেসে আসছে |

আলোআঁধারীর মায়াজালে পরাশরবাবুর হটাৎ নজর পড়লো সিলিং ফ্যানটার দিকে | শরীরের সব রক্ত যেন একসাথে হৃদপিন্ডে ধাক্কা মারলো ওনার | সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলছে আধপোড়া একটা নারীদেহ |
Copyright©️All rights reserved
Piyali Chakravorty

Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
ওদিকে পরাশর বাবুর বাড়িতে তখন তোলপাড় কান্ড চলেছে | একেই তো ওনাকে বাড়িতে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা , তার ওপর বাণীব্রত নিজের হাত কামড়ে কামড়ে মাংস খুবলে তুলছে | প্রবল আক্রোশ তখন ওর চোখে মুখে |

ভয়ে ওর মা বা শক্তি কেউই ওর দিকে এগোনোর সাহস করছেনা | বাণীব্রতর ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিয়ে ওরা ঠকঠক করে কাঁপছে |

বাণীব্রতর গলা দিয়ে তখন দুরকমের স্বর একসাথে বেরোচ্ছে , একটা ওর নিজের , যে কিনা যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে , আর আরেকটা কোনো বাচ্চা মেয়ের , যার স্বর শুনলে বুকের রক্ত হিম হয়ে যায় |

চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে পৈশাচিক শব্দে সে বলছে , সবাইকে মারবো , সবাইকে মরতে হবে , আমিও মরেছি , কারুর পরিত্রান নেই আমার হাত থেকে |

বলতে বলতে , বাণীব্রত নিজের কত কামড়ে চিরে ফালাফালা করছে | অনিমাদেবী  একাধারে ছেলের করুন অবস্থা , আর অপরদিকে ওই পৈশাচিক উল্লাস  সহ্য করতে না পেরে চিৎকার করে জ্ঞান হারালেন |

ওদিকে পরাশর বাবুর সামনে সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলে রয়েছে আধপোড়া নারীদেহ | উনি এতটাই ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কখন প্রস্রাব করে ফেলেছেন নিজেই বুঝলেন না |

হটাৎ সম্বিৎ ফিরে পেয়ে উনি ভীষণ একটা চিৎকার করে পড়ি কি মরি ভাবে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলেন | আর একমুহূর্তও অপেক্ষা না করে উনি দৌড়োলেন বাড়ির দিকে |

রাস্তায় পরিচিত ব্যক্তিরা ওনাকে দেখে ভাবলো , হয়তো ওনার মানসিক কোনো সমস্যা হয়েছে |

বাড়ি ঢুকে ওই পরিস্থিতি দেখে উনি একদম ভেঙে পড়লেন | হায় ভগবান , ছেলেটাকে কি শেষপর্যন্ত বাঁচাতে পারবোনা ? ওনার স্ত্রীর ততক্ষনে জ্ঞান ফিরে এসেছে | একে - অপরকে জড়িয়ে ধরে ওনারা কান্নায় ভেঙে পড়লেন |

অনিমাদেবী : কোথায় চলে গিয়েছিলে তুমি ? একেই অসুস্থ শরীর | আমাকে তো একবার ডাকতেও পারতে |

পরাশর বাবু : তুমি জানোনা , কি ভীষণ বিপদে পড়েছি আমরা | ছেলেকে এখন রক্ষা করা খুব মুশকিল | এর আগেও নাকি আরেকজনকে ভর করেছিলো , তাকে বাঁচানো যায়নি  |

অনিমাদেবী: কিসের ভর ? কে করেছে ভর ? কেনই  বা আমার ছেলেটাকে এরকম করলো ?

পরাশর বাবু প্রিয়ঙ্করদের বাড়িতে যতটা জেনেছিলেন এবং দেখেছিলেন , বিস্তারিত স্ত্রীকে জানালেন | ওনার কথা শুনে অনিমাদেবী খানিক্ষন চুপ করে বসে রইলেন |

তারপর বললেন , ' এখন ভয় পেলে বা ভেঙে পড়লে চলবেনা | আমাদের শক্ত হতে হবে | আজকেই গিয়ে    স্বনামধন্য তন্ত্রসম্রাট ভোলানাথ ভট্টাচার্য্যের সাথে দেখা করো | ওনার নিশ্চই  কোনো উপায় জানা থাকবে | '

পরাশর বাবু : বাহ্ ! আমার তো মনেই ছিলোনা | আজ বিকেলেই কেওড়াতলা মহাশ্মশানে ওনার পায়ে গিয়ে পড়বো , নিশ্চিত উনি কোনো উপায় বলে দেবেন |

বাণীব্রত এখন অচৈতন্য হয়ে ঘরের মেঝেতে পড়ে  আছে | দুটো হাত রক্তে ভেসে যাচ্ছে | পরাশর বাবু ওনার ফ্যামিলি ফিজিসিয়ানকে কল করলেন | ডাক্তার সেন এসে বাণীব্রতকে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এবং কড়া ডোজের ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে চলে গেলেন | ও যতক্ষণ ঘুমোবে ততক্ষন ভালো থাকবে | উনি ক্লিনিক থেকে একজন নার্সকে পাঠিয়ে ওর স্যালাইনের ব্যবস্থা করে দেবেন |

ঘুমন্ত ছেলের মাথার সামনে বসে অনিমাদেবী আঁচলে বার বার চোখের জল মুছছেন | আর পরাশর বাবু অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন বিকেলের |

তান্ত্রিক ভোলানাথ ভট্টাচার্য পঞ্চমুন্ডীর আসনে বসে ধুনি জ্বালিয়ে আরাধনায় নিমগ্ন | শ্মশানের এক পরিত্যক্ত চামুন্ডা মাতার মন্দিরের সামনে ওনার বসবাস | উনি ছোটবেলা থেকেই শ্মশানবাসী | 

বিকেল পাঁচটা নাগাদ তান্ত্রিক ভোলানাথ ভট্টাচার্যের কাছে পরাশর বাবু সবে পা রেখেছন , তান্ত্রিক ওনাকে দেখে শিউরে উঠলেন | 'সর্বনাশ ! মহা বিপদ ! বাঁচানো খুব মুশকিল ' , বলে তান্ত্রিক যজ্ঞবেদীর ওপরে উঠে দাঁড়িয়ে বিস্ফারিত চোখে পরাশর বাবুর দিকে তাকিয়ে আছেন |

পরাশর বাবু কেঁদে ওনার পায়ে পড়লেন | আপনি বাঁচান | আপনিই পারবেন | দয়া করুন বাবা | আমার ছেলেটা নাহলে মারা পড়বে |

তান্ত্রিক : তোর ছেলেকে যে ধরেছে তাকে আমি আগে একবার বশ করেছিলাম | কিন্তু সে মুক্ত হলো কিভাবে ? এ অতি আশ্চর্যজনক |

পরাশর বাবু : আপনি তো সব জানেন বাবা , আমার ছেলেটাকে বাঁচান |

তান্ত্রিক : আগামী পরশু কৌশিকী অমাবস্যার রাত | ঐদিন আমি যাবো সেই বাড়িতে , যেখান থেকে আমি ওই আত্মাদেরকে আগেও বশ করে তিনহাত মাটির নিচে পুঁতে দেবার ব্যবস্থা করেছিলাম |

পরাশর বাবু : আপনার দয়া অপরিসীম | আমি ওই বাড়িতে গিয়ে সব ব্যবস্থা করে রাখবো | আমাকে বলে দিন কি করতে হবে ?

তান্ত্রিক : তুই কি ব্যবস্থা করবি রে ? তোর ক্ষমতা কতটুকু ? যা , এখন আমাকে বিরক্ত করিসনা | যা করার আমিই করবো | পরশু অমাবস্যার রাত্রে ঠিক বারোটায় আমি গিয়ে হাজির হবো ওই বাড়িতে |

তান্ত্রিকের কথায় আশার আলো দেখতে পেয়ে পরাশর বাবু শ্মশান থেকে বেরিয়ে বাসে ওঠার জন্য হাঁটতে শুরু করলেন |

অদূরেই কাঠের চিতায় একজন যুবতীকে দাহ করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে | পরাশর বাবু হেঁটেই চলেছেন | বাসস্টপ আর আসেনা | এতদূরে তো হবার কথা নয় | আসার সময় খুব বেশি হলে তিন মিনিট হেঁটেছিলেন বাস থেকে নেমে |

উনি প্রায় পনেরো মিনিট ধরে হাঁটছেন | কিন্তু পথ শেষ হবার নাম নেই | সন্ধ্যে পেরিয়ে রাত নেমেছে শ্মশানের বুকে | কুকুরের কান্না আর 'বলো হরি , হরি বোলের' ধ্বনিতে মুখরিত চরাচর |

পরাশর বাবু প্রায় চল্লিশ মিনিট হেঁটেও বাস স্টপ খুঁজে পেলেন না | ঘুরে ফিরে সেই শ্মশানের সামনেই বার বার এসে পড়তে লাগলেন |

ওনার অন্তরাত্মা কেঁপে কেঁপে উঠতে  লাগলো | প্রায় দু - ঘন্টা ধরে হেঁটেও উনি সেই একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছেন | এ এক অজানা মৃত্যুকূপ | এর অন্ত নেই |

শরীরের শেষ শক্তিটাকে সঞ্চয় করে উনি আবার সেই তান্ত্রিকের কাছে গিয়ে পৌঁছলেন |

ওনাকে দেখে তান্ত্রিক বীভৎস ভাবে হেসে উঠলেন , ' কি রে ? বেরোতে দিচ্ছে না তোকে ? ঘুরপাক খাচ্ছিস এতক্ষন ধরে ? এই নে , বলে তান্ত্রিক একটা মৃত মানুষের হাড়ের টুকরো পরাশর বাবুর দিকে ছুঁড়ে দিলেন আর বললেন , যা , এবারে চলে যেতে পারবি , মন্ত্রপূত হাড়ের এই টুকরোটাই তোকে উদ্ধার করে পৌঁছে দেবে গন্ত্যব্যস্তলে |

সত্যিই আশ্চর্যজনকভাবে উনি তিন - চার মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলেন বাস স্টপে | তান্ত্রিকের ওপর বিশ্বাস ওনার আরো বেড়ে গেলো | নিশ্চই উনি আমার ছেলেকে ঠিক করে তুলবেন |
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty

Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
বাড়ি ফিরে পরাশর বাবু অনিমাদেবীকে সব কথা আদ্যোপান্ত ব্যাখ্যা করলেন |

অনিমাদেবী : জয় মা চামুন্ডা , আমাদের পরিবারকে রক্ষা করো মা |

মাঝখানে মাত্র একটা দিন | ছেলেকে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখে এই দিনটা কেটে গেলো |

কৌশিকী অমাবস্যার দিন সন্ধ্যেবেলা পরাশর বাবু প্রিয়ঙ্করদের বাড়িতে গেলেন | প্রিয়ঙ্কর তখন বাড়িতে সম্পূর্ণ একা | পরাশর বাবুকে দেখে প্রিয়ঙ্কর ভেতরে গিয়ে বসার অনুরোধ করলো |

পরাশর বাবু বললেন , ' আমি এখন বসতে আসিনি | আজকে কৌশিকী অমাবস্যার রাত | আজকে রাত্রি ঠিক বারোটার সময় আমি আসবো , আর আসবেন তন্ত্রসিদ্ধ ভোলানাথ ভট্টাচার্য | এই বাড়ির অশরীরীদেরকে বশ করতেই তিনি আসবেন এখানে |

প্রিয়ঙ্করের সাথে কথোপকথনের মাঝখানেই পরাশর বাবু কিরকম একটা অস্বস্তি বোধ করতে লাগলেন | প্রিয়ঙ্করকে দেখে কিরকম যেন অন্য রকম লাগছিলো , যেন কোনো একটা আক্রোশ ফুটে উঠছে প্রিয়ঙ্করের চোখে মুখে |

অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে ওর মুখমন্ডল | ধীরে ধীরে অতি ক্রুর আর শয়তানি হাসি ফুটে উঠলো ওর চোখেমুখে | বদলে যেতে লাগলো ও | এসব দেখে পরাশরবাবুর হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেলো | উনি বুঝে গেলেন যে , এটা প্রিয়ঙ্কর নয় , কোনো এক অশরীরী আত্মা |

পরাশর বাবু ওখান থেকে পালাতে গিয়ে দেখলেন ওনার পা দুটো পাথরের মতো ভারী হয়ে উঠেছে | উনি চেয়েও একচুলও নড়তে পারছেন না |

প্রিয়ঙ্করের মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠলো এক দানবীয় রূপ | বিস্ফারিত মণিবিহীন চোখে ভয়ানক আক্রোশ | পরাশর বাবু ভয়ে কেঁদে ফেললেন ওই বীভৎস চেহারা দেখে |

জ্বলজ্বলে দৃষ্টি নিয়ে ওই পিশাচ এগিয়ে এলো পরাশর বাবুর দিকে | ধারালো নখ বসিয়ে দিলো ওনার বুকের ওপরে | তারপর আচমকা সেই বীভৎস অবয়ব মিলিয়ে গেলো হাওয়ায় |

পরাশর বাবুর বুক দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়ছে | প্রাণের ভয়ে পড়ি কি মরি করে উনি দৌড়ে পালালেন | বাড়ি যেতে অনিমাদেবী ওনার রূপ দেখে ভয় পেয়ে গেলেন | সাদা শার্টের একদিকটা রক্তে ভিজে সপসপ করছে | পরাশর বাবু যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছেন |

ক্ষতস্থানে ওষুধ লাগিয়ে দিতে যাবার জন্য শার্ট খুলতে যেতেই বুকপকেটে শক্ত কিছু হাতে ঠেকলো | পরাশর বাবু দেখলেন সেটা তান্ত্রিকের দেওয়া সেই হাড়ের টুকরো | এখন উনি বুঝতে পারলেন সেই শক্তিশালী আত্মা কেন ওনাকে ছোঁয়ার পর হটাৎ হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো |

তান্ত্রিকের উদ্দেশ্যে উনি করজোড়ে প্রণাম জানালেন |

রাত ঠিক কাঁটায় কাঁটায় বারোটা , প্রিয়ঙ্করদের বাড়ির ডোরবেলটা কয়েকবার বেজে উঠলো | প্রিয়ঙ্করের বাবা প্রীতমবাবু ঘুমজড়ানো চোখে উঠে এসে দরজাটা খুলে তন্ত্রসম্রাটকে দেখে চমকে উঠলেন , ' বাবা , আপনি ? আপনি কেন এখানে ? '

তান্ত্রিক : তুই জানিসনা আমি কেন এসেছি ? আগেরবার ওই মা আর মেয়ের আত্মাকে বন্দি করে তোদের গ্রামের বাড়ির বাগানে বুড়ো অশ্বত্থগাছের তলায় তিন হাত মাটি খুঁড়ে পুঁতে দিয়েছিলাম | ওরা মুক্ত হলো কিভাবে ? '

প্রীতমবাবু : আমি কিছু জানিনা | আমাকে ক্ষমা করুন | দয়া করুন বাবা | ওদেরকে এখানেই থাকতে দিন |

তান্ত্রিক : সব জানিস তুই , শয়তান ! তোর শয়তানি আমি বুঝিনা ভাবছিস ? নিজের ছোটভাইকে বাঁচাতে তুইও ওই নারকীয় হত্যাকান্ডকে লোকচক্ষুর আড়াল করে রেখেছিস | আর তারজন্য ফল ভোগ করছে একটা নিরীহ পরিবার ! তোকে এর উচিত শিক্ষা দেবো | আগে তো ওই দুই আত্মাকে বন্দি করি | আমি এবারে ওদেরকে আমার হেপাজতে রাখবো | এখন বল , কেন এরকম করেছিস ? কেন ওদেরকে বন্দিদশা থেকে আবার মুক্ত করেছিস তুই ? নাহলে তোর রেহাই নেই |

প্রীতমবাবু : আমার কোনো দোষ নেই বাবা | আপনি বিশ্বাস করুন | ওরা রোজ ঘুমের মধ্যে আমাকে দুঃস্বপ দেখাতো , ভয় দেখাতো | আমার বাচ্চার ক্ষতি করার চেষ্টা করতো |

তান্ত্রিক : এখন চল সেই দরজাটা খুলে দে আমাকে | ওদেরকে আমি চিরকালের জন্য বন্দি বানাতে এসেছি আজ |

প্রীতমবাবু তান্ত্রিকের পায়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন , ' এরকম করবেন না , তাহলে আমার পরিবারটা শেষ হয়ে যাবে | '

তান্ত্রিক : তোর একারই পরিবার আছে ? ওই নির্দোষ মানুষগুলো যে শাস্তি পাচ্ছে তারজন্য কোনো হেলদোল নেই তোর ! ভালোয় ভালোয় দরজাটা খুলে দে বলছি | নাহলে আজকেই তোর জীবনের শেষ রাত |

তান্ত্রিকের চোখের অগ্নিদৃষ্টিতে ভয় পেয়ে প্রীতমবাবু কাঁপা কাঁপা হাতে চাবি নিয়ে এসে ওই ঘরের দরজাটা খুলে দিলো |

তান্ত্রিক ভেতরে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন | মন্ত্রপূত ঘটের মুখটা খুলে চারদিকে মন্ত্রপুর জল ছিটিয়ে দিতে লাগলেন | আর আহ্বান করলেন মা চামুন্ডাকে |

কিছুক্ষনের মধ্যেই ঘরের ভেতরে অশরীরীর আর্তচিৎকার শোনা যেতে লাগলো | ঘরের ভেতর ঘূর্ণিঝড় বয়ে চলেছে , সমস্ত আসবাবপত্র এদিক ওদিক ছিটকে যাচ্ছে | করুন কান্নায় মুখরিত হয়ে উঠছে আকাশ বাতাস | কালো রঙের কুন্ডলীপাকানো ধোঁয়ায় সারাঘর ছেয়ে গেছে |

ওদিকে পরাশর বাবুর বাড়িতে বাণীব্রত ঘুম থেকে জেগে উঠেছে | প্রবল অস্বস্তি হচ্ছে শরীরে | ও মাটিতে পড়ে ছটফট করছে , আর ওর সারা শরীর থেকে কালো ধোঁয়ার কুন্ডলি পাকিয়ে পাকিয়ে বাইরে বেরোচ্ছে | সেই কালো ধোঁয়া ঘনীভূত হয়ে জানালার বাইরে বেরিয়ে গেলো | কিছুক্ষন পরে বাণীব্রত জ্ঞান হারালো |

পরাশর বাবু আর অনিমাদেবী বুঝতে পারলেন যে তন্ত্রসম্রাটের তন্ত্রবিদ্যার জাদু শুরু হয়ে গেছে | হয়তো ওই অতৃপ্ত আত্মা বাণীব্রতর শরীর ছেড়ে বেরোতে বাধ্য হয়েছে |

বদ্ধ ঘরের মধ্যে তান্ত্রিকের জোরে জোরে মন্ত্রোচ্চারণ আর আহ্বানে মা এবং মেয়ের অতৃপ্ত আত্মা কেন্দ্রীভূত হলো মন্ত্রপূত ঘটের ওপরে |

তারপর ধীরে ধীরে সব শান্ত হয়ে এলো | ঝোড়ো হাওয়াও উধাও হয়ে গেলো | কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলিটা ঘটের ভেতরে হারিয়ে গেলো | তান্ত্রিক তৎক্ষণাৎ ঘটের মুখটা একটা লাল কাপড় দিয়ে বেঁধে দিলেন | তারপর বেরিয়ে এলেন ঘরের বাইরে |

প্রীতমবাবুকে উদ্দেশ্য করে বললেন , ' তোদের যা যা পাপ সব ওই নির্দোষ পরিবারের কাছে স্বীকার করবি , নাহলে এরপর তোকে আমি নিজের হাতেই শাস্তি দেব | ' তন্ত্রসম্রাট ধীরে এবং দৃঢ় পদক্ষেপে বেরিয়ে গেলেন প্রীতমবাবুর বাড়ি থেকে |
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty

Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো বাণীব্রত | মাথার সামনে বাবা - মা কে দেখে আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠলো | যেন বহুদিন পর ওর বাবা - মায়ের কাছে ফিরে এসেছে |

পরাশর বাবু আর অনিমাদেবী যেন তাদের চেনা বাণীব্রতকে ফিরে পেলেন | তিনজনেই একে - অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করে | এই অশ্রু শুধুমাত্র আনন্দের |

খানিকটা সুস্থ হবার পর পরাশর বাবু আর অনিমাদেবী বাণীব্রতকে জিজ্ঞাসা করেন , ' কি হয়েছিল ওর , যার জন্য ও ওরকম ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিল , কি ঘটেছিলো সেই সন্ধ্যাবেলায় প্রিয়ঙ্করদের বাড়িতে ! '

বাণীব্রতর চোখগুলোয় স্পষ্ট ভয় ফুটে উঠলো | ও বলতে শুরু করলো , ' আমি সেদিন সন্ধ্যাবেলা ক্রিকেট খেলে প্রিয়ঙ্করদের বাড়িতে গেছিলাম | ভাবলাম একটু গল্প গুজব করে রবিবারের সন্ধ্যেবেলাটা কাটাবো | কিন্তু ওখানে গিয়ে দেখি তখন প্রিয়ঙ্করের এক ছাত্র পড়তে এসেছে |

প্রিয়ঙ্কর বললো ওর বেডরুমে আমাকে বিশ্রাম নিতে , ও পড়িয়ে একটু পরেই ওপরে চলে আসবে | জানো বাবা , আমি বিছানায় শুয়েছি , চোখটা লেগে আসছিলো | হটাৎ কেমন একটা পচা গন্ধ এসে লাগলো আমার নাকে | ঝট করে ঘুমটা ভেঙে গেলো |

বিছানার ঠিক পায়ের কাছে দুটো খোলা জানালা | আমি দেখি দুটো জানালায় দুজন দাঁড়িয়ে আছে আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে | কি জ্বলন্ত সেই দৃষ্টি | তাদের মধ্যে একজন বিবাহিতা নারী আর অপরজন একটা দশ - বারো বছরের বাচ্চা মেয়ে |

ওরা আমাকে হাতের ইশারায় ওদের কাছে ডাকছিলো | আমি ওঠার চেষ্টা করলাম , কিন্তু শরীরটা পাথরের চেয়েও বেশি ভারী লাগছিলো আমার | সারা শরীরে তীব্র ব্যাথা আর জ্বালা করছিল | আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করে চারদরটা মাথা পর্যন্ত মুড়ি দিয়ে ঠকঠক করে কাঁপছি |

খানিক্ষন পরে ভাবলাম এবারে উঠে একদৌড়ে ওদের বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাবো | ধীরে ধীরে চাদরটা সরাতেই আমার হার্ট বন্ধ হয়ে যাবার জোগাড় | দেখি , ওরা ঘরের ভেতরে খাটের দুপাশে দুজন দাঁড়িয়ে আছে | চোখ মুখ গলে গলে পড়ছে , আর পচা মাংসের গন্ধে আমার দম যেন বন্ধ হয়ে আসছে |

আমি চেঁচাবার জন্য মুখ খুলেও মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরোলো না | আমি আবার মাথা পর্যন্ত ঢেকে শুয়ে ঠকঠক করে কাঁপছি , গলা শুকিয়ে কাঠ , নাক দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে তখন আমার | চোখ বন্ধ করে কাঁদছি , আর তোমায় ডাকছি বাবা , এসো , আমাকে বাঁচাও |

হটাৎ মুখের ওপর হীমশীতল বাতাসের ঝাপ্টা এসে লাগলো | মাথাঢাকা চাদরের ভেতরেই কোনোমতে চোখ খুলে দেখি ওই বীভৎস দুটো মুখ আমার একদম মুখের ওপরে ঝুঁকে আছে | ক্রুর এবং পাশবিক হাসি ফুটে উঠেছে ওই দুই মুখাবয়বে | এরপর আর আমার কিচ্ছু মনে নেই |

পরাশর বাবু আর অনিমাদেবী ছেলেকে বুকে জড়িয়ে কাঁদতে লাগলেন , ' কত কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে তোকে বাবু , কত ব্যাথা পেয়েছিস | আর কোনো বিপদ হবেনা , আর কেউ কিচ্ছু করতে পারবেনা | তন্ত্রসিদ্ধ ভোলানাথ ভট্টাচার্যকে ওনারা মনে মনে শ্রদ্ধা জানালেন | ছেলেকে ওনারা বললেন কিভাবে তান্ত্রিক ওর শরীর থেকে আত্মাকে মুক্ত করে বন্দি বানিয়েছেন | ওনার জন্যেই বাণীব্রত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পেরেছে |

কিছু সময় পরে ওদের বাড়ির ডোরবেলটা বেজে উঠলো | পরাশর বাবু দরজা খুলে দেখলেন সামনে প্রিয়ঙ্করের বাবা প্রীতমবাবু দাঁড়িয়ে আছেন | ওনার চোখেমুখে অনুতাপ ও ভয়ের স্পষ্ট ছাপ লক্ষ্য করলেন |

পরাশর বাবু : আসুন , ভেতরে আসুন | আমি জানতাম আপনি নিশ্চই আসবেন |

ড্রয়িং রুমে প্রীতমবাবুকে বসিয়ে শক্তিকে বলে দিলেন দু কাপ কফি দিয়ে যেতে |

প্রীতমবাবু : আমি আজকে আপনাদেরকে কিছু বলতে এসেছি | আপনাদের ছেলের এত কষ্টের জন্য আমিও কমবেশি দায়ী | এর পেছনে আছে এক অতি মর্মান্তিক ঘটনা | সব শুনে যদি আপনি আমাকে ক্ষমা করতে পারেন তো ভালো , নাহলে আমি পুলিশের কাছে নিজের সব দোষ স্বীকার করে নেবো |

প্রীতমবাবু বলতে শুরু করলেন , ' আমাদের পরিবারটা খুব সুন্দর , সুখী পরিবারের প্রকৃষ্ট উদাহরণ ছিল | জয়েন্ট ফ্যামিলিতে আমরা দুই ভাই , আমাদের দুজনের বৌ আর বাচ্চাদেরকে নিয়ে খুব সুখে ছিলাম |

ছোটভাইয়ের অর্ডার সাপ্লাই- এর ব্যবসা ছিল | ভাইয়ের বৌ খুব সুন্দরী ছিল | ওদের একটা ফুটফুটে মেয়ে , তখন ও ক্লাস ফাইভে পড়ে |

আমার ভাইয়ের সেই সময় ব্যবসায় মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যায় | লস এতটাই বেশি ছিল যে , ওর ব্যবসাটা প্রায় বন্ধ হয়ে যায় | সারাদিন ও পাগলের মতো এদিক ওদিক ঘুরেও কিছুতেই কিছু উপায় বের করতে পারছিলোনা | দিন দিন ও মানসিক অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়তে লাগলো |

একদিন ওর সাথে দেখা করার জন্য দুজন লোক বাড়িতে আসে | ওরা আমার ভাইয়ের ব্যবসার কাজে ওকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেয় | তখন আমরা বুঝতে পারিনি কি ভয়ানক লালসা রয়েছে এর পেছনে | আমার ছোটভাই যে টাকার জন্য এত নিচে নামতে পারে আমি স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারিনি |

ও ওই দুজন লোককে বাড়িতে ডেকেছিল ওর বৌ আর বাচ্চা মেয়েটাকে দেখানোর জন্য | পাঁচ লক্ষ টাকার পরিবর্তে ওই দুজন নারীমাংসলোভী নরখাদকের হাতে নিজের বৌ আর ফুটফুটে মেয়েটাকে তুলে দিতে ও দ্বিতীয় বার ভাবেনি |

নিরীহ অসহায় বউটাকে ভয় দেখিয়ে , হুমকি দিয়ে , প্রচন্ড মারধোর করে প্রতিদিন রাত্রে তুলে দিতো ওই পিশাচদের হাতে | বাচ্চা মেয়েটার কান্না ভেসে আসতো বন্ধ দরজার ওপার থেকে |

আমি আর আমার স্ত্রী অনেকভাবে বাধা দেবার চেষ্টা করি | কিন্তু ওই লোকগুলো ভীষণ নৃশংস ছিল | ওরা আমাকে বলে রেখেছিলো , যদি আমি নিজের মুখ না বন্ধ করে রাখি , তাহলে আমার ছেলে স্কুল থেকে আর বাড়ি ফিরবেনা | ভয়ে আমি নিজের মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছিলাম | আর তাছাড়া ওরা আমার ভাইয়ের বৌ আর মেয়ের কিছু অশালীন ফটো আর ভিডিও তুলে রেখেছিলো , যাতে কোনোভাবেই ওদের কুকীর্তি ফাঁস করতে মানুষ ভয় পায় |

নিত্যদিন নতুন নতুন লোক এসে ওই দুজন নিরীহ মানুষের ওপর যথেচ্ছ অত্যাচার চালাতো | ছিঁড়েকুটে খেতো ওদেরকে | আমার ভাই তখন টাকার নেশায় পাগল | নিত্যদিনের অত্যাচার বেড়েই চলছিল | তারপর এলো সেই দিনটা |

ঐদিন সন্ধ্যেবেলা তিনজন লোক এসে ভাইয়ের ঘরে ঢুকলো | কিন্তু ওর বৌ আর মেয়ে এভাবে আর অত্যাচার সহ্য করতে রাজি নয় | মেয়েকে আড়াল করে রেখে মা ওই লোকগুলোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালো | আঁশবঁটি হাতে নিয়ে প্রতিরোধ করতে লাগলো ওদেরকে | কিন্তু ও বেচারি একা আর ওরা ছিল তিনজন | শক্তিতে পারবে কিভাবে !

একজন দৌড়ে গিয়ে পেছন থেকে আমার ভাইয়ের বৌকে জাপ্টে ধরলো , আর ওর হাতটা মচকে দিয়ে বঁটিটা হাত থেকে ফেলে দিলো | তারপর বাকি দুজন মিলে ওর চোখের সামনেই বাচ্চা মেয়েটাকে ধরে অকথ্য অত্যাচার চালালো |

সেই রাত্রেই ভাইয়ের বৌ সব যন্ত্রণার হাত থেকে মুক্তি পাবার জন্য মেয়ের গলা টিপে মেরে তারপর নিজেও গলায় দড়ি দেয় ওই ঘরের মধ্যেই |

পুলিশ কেসের ভয়ে আমার ভাই আমার কাছে এসে কান্নাকাটি শুরু করে | আর আমাকে শাসাতেও শুরু করে যে , ' তুই সব অন্যায় এতদিন দেখে সহ্য করেছিস , পুলিশ যদি সেই কথা জানতে পারে , তাহলে তোরও শাস্তি অনিবার্য | ' আমি ভয়ের চোটে ওর প্রস্তাবে সম্মত হই |

ওদের দুজনের শরীরগুলোকে কেরোসিন ঢেলে বেশ খানিকটা পুড়িয়ে দেওয়া হয় |  তারপর আমার ল্যাবরেটরি থেকে ইথার আর ফর্মালডিহাইড নিয়ে গিয়ে ও নিজের বৌ আর মেয়ের মৃত শরীরের ওপরে ভালো করে ঢেলে দেয় | ঐভাবেই বেশ কয়েকদিন ধরে ওষুধ আর সল্যুশন দিয়ে ওদের মৃতদেহ গুলোকে রেখে দেওয়া হয় |

তারপর একদিন সুযোগ বুঝে নিশুতি রাতে আমরা গাড়ি করে ওদের বডিগুলোকে নিয়ে গিয়ে জলা জমিতে পুঁতে রেখে আসি | তার দু - তিন দিনের মধ্যেই আমরা বুঝতে পারি বাড়িতে কিছু একটা অশুভ ঘটতে চলেছে |

প্রতি রাত্রে কান্নার আওয়াজ আর পচা গন্ধে আমাদের তখন পাগল হবার জোগাড় | একদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার ভাইয়ের ঠান্ডা শরীরটা পড়ে আছে উঠোনের ঠিক মাঝখানে | চোখদুটো ভয়ে বিস্ফারিত , মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বেরোচ্ছে |

ডাক্তারকে কল করতে বললো , ম্যাসিভ হার্ট এটাক হয়ে রাত দুটো নাগাদ মারা গিয়ে থাকবে | আমার বুঝতে বাকি রইলোনা যে কিজন্য ভয়ে ওর হার্ট এটাক করেছে |

আমি তখনি তন্ত্রসিদ্ধ ভোলানাথ ভট্টাচার্যকে আমার বাড়িতে আহ্বান জানাই | সব কথা শুনে উনি আমার কাপুরুষতার জন্য প্রচন্ড রেগে ওঠেন | তবুও আমি ওনার হাতে পায়ে ধরে আমার পরিবারকে বাঁচাতে ওই দুজনের আত্মাকে বন্দি বানানোর অনুরোধ করলাম |

উনি দয়াপরবশতঃ আমার কথায় রাজি হলেন এবং মা ও মেয়ের আত্মাকে পিতলের ঘটে বন্দি করে আমাদের গ্রামের বাড়ির এক বিশাল অশ্বত্থ গাছের নিচে তিন হাত মাটি খুঁড়ে পুঁতে দেবার ব্যবস্থা করেন |

কিন্তু তার পর থেকে রোজ রাত্রে আমি দুঃস্বপ্ন দেখতাম | রোজ আমাকে ওদের অতৃপ্ত আত্মা ভয় দেখাতো , যদি ওদেরকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত না করি তাহলে আমার পুরো পরিবারকে শেষ করে দেবে ওরা |

আমি বাধ্য হই ওদেরকে তান্ত্রিকের দেওয়া বন্দিদশার হাত থেকে মুক্ত করতে | ওরা কোনোদিন আমার পরিবারের কোনো ক্ষতি করেনি |

কিন্তু বহিরাগত কোনো পুরুষমানুষ দেখলে ওদের ভেতরের জিঘাংসা ফুটে ওঠে | আর তার ফলেই আপনার ছেলেকে এতো কষ্ট পেতে হলো |

আমাকে আমার অপারগতার জন্য ক্ষমা করে দিন | আপনি ক্ষমা না করলে আমি নিজেকে পুলিশের হাতে তুলে দেবো |

পরাশর বাবু : আচ্ছা , আপনাদের বাড়ি থেকে যে হটাৎ আপনার ভাইয়ের বৌ আর মেয়ে উধাও হয়ে গেলো , তারজন্য প্রতিবেশী বা ভাইয়ের শশুরবাড়ি থেকে কেউ কোনো খোঁজ করেনি ?

প্রীতমবাবু : আমার ভাইয়ের বৌ অনাথা , অসহায় মহিলা ছিলেন , তাই ওর বাপেরবাড়ি বলে কিছুই ছিলোনা | সেই জন্যেই হয়তো আমার ভাই এতটা নির্ভয়ে এইসব পাপ কাজ করতে পেরেছে |

প্রতিবেশীরা প্রথম প্রথম খোঁজ খবর নিতো , আমরা বলেছি ব্যবসা সংক্রান্ত কাজে ওদেরকে আমার ভাই বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে | কিছুদিন পর থেকে সকলের স্মৃতি থেকে ধীরে ধীরে ওরা হারিয়ে গেলো |

পরাশর বাবু : আপনাকে আমি ক্ষমা করতে পারি , কিন্তু আপনি কি নিজেকে নিজে ক্ষমা করতে পারবেন ? সারাজীবন দগ্ধে দগ্ধে মরবেন , কারণ আমরা সবাই জানি কবিগুরুর লেখা সেই প্রবাদবাক্যটি কত সত্যি , অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে তবে ঘৃণা তারে যেস তৃণসম দহে | আপনি এখন আসতে পারেন |

প্রীতমবাবু আজ সত্যিই খুব অনুতপ্ত | পরাশরবাবুর ক্ষমা করাটা ওনার অন্তরাত্মাকে পাপের গ্লানিতে আরো কলঙ্কিত করে তুললো | 
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty

.............. সমাপ্ত ..............







শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...