রবিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২০

অনু গল্পঃ"পুনরাবৃত্তি" #কলমে~পল্লবী





দুপুর গড়িয়ে ক্রমশঃ বিকেলের দিকে এগুচ্ছে। ছেলেটি ধীরে ধীরে এগিয়ে শহরের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা বড়ো সবুজ উদ্যানটির ভিতরে ঢুকে একপাশে রাখা বেঞ্চে বসে পড়ে ক্লান্ত শরীরকে মেলে দিয়ে। সকাল থেকেই মাথাটা প্রচন্ডভাবে ধরে আছে। কপালের দুপাশের রগ এমন ভাবে লাফাচ্ছে, যেনো জালে সদ্যতোলা মাছ মুক্তির জন্য ছটফট করছে। জাল ই বটে! সেতো নিজেই ওই 'ভালবাসা' নামক জালের পাতা ফাঁদে পা দিয়েছিল! আর সবকিছু জেনে শুনে যে ফাঁদটি পেতে ছিলো, সে কেনো তবে আজ মুক্তি চায়? সেতো জানতো, ওর এই সংগ্রামী জীবনের কথা, বেকারত্বের কথা, বাড়িতে দু -দুটো আইবুড়ো বোন থাকার কথা! সর্বোপরি ওর আর্থিক অসচ্ছলতার কথা, নিম্নবিত্ত পরিবারের কথা, যেখানে তৃতীয় শ্রেণির চাকুরীরত বাবার সামান্য আয়ে পাঁচজনের পরিবারটা ধুঁকে ধুঁকে কোন রকমে চলে!

ভাবতে ভাবতে সে তিন -চার কদম এগিয়ে সামনে একটি শতবর্ষী গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া টং এর পাশে দাঁড়িয়ে চায়ের অর্ডার করে। ওপাশ থেকে চা বানাতে বানাতে শ্যামলা বর্ণের কিশোর একটি মুখ এদিক - ওদিক চেয়ে কোমল কণ্ঠে বলে ওঠে, "আফার আজ এতো দেরী ক্যান ভাই? আবারো কি কাজিয়া করছেন নি"?? বলতে বলতে কিশোর মুখটি বিপরীত দিকের একজোড়া রক্তবর্ণ চোখের দিকে তাকিয়ে থেমে যায় নিমেষেই।

ছয় বছর আগে এক বন্ধুর অনুরোধে টিউশন পড়াতে গিয়ে ওর সাথে প্রথম পরিচয়। তারপর ধীরে ধীরে সেই পরিচয় যে কখন প্রণয়ে পরিণত হয়েছে, কখন যে ওর গুটিয়ে রাখা আঙ্গুল, সে তার হাতের তালুতে জড়িয়ে নিয়েছে বুঝতেই পারেনি। যখন বুঝলো, পিছু হটার সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে গেছে। 'ভালবাসা' নামক 'হলুদ'ব্যাধিতে সমস্ত দেহ, মন তার আক্রান্ত! দীর্ঘ এই সম্পর্কের আজ একটা চুড়ান্ত পরিণতি হয়েই যাবে! কয়েক মাস ধরেই বন্ধুরা কানাঘুষো করে বেরাচ্ছিল, ওর সাথে অন্য এক ছেলেকে নিয়ে। প্রায়ই নাকি দুজনকে দেখা যাচ্ছে একসাথে।

চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে বিলটা মেটায়। রশিতে ঝুলানো সস্তা দামী নিকোটিনের প্যাকেট থেকে সরু জিনিসটা বের করে দু ঠোঁটের ফাঁকে রেখে জ্বালিয়ে একটা চরম সুখটান দেয়। আহ্,, বুকের ভিতরটা যেনো জ্বলে,পুড়ে ছাই হয়ে গেলো! হ্যাঁ...সেতো আজ কয়েক মাস ধরে ছাই ই হচ্ছে প্রতিনিয়ত! সোশ্যাল সব সাইটে একের পর এক ব্লক দিলো। জিজ্ঞেস করতেই উত্তর এলো," পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটছে, তাই ডিএক্টিভেট করে রেখেছে! কল দিলে পিক করেনা। কারণ, তাও পড়াশোনা! মোবাইল সাইলেন্ট মোডে থাকে আজকাল! ছেলেটি মনে মনে হাসে আর ভাবে," আজকের এই লেখাপড়ায় ভীষণ মনোযোগী মেয়েটিই কোন এক পূর্ণিমা রাতে এক কাপড়ে ওর হাত ধরে গৃহত্যাগ করতে চেয়েছিলো, ভালবাসার সুখের নীড় বাঁধবে বলে"! হায় প্রেম! অবেলার ভাংচুরের প্রেম!?!

"এ হাওয়ায় কান পেতে শোন
তোকে মনে পড়ছে ভীষণ"!

উদাস নয়নে উদ্যানের প্রবেশ পথের দিকে তাকিয়ে আবারো আস্তে আস্তে সেই বেঞ্চে এসে বসে।চেয়ে থাকে যতদূর দৃষ্টি যায়! যদি ক্ষনিকের তরে হলেও তার দেখা পায়?! অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকা ছেলেটা খেয়ালই করেনা যে, কখন বৈকালিক ভ্রমণে আগতদের কোলাহলে মুখরিত হয়ে উঠেছে চারিদিক!হঠাৎ পাশে ধপাস করে কারো বসার শব্দে তাকিয়ে দেখে,অনিন্দ্যসুন্দরী এক তরুণী হাঁপাতে হাঁপাতে কানের দুপাশ থেকে হেডফোন সরাচ্ছে। পরনের ট্র্যাকস্যুট ঘামে ভিজে জবজবে অবস্থা!

ছেলেটির দিকে তাকিয়ে মিষ্টি কণ্ঠে বলে ওঠে, "আজ কি গরম তাই না"! "ভাদ্র মাস.."! পাশ থেকে নির্লিপ্ত উত্তর আসে। মেয়েটি অবাক হয়ে কতক্ষন তাকিয়ে থেকে বলে ওঠে," আচ্ছা বলতে চাচ্ছেন ভাদ্রমাস, তাই গরম বেশী পড়ছে?! তাইতো", বলে খিলখিলিয়ে হাসতে থাকে। মেয়েটির ঐ রিনরিনে স্বচ্ছ হাসি আর কাজল কালো চোখের পানে চেয়ে ছেলেটি মনে মনে আওড়াতে থাকে কবি সাদাত হোসাইনের কবিতার দু লাইন...
 

"অমন কাজল চোখে তুমি চেয়ো রোজ,
ঐ চোখে জীবনের হিসেব সহজ"।
 

(সমাপ্ত)।।
Copyright©️ All rights reserved
 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার: কবি সাদাত হোসাইন🙏🙏

 

৮টি মন্তব্য:

  1. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন
  2. খুব সুন্দর গল্প। পড়ে অভিভূত হলাম😍

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...