শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২০

প্রেতপুরী পর্ব - ৩ (পিয়ালী চক্রবর্তী)

 



Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
বিকাশ নিজের রুমে ফিরে প্রশান্ত স্যারকে রজনীশের সাথে হওয়া সব ঘটনা বর্ণনা করলো ( কিন্তু নিজের সাথে ঘটে যাওয়া গতরাতের ঘটনার কথা লুকিয়ে রাখলো ) |

সব কথা শুনে উনি বিকাশের ওপরে ব্যাঙ্গাত্মক হাসি হাসতে শুরু করলেন , ' ও নাহয় মূর্খ মানুষ , গাঁজা টেনে হয়তো কল্পনা করেছে এসব , কিন্তু তুমি তো সম্পূর্ণ সজ্ঞানে , তুমি এসব বুলশিট কিকরে বিশ্বাস করলে ! সাইন্স- এর স্টুডেন্ট হয়ে এসব ভুতুড়ে গল্প শুনে ওর হয়ে আমার কাছে সুপারিশ করতে এসেছো ? একটা রাঁধুনি ! সে অফিসারদের ঘরে থাকার প্রশ্নই বা ওঠে কি করে ? '

বিকাশ : স্যার , আমি ওর চোখেমুখে ভয় আর দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট দেখেছি | সেটা কখনোই মিথ্যে হতে পারেনা |

প্রশান্ত স্যার : তোমার এতো দরদ যখন , তুমিও গিয়ে নিচে ওর কাছে ঘুমোতে পারো | আমাকে এসব বলে কোনো লাভ হবেনা |

বিকাশের খুব খারাপ লাগলো , ' কথাগুলো স্যার খুব নির্দয়ভাবে বলে দিলেন | যদি সত্যিই নিচের ঘরে থাকার ব্যবস্থা থাকতো , আমি নিশ্চই চলে যেতাম | '

রজনীশের জন্য কিছু করতে না পেরে ওর খুব খারাপ লাগছে | বেচারা সত্যিই খুব ভয়ে আছে | কিছুক্ষনের মধ্যেই রাত্রের খাবার খেয়ে সবাই ঘুমিয়ে পড়লো | বিকাশের চোখে ঘুম নেই | কে জানে বেচারা রজনীশ নিচে একা একা কি করছে !

ওদিকে সবাইকার খাওয়া - দাওয়ার পাঠ শেষ হলে রজনীশ ভয়ে ভয়ে রান্নাঘরের সিঙ্কে বাসন ধুচ্ছিলো | এমন সময় দমকা হাওয়ায় রান্নাঘরের জানালার পাল্লাদুটো খুলে গেলো |

গতরাতের মতো আজকেও দুটো চোখ ওর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে , মরা মানুষের মতো ঘোলাটে দৃষ্টি নিয়ে | মোহগ্রস্তের মতো রজনীশও ওই চোখদুটোর দিক থেকে দৃষ্টি সরাতে পারছেনা |

এমন সময় ওর পিঠের ওপর কারুর শীতল হাতের স্পর্শ অনুভব করে ও চমকে চিৎকার করতে গেলো | কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোচ্ছে না | কেবল একটা চাপা গোঙানির মতো আওয়াজ বেরিয়ে আসছে |

পিঠের ওপর শীতল স্পর্শ তখনো একইরকম অনুভূত হচ্ছে ওর | হটাৎ কেউ যেন ওকে সজোরে ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে দিলো | তারপরই ওর বুকের ওপর প্রবল চাপ অনুভূত হতে লাগলো |

কোনো এক অদৃশ্য শক্তি ওর শরীর আর মনের ওপরে ধীরে ধীরে কব্জা করে নিচ্ছে | প্রবল আক্রোশে কোনো নারীশরীর যখন কোনো পুরুষের সঙ্গম কামনা করেও ব্যর্থ হয়ে হিংস্র হয়ে ওঠে , ওর দেহেও সেরকম হিংস্রতার ছাপ ফুটে উঠতে লাগলো | সারা মুখে , বুকে , গলায় নখ বসিয়ে কেউ যেন ওকে রক্তাক্ত করে দিচ্ছে | ওর সারাশরীরে প্রচন্ড ব্যাথা , জ্বালা অনুভব হচ্ছে | ছটফট করছে ও , শূন্যে দুহাত নাড়িয়ে সেই অপ্রতিরোধ্য অদৃশ্য শক্তির মোকাবিলা করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছে |  

কানে কানে কেউ ফিসফিস করে যেন বলছে , আজকেই তোর শেষ রাত , আজকের পর তুইও আমার মতো মুক্ত হয়ে যাবি | নারীকন্ঠের পৈশাচিক উল্লাস চলছে ওর কানের কাছে | বুকের ওপরে পাথরের মতো ভারটা যেন আরো বেড়ে চলেছে | শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে ওর |

মনে মনে ওর অসুস্থ মায়ের কথা ভেবে চোখের কোণ  দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো , ' আমি না থাকলে তোমায় কে দেখবে মা ! কিন্তু আজকেই আমার শেষ রাত , এসেছে ভয়ানক মৃত্যুদূত , সাথে করে নিয়ে যাচ্ছে আমায় | তোমার কোল খালি করে চলে যেতে হচ্ছে মা , আমাকে ক্ষমা কোরো | ' মৃত্যুর আগে মনে মনে এই কথাগুলো বলে রজনীশ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো |

ওদিকে বিকাশ ঘরে বসে দুশ্চিন্তায় নিমগ্ন | হটাৎ দেখে , বারান্দার দরজার ঘষা কাছের ওপারে কেউ যেন অতি কষ্টে হেটে চলে যাচ্ছে | খটখট করে ক্র্যাচেস নিয়ে হাঁটার মতো শব্দ আর একটা ছায়ামূর্তি একবার এদিক থেকে ওদিকে , আবার ওদিক থেকে এদিকে পায়চারি করছে |

বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে ও একটানে বারান্দার দরজা খুলে ফেললো , ' কই ! কেউ তো নেই এখানে ! কিন্তু আমি যে স্পষ্ট দেখলাম | '

বাইরে দিগন্তবিস্তৃত সমুদ্র যেন ওকে গিলে খেতে আসছে | ভয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ও লাফিয়ে এসে নিজের খাটের ওপর পড়ে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলো | এই বাড়িতে নিশ্চই কিছু আছে | এই বাড়ি অভিশপ্ত | এখানে থাকা উচিত হবেনা |

এসব মনে মনে ভাবতে ভাবতে হটাৎ ওর ফোনটা বেজে উঠলো | রাত তো প্রায় এগারোটা বাজতে যায় | এখন বাড়ি থেকে ফোন আসছে দেখে ও চিন্তায় পড়ে গেলো | ফোনটা ধরে হ্যালো বলতেই ওদের কুলগুরু চতুর্বেদীজীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো |

চতুর্বেদীজী : বিকাশ ! তুই যদি পারিস তো আজকেই ওই বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যা | বাকি যারা আছে তাদেরকেও চলে যেতে বল |

বিকাশ কেঁদে ফেললো গুরুজীর কথা শুনে , ' গুরুজী , আপনি কিভাবে জানলেন যে আমি প্রচন্ড ভয়ে আছি ? '

গুরুজী : আমি ধ্যানে বসেছিলাম , হটাৎ দেখি , তোর সাংঘাতিক বিপদ | সঙ্গে সঙ্গে আমি তোর বাড়ি চলে এসেছি , তোর মা - বাবাকে সব কথা জানিয়েছি , ওনারাই তোর সাথে কথা বলার জন্য অনুরোধ করলেন | তুই এমন একটা বাড়িতে গিয়ে পড়েছিস যে বাড়িটা এক অতি মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে | তুই পারলে এখনই বেরিয়ে যা , এতো কথা বলার সময় নেই | প্রাণ বাঁচা , বেরো আগে ওই বাড়ি থেকে |

বিকাশ ঠিক করলো আর নয় , গুরুজী সুদূর এলাহাবাদে বসে আমার বিপদের আভাস পেয়েছেন , আর কোনো সন্দেহই রইলোনা যে এটা একটা ভুতুড়ে বাড়ি | কাউকে কিছু না বলে বিকাশ তাড়াতাড়ি করে আলমারি থেকে নিজের ট্রলি লাগেজটা বের করে নিলো |
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty

চলবে ..............


২টি মন্তব্য:

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...