#বিষয় :- অনুগল্প
#নাম :- 'ব্যালান্স'
অনুরিমা,ঋতিকা দুই বন্ধু। দেখতে শুনতে অতীব সুন্দরী বললে যা বোঝায় তাই। পড়াশোনায় ক্লাসে প্রথম ও দ্বিতীয় পালা করে তাদের হওয়া চাই। এখন তারা নবম শ্রেণীর ছাত্রী।
তাদের একদিন ভাষার ক্লাস নিচ্ছেন গৌরহরি গড়াই। বলেলেন ভাষা বামাবেশী। মাথার বাম দিকের স্নায়ুমন্ডলই ভাষা জ্ঞান গড়ে তোলে। এ থেকেই মানুষ বুদ্ধিমান বলে প্রমাণিত হয়। ভাষাসূত্রে তাই মানুষ বামাবেশী।
স্নায়ুতন্ত্রের চ্যাপ্টার একদিন পড়াচ্ছেন অনুকূল বক্সি! মানব শরীরে স্নায়ুতন্ত্র নিয়ে একটা লম্বাচওড়া লেকচার দিয়ে দিলেন। বাম পাশে হৃদপিন্ড আমাদের জীবন ধারণ করার প্রধান কারিগর বললেন। ইনিও বামাবেশী তাদের মতে। শরীরের বামদিকের প্রাধান্য দুই স্যার বললেন বলে তারা নাম দিয়েছে বামদেব স্যার।
অঙ্কের স্যার রামতনু বড়ুয়া বললেন অঙ্কে সেই ভালো যার মাথার ডানদিকের স্নায়ুতন্ত্র খুব শক্তিশালী হয়। সেই কেবল বামদিককে বলে এসো এদিকে। মেলাতে চায়। হয় তার পথে এসো,নাহয় অঙ্ক শেখা যাবে না। তাই নিয়ে ডানপক্ষ ও বামপক্ষের ব্যালেন্স। যার যত এই ব্যালেন্সে বনিবনা হয় না সে তত অঙ্কে কাঁচা।
আর সোস্যাল সায়েন্সের স্যার অমিতাভ খাস্তগীর বলেন ডান ও বাম থেকে এসেছে ডানপক্ষ ও বামপক্ষ। তাই রাজনীতির দুটি ধারা। বামপক্ষ ও ডানপক্ষের স্বরূপ যে বুঝতে পারবে সেই রাজনীতিটা বুঝতে পারবে।
এইসব শুনে একদিন
পাড়ার নকুল দিন্ডাকে নিয়ে ভাবতে বসল অনুরিমা ও ঋতিকা।
নকুলের রেশন দোকান। নোকলা বলে তাচ্ছিল্য সুরে লোকে ডাকে। সে ছেলে থেকে বুড়ো পর্যন্ত সবাই। লোক হিসেবে একটুও ভাল নয়। নকুল ভাবে ভালো হলে অসুবিধা আছে। করে কম্মে খাওয়ার অসুবিধা। তাই ভালো সাজতে গেলে কিছুই মিলবে না।
এলাকার অভিযোগ নোকলা হিসাবের এধার ওধার করে মাল সরায়। গ্রামের চাষাভুষার দল। পয়সার অভাব প্রতিপদে। সময়ে রেশন ধরার যার যেদিন পালা সে না ধরতে পারলে তার মাল নকুল গ্যাড়ায়। তাই নিয়ে এলাকার অভিযোগ। তারই অভিযোগের ভিত্তিতে একদিন থানা-পুলিশ হলো। রেড হলো। নকুল গ্রেফতার হলো। রাজনৈতিক নেতাদের ধরে জামিন পেল।
এই যে ঘটনা তা থেকে ওরা বুঝল- নকুলের হৃদয় বলে কিছু ছিল না। তাই হিসেবের গরমিলে মিল দেখিয়ে চাল-ডাল-গম সরাত।
এতো দিন কি করে এসব করতো? করতো কথার চটকদারিত্বে। কথার মারপ্যাঁচে তাকে কেউ ঘায়েল করতে পারত না। আর ভাষা ও হিসেবের অঙ্ক দিয়ে ডানপক্ষ ও বামপক্ষ মতের মিলিজুলি করত। আর তাই তার জীবনের উষ্ণতা। তাই নিয়ে জীবন উপভোগ করে বেদম। চালাকি দিয়ে মহৎ কাজের ফিরিস্তি দেয়। তা ঢাকতে সে ছিল পশুপ্রেমী। পশুদের উপর কেউ অত্যাচার করলে নকুলের সহ্য হতো না। প্রমাণ করতো সে বিরাট হৃদয়বাণ।
নকুল ঐ তো এইট পাশ। স্কুলের দাওয়ায় প্রায়ই কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকত। শেষে তার বাবা বিলকুল মিদ্যা হতাশ হয়ে কোনো মতে এইট পাশ করিয়ে রেশন দোকানে বসিয়ে দিলেন। সেই থেকে তার গতি একটা ডান-বামের রহস্যে মোড়ক হয়ে উঠল।
সে অনায়াসে রপ্ত করে ফেলল জীবন মানেই ব্যালেন্স। ব্যালেন্স জ্ঞান যার যত সে তত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মানসিকতার হবে। কোথা থেকে এই দর্শন লাভ করেছিল সে নিজেও জানে না। তা থেকেই সে ভাবতো নিজেই বড় হলেই হল।
এই নকুল দিন্ডার জীবন ঋতিকা ও অনুরিমার পড়াশোনার প্রধান ভিত্তি হল। সবেতেই নকুল দিন্ডাকে দেখতে লাগল। পড়াও এক ব্যালান্সের খেলা।
এই পর্যন্ত সব ঠিক ছিল। কিন্তু তাদের মধ্যে বয়স একটা পরিবর্তন আনছে যে ক্রমে বুঝতে পারল। হৃদয়ে রোমান্স অনুরিমার মাঝে আনন্দের খুব বান ডাকত। আর ঋতিকার মধ্যে অঙ্কের প্রতি এমন টান এলো দেখল রোমান্স ও বাস্তবের কোথাও না কোথাও বিরোধ আছে। মেয়ে বলে নিজেকে আরো বেশি করে চিনতে পারল। বাস্তবের কষ্টিপাথরে নিজেকে ফেলে পরখ করল। দেখল অনুর সঙ্গে অনেক পার্থক্য তার। এখন কোথায় একটা যেন দূরত্ব মেপে আসছে।
এই পরিবর্তন এলো নকুলকে দেখে শেখা যেদিন বন্ধ হলো। কেমন করে?
এই ডান বামের খেলায় ঠাঢয় এসে দাঁড়াল অনুরিমার ভাষা ও ঋতিকার অঙ্ক। একদিন দু'জনে মান অভিমান থেকে ঝগড়া - কথা বলা বন্ধ। ঋতিকা বাস্তববাদী। অরুণিমা আবেগ প্রবণ। বয়ঃসন্ধি থেকে হৃদয়ের চাহিদায় তারা একদিন যত একাকার ছিল, একদিন হয়ে গেল চরম প্রতিপক্ষ। তারা বুঝতেও পারল না কখন তাদের পথ আলাদা হয়ে গেছে। নিজেদের নিয়ে এখন ব্যস্ত থাকে। একটা অজান্তে প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে যায়।
বাম ও ডানের টানাপোড়েনের কষ্টিপাথর দিয়ে অণুরিমা ও ঋতিকাকে বিচার করলে সারা দুনিয়ার মানব জাতিকে খুঁজে পাবে।
ব্যালান্সই সব।
# কলমে ~ মৃদুল কুমার দাস।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন