সোমবার, ১৬ নভেম্বর, ২০২০

#বিষয় - অনুগল্প

 #বিষয়- 'অনুগল্প'

#নাম'- 'ফে-রি-ও-য়া-লা'


    নাফিসা বিবি রোজ দুটো ভাতে ভাত ফুটিয়ে দেয় নাজির হোসেনের জন্য। সেই ভোরে বেরিয়ে যায়। ফিরে আসে গোধূলি যখন দ্বারে কড়া নাড়ে। 

 হোসেনের আবার ফেন ভাত খুব পছন্দের। মা আমিনা এতোদিন করে এসেছে তার আদরের হোসুর জন্য। গত বছর মা গত হয়েছে,আর বাবা নাজির আলি সেই কবে আমিনার কোলে ছ'মাসের শিশু হোসেনকে দিয়ে ছুটি নিয়ে চলে গেল ঐ তারাদের সাথে থাকতে। পারিবারিক ফেরিওয়ালার ব্যবসা তাদের। সেই বাপ ঠাকুর্দার আমল থেকে। নাজির কিন্তু মনে মনে ঠিক করে রাখে তার হসুকে পড়াশোনা করিয়ে ডাক্তার করবে। এই স্বপ্ন দেখাই যেন কাল হলো। ফেরিওয়ালার বংশে এরকম স্বপ্ন বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না তো,এও মনে মনে ভাবে নাজির। মনে মনে বলে - "বাপু তোদের বংশ ফেরিওয়ালার। বেশি ভাবলে অমঙ্গল হবে। এ যুগে বাপ ঠাকুর্দার পেশা ছেড়ে অন্য পথে পেশা বদল করে উন্নতি তো হয় না,উল্টে হাল হারা নাবিক হতে হয়।"

    আদরের হসুর বড় হয়ে প্রশ্নের জবাবে আমিনা তারাদের দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, আর হোসুকে বাপের চলে যাওয়ার জন্য এই স্বপ্নকে দায়ী করে। আর বলে -

"তুই কোনদিন এমন স্বপ্ন দেখিস না বাবা। এ আমাদের বংশের অভিশাপ।" 

  মা আমিনার কাছে হোসেন তার আব্বাজানের শেষ দিনের গল্প শোনে এভাবে, সেদিন বেগুন ভাতে দিয়ে ভাত খেল। রান্নার সময় হোসু বাপের কোলে একটু উঠোনে আদর খেতে খেতে ঘোরে। ও আমিনা ভাতে ভাত রান্না চড়ায়। রান্না হয়ে গেলে আমিনা আসন পেতে খেতে দেয়।

 দুধের শিশু  মায়ের স্তনের একটায় মুখ আরেকটা কচি কচি হাতে স্তনের বোঁটায় হাত দিয়ে ধরা - সেই মুহহূর্তের আমিনা ছেলের জগতে হারিয়ে যায়। বাপ, বেটার খাওয়া সে যে জন্ম জন্মান্তরের সুখ অনুভব করে। সেদিন আর ফেরেনি নাজির। জলজ্যান্ত মানুষটা কোথায় উধাও হয়ে গেল। অনেক খুঁজে শেষে হাল ছেড়ে দিয়েছে।

    এই গল্প হোসেন নাফিসাকে নতুন বৌয়ের কাছে এই তার গল্পের কথা বেশ রসিয়ে বলে। নাফিসাও যেন পারিবারিক এই নিয়মরীতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে সংসার পথে বা বাড়ায়। 

 আমিনা ডেঙু জ্বরে আর বাঁচল না। শয্যা থেকে তুলে কবরে শুইয়ে দিয়ে এলো হোসেন। আর ক'টা দিন শোকে একদম বাকহারা অবস্থায় কাটতে থাকে। ফেরি করতে বেরোয় না। ঘরে চুপচাপ বসে থাকে। নিঃসন্তান তারা। আমিনার মতো গুছিয়ে সংসার করার সাধ পূরণ হয় না,একটা সন্তানের অভাবে। নাফিসাকে তালাক দেওয়ার কথা হোসেন মনেও ভাবে না। আজ না হয় কাল কোল জুড়ে তাদের বংশধর আসবে। কিন্তু হঠাৎ এভাবে আমিনার চলে যাওয়া হোসেনের জীবনে ঝড় উঠল।

 ঘরে বসে বসে শহরের অলিগলির কথা খুব মনে হয় যখন নিঃস্তব্ধ দুপুর নামে যখন। সেই দুপুরে ফেরিওয়ালার স্বপ্ন পূরণ হয় বেশি - বিক্রিবাটা হয় বেশি। কেননা দুপুরের কাজ মিটিয়ে মা বৌয়েরা সাজের জিনিস কেনে, ঘরের দাওয়ায় বসিয়ে। জিনিস বিক্রির পর ট্যাঁকে পয়সা গুঁজে খর রোদে,পা পুড়ে যাওয়া পথে আবার হাঁক চু-উ-উ-ড়ি.... এই চুড়ি যখন বলে দুপুর রোদের ঘরের বন্ধ জানালা হুটহাট খুলে যায়। এর ডাক,ওর ডাক... কাকে যে সামলায় মুশকিল! সারাদিনের জিনিস ঐ নিঃস্তব্ধ দুপুরে অর্ধেক বিক্রি হয়ে যায়। গিন্নিদের চারধারে ছোট ছোট খুকিদের কৌতূহল ভরা চোখ হোসেনের দুপুর রোদের মাথায় আস্ত টাঁক জুড়িয়ে যায়। 

  প্রতি ভাতৃদ্বিতীয়া অন্নপূর্ণা গিন্নি মা বাড়ীর অনুষ্ঠানে হোসেনকে বসিয়ে পেটপুরে খাওয়ায়। ফোঁটা দেয়। ও কয়েক বছর চলছে। এই দিনটার জন্য হোসেনও খুব মুখিয়ে থাকে। 

এবারেও অন্নপূর্ণা সারাদিন অপেক্ষায় থাকে, হোসেনের জন্য খাবার তুলে রাখে। কিন্তু হোসেন আর আসে না। ক'দিন আসেওনি,যে মনে করিয়ে দেবে। হোসেনের আর দেখা নেই বলে অন্নপূর্ণা গিন্নি মা সাত পাঁচ ভাবতে থাকেন। শরীর খারাপ নয় তো! 

 এদিকে হোসেন মনমরা থাকে। নিস্তব্ধ দুপুর এলেই মনটা খুব উতলা হয়। হঠাৎ আজকের দিনটা এই নিঃস্তব্ধ দুপুরে মনে হতেই মন হু হু করে ওঠে। সাইকেলটা উঠোনে বের করে। সাইকেলের চাকায় পাম্প নেই। না থাকারই তো কথা। হোসেনের মনের জঙে,সাইকেলেও জঙ্ পড়েছে। পাম্প ফুরিয়েছে। গিন্নি মার কাছে পৌছতেও সময় লাগবে। সে লাগুক দৌড় দিল। নাফিসা ঘোর ভাঙার আগেই হোসেন চোখের নিমেষে হাওয়া। সেই দৌড়ই তার নিয়মিত গেল আবার। শোকের সাজ ফেলে হোসেন এখন পাক্কা নিঃস্তব্ধ দুপুরের ফে-রি-ও-য়া-লা। আজ সেই দিন হোসেন আজ বেশ সাজুগুজু করেছে। ফোঁটা নেবে। দুপুরবেলা নেবে।

  

 #কলমে ~ *মৃদুল কুমার দাস।*

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...