# বিষয় - ছোটোগল্প
#কলমে - মৃদুল কুমার দাস।
(১)
ক'দিন ধরে চোখের সামনে বিজ্ঞাপন খুব ছক্কা হাঁকিয়ে যাচ্ছে। ঝা চকচকে বিজ্ঞাপন। দুপুরে বিশ্রাম নেওয়ার সময় বিজ্ঞাপনে নজর পড়ে। অফিস থেকে ফিরে চা জলখাবার দিতে দিতে বিরতি বলে - "কি গো, ফ্ল্যাট নেওয়ার ব্যাপারে কিছু ভাবলে?"
চায়ে চুমুক দিতে দিতে টিভি-তে কড়া নজর। কেন্দ্রীয় বাজেট নিয়ে সারাদিন অফিসে সরগরম ছিল। বিজিত কাজের চাপে মাথা তুলতে পারেনি। ফলে আলোচনায় মজা পাওয়ার খুব একটা সুযোগ হয়নি। তাই বাড়িতে সোফায় বসে চায়ে চুমুক দিতে দিতে এক দৃষ্টিতে বাজেটে নজর। বিশেষ করে স্যান্ডার্ড ডিকাশন কত হল? ট্যাক্সের স্ল্যাব কী হবে? তাই নিয়ে একেবারে বুঁদ। ট্যাক্স কতটা পড়বে?
বিরতির কথা কানে যাচ্ছে, কিন্তু নো রেসপন্স দেখে বিরতির মেজাজ গেল বিগড়ে। রিমোর্ট নিয়ে টিভি ঝপ করে বন্ধ করে দিল। বলতে লাগলো - "ক'দিন ধরে বলছি, মুকুন্দপুরে পিয়ারলেস কোম্পানির অতো সুন্দর কম্পাউডে ফ্ল্যাট একটা বুক করতে, ধরাছোঁয়ার মধ্যে রেট। টু বেড রুম। কী ভাবলে?" বিজিতকে ভাবার সময় দিয়ে বিরতি হনহনিয়ে চলে গেল রান্না ঘরের দিকে। গ্যাসে দুধ বসে। বাতি কমিয়ে বসিয়ে রেখে এসেছিল। গ্যাস বন্ধ করে বিজ্ঞাপনের কাগজসহ এবার হাজির।
বিজিত বলল - "আমি তো জানি তোমার নজর যখন পড়েছে ফ্ল্যাট পারচেজ করবেই,কার বাপের সাধ্য তোমাকে বিরত করে? নাম বিরতি! বাপ নামটা একেবারে জুৎসই রেখেছিল।" কথাগুলো বলতে বলতে
ফেসবুকে মগ্ন বিজিত। আজকের পোষ্টে কমেন্ট, শেয়ার দেখছে, যেখানে কয়েকটা শব্দে একটা উপলব্ধি ছিল-
"বিশ্বকবির রচিত কাহিনী দিয়ে ছবি যতটা হিট, কয়েকটি গানকে সামনে রেখে ছবি মানেই ততোধিক হিট।"
লাইক দু'শ, শ'খানেক কমেন্ট,আর পঞ্চাশ খানেক শেয়ার। কাউকে এখনো নিজের প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় হয়নি। বিরতির তাগাদায় ফেসবুক থেকে মন তুলে নিয়ে বিরতিতে মন দিল। বিরতিকে আশ্বস্ত করে বলতে হলো- "ব্যাঙ্ক লোন দেবে ত্রিশ লাখ, হাতে লিকুইড মানি পাঁচ, আপাতত পাঁচ দিয়ে ফ্ল্যাট সাজানো হয়ে যাবে।"
বিরতি উল্লসিত হয়ে মুখে "ব্রাভো!" বলল।
"কতদিন পরে চাবি হ্যান্ডওভার হবে?" বিরতির কৌতূহল ভরা প্রশ্ন। বিরতি আরো বলে- "এই যে গোপনে কাজটা করেছ, আমাকে না জানিয়ে, আরো কি কি গোপনে করছো কিনা সন্দেহ হয়।" রসভরা বাক্যে বিরতিকে বড়ই মোহময়ী লাগছে বিজিতের এই মুহূর্তে। পাশ ঘেঁষে বসে। গলা জড়িয়ে ধরে। বিজিত এই বিরতিকে চেনে যখন রাতের সোহাগ বিলিয়ে দেয়। আর বলে-"ভাড়া বাড়ি আর ভালো লাগছে না। কবে নিজের ঘর হবে, সেই সুখ কি আমার কপালে আছে কিনা ঘোর সন্দেহ এ পর্যন্ত হয়ে আসছে,তা নিরসন করলে তুমি। আজ রাতে..." বলে হাসতে থাকে বিরতি।
পঁচিশ বছরের দাম্পত্য জীবন। বিজিত আটাশ বছর বয়সে বিরতিকে সহধর্মিণী হিসেবে পেয়েছিল। বিরতি তখন তেইশ। এই পঁচিশ বছরে বিজিতের কাছে পাওয়া বলতে এক ছেলে ও এক মেয়ে। সোনা দানা সে বিজিতের দানে কপাল মন্দ। অবশ্য বাবা যা দিয়েছে যথেষ্ট মনে করে বিরতি। বিজিতকে দিতে হবে না, প্রয়োজন নেই, কিন্তু সেজন্য বিজিতকে দু'চার কথা অবলীলায় শোনায় সখে, পরিস্থিতি হলেই। বিজিত যে তা জানে না তা নয়, তবে সেসব শুনতে শুনতে বিজিতের গা সহা হয়ে গেছে। শুধু বাকি ছিল মনের মতো একটা ফ্ল্যাট।
প্রত্যেক মেয়েরা একান্তই নিজের বলতে চায় একটা সুখের সংসার। স্বামী, সন্তান,মাথার উপর একচিলতে ছাদ। সময়ে সব হয়। এটুকু অন্তত বিশ্বাস ছিল বিরতির।
ছেলে মেয়ের পড়াশোনার পেছনে খরচ তো কম নয়। ছেলে অঙ্কুশ ব্যাঙ্গালোরে তথ্য প্রযুক্তিতে,মেয়ে অঙ্কিতার ডাক্তারি পড়ার ইচ্ছে। মেয়ে বাইরে চলে গেলে ঐ হাজার স্কয়্যার ফুট যথেষ্ট। অবশ্য মেয়ে- জামাই, ছেলে বউমা হলে তখন...।
বিজিত বলে - "এই ঘরে তোমার ছেলে মেয়ে থাকতে আসছে, তুমি যেমন।" আর কথা বাড়ায় না। আবার ফেসবুকে নজর দেওয়ার জন্য মন উসখুস করে। বিরতি সরে যেতেই ফেসবুক আবার...
(২)
বছর খানেক হলো বিজিত ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলেছে। বন্ধু সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়েছে। খুলে ছিল গতবছর জন্মদিনে। জন্ম তারিখটা যে খুব লাকি এত বছর বয়সেও বিজিত বুঝতে পারেনি। এই বুঝল। উনিশ দশ উনিশশো চৌষট্টি। আদি,মধ্য ও অন্ত দিন মাস বছর সংখ্যা যোগ করলে দশ হচ্ছে। দশ সংখ্যা সেলিব্রিটিদের পয়া। বিজিত সেই সৌভাগ্যবান। জন্মদিন নিয়ে নিজের জন্য খুব গর্ব হয় বিজিতের। সেই জন্মদিন আর মাস খানেক বাকি। এবার শারদীয়া উৎসবের মধ্যে পড়েছে। তাই জন্মদিন বন্ধুদের কাছে খুব সম্বর্ধণা লাভের আশায় আছে।
বিজিতের এই ফেসবুকে বুঁদ হয়ে থাকা বিরতির একটুও পছন্দ নয়। যেদিন থেকে ফেসবুক খুলেছে বিজিত সেদিন থেকে কেমন অন্য একটা মানুষ লাগে বিজিতকে। তাই থেকে বিরতির সোস্যাল মিডিয়ার উপর কেমন একটা গাত্র জ্বালা লাগে। একদিন এই নিয়ে বিজিতের সঙ্গে খুব ঝটাপটি লেগে যায়। বিজিত টিভি সিরিয়াল দু'চোখে সহ্য করতে পারেনা। সিরিয়াল নিয়ে তীব্র কটাক্ষ করে বিজিত।
বিরতির সন্ধ্যা থেকে একের পর এক সিরিয়ালই বিজিতের খবর দেখাকে মাটি করে দিয়েছে। অগত্যা এন্ড্রয়েডে স্টার আনন্দে খবর দেখে আশ মেটায়।
বিরতি দেখে দিনে দিনে মেয়েটাও কেমন বাপের নেওটা হচ্ছে। একদিন তো বিজিত তার ফেসবুকে আঙুল চালাতে চালাতে, হঠাৎ অজান্তে ফেসবুক গেছে লগ আউট হয়ে। অগত্যা মেয়ের দ্বারস্থ হতে হলো বিজিতকে। এমনিতেই রবিবার। ছুটির দিন। কাজের চাপ বেদম। কাজের ফাঁকে বাপ বেটির মোবাইলে এরকম বুঁদ হয়ে সেঁটে থাকা দু'চোখে সহ্য হচ্ছে না। পড়ার অতো চাপ। বাপের ফূর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ।
আবার এও ঠিক অতো পড়া পড়া করে ভালো লাগেনা। একটু রিল্যাক্স করা দরকার। বুঝেও মায়ের স্বভাবসুলভ শাসন একটা না থাকলে চলে। বাপটা তো গোল্লায় গেছে। কোনোদিন ছেলেমেয়ের পড়াশোনা নিয়ে মাথা ঘামাতে হলো না। এই বিরতি শর্মাকে পেয়েছিলে বলে এজন্মে বেঁচে গেলে। মেয়ে অঙ্কিতাকে বিরতি ধোয়া বাসন গোছাতে গোছাতে বলে- "অঙ্কু এবার যা,তোর পড়ার ঘরে যা।"
বাপবেটি তখন তুঙ্গে মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ পেতে। অঙ্কিতার মায়ের তাগাদায় কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কিছুক্ষণের চেষ্টায় লগ আউট সরে গেল। শেষে বাপ বেটিতে সাফল্যের উচ্ছ্বাস বেরিয়ে পড়ল। দূরে কাজের ঝোঁকে দু'টোকেই উদ্দেশ্য করে বিরতি বকে যায় আপন মনে। কেউ গ্রাহ্য করে না।
পূজোর মাস দেড়েক বাকি। পূজোর কেনাকাটার সব দায়িত্ব বিরতির। কার কি পছন্দ বিরতি ভালই বোঝে। একবার বিজিত নিজের জন্য একটা শখ করে পাঞ্জাবি কিনেছিল। পাঞ্জাবীর কালার দেখে মেয়ে পর্যন্ত হেসে গড়িয়ে পড়ে। সেই থেকে নাককান মূলে কেনাকাটাকে বিজিত চিরতরে বিদায় জানিয়েছে।
ওদিকে ছেলে ছুটিতে বাড়ি আসবে। ক'টা দিন থাকবে। ছেলে য'দ্দিন থাকবে বিরতি দুনিয়ার কাউকে চেনে না। ছেলের জন্য পছন্দ মতো পরিপাটি করে রান্না যা বিরতি করে, ক'টা দিন সে ভুরিভোজের অভাব হয়না। শুধু বিজিতের পকেটের লক্ষ্মী যা একটু চঞ্চলা হন। কিছু বলার জো নেই। বললে রে রে করে উঠবে। সে রান্না বলতে - চিংড়ি থেকে ইলিশ হরদম। ইডলি স্ট্যান্ড,ধোসার তাওয়ার বিশ্রাম বলে কোনো নেই। ফ্রায়েড রাইস, বিরিয়ানি সে তো কমন ব্যাপার। ছেলের আর মায়ের ভেটকি পাতুরি প্রথম পছন্দের। বিজিতকে মন খুলে বাজার করতে হবে। তবুও এটা নেই ওটা নেই হরদম তাগাদায় বিজিতকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে বিরতি। বিজিতকে একেবারে পত্নী সোহাগী পতি হতে হবেই ক'টা দিন। বিরতির দর এই ক'টা দিন এতো গরম গরম পাশে কোনো বায়না চলবে না। বিজিতের সহায় তখন ফেসবুক। তবে খুব সাবধানে। অনেক সুন্দরী মহিলা তার ফ্রেন্ড লিস্টে এসে ভিড় করছে। রীতিমত ম্যাসেঞ্জারে চ্যাটিং হয়। বিরতির সন্দেহ অমূলক নয়। তাই নিয়ে ইদানিং একটু বেশ কথা কাটাকাটি হয়। এসব পছন্দ নয় বিরতির।
(৩)
ফেসবুকে বিজিত রীতিমত অ্যাডিক্টেড। জন্মদিনে একটা প্রোফাইল পিকচার নতুন ছেড়েছে। তাই দেখে মেয়ে বন্ধুদের খুব পছন্দ। জন্মদিনে শুভেচ্ছার বন্যায় ভেসে গেল বিজিত। নতুন ফ্ল্যাটের গোছানো জীবন। বিরতির খুব পছন্দ। কম্প্লেক্সের পূজো। বিজিত বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা বলতে ফেসবুকে। শুভেচ্ছা বিনিময় মন্দ হলোনা। ইমেজ দিয়ে রাশি রাশি মিষ্টি বিতরণ সে বলতে আর! ফেসবুকে বিজয়া দশমী সারতে সারদিন মত্ত ছিল বিজিত।
আর ওদিকে বিরতির চিরকালের অভ্যেস বিজয়া দশমীর সিঁদুর খেলা তার চাই। কম্প্লেক্সের পূজোয় বিরতি মনভরে সিঁদুর খেলল।
বিজিতকে এক বন্ধু শুভেচ্ছা পাঠিয়েছে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ও মথুরবাবুর বিজয়া দশমীর কথোপকথন নিয়ে। মথুরবাবু তো কিছুতেই মাকে বিসর্জন দেবেন না পণ করে বসে আছেন, মথুরবাবু বলছেন- "প্রাণ থাকতে মাকে বিসর্জন দিতে পারবো না।"
ঠাকুর তখন হেসে বললেন- "ওঃ! এই তোমার ভক্তি। তা মাকে ছেড়ে তোমায় থাকতে হবে কে বললে? আর বিসর্জন দিলেই বা তিনি যাবেন কোথায়? ছেলেকে ছেড়ে মা কি কখনো থাকতে পারে? এই তিন দিন মা বাইরের দালানে বসে পুজো নিয়েছেন, আজ থেকে তোমার আরো নিকটে থেকে, সর্বদাই হৃদয়ে বসে তোমার পুজো নেবেন। মাকে বিসর্জন দেবে কোথায়? বিসর্জন দেবে নিজের হৃদয়ে।"
বিজিত তখন বিসর্জনের গুরুত্ব বোঝাতে ঐ বন্ধুকে কমেন্ট বক্সে লিখল- "ঠাকুর যা বলেন তাই বাণী। এই কথাগুলি এক চিরন্তন লোকশিক্ষা। বিসর্জন মনের একটা সংস্কার। বাহ্যিক আড়ম্বর। লোক দেখানো। যত অন্নগত প্রাণ,তত সংস্কার। যেমন খাওয়ার পর হাত মুখ ধোয়ার মত। খাওয়ার পর কই বলি কি হাত ধবোনা? এই ধোয়াধুয়ি বাইরের। আহারের শক্তি রইল ভেতরে। বিসর্জন ঠিক তেমনি।
মায়ের দুই রূপ। মৃন্ময়ী ও চিন্ময়ী। বছরভর চলে তারই সাধনা। বছরে একটিবারের জন্য আছেন মৃন্ময়ী রূপে ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করতে আসেন। তার এই মৃন্ময়ী রূপের জন্য যত ঘোড়া ঘোড়া চোখের জল ফেলি,কই চিন্ময়ী রূপের জন্য ক'ঘড়াই বা জল ফেলি আমরা?
সংস্কার আমাদের দিয়েছে ধর্মীয় সংস্কৃতি। ক'টা দিন খুব জমিয়ে সর্বজনীন সংস্কৃতির রূপ দিই। বিজয়া দশমী যেই না আসে অমনি মন খারাপ মাকে বিদায় দিতে হবে। আবার বছর ঘুরলে তবেই মা এমন অপরূপ সাজে আসবেন। এই বিরহবোধে মাকে বিদায় দিতে এতো কান্না। ঠাকুর শুধু মথুর বাবুকে বললেন না,ভক্ত মাত্রেরই এই শিক্ষা দিলেন।"- এই কমেন্টের উপর লাইক দেখে বিজিতের মন ভরে গেল। মনন থেকে চিন্তনের এমন আনন্দ বিরতি কি আর বুঝবে! ফেসবুকে বন্ধুদের নিয়ে বিজিত যেন আপন হতে বাহির হয়ে বিশ্বমাঝে দাঁড়িয়েছে।
(৪)
বিজিত একটা কবিতা লিখে ফেসবুকে চাপিয়ে দিল-
"পিরিতি মূরতি খানি
পরকিয়া অভিসারী
অঙ্গে রাধা আবরনী
আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি তরে
কৃষ্ণেন্দ্রীয় প্রান ভরে
পরকীয়া পদাবলী
প্রকাশ্যে পদধ্বনি।
তারি লাগি প্রাণ উচাটনি।"
রাধাকৃষ্ণ ইমেজ দিয়ে কবিতাটি যেইনা চাপিয়েছে অমনি লাইক কমেন্ট শেয়ারের সে কি বন্যা!
পরের দিন একটি জবর্দস্ত লেখা ওয়ালে চাপাল বিজিত। পিথাগোরাসের সন্তান উৎপাদনের তত্ত্ব।
পিথাগোরাস ছিলেন ধর্মগুরু। জ্যামিতি শাস্ত্রে তাঁর নামাঙ্কিত উপপাদ্য সমকোণী ত্রিভুজ ও তার ক্ষেত্রফলের সূত্র আবিস্কারের জন্য তিনি জগৎ বিখ্যাত।
তাঁর একটি সম্প্রদায় ছিল। তিনি ছিলেন ধর্মগুরু। আচরণবিধি প্রচার করতেন শিষ্যদের দিয়ে। যেমন- ছোলা জাতীয় দানা খাওয়া নিষিদ্ধ। পড়ে থাকা জিনিস কুড়ানো যাবে না। সাদা রঙের মোরগ ছোঁয়া বারণ, ফুলের মালা ছেঁড়া পাপ ইত্যাদি।
শুধু আচরণবিধি প্রণয়ন করে আটকে থাকেননি,তিনি নিদান দেন সন্তানের জন্ম ও তার মূলে নারী-পুরুষের ভূমিকা কি তাই নিয়ে। যা নিয়ে আদি থেকে কৌতুহল ছিল তাই নিরসনে এগিয়ে এলেন।
তখনকার সময়ে ছিল বিশ্বাসের ছড়াছড়ি। পাঁচশ' খ্রীষ্টপূর্বাব্দে সন্তান উৎপাদনের একটি নিজস্ব তত্ত্ব প্রচার করলেন তিনি। তাঁর মতে সন্তানের জন্মদাতা কেবলমাত্র পিতা। পুরুষের শুক্রাণু হলো পূর্ণাঙ্গ মানুষের ক্ষুদ্র সংস্করণ। পুরুষের মধ্যে শুক্রাণু ভ্রুণ রক্ত বাহিত হয়ে সারা শরীরে ঘুরে বেড়ায়। ঘুরে ঘুরে সারা শরীরের বিভিন্ন অংশের খবর নেয় তারপর আস্ত মানুষের রূপ নিতে মাতৃজঠরে স্থান করে নেয়। মাতৃজঠর তখন কেবলমাত্র ভ্রূণের ধারক হয়। কেবলমাত্র আধার। এছাড়া সন্তান উৎপাদনে নারীর কোনো ভূমিকা নেই।
পিথাগোরাসের এই তত্ত্বকে নিয়ে শিষ্য প্লেটো তার 'দ্য রিপাবলিক' গ্রন্থে পৌঁছে গেলেন একেবারে ফর্মুলায়। গ্রন্থটিতে প্লেটো এভাবেই ফর্মুলা দিলেন উন্নত নারীর সন্তান উন্নত, আর নীচ নর-নারীর সন্তান অবশ্যই নিম্নমানের। তাই সুনাগরিক সৃষ্টি করতে হলে রাষ্ট্রনায়কদের উচিত প্রজননের ফর্মুলার সাহায্যে কে কার শয্যাসঙ্গী হবে তা ঠিক করে দেওয়া। আজও বংশ, কৌলিন্য দেখে বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার সংস্কার পালিত হয়ে আসছে।
পিথাগোরাসের তত্ত্বকে একেবারে মনগড়া বলে উড়িয়ে দিলেন প্লেটোর শিষ্য তথা দার্শনিক ও শিক্ষাগুরু অ্যারিস্টটল।
অ্যারিস্টটলের যুক্তি সন্তান যদি শুধু বাবার ভ্রুণ থেকে জন্মায় তবে সন্তানের মধ্যে মা-ঠাকুমা-দিদিমার লক্ষণ থাকে কি করে?
আরো যুক্তি- যে পুরুষ দাড়ি গজানোর আগেই সন্তানের জন্ম দেয়, তার সন্তানের মধ্যে দাড়ি গোঁফ আসে কোথা থেকে? কিংবা কন্যা সন্তান তথা স্ত্রী যৌনাঙ্গের খবর বাবার কাছ থেকে পায় কিভাবে?
সবাই মানল অ্যারিস্টটলের মতকে।তিনি মত দেন সন্তানের জন্ম দেয়ার কৃতিত্ব একা পুরুষের নয়। নারী শুধু সন্তানধারণের আধার নয়, শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়া-কলাপ মা তার সন্তানের উপর ন্যস্ত করে পূর্ণাঙ্গ একটি শিশুর জন্ম দেয়। সন্তান উৎপাদনের জন্য বাবা ও মায়ের উভয়ের ভূমিকা থাকে।
অ্যারিস্টটলের এই মতকে অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে,সতরশ' ষাটের দশকে ইতালির জীববিজ্ঞানী স্প্যালানজানি প্রমাণ দিলেন স্ত্রী ও পুরুষ উভয়ের সন্তান উৎপাদনে ভূমিকা থাকে। সঙ্গে পিথাগোরাস, প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের ইমেজ দিয়ে লেখাটা নিজের প্রোফাইলে ওয়াল আপ করতেই সৃজিতা বোস, কঙ্কনা, বিপাশা, অনুলেখা, বিদিশা শত শত মেয়ে বন্ধু কমেন্টের পর কমেন্টে সে ধূমধাড়াক্কা অবস্থা সামাল দিতে বিজিতের জেরবার অবস্থা।
একজনতো কমেন্ট করলেই বসল - "এ তো পিথাগোরাসকে অপমান করা। পিথাগোরাসের সময় যা ছিল তাই তিনি বলেছেন। তিনি না যদি বলতেন অ্যারিস্টটল বলতেন কি করে? এত বাইরের খবর দিচ্ছেন,কই ঘরের মধ্যে চরক,শুশ্রুত এব্যাপারে যা বলে গেছেন তার খবর কি রাখেন? সন্তান উৎপাদনের তত্ত্ব উদ্ধারে আমাদের ভূমিকা কম কিসে। তা লাইম লাইটে না আসার জন্য আপনার গ্লানি বোধ হয়না? শুধু পাশ্চাত্য ভাবনার আলোটাই শুধু দেখলেন? নিজের ঘরের আলো কবে দেখবেন?" এমন আক্রমণে বিজিতের ভিরমি খাওয়া অবস্থা। সত্যিই তো এ আমাদের দুর্বলতা।
পৃথা মজুমদার তথ্যের মধ্য যেখানে উন্নত বাবা মা উন্নত সন্তান উৎপাদনের কথা রয়েছে, তাই নিয়ে খুব প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত! বিজিত একেবারে গলে জল। ক'দিন ধরে খুব লাইক ও শেয়ার করছিল, এবার সরাসরি মন্তব্য করে বসল। গোপন কথা বলার জন্য একেবারে ম্যাসেঞ্জারে চ্যাটিং পর্বে ঢুকে গিয়ে, বিজিতে নিজেকে নিবেদন করেও ফেলল। প্রথম প্রথম আপনি হতে হতে ক্রমশ তুমিতে সম্পর্ক অচিরে গড়াল।
পোস্টটির উচ্ছ্বসিত প্রশংসার ভাষা কোথা থেকে পেল তাই নিয়ে ভাবতে থাকে বিজিত। পৃথার কথাগুলো বিজিতের রক্তে কেমন একটা মত্ততা ছড়াল। ওর সব আছে, কিন্তু সুখটুকু যেন কোথাও একটা বাধা হয়ে আছে। বিজিতের চারধারে একটা মোহময়ী বেশে নিজেকে হাজির করেছে পৃথা।
(৫)
পৃথা মজুমদার। বয়স আটত্রিশ। ফেসবুকে জন্ম তারিখ তাই বলছে। নামখানা, উত্তর চব্বিশ পরগনা। ট্রেজারি অফিসের অ্যাকাউন্ট্যান্ট। গেট আপে মোহময়ী। প্রোফাইল পিকচার তাই বলছে। বিজিত চ্যাটিং করে খুব গোপনে। বিরতি জানলে রেহাই থাকবে না। সম্পর্ক এতদূর না গড়ালেই ভালো হতো। কী লাভ এসব করে। এরেই বলে মধ্যবিত্ত মানসিকতা- যে কোনো বিষয়ের মধ্য অবস্থানে পেন্ডুলামের মতো দোলে।
বিরতির কথা ভেবে পৃথাকে ব্লক করবে ভাবে। আবার কেন করবে পরক্ষনে ভাবে। মনের একি অবস্থা! বিরতির সন্দেহ সত্যি হলে আর রক্ষা থাকবে না। পঞ্চাশোর্ধ বয়সে একি ভীমরতি!
ম্যাসেঞ্জারে ফটো লেনদেন হয়ে গেল। মেয়েকে নিয়ে বিরতি ব্যস্ত। রাতে মেয়ের কাছে শোয় বিরতি। মেয়ে অনেক রাত পর্যন্ত পড়ে। বিজিত অন্য ঘরে। এই একাকিত্বের পূর্ণ সুযোগে পৃথা বিজিতকে সব পোজের ছবি ট্রান্সফার করে। বিজিতের দুর্বলতার সুযোগ নেয়। বিজিতও ফটো দেয়। গোপনে ফোনালাপ চলে। ফোনে পৃথা দুঃখের কথা কেবলই বলে। সে কিছুই চায়না, শুধু একটু ভালবাসা। এইভাবে যেমন চলছে।
বিজিত ভাবে একদিন ধরা পড়বেই বিরতির কাছে। সেদিন কি করবে? ব্লক করে দিলে হয়। আর হয়ে ওঠে না। ওঠে না নয়, পারে না।
এই ভাবে নীরবে বেশ চলতে থাকল, বিরতির অজান্তেই। বিরতি আঁচ করে। কিন্তু সন্দেহ করা ঠিক নয়, ভেবে গুরুত্ব দেয়না। এরপর?
বিজিত অনুশোচনায় ভুগতে থাকে। আর পৃথা বিজিতময়। একদিন তো দেখা করার প্রস্তাব দেয় পৃথা। বিজিত বুঝতে পারে সে পরকিয়ার খাদের কিনারে। পৃথা কেন এতো নাছোড়বান্দা? ওর স্বামীকে ভয় নেই? না স্বামী ইহ জগতে নেই? স্বামীর কথা জানতে চাইলে এড়িয়ে যায়।
বিজিত রায় তুমি পরকিয়ায় শেষ পর্যন্ত ফাঁসলে। পৃথা এখন একদিন ফোন না করলে বিজিত আনমনা হয়। কিন্তু এভাবে কতদিন?
শেষ পর্যন্ত বিজিত একদিন দেখল পৃথা ব্লক। তাহলে কি পৃথাই ব্লক করলো? ফোন নম্বরও ব্লক। যাক বাঁচা গেল। এতো বিজিতের বাইরের কথা। ভেতরে কিন্তু বড়ই ম্রিয়মাণ। বিরতির নজরে ধরা পড়ে যায়। বিরতি যে সে নয়। বিজিত হাড়ে হাড়ে চেনে।
মেয়েরা ছেলেদের নজর চেনে। এটা ওদের ঈশ্বর দত্ত বিশেষ গুণ,যা ছেলেদের তুলনামূলকভাবে ঘাটতি আছে।
বিরতিই করেছে। ফোনটা কোনো কারণে বিজিত ঘরে ছেড়ে কয়েক ঘণ্টা বাইরে গিয়েছিল। বিরতি সেই সময় পৃথা রহস্য সব ধরে ফেলে। মেয়েকে দিয়ে ব্লক করিয়েছে।
বিরতি সব জেনেও বিজিতকে কিছুই বলে না। ভান করে কিছুই ঘটেনি। বিরতির হাতে এখানেও সত্যিই রাশটা ধরা থাকল। এই জীবনে বিজিতের কি আর ছন্নছাড়া হতে দেওয়া যায়। হতচ্ছাড়া!
পৃথা চ্যাপ্টার কী হবে? আবার নতুন অ্যাকাউন্ট নিয়ে যদি আসে সে দেখা যাবে।
@copyright reserved for Mridul Kumar Das
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন