বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২০

গ্রাস (পিয়ালী চক্রবর্তী)

 


            "আজকে কি আছে গো দুপুরের খাবারে ? এমা , আজকেও সেই একই ডাল - ভাত - পেঁপের তরকারি ? তিন দিন হয়ে গেলো এখানে ভর্তি আছি , রোজ দুবেলা এক খাবার খেতে কারুর ভাল লাগে বলতো ? হ্যাঁগো তোমরাও কি এই খাবারই খাও ? নাকি তোমাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা ? " রাগে গজগজ করতে করতে বলে চললো মনিময় |

            যক্ষা রোগের চিকিৎসা করাতে ও তিন দিন আগে এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে | একেই যক্ষা হলো ক্ষয়রোগ , পুষ্টিযুক্ত খাবারই হলো এই রোগের আসল পথ্য | কিন্তু মাছ - মাংস - ডিম তো দূরের কথা , কোনোদিন একটু ভালো সবজিও হাসপাতাল থেকে দেয়না |

            মণিময়ের বাড়ি অনেক দূর , সেখান থেকে রোজ দুবেলা খাবার বয়ে নিয়ে আসার লোকও নেই , ঘরে তার দুই বাচ্চাকে নিয়ো বৌ একাই আছে এখন |

            কিন্তু না ভালো খাবার , না সময়মতো ডাক্তার , কোনোটাই এখানে ভালো নয় | গতকাল থেকে ডান দিকের বুকে খুব যন্ত্রনা করছে ওর | নার্সদেরকে বার বার বলা সত্ত্বেও একবারের জন্যেও কেউ দেখে গেলোনা | তার ওপর রোজ একি খাবার খেতে খেতে ওর খিদেটাই চলে যাচ্ছে |

            দুপুরে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়লো সে | সন্ধ্যাবেলা আজকে নাকি বড় স্যার আসবেন | ডাক্তার কুন্দন ভট্টাচার্য |

            রাত তখন নয়টা বাজে , ডাক্তারবাবু ওয়ার্ডের সব পেশেন্ট দেখে নিজের কেবিনে গিয়ে বসলেন | প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দুজন নার্স আর দুজন ওয়ার্ড বয় ওনার কেবিনে গিয়ে ঢুকলো | ওরা কিছু একটা ব্যাপার নিয়ো আলোচনা করছিলো |

            মণিময়ের বেড টা ঠিক ডাক্তারবাবুর কেবিনের সাথে লাগোয়া | অধিকাংশ পেশেন্টই তখন রাত্রের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে | মণিময়ের কিছুতেই ঘুম আসছিলোনা | সে বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করতে লাগলো |

            হটাৎ সে একটা চাপা গলার শাসানির মতো আওয়াজ শুনতে পেলো | ভালো করে কান পেতে শুনে সে বুঝতে পারলো যে, আওয়াজটা কেবিনের ভেতর থেকে আসছে | ওর কৌতূহল আরো বেড়ে গেলো , "ব্যাপারটা কি !!! দেখি একটু "

            এই ভেবে সে কেবিনের একদম ধারে গিয়ে দেওয়ালে কান লাগিয়ে শোনার চেষ্টা করলো | শুনতে শুনতে সে বুঝতে পারলো কোথায় এসে পড়েছে সে |

            ডঃ : আজকের সকালের কালেকশন কই ? ওয়ার্ডে আজকে দেখলাম আরও 5 জন নতুন ভর্তি হয়েছে |

            মিনতি ( নার্স ) : স্যার আজকে সকালে বিলতলা রেস্টুরেন্ট থেকে 5 কিলো চিকেন , 35 টা ডিম , 3 কেজি চাল আর 2 কেজি ডাল নিয়ে গেছে | কালেকশনের ১০৫০ টাকা নিতাইয়ের কাছে আছে |
         
            ডঃ : আর রাত্রের কি খবর?
        
            আল্পনা ( নার্স ) : আজ্ঞে , রাত্রে রাধিকাপট্টির হোটেলটা থেকে 4 কেজি মাছ , 35 টা কেকের প্যাকেট , 35 টা লাড্ডু , 3 কেজি চাল আর 4 কেজি সবজি নিয়ে গেছে | কালেকশন এর 900 টাকা জামালের কাছে আছে |

            ডঃ : কি !!! আজ দুবেলা মিলিয়ে মাত্র 1950 টাকার কালেকশন হয়েছে !!! তোমরা তো আমাকে ভাতে মারবে দেখছি | গতকাল বলেছিলে আজকে অন্তত 2500 টাকা কালেকশন হবে ? কই ? এখান সব চুপ করে দাঁড়িয়ে আছো কোনো ? এটা কি আমি একা খাবো নাকি ? তোমরাও তো নেবে , কাল থেকে মন দিয়ে কাজ না করলে এক একটাকে লাথি মেরে দূর করবো এই বলে রাখলাম , এখান থেকে একবার তাড়িয়ে দিলে আর কোত্থাও যাতে তোমরা চাকরি না পাও সে ব্যবস্থাও আমি করবো | যাও সব , দূর হও আমার সামনে থেকে | আর এই নাও , যেমন ইনকাম তেমন কমিশন , 200 টাকা রাখো , চারজনে ভাগ করে নিয়ো | কালকে কোনো অজুহাত শুনবনা , 2500 টাকার কালেকশন আমার চাইই |

            মনিময় নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলোনা | একি শুনলো ও ? ডাক্তার তো ভগবানেরই আরেক রূপ , কিন্তু কিছু কিছু ডাক্তার শয়তানকেও হার মানায় | মরণাপন্ন রোগীদের মুখের গ্রাস ছিনিয়ে এরা কালোবাজারি করছে ? আমাদের জন্য বরাদ্দ পুষ্টিযুক্ত ভালো ভালো খাবারগুলো বাইরের হোটেলে বিক্রি করে সেই টাকা ভাগ করে নিচ্ছে ?

            না , এর বিহিত করতেই হবে | এতকিছু জেনে চুপ করে থাকা মানে এদেরকে সাহায্য করা | ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি , ' অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে , তবে ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে ' | নিজের কর্তব্য মনে মনে স্থির করে ফেললো মনিময় |

            পরেরদিন সন্ধ্যেবেলা যখন ডাক্তার ওকে দেখে অন্য পেশেন্ট দের সাথে ব্যস্ত হয়ে গেলো , আস্তে আস্তে পা টিপে টিপে বারান্দার পাশের দরজা দিয়ে নিচে নেমে এলো সে | তারপর বাগানের পেছনের পাঁচিল টপকে সোজা বড়রাস্তায় এসে পড়লো | প্রথমেই সে পেট ভরে মিষ্টি - কচুরি - চা খেয়ে নিলো | তারপর শরীরে বল পেয়ে সে গেলো নিকটবর্তী থানায় |

            থানায় গিয়ে বড়োবাবুকে সব কথা খুলে বলতে বড়োবাবু অবাক হয়ে গেলেন | ডঃ কুন্দন ভট্টাচার্যের মতো একজন স্বনামধন্য চিকিৎসকের এ কি কদর্য রূপ ? মণিময়ের মুখ থেকে হোটেলগুলোর নাম , আর ডাক্তারের কুচক্রে সাহায্যকারী নার্স আর ওয়ার্ড বয় গুলোর নাম শুনে নোট করে নিলেন | মনিময়কে পুলিশের জীপে করে তার বাড়ি পৌঁছে দেবারও ব্যবস্থা করে দিলেন |

            "এবার আগুন নিয়ে খেলা , এক একটাকে টেনে এনে এমন শিক্ষা দেবো যাতে এইধরণের জঘন্য অপরাধ করতে আর কেউ সাহস না করে " নিজের মনে বলতে বলতে বড়োবাবু জীপে করে বেরিয়ে পড়লেন |

            প্রথমেই গেলেন বিলতলা রেস্টুরেন্টে | বড়োবাবুকে দেখেই রেস্টুরেন্টের মালিক প্রমাদ গুনলো | " আসুন স্যার , আমার কি সৌভাগ্য আপনি আমার রেস্টুরেন্টে এসেছেন , এই মিন্টু , স্যারের জন্য একটা কোল্ড ড্রিংক নিয়ে আয়রে " |
           "থাক , কোল্ড ড্রিংক আনতে হবেনা | আপনি আমার গাড়িতে উঠুন , আপনাকে একটু থানায় যেতে হবে " |
            "সে কি বলছেন স্যার , আমি , থানায় ? কিন্তু কোনো ? আমি কি করেছি "?
            " সেটা নাহয় থানায় গিয়েই বলবো , আপাতত গাড়িতে উঠে পড়ুন " |
            "স্যার , কিছু নিয়ে এখানেই কেস বন্ধ করে দেওয়া যায়না " ?
            "কি ? অন ডিউটি পুলিশ অফিসারকে আপনি ঘুষ দেবেন বললেন ? আপনাকে এই অপরাধের জন্য এখনই গ্রেফতার করলাম " |

             বিলতলা হোটেলের মালিক সুধাকরকে ধাক্কা মারতে মারতে জীপে তুলে বড়োবাবু থানায় হাজির হলেন | তারপর ওকে লক আপে ভরে দিলেন | একইভাবে গ্রেফতার করে আনলেন রাধিকাপট্টির হোটেল মালিক চন্দনকেও |

            এবার চললো পুলিশি জেরা | জেরার মুখে ওরা বেশিক্ষন টিকতে পারলোনা | সব কথা ফাঁস করে দিলো |

            ওরা গত ৬ বছর ধরে কলেজ অফ মেডিসিন হাসপাতাল থেকে দুবেলা রোগীদের জন্য বরাদ্দ মাছ , মাংস , ডিম , চাল , ডাল , সবজি সব বাজার দরের চেয়ে অনেক কম দামে কিনে আনে ওদের হোটেলের জন্য |

            ডঃ কুন্দন ভট্টাচার্যের সাহায্যেই ওরা জিনিসগুলো আনতে সুযোগ পায় | এটা একটা দুষ্ট চক্র , যাতে ডঃ ছাড়াও কয়েকজন নার্স আর ওয়ার্ড বয় জড়িত আছে |

            হোটেল মালিকদের সমস্ত কথা ভিডিও রেকর্ডিং করে নিয়ে বড়োবাবু এবার চললেন রাঘব বোয়ালকে ধরতে |

            হসপিটালে পৌঁছেই মিনতি , আল্পনা , নিতাই আর জামালকে ডেকে পাঠালেন | মিনতি আর নিতাইয়ের মর্নিং ডিউটি হওয়ার দরুন তারা তৎক্ষণাৎ বড়োবাবুর সামনে হাজির হলো | আর কল্পনা এবং জামালকে স্টাফ কোয়ার্টার থেকে খবর দিয়ে ডেকে আনা হলো |

            এদের চারজনকে হোটেল মালিকদের বয়ানের সাহায্যে গ্রেফতার করে গাড়িতে তুলে দিয়ে তারপর বড়োবাবু হাঁটা লাগলেন ডক্টরস কোয়ার্টারের দিকে |

            ডাক্তারবাবু তো এই ভর দুপুরবেলা তার কোয়ার্টারে পুলিশ দেখে চমকে উঠলেন | তবুও যতটা সম্ভব নিজেকে সামলে জিজ্ঞাসা করলেন ,
          " অফিসার আপনি ? কি মনে করে ? "
          "সেটা আপনি আমার সাথে গেলেই বুঝতে পারবেন | যান , গিয়ে ড্রেস করে আসুন , আমি অপেক্ষা করছি | যান তাড়াতাড়ি , সময় নষ্ট করবেন না " |

            ডঃ ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে রেডি হয়ে বেরিয়ে এলো , বড়োবাবুকে অনুনয় বিনয় করতে লাগলো তাকে ছেড়ে দেবার জন্য | কিন্তু বড়োবাবু নিজের সিদ্ধান্তে অনড় |

            ডঃ কে তার সাথী নার্স ও ওয়ার্ডবয়দের সাথে হাতে হাতকড়া পরিয়ে ভ্যানে তোলা হলো |

            পুলিশের জেরার মুখে তারা তাদের জঘন্য অপরাধ স্বীকার করলো | হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের প্রত্যেককে বরখাস্ত করে দিলো এবং ডঃ কুন্দন ভট্টাচার্যের ডাক্তারি লাইসেন্স বাতিল করে দেওয়া হলো | আর ওদের সবার বিরুদ্ধে রোগীদের খাবার চুরি করে বিক্রি করার অপরাধে কেস শুরু হলো |

            কেস কতদিন চলবে তা স্বয়ং ঈশ্বর জানেন | পুলিশের তরফ থেকে অসীম সাহসিকতার জন্য মনিময় কে বিশেষ পুরস্কার দেওয়া হলো | এছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে তার যক্ষা রোগের চিকিৎসার সমস্ত দায়ভার বহন করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হলো |


©️All rights reserved
   Piyali Chakravorty

++++++++++++++সমাপ্ত++++++++++++++


৪টি মন্তব্য:

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...