রবিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২০

জানি সে ফিরবে না আর--- (পারমিতা মন্ডল।,)

জানি সে ফিরবে না আর।( ছোট গল্প)


পারমিতা মন্ডল। 


আজ বারো বছর হলো আমাদের বিয়ে হয়েছে ।ছোট স‌ংসার ।আমার বাবা নেই ।মা ,আমি, আমার ছেলে ও স্ত্রী --এই নিয়ে আমাদের ছোট সংসার।আমি মোটামুটি একটি সরকারি চাকরি করি ।পয়সা কড়িও ভালো পাই ।সচ্ছল পরিবার । কোনো অভাব নেই ।


আমার স্ত্রী আমাকে খুব ই যত্ন করে, পরিবারের সবার প্রতি ওর খুব খেলাল । আমাদের দেখা শোনা করে বিয়ে হয়েছে।এই বিয়েতে দিয়া রাজি ছিল না ।সে অন্য কাউকে ভালো বাসতো । একথা আমি বিয়ের পর ওর কাছেই শুনেছি ।তবুও বিয়ের পরে  ও আমার সাথে কোন খারাপ ব‍্যাবহার করেনি । কোন কাজে বাধা দেয়নি, খুব সহজেই আমাকে মেনে নিয়েছে ।


কিন্তু ওর মনে যে একটা না পাওয়ার কষ্ট ছিল সেটা আমি বুঝতে পারতাম । অনেক দিন দেখেছি গভীর রাতে না ঘুমিয়ে সারা রাত ধরে কেঁদে বালিশ ভিজিয়েছে ।আমি ওকে কাঁদতে দিয়েছি । ওকে কাঁদতে দেখে আমার খুব খারাপ লাগতো ।কিন্তু সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোন ভাষা আমার জানা ছিল না । প্রিয় জনকে হারানোর যন্ত্রণা পৃথিবীর সব যন্ত্রণাকে হার মানায় । তাই কিছু বলিনি ।অপেক্ষা করেছি । জীবনের প্রথম ভালো বাসা ভোলা সত্যিই কষ্টকর। তাই ওকে স্বান্তনা দিয়ে কিছু বলা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আমি ওকে সময় দিয়েছি। তাই আস্তে আস্তে দিয়াও স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।


যাইহোক আমাদের বাড়িতে আসার পর সেদিন ছিল ওর প্রথম জন্ম দিন । আমার মা ওকে খুব ভালো বাসে। নিজের মেয়ে নেই বলে হয়তো একটু বেশিই ভালো বাসে । তাই দিয়ার জন্য পায়েস বানিয়েছিল । আমার সাধ‍্য মতো আমিও ছোট খাটো অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলাম ।বড় একটা কেক আনা হয়েছিল ,কাটা হবে ।কিন্তু যার জন্য এই আয়োজন তার মুখে একটা বিষন্নতার ছাপ ।হাসছিল, ছোটাছুটি করছিল ,সবাইকে আপ‍্যায়ন করছিল  --তাও কোথায় যেন মাঝে মাঝে হারিয়ে যাচ্ছিল দিয়া । তবে আমার প্রতি ওর কোন অভিযোগ নেই আজও । আমাকে বুঝতে ও দেয়না ওর মনের কষ্ট। কিন্তু এই কয়দিনে আমি ওকে খুব ভালোবেসে ফেলেছি ।তাই ওর বিষন্ন ভরা মুখটা দেখলে আমার খুব কষ্ট হয়।


জন্ম দিনের অনুষ্ঠান, তাই দিনের বেলাতেই হচ্ছিলো । হঠাৎ বাইরে সাইকেলের কিড়ি‌ং কিড়ি‌ং আওয়াজ পেলাম । পিয়ন


চিঠি ,চিঠি বলে ডাকাডাকি করছিল । বেরিয়ে দেখি নীল খামের উপর গোটা গোটা অক্ষরে দিয়ার নাম লেখা একটি চিঠি। কিন্তু কে পাঠিয়েছে, তার কোন নাম ঠিকানা লেখা নেই ।দিয়াকে ডেকে ওর হাতে দিলাম চিঠিটা । দিয়া চিঠিটা দেখে বুঝতে পারলো না কে পাঠিয়েছে ।তাই পড়ার জন্য ঘরে নিয়ে চলে গেল । ও যখন ফিরে এলো তখন যেন উচ্ছল একরাশ ঝরনা । এতোদিন কখনো ওকে এতো হাসিখুশী দেখিনি । ঐ চিঠিটা পাওয়ার পর কি ও আজ এতো খুশি ? কার চিঠি ছিল ওটা ? না, দিয়াও কখনো বলেনি আর আমিও কখনোই জানতে চাইনি ঐ নামহীন চিঠিটার ব‍্যাপারে ।তারপ‍র থেকে প্রতি বছর দিয়ার জন্মদিনে ঐ নীল খামআলা নামহীন  চিঠিটা আসে ।আর দিয়া খুব খুশি হয়ে যায়।


এখন দিয়া আর আগের মতো গভীর রাতে বালিশ ভেজায় না ,আগের মতো মন খারাপ করেও  থাকে না।আমরা খুব ভালো ভাবে সং সার করছি । বছর দুই বাদে আমাদের কোল আলো করে এলো আমাদের ছেলে সায়ন ।ব‍্যাস্ততা  বেড়ে গেল অনেক দিয়ার ।ছেলের এখন নয় বছর বয়স ।আমার সাথে প্লান হয়েছে, এবার তার  মায়ের জন্ম দিন  সে পালন করবে । মাকে সারপ্রাইজ দেবে । তাই আজ সকাল থেকে তোড়জোড়। দিয়া আমাকে বলল ,," তুমিও কি সায়নের মতো বাচ্চা হয়ে গেলে নাকি ?"বুড়ি , হয়ে গেছি ,কেন এসব করছো ? " আমি মুচকি হাসি ।মনে মনে বলি "আমি তোমার প্রথম ভালো বাসা নই তা জানি । তবুও আমি জানি তুমি আমাকে ভালো বাসো। আর তুমি তো আমার প্রথম ভালো বাসা ।তাই তোমার মুখে হাসি ফোটাতে আমি সব করতে পারি ।একটু পরেই তো তোমার নামহীন চিঠিটা চলে আসবে ।তবুও আমার একটু ও হিংসা হয়না তোমার উপর। আমি যে তোমাকে ভালোবাসি।"


ঠিক যথা সময়ে পিয়ন চিঠি নিয়ে হাজির হলো । আমার হাতে দিল চিঠিটা । সেদিন আর কৌতুহল চেপে রাখতে পারলাম না ।ভাবলাম খুলে পড়েই দেখি একবার চিঠিটা । ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়ে নামহীন  চিঠিটা খুললাম।লেখা আছে ---


কল‍্যানেষু,


আপনি আমাকে চিনবেন না । আমি সুকমোলের বন্ধু।ওর কাছে আপনার কথা অনেক শুনেছি। জানি আপনার বাবা সেনাবাহিনীতে চাকরি করা ছেলের সাথে বিয়ে দিতে চাননি। কারণ যারা দেশের সুরক্ষা ক‍রে তারা প‍রিবারের জন্য সময় দিতে পারে না । তাদের জীবন বড় অনিশ্চিত। যেকোনো সময় মৃত্যু হাত ছানি দেয়। আপনার বাবা হয়তো ঠিক কাজই ক‍রেছিলেন। তাই আজ আপনি বিধবা  হওয়ার হাত থেকে বেঁচে গেলেন। বর্ডার সীমান্তে ঝামেলা লেগেছিল দুই পক্ষের সেনাবাহিনীর সাথে । তারই একটি গুলি এসে সুকোমলকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দেয়। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে সুকোমল ।আজ জাতীয় পতাকায় মুড়ে গান সেলুট দিয়ে ওর বডি বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর ওর ঘর থেকে আপনার ঠিকানা পেয়ে ,আপনাকে জানালাম ।সুকোমল আপনাকে খুব ভালো বাসতো।


ইতি


আপনার সুভ‍্যানুধায়ী।


চিঠিটা এক নিমেষে পড়ে ফেললাম আমি ।নিজের অজান্তে দু'চোখ দিয়ে জল ঝরে পড়লো ।এ চিঠি দিয়াকে দেখানো যাবে না । ওকে এতো কষ্ট আমি কিছুতেই পেতে দেব না ।তাই আমি চিঠিটা ছিঁড়ে ফেললাম ।তার পরিবর্তে আমি নিজেই সুকোমল হয়ে একটি চিঠি লিখে (টাইপ করে) ডাকবাস্কে ফেলে এলাম। ঐ দিন আর নামহীন চিঠিটা দিয়ার কাছে এলো না । সারাদিন ও অন‍্যমনষ্ক হয়ে । রইল । আমি সব বুঝেও চুপ করে  রইলাম। দুদিন পরে চিঠিটা এলো । চিঠিটা পড়ে ও খুব খুশি হলো ।


সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত প্রতি বছর দিয়ার জন্ম দিনে নামহীন চিঠিটা আমিই পাঠাই । জানিনা আমি ঠিক করছি  না ভুল করছি । কিন্তু আমার ভালোবাসার মানুষকে একটু খুশী দেখতে, একটু ভালো রাখতে আমি এই অন‍্যায় টুকু  করতে রাজি আছি ।

সমাপ্ত।
কলমে--পারমিতা।


২টি মন্তব্য:

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...