বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২০

বাৎসল্য (পিয়ালী চক্রবর্তী)

 


          গাজীপুর পৌঁছতে যে এত দেরি হবে তা বুঝতে পারেনি পার্থ | ট্রেনটা প্রায় পৌনে দুঘন্টা লেট | স্টেশন থেকে ওর বাড়ি ৪ মাইল দূরে | এখন রাত ১১ : ৪৫ বাজে | এত রাতে তো রিস্কা বা ভ্যান কিছুই পাওয়া যাবেনা |

          রাতটা কোনোমতে যদি কারুর বাড়িতে আশ্রয় পাওয়া যেত তাহলে ভালো হতো | এতদূর তো হেঁটে যাওয়া সম্ভব নয় | স্টেশনের সামনেই একটা চায়ের দোকান | দোকানদার তখন ঝাঁপ বন্ধ করছে | পার্থ তাড়াতাড়ি দোকানে গিয়ে দোকানদার ভদ্রলোককে অনুরোধ করল এক কাপ চায়ের জন্য |

          ভদ্রলোক চায়ের পাত্র আগুনে চাপাতে চাপাতে পার্থকে জিজ্ঞেস করলো: দাদা এত রাত্রে আপনি কোথায় যাবেন ? আজকে আবার অমাবস্যার রাত , তেনারা তো এই রাত্রেই তান্ডব শুরু করেন |

           দোকানদারের কথা শুনে পার্থর গা ছমছম করে উঠলো | ও বললো : আচ্ছা দাদা , কাছেপিঠে কোনো হোটেল বা ক্লাবে আমার আজকের রাতটা থাকার ব্যবস্থা করে দিতে পারেন ? আপনাকে তার জন্য আমি ভালো পারিশ্রমিক দেবো | আসলে আমি এখানকারই ছেলে , কিন্তু চাকরি সূত্রে কলকাতায় থাকি | আমার মায়ের খুব অসুখ , তাই মা কে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে এসেছি | আপনি দয়া করে আজকের রাত টা আমার কোথাও একটা থাকার ব্যবস্থা করে দিন |

          দোকানদার মৃদু হেসে বললো : যদি এখানে কোনো বাড়ি বা ক্লাব থাকতো তাহলে আপনি এতক্ষনে কি দেখতে পেতেন না ? এই এলাকার কয়েক মাইল এর মধ্যে কিচ্ছু নেই | আপনি বরং স্টেশনেই রাতটা কাটিয়ে দিন | এই বলে দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করে দোকানদার নিজের সাইকেলে চড়ে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেলো |

          পার্থ এখন পড়লো অকুল পাথারে | জনমানবহীন প্লাটফর্ম যেন তাকে গিলে খেতে আসছে |

         সহসা পিছনদিক থেকে একটা আওয়াজ শুনতে পেলো | সে ঘুরে দেখে কেউ একজন সাইকেল ভ্যান নিয়ে যাচ্ছে | পার্থ এই অমাবস্যার রাতেও যেন হাতে চাঁদ পেলো |

         "শুনছেন , ও ভাই , শুনুন না " বলে ভ্যানওয়ালা কে ডেকে থামালো সে | কাছে গিয়ে বললো "আমাকে একটু খালপাড় অবধি পৌঁছে দেবেন ? আসলে ট্রেন লেট করায় আমি এত রাত্রে এখানে এসে পৌঁছেছি | বাকি দু একজন যারা আমার সাথে এই স্টেশনে নেমেছে তারা নিত্যযাত্রী হওয়ায় তাদের রাখা সাইকেলে করে নিজেদের গ্রামের দিকে চলে গেছে | আমার গ্রাম খালপাড়ের একদম কাছে , আপনি যা পারিশ্রমিক চাইবেন আমি দেব | আমাকে পৌঁছে দিন |

          " ঠিক আছে , আপনি উঠে বসুন , আমি আপনাকে ঠিক জায়গামতো পৌঁছে দেব " , এই বলে ভ্যানওয়ালা পার্থর দিকে চেয়ে মুচকি হাসি দিলো |

            সেই হাসিতে কি যে ছিল , পার্থর গায়ের প্রতিটা রোমকূপ খাড়া হয়ে উঠলো | কিন্তু উপায় নেই | বাধ্য হয়ে ও ভ্যানে উঠে বসলো | ভ্যান চলতে শুরু করলো | সে কি বেগ , পার্থর মনে হচ্ছিলো সে যেন ছিটকে পড়ে যাবে | দুহাতে ভ্যানের কাঠগুলোকে চেপে ধরে বসে সে ভয়ে কাঁপতে লাগলো আর বলতে লাগলো " ভাই একটু আস্তে চালাওনা | আমি তো পড়ে যাবো " !!!

          পার্থর কথা ভ্যানওয়ালা কানেই নিলোনা | কিছুদূর গিয়ে পার্থর মনে কেমন একটা সন্দেহ হলো , " এই বাবলাগাছটার পাশ দিয়ে একটু আগেও গেলাম মনে হলো , আবার সেই বাবলাগাছটা কোথাথেকে এলো !!! " ভয়ে ওর হাড় হিম হয়ে গেলো |

          হঠাৎ সে দেখে ভ্যানটা এমনি এমনিই চলছে , ভ্যানওয়ালা কোনো প্যাডল করছেনা | এ কিকরে সম্ভব ? চোখটা ভালো করে রগড়ে নিয়ে দেখলো , ঠিকই , ভ্যান আপনা আপনি চলছে | ওর শিরদাঁড়া বেয়ে একটা হিমেল স্রোত নেমে গেলো | প্রানপনে ও রামনাম জপ করতে লাগলো |

          হঠাৎ ভ্যানওয়ালা মাথাটা পুরোপুরি পেছন দিকে ঘুরিয়ে পার্থর দিকে দেখলো , সেই দৃশ্য দেখে ওর হার্টফেল হবার উপক্রম | ভ্যানওয়ালা বলতে লাগলো : "ভয় পেলেন নাকি ? আমার নাম রহিম , স্টেশন চত্বরেই ভ্যান চালাতাম | ছোট্ট সুন্দর একটা পরিবার ছিল আমার | কিন্তু আল্লাহ আমার কপালে সুখ লেখেনি , একদিন রাত্রে বৌটার খুব পেটে ব্যাথা শুরু হলো , বাচ্চা ছেলেটাকে একা ঘরে রেখে বৌকে নিয়ে চললাম কুলতলির মাঠের পাশের ডাক্তারখানায় | সাথে বেশ কিছু টাকা ছিল | তা প্রায় হাজার দুয়েক হবে |

          পেছনে কিছু নেশাখোর বখাটে ছেলে পড়ে গেলো | ওরা বাইক নিয়ে আমাদের পথ আটকে দাঁড়ালো | আমার বৌয়ের গলায় ভোজালি ধরে আমার থেকে টাকা চাইলো | আমি দিতে অস্বীকার করায় ওরা চোখের সামনে আমার বৌটার গলায় ভোজালিটা এফোঁড় ওফোঁড় করে দিলো | আমি চিৎকার করতে শুরু করলাম , ওরা আমার মুখও চিরতরে বন্ধ করে দিলো | দেখবেন ? দেখবেন সেই দৃশ্য ? সহ্য করতে পারবেন তো ?"

             এই বলে রহিম ওর গায়ের চাদরটা সরালো , পার্থ আঁতকে উঠলো সেই দৃশ্য দেখে | রহিমের পেটের নাড়িভুঁড়ি সব বেরিয়ে গলগল করে রক্ত পড়ছে , আর বিকট চিৎকার করে রহিম আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে তুলছে |

           পার্থ ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলো , ও হাত জোড় করে বললো : "আমি তো তোমার কোনো ক্ষতি করিনি , আমাকে ছেড়ে দাও " |

          রহিম বললো : "আপনি আমার কোনো ক্ষতি করেননি , আপনি সত্যিকারের একজন ভালো লোক , সেই জন্যেই আপনার কাছে এসেছি | একটু দয়া করুন | আমার নয় বছরের বাচ্চাটাকে ছেড়ে তো আমরা দুজনেই চলে গেছি , ও রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করে খায় , স্কুল থেকেও তাড়িয়ে দিয়েছে ওকে , না খাবার ঠিক আছে না ঘুমোবার | আপনি দয়া করে ওকে কোনো শিশুকল্যাণ সমিতির হাতে তুলে দিন | নাহলে ছেলেটা আমার মরে যাবে দাদা |

          পার্থ ভূতে বিশ্বাস করতো , কিন্তু এর আগে কখনো স্বচক্ষে ভূত দেখেনি | ভূতের যে বাৎসল্যবোধ থাকে তা জেনে সে মুগ্দ্ধ হয়ে গেলো | রহিমকে ও কথা দিলো যে ওর বাচ্চার সব দায়িত্ব পার্থ নিজেই নেবে |

          এত সব ঘটনার মধ্যে দিয়ে কোন সময় পুবের আকাশ একটু একটু পরিষ্কার হতে শুরু করেছে | রহিম বললো , "দাদাবাবু সামনে তাকিয়ে দেখুন , খালপাড় এসে গেছে | আমি চলি , আপনার হাতে আমার কলিজার টুকরোটাকে সপেঁ দিলাম"  |

          এই বলে ভোরের আলোর সাথে রহিম বিলীন হয়ে গেলো |

          পার্থ বাড়ি পৌঁছে রহিমের ঘটনার সত্যতা যাচাই করেই সঙ্গে সঙ্গে রহিমের বাড়ি ছুটলো | সেখানে উঠোনে মাদুর পেতে শুয়ে ছিল রহিমের ছেলে জাহির | ঘুমন্ত জাহিরকে কোলে তুলে নিজের বাড়ি এসে ওকে পরম যত্নে খাওয়ালো , তারপর নিজের মাকে আর জাহিরকে সাথে করে বেরিয়ে পড়লো কলকাতার উদ্দেশ্যে | আজ ওর মনে হলো রহিমের বিদেহী আত্মা ওদের দিকে চেয়ে হাসছে |

©️All rights reserved
   Piyali Chakravorty

++++++++++সমাপ্ত+++++++++


৪টি মন্তব্য:

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...