মোবাইলে সেট করা অ্যালার্মের কর্কশ শব্দে ঘুমটা ভেঙে যায়। গতকাল রাত জেগে এসাইনমেন্ট পেপার রেডি করে সাড়ে চারটায় শুয়েছিলাম। এখন বাজে ছটা!পাশ ফিরে শুয়ে নতুন করে টাইম সেট করে আবার একটু ঘুমানোর চেষ্টা করি।আজ সোয়া সাতটায় প্রথম ক্লাসটি পি.কে.সি. স্যারের ম্যানেজম্যান্ট একাউন্টিং এর। এই সাবজেক্টে এমনিতেই বেশ দুর্বলতা আছে , তার উপর ক্লাস এটেন্ড না করলে কপালে জুটবে স্যারের শনি দৃষ্টি! ম্যানেজ করা যাবে, মনকে এই সান্ত্বনা দিয়ে ভাবতে ভাবতে চোখে আবারো ঘুম নেমে আসে।নাহ্, এবার শুধুমাত্র অ্যালার্মের কর্কশ আওয়াজ ই নয় সাথে মায়ের তারস্বরে চিৎকারও শুরু হয়েছে। আগের দিনই বলে রেখেছিলাম সকালের ক্লাসের কথা, যাতে ডেকে দেয়। চটজলদি উঠে রেডি হতে হতে একবার পরিচিত রিকশাচালক কে ফোন করে নিশ্চিত হই উপস্থিতি নিয়ে।গায়ে গলাবন্ধ সোয়েটার আর মাথায় কান ঢাকা টুপি পড়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে হঠাৎ করেই যেনো কে এসে উঁকি দিয়ে যায় মনের করিডোরে! উজ্জ্বল,ভাসা,ভাসা সেই গভীর দুটি কালো চোখ! যেন সাগরের অতল আহ্বান! মনে মনে বলি..হারামী!
হাড় কাঁপানো শীতের শীতল পরশ মেখে ব্যাটারি চালিত রিকশা কুয়াশা ভেদ করে তীব্রবেগে ছুটে চলেছে রাজপথ ধরে। রিকশার ব্যাটারির সেই একটানা ঘো ঘো শব্দে মনটা যেন আজ বারবার হারাচ্ছে অচিনপানে! কি করে হারামী টা এখন?! একটা দীর্ঘশ্বাস যেন অজান্তেই বেড়িয়ে আসে। কানে ইয়ার ফোন গুঁজে দিয়ে এফএম রেডিও চালু করি। গান শুনে যদি মনের ভাবালুতা একটু হলেও কাটে!? এই মুহুর্তে বাজছে ন্যান্সির সেই বিখ্যাত " ঝরা পাতা ঝরে যায়! আহারে কি মায়ায়..!" গানটি! সাড়ে চার বছর আগে, এমনই এক পাতা ঝরার দিনে, বিবিএ অনার্স উইন্টার সেশনের, ফার্স্ট সেমিস্টারের প্রথম ক্লাস ছিলো সেদিন। লাজুক আমি ক্লাসে ঢুকেই জড়োসড়ো হয়ে বসে ছিলাম থার্ড রোতে একদম দেয়াল ঘেঁষা সাইড টেবিল লাগানো চেয়ারে। পাশের সিট গুলো খালি পড়ে আছে দেখে মনে মনে খুশিও হয়েছিলাম। যাক,পাশে এসে কেউ বসবে না এটলিস্ট! প্রচণ্ড হাসির শব্দে পিছনে তাকিয়ে দেখি,কর্নারে দাঁড়িয়ে অন্য অনেকের মাঝে শিরোমনি হয়ে থাকা উজ্জ্বল কালো টলটলে দুটি চোখ আমার পানে চেয়ে হেসে চলেছে। একটু অবাক হয়ে দৃষ্টি ক্ষনিকের তরে ফিরিয়ে আবার তাকাতেই দেখি, সেই গভীর চাহনি! এবার হাস্যোজ্জ্বল নয়, কেমন যেন উদাসীন! তাকিয়ে আছে আমার দিকেই অপলক!
বাইরে ঘণ্টার শব্দে সজাগ হতেই দেখি পাশে এসে বসলো সে। কাঁধ পর্যন্ত বেয়ে নামা ঘন কোকড়াঁনো চুলে ভর্তি মাথাটা অদ্ভুত ভঙ্গীতে নেড়ে বলেছিল,"ফ্রেন্ড আজ থেকে। এক্ষেত্রে তোমার কোন চয়েজ নেই"। পাগল নাকি?! বন্ধু বললেই হলো?! এতো সহজ বন্ধুত্ব! সেই থেকে আঠার মতো লেগে থাকার শুরু। ক্যাম্পাসে যতক্ষণ থাকতাম সারাক্ষণ জ্বালাতো!কখনো ক্লাস মিস করলে বাড়িতে এসে হাজির হতো আর শুরু হতো আমার না যেতে পারার কারণ ব্যাখ্যা র ! ছুটির দিনে ওর স্কুটিতে চড়ে ঘোরাঘুরি করেই কাটতো অলস বিকেলের মুহুর্ত গুলি! জোড়া শালিক হয়ে ঘুরে বেড়াতাম এই শহরের যতো অচেনা অলি - গলি! প্রতিবার রাইডের আগে এক ঠোঙা বাদাম কিনে হাতে ধরিয়ে দিতো। সেই বাদাম খোঁসা ছাড়িয়ে মুঠোয় নিয়ে তার মুখে পুরে দেওয়া ছিলো আমার কাজ। রাগ করে বলতাম," ধুর! শুধুই এতো খাটাস! আর ঘুরবো না তোর সাথে"। এক দৃষ্টে চেয়ে হেসে বলতো, " ওটাতো হট সিট রে! জানিস না, ওই সিটে বসার লাইন কতো লম্বা"! সত্যিই তাই। সবকিছু উপেক্ষা করে সে শুধু আমার দিকেই ধাবিত হতো। সব বুঝেও না বোঝার ভান করতাম। কষ্ট বাড়িয়ে লাভ কি! দুজনের সবকিছুই যে বিপরীত ছিলো!
উত্তুরে হাওয়ায় রাস্তার দুধারে সারিবদ্ধভাবে লাগানো গাছের পাতারা সোনালী বর্ণ ধারণ করে কেমন যেন ঝরে ঝরে পড়ছে আর বাতাসে হালকা হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে আনমনে ব্যস্ত রাস্তার বুকে!ফাইনাল সেমিস্টার শেষে ব্যাচের সবাই মিলে গেছিলাম পাহাড়ী এলাকার এক রিসোর্টে দুদিনের জন্য।উদ্দেশ্য ট্রেকিং। রুম শেয়ার করতে হবে হারামীটার সাথে! চিন্তিত মনে রুমে ঢুকে দেখি, যা ভেবেছিলাম তাই। দিয়েছে ডাবল বেড। সেপারেট করার কোন চান্স নেই। ওর দিকে চেয়ে দেখি মুচকি হাসি নিয়ে দেখছে আমায়। রেগে বললাম, " তুই এক্ষুনি রুম চেঞ্জ কর। যা বানরের স্বভাব!হুটহাট ঘুমের ঘোরে গায়ের উপর এসে পড়িস, নয়তো নিজেই নিচে পড়ে চিতপটাং হয়ে থাকিস। গত তিনবারের অভিজ্ঞতা থেকে অনেক শিক্ষা হয়েছে। তোর লাথি - গুঁতো খাওয়ার কোন শখ নেই এবার"।
ক্যাম্পাসের প্রবেশ মুখটা বড়োই মনোমুগ্ধকর। দুপাশে সারি বেঁধে লাগানো দেবদারু, মেহঘনি, জারুল, শীল কড়ই আর ফাঁকে ফাঁকে থাকা রাধাচূড়া! পাতা ঝরার দিনে,এই পথ আজ ঝরা পাতার মর্মর ধ্বনিতে বিরহে কাতর যেন! ঘাড়ের কাছে ছয়মাসের পুরনো ক্ষতে আনমনে আঙ্গুল ছুইয়ে ধীরলয়ে পা বাড়ায় সামনে। ক্যাম্পাসে সবাই জেনে গেছে জোড়া শালিকের বিচ্ছেদের খবর!সে রাতে ওই পাহাড়ী রিসোর্টে, কেনো করলি এ রকম বল?! ভালই তো ছিলাম বন্ধু বেশে, সাথী হয়ে সর্বক্ষণ! আমার আধ খাওয়া সমুচা কিংবা কাটলেট, বেশী ঠান্ডায় খেতে না পেরে পাশে রাখা কোকের ক্যান তুই যে উদাসীনতার ভান করে খেয়ে ফেলতিস, তা দেখেও না দেখার ভান আমিও করতাম, ঠিক তোর মতো! ভালোই ছিলাম রে পরস্পরকে ফাঁকি দেয়ার এই খেলায়! কেন সে রাতে সারা জীবনের মতো ক্ষত উপহার দিলি?! হ্যাঁ,, ক্ষনিকের রাগে বলেছিলাম সম্পৰ্ক ছিন্নের কথা! তাই বলে তুই এভাবেই শেষ বিদায় বলে উড়াল দিবি দূর দেশে?! বৃক্ষরাজি গা থেকে পুরনো পাতা ঝরিয়ে ফেলছে, আগামী বসন্তে ফুলে - ফলে নব রূপে সাজবে বলে! তুই কি আসবি তবে ফিরে এই বসন্তে?! একবার এসেই দেখ!!!

অনেক দিন পর একটা ভাল গল্প পড়লাম👌👌👌
উত্তরমুছুন