#বিষয়- আধ্যাত্মিক আলোচনা
# নাম - দুঃখবাদ
জগৎ দুঃখময়। পৃথিবীতে জন্মালে দুঃখ বিনা পার্থিব জীবন হয় না। একে এড়িয়েও চলা যায় না। এর কারণ সম্বন্ধে মহাপুরুষগণের আলোচনা বহুমুখী। উল্লেখযোগ্য কারণ ভগবান বুদ্ধের কথায় - সকল দুঃখের কারণ 'তহ্না'- তৃষ্ণা। সাংখ্যকার কপিল মুনি এই নিয়েই আস্ত সাংখ্যতত্ত্বে আলোচনা করতে গিয়ে তিন রকম দুঃখের কথা বলেছেন। যথা-আধিভৌতিক,আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক। এই তিন কারণে দুঃখ এড়ানো যাবে না, তবে দূর করার নিরন্তর চেষ্টা করতে হয়। তার উপায়ও বলতে গাদা গাদা পুঁথি রচিত হয়েছে।
এই দুঃখের কারণ কী? কোথা হতে এর আবির্ভাব? সূত্রপাত কী? - এই সমস্তের মীমাংসা করতে হলে জগৎ সৃষ্টির ব্যাপারটির দিকে তাকানো যাক। দেখা যাবে এই দুঃখ আসার মূলে পাঁচটি অঙ্ক আছে। যথা -
প্রথম অঙ্কের যবনিকা উঠতেই দেখা গেল, পৃথিবী জড়পিন্ডবৎ হয়ে ঘুরছে। তার সবই জড়। কেবল জড়েরই লীলা। তাতে দুঃখের কোনো বালাই নেই।
এর দ্বিতীয় অঙ্কে পেলাম উদ্ভিদকে। প্রাণের আবির্ভাব ঘটল। তখনও দুঃখের লেশ মাত্র নেই।
এবার তৃতীয় অঙ্ক। এই অঙ্কে গাছেদের সঙ্গে যোগ হলো আরো নানা ধরনের প্রাণি। শত্রুহীন গাছেদের মাঝে নানা ধরনের প্রাণিরা গাছের উপর নির্ভর করে বাঁচার পথে সামিল হল। এখান থেকেই সুখ ও দুঃখের সূচনা হল। কেন না প্রাণের বৈচিত্র্য প্রকাশিত হলো একে অপরের উপর আধিপত্য বিস্তার থেকে। আর তা থেকে একে অপরকে হত্যায় লিপ্ত হলো। হত্যা তথা প্রাণহানি অবশ্যই দুঃখের কারণ। এল হার-জিতের ভাব। আর তখনই দুঃখ-সুখ একটা ভাবের রূপ পেল।
তবে এই দুঃখের প্রকাশ ছিল না বলে মারাত্মক মনে হতো না।
চতুর্থ অঙ্কে এলো মানুষ। মানুষ নানা ভাবগত সূত্রে নিজেদের চরিত্র তুলে ধরল। এই চরিত্রের স্বরূপে সব বিপরীত ভাবসকল(সুখ-দুঃখ,হাসি-কান্না,সাধু-অসাধু,সত্য-মিথ্যা,নম্র- উগ্র,কোমল-কঠোর...) নিয়ে মানুষ তার স্বভাব ও চরিত্র নিয়ে হাজির হলো।
এরই মাঝে বিশ্ব বিধাতা দৌত করে বুঝিয়ে দিলেন আদিপ্রাণ ও আবির্ভূত শেষ প্রাণের মধ্যে পার্থক্য থাকবেই। আদি প্রাণের উপর সবাইকে নির্ভর করতে হবে। গাছই সব প্রাণের অস্তিত্বের মূলে থাকবে। কিন্তু যদি সেই গাছের উপর কেউ চড়াও হয় তাহলে তার কপালে যথেষ্ট দুঃখ নেমে আসবে। গাছের প্রাণ আছে, চলন আছে, কিন্তু গমনের সৌভাগ্য নেই বলে তার উপরে অন্য সব প্রাণীদের নির্ভর করে থাকতে হবে। কেননা গাছের গমনের আনন্দ নেই বলে তাকে দেওয়া হলো সর্বশক্তিমান। বিশেষ করে মানুষ সবার শেষে বলে গাছের থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব নিয়ে পুরোপুরি নির্ভরশীল জীবন হয়ে থাকবে। এই গাছেদের ক্ষতি করলে গাছ কিছুই বলবে না,এর বল আখেরে মানুষকে ভুলতে হবে।
আর মানুষ সবের মধ্যে একটা ভাবের আনন্দ ও পীড়িত হওয়ার মধ্যে থাকবে। নিজের আচরণেই এই আনন্দ ও পীড়ন নির্ভর করবে। যেমন আচরণ তেমনি সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্নাকে নিয়ে চলতে হবে। কেবল মানুষ কথা বলতে পারবে বলে সকল জীবের দায় তার। তার উপর বর্তালো জগতের আধিদৈবিক, আধিভৌতিক ও আধ্যাত্মিক ভাব। যা থেকে আচরণ অনুযায়ী সূখ ও দুঃখের চক্রবৎ পরিবর্তন ঘটবে।
এই চতুর্থ অঙ্কে মানুষ জ্ঞানবাদী যত ভোগবাদী তত,আর দুঃখ ও আনন্দ সমান সমান। দুঃখ না হলে আনন্দ আসবে না। যেমন মৃত্যু না হলে জন্ম আসে না। জন্ম হলে মৃত্যু তো আসবেই।
মানুষ এই চতুর্থ অঙ্কে সবার মূলে - বস্তুতে বস্তুতে সংঘাতে মানুষ, মানুষে ও বস্তুতে সংঘাতে মানুষ,আর মানুষে ও মানুষে কে না জানে। যেদিন থেকে পশু শিকার করে মানুষ বাঁচতে শুরু করল সেদিন থেকেই দুঃখের অনিবার্য কারণ নেমে এলো। জীব হিংসা মহাপাপ,তা থেকেই যত দঃখ। কি বোঝা গেলো তো জগতে দুঃখের বোঝা কেমন- কেন সবের মূলে দুঃখ! কেন এখন চলছে ঘোরতর দুঃখের পালা!
এবার আসি পঞ্চম অঙ্কে দুঃখ থেকে মুক্তির উপায় বের করার নানা পথের নির্দেশের কথায়। তা থেকে শান্তি ও স্বস্ত্যয়নের কথায়। ও তো সব জানা কথা, কীভাবে দুঃখ থেকে মুক্তি পাব। মুক্তি পাওয়ার উপায় আদৌ নেই। বরং তাই প্রত্যাশিত ফল। দুঃখ থেকে মুক্তি পেতে দিব্য জীবন লাভ করতে হবে। কিন্তু জগৎ ও জীবন যে ব্যবহারিকতার দাসত্ব করতে জন্ম হয়েছে। তাই "দুঃখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহীতে?"
দুঃখ বিনা জগৎ অসম্পূর্ণ। দুঃখ না থাকলে দুঃখ ঘোচানোর সাধনার কি হবে!
তাই তো খ্রিষ্টও জগৎকে দুঃখের সার বলে জেনেছেন। তাই তো আমরাও বলি - "হে দারিদ্র্য তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রিস্টের সম্মান।" দারিদ্র ও দুঃখ বিনা জীবন হয় না বলে তাকে খ্রিস্টের মডেলে দেখে দুঃখকে বরণ করি, আনন্দের সঙ্গে মোলাকাত হবে বলে।
#কলমে~ মৃদুল কুমার দাস।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন