প্রত্যেকেরই জীবনে কোনো না কোনো সময় এমন কিছু ঘটনা ঘটে যার কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আমরা কোনোদিনও দিতে পারিনা । সেই ঘটনাগুলোকেই আমরা নাম দিয়ে থাকি অলৌকিক ঘটনা হিসেবে । সেরকম একটি ঘটনা আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই ।
সেকবছর রথযাত্রায় আমি আর সানা ( আমার একমাত্র কন্যাসন্তান ) বেঙ্গালুরুতে । খুব মন খারাপ করে বসে আছি কারণ রথযাত্রা সেখানে খুব একটা ভালো করে পালিত হয় না । কিন্তু প্রবল ভাবে মন টানছে একটিবার জগন্নাথ দেবের রথের দড়ি ধরে টানার ।
দুপুরের দিকে আমার এক বহু পুরোনো বান্ধবীর ফোন এলো । সে আমাকে বললো যে, সেও নাকি বেঙ্গালুরুতে আছে এবং তাদের বাড়িতে খুব ধুমধাম করে রথযাত্রা উৎসব পালন করা হয় । আমি যেনো সানাকে নিয়ে চলে যাই ওদের বাড়ি ।
মুহূর্তে আনন্দে আমার মন ভরে উঠলো । আমরা তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে পৌঁছে গেলাম সেই বান্ধবীর বাড়ি । ওর সাথে দেখা হতেই কুশল বিনিময় করে আমি ওকে জিজ্ঞাসা করলাম যে, অনেক দিন যোগাযোগ নেই আমাদের, আমার ফোন নম্বর ও কোথায় পেলো? আমি বেঙ্গালুরু আছি সেটা ও কিভাবে জানলো ?
ও বললো, আমার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে নাকি ও জানতে পেয়েছে আমার ফোন নম্বর আর সেখান থেকেই তথ্য পেয়েছে যে আমিও ব্যাঙ্গালুরুতে থাকি ।
ওর কথা শুনে আমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো , কারণ আমার তখন কোনো ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ছিলই না । মনে মনে ভগবান শ্রী জগন্নাথ দেবকে অনেক প্রণাম করলাম । আমার মত তুচ্ছ সন্তানের মনস্কামনা পূর্ণ করতেও যে তিনি সচেষ্ট তা ভেবে আনন্দের সীমা রইল না । চোখের জলে ভেসে সেদিন রথের দড়ি টেনেছি ।
আজ পর্যন্ত ওই ঘটনার কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাইনি ।
আরেকটি ঘটনা যা আজও আমাকে ভাবায় । ঘটনাটি নিম্নরূপ :-
একটি রাত্রের ঘটনা উল্লেখ
তখন আমার দশ কি এগারো বছর বয়স । সময়টা বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি । প্রচণ্ড গরম পড়েছিল সেদিন । আর গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো লোডশেডিং হয়ে গেলো । গরমে কেউ ঘরে শুয়ে ঘুমোতে পারছিনা । বাবা বলল, "চল মাম, আমরা ছাদে গিয়ে ঘুমোই ।"
বাবার কথামতো, আমি, মা আর বাবা ছাদে গেলাম ঘুমোতে । মাদুর, চাদর, বালিশ পেতে নিলাম ছাদের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় । আমাদের ছাদটা বিশাল বড়ো চৌকাকৃতির সাথে একদিক দিয়ে "এল" শেপের উপবৃদ্ধি যুক্ত ।
ফুরফুরে হাওয়া বইছে, গরমের চিহ্নমাত্র নেই । আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম ।
আমার হাতে সবসময় একটা রেডিয়াম ডায়াল ঘড়ি থাকতো, যেটা আমার ছোটকাকা আমেরিকা থেকে এনে দিয়েছিল । ঘুমের সময়েও ওই ঘড়ি হাতে থাকতো আমার । সেদিন ছাদে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ার বেশ কিছুক্ষণ পরে কেমন যেন একটা অস্বস্তি বোধ হতে লাগলো । উশখুশ করতে করতে চোখ খুলে তাকালাম চারদিকে । আমার একপাশে মা আর অপরপাশে বাবা শুয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছে ।
ঘড়িতে দেখলাম রাত ২:৫৬ বাজে । এদিক ওদিক চাইতে চাইতে হটাৎ ওই "এল" শেপের ছাদের দিকে নজর পড়তে দেখি, এক অতিকায় মানুষ, যার মাথায় ঝাঁকড়া চুল, বিশাল লম্বা উচ্চতা, চাঁদের আলোয় তার ফর্সা শরীরটা বেশ ভালোই বোঝা যাচ্ছে । আমি কিছুতেই ওই মানুষটির সাথে আমাদের বাড়ির কোনো লোকের চেহারার মিল পেলাম না ।
ভয়ে আমার হাত পা হীম হয়ে এলো । বাবাকে ধাক্কা মেরে সবে তুলতে যাবো, চকিতে দেখি সেই মানুষের আর কোনো অস্তিত্বই নেই আমাদের ছাদে । তবুও বাবাকে তুললাম ধাক্কা মেরে । ভয়ে চেঁচিয়ে কেঁদে কেটে অস্থির হয়ে পড়েছি তখন । কোনোমতে ভয়ার্ত কণ্ঠে বাবাকে সব ব্যক্ত করলাম । বাবা পৈতে দিয়ে আমার মাথায় জপ করে দিলো । খানিকটা ভয় কাটলো ।
তার কিছুক্ষণের মধ্যেই কারেন্ট চলে আসায় আমরা নীচে নেমে এলাম । নীচে এসে ওই মাঝরাত্রে আমার প্রিয়তমা, অনুপমা সাধের ঠাকুমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে সবকিছু বলে যেনো হালকা হলাম । সে তো আমার অবস্থা দেখে ভয়ে অস্থির । আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে ঘুম পাড়িয়ে দিলো ।
পরের দিন সকালে বুঝতে পারলাম আসল ব্যাপারটা । আমাদের বাড়িঘেঁষে একটা নিমগাছ ছিল । কিছুদিন আগেই আমাদের পাশের বাড়ি থেকে উদ্যোগ নিয়ে সেটা কাটিয়ে দিয়েছিল । সেই গাছে থাকতেন এক ব্রহ্মদৈত্য । ওই নিমগাছ কাটার ফলে তিনি গৃহহীন হয়ে পড়েছিলেন । তাই আমাদের বাড়ির যেদিকটায় ওই নিমগাছ ছিল, সেই দিকের ছাদে দাঁড়িয়েছিলেন উনি গতকাল রাত্রে ।
আমি জানি এই ঘটনা বেশিরভাগ মানুষ বিশ্বাস করবেন না । আর আমি বিশ্বাস করানোর প্রচেষ্টাও করবো না । কিন্তু , আলোর বিপক্ষে যেমন আঁধার আছে, ভালোর বিপক্ষে আছে মন্দ, ঠিক তেমনই দেবতার বিপরীতে আছে অপদেবতা ।
আরেকটি ঘটনা, যা আমাকে চিন্তাধারাকে ছোটবেলা থেকে তাড়া করে বেড়ায়, আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম :-
ছোট্ট মেয়ে স্নেহা | অনেকদিন ধরে শখ ওর মায়ের মামারবাড়ি ঘুরতে যাবে গ্রামে | গ্রাম কাকে বলে আগে কোনোদিন দেখেনি সে |
অ্যানুয়াল পরীক্ষার পর বায়না ধরলো , ' ও মা , তুমি যে বলেছিলে তোমার মামারবাড়ি ঘুরতে নিয়ে যাবে ! এখন তো পরীক্ষাও শেষ | চলোনা , একদিন ঘুরে আসি গ্রামে , তোমার মামারবাড়ি থেকে |
মেয়ে পুরো নাছোড়বান্দা | নাহঃ , এবারে নিয়ে যেতেই হবে ওকে একবার | স্নেহার মা সীমা মেয়ের বায়নার কথা স্নেহার বাবাকে জানালো | স্নেহার বাবা অবিনাশ মেয়ে অন্ত প্রাণ |
উনি সব শুনে বললেন , ' সত্যিই তো , ওকে কতদিন আগে থেকে প্রমিস করে রেখেছো | আমার এই সপ্তাহে একটা অফিস ট্যুর আছে জব্বলপুরে | দিন চার - পাঁচ তো লাগবেই ফিরতে | তুমি যাওনা , মেয়েকে নিয়ে ঘুরে এস তোমার মামারবাড়ি থেকে |
সীমা : আচ্ছা , তাহলে সেইমতো প্ল্যান করে তুমি যেদিন বেরোবে , সেইদিনই আমি ট্রেনে করে বসিরহাট চলে যাবো | ২-৩ দিন কাটিয়ে আসবো | বুবুনকে ফোন করে বলে দেব ও যেন এসে আমাদেরকে নিয়ে যায় |
প্ল্যানমতো সীমার মামাতো ভাই বুবুন চলে এলো অবিনাশদের বাড়ি | অবিনাশ অফিস ট্যুরে বেরিয়ে যেতেই , ওরা তিনজন রওনা হলো শিয়ালদহ স্টেশনের উদ্দেশ্যে |
স্নেহার তো দারুন মজা | লোকাল ট্রেনে আগে কোনোদিনও চড়েনি ও | খাবার , খেলনা যা যা বিক্রি করতে ফেরিওয়ালা উঠছে , ওর সব চাই |
ট্রেনে করে বসিরহাট পৌঁছতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেলো | তিনজনে একটা ভ্যানে করে যখন সীমার মামারবাড়ি গিয়ে পৌঁছলো , তখন রাত হয়ে গেছে |
বড়মামা , বড়মামী , ছোটমামা - ছোটমামী আর তাদের ছেলে - মেয়ে সবাই মিলে এসে সীমা আর স্নেহাকে ঘিরে ধরলো |
বড়মামী : কতদিন পরে এলি সীমা , সেই ওর অন্নপ্রাশনের সময় দেখেছি ! কত বড়ো হয়ে গেছে রে ! কি মিষ্টি দেখতে হয়েছে ! আয় আয় , ঘরে এসে জামাকাপড় পাল্টে নিয়ে বোস |
সবাই স্নেহাকে নিয়ে খুব মেতে উঠেছে | স্নেহাও খুব মজা পাচ্ছে ওদের আদর আর ভালোবাসায় | ঘরে গিয়ে জামা পাল্টে হাত মুঝ ধুয়ে ওরা সবাইকে সাথে নিয়ে জুত করে বসলো |
ছোটমামী ওদের জন্য পুকুরে টাটকা মাছভাজা আর কফি নিয়ে এসেছে | বর্ধিষ্ণু পরিবারে কিছুরই অভাব নেই , বরং বেশ বিলাসিতার চিহ্ন ফুটে উঠছে |
ওর মামারা আগে জমিদার ছিলেন , রায়চৌধুরী খেতাব পাওয়া আছে ওনাদের | কিন্তু এত স্বচ্ছল হওয়া স্বত্তেও বাড়িটা যেন কিরকম ভাঙাচোরা | বাড়ির ভেতরটা যতটা সুন্দর , বাইরে থেকে দেখলে যেন ঠিক উল্টো মনে হয় |
কিছুক্ষন গল্প করার পর স্নেহা ওর মায়ের কানে কানে বললো , ' মা , টয়লেট যাবো | '
আর ঠিক সেই মুহূর্তে লোডশেডিং হয়ে গেলো | কুপকুপ করছে অন্ধকার | গ্রামের মানুষ এসবে অভ্যস্ত , কিন্তু সীমা অন্ধকারকে খুব ভয় পায় |
বড়মামী একটা মোমবাতি নিয়ে , স্নেহাকে সাথে করে নিয়ে গেলো টয়লেটে | বাথরুমের দরজাটা খোলাই রাখতে বলে , মামী কল থেকে জল আনতে গেছেন |
স্নেহা টয়লেটে সবে ঢুকেছে , হটাৎ ও দেখলো ওর সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন এক অতি বৃদ্ধা মহিলা |
মোবাতির আলো - আঁধারিতে স্নেহা দেখলো ওনার হাতে ধরা রয়েছে একটা ঝাঁটা , সাদা শনের মতো চুলগুলো খোলা , ঝাঁকড়া | আর চোখে এক অদ্ভুত আক্রোশ | জ্বলজ্বলে চোখে উনি একদৃষ্টে চেয়ে আছেন স্নেহার দিকে | তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে লাগলো অশক্ত নড়বড়ে শরীরটা নিয়ে স্নেহার দিকে |
হাড়হীমকরা সেই আক্রোশপূর্ণ দৃষ্টিতে ভয় পেয়ে স্নেহা তারস্বরে চিৎকার করে উঠলো , ' মাআআআআ ...'
বড়মামী ওই আর্তচিৎকারে জলের বালতি ফেলে তাড়াতাড়ি বাথরুমের সামনে গিয়ে দেখে স্নেহা অজ্ঞান হয়ে বাথরুমের মেঝেতে পড়ে আছে |
স্নেহার চিৎকার শুনে সীমা আর বাড়ির সবাই এসে বাথরুমের সামনে এসে দেখে বড়মামী ততক্ষণে স্নেহার মুখে-মাথায় জলের ঝাপ্টা দিয়ে জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করে চলেছেন | কিন্তু ও সম্পূর্ণরূপে অচেতন |
মেয়েকে দেখে সীমা চিৎকার করে কাঁদতে লাগলেন |
পাড়ার বৃদ্ধ ডাক্তারের বাড়ি ততক্ষনে খবর পৌঁছে গেছে | ডাক্তার এসে ভালো করে পরীক্ষা করে বুঝতে পারলেন যে স্নেহা মারাত্মক ভয় পেয়ে জ্ঞান হারিয়েছে | ওর হার্টবিট খুব দ্রুত হারে চলছে |
কেন স্নেহা ভয় পেলো ! কেনই বা অজ্ঞান হলো , যতক্ষণ না ওর জ্ঞান আসছে , ততক্ষন পর্যন্ত কিছুই বোঝা যাচ্ছে না | কিছুক্ষন পরে ডাক্তারের চিকিৎসায় সাড়া দিয়ে , স্নেহা চোখ মেলে তাকালো |
সীমা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে মেয়েকে আদরে আদরে ভরিয়ে তুললেন |
স্নেহার দৃষ্টিতে তখন আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট |
সবাই জিজ্ঞাসা করতে লাগলো , ' কি দেখে তুই অমনভাবে চিৎকার করেছিলিস মা ? '
স্নেহা ভয়ার্ত কণ্ঠে বললো , আমি দেখলাম , একটা বুড়ি , তার সাদা চুলগুলো খোলা ঝাঁকড়া , হাতে একটা ঝাঁটা নিয়ে আমার দিকে বড়ো বড়ো চোখে চেয়ে আছে | ওর চোখ দিয়ে যেন আগুন বেরোচ্ছিল | বুড়িটা আমার দিকেই এগিয়ে আসছিলো | '
স্নেহার কথা শুনে সবাই যেন কেঁপে উঠলো | বড়মামা থপ করে মাটিতে বসে পড়লেন | সীমা কিছু বুঝে উঠতে পারছিলোনা কেন এরকম করছে সবাই ?
বড়মামীকে জিজ্ঞাসা করতে উনি বললেন , ' স্নেহা গিন্নি মা কে দেখেছে | '
সীমা : উনি কে হন ? তোমাদের বাড়িতেই থাকেন ?
বড়মামী : উনি আমাদের পাশের বাড়িতে থাকতেন | প্রচন্ড কলহপ্রিয়া ছিলেন | নিত্যদিন আমাদের সাথে ঝগড়া বিবাদ লেগেই থাকতো ওনার | কালা -জাদু তে পটিয়সী ওই মহিলা মারণ - উচাটন বিদ্যার প্রয়োগে অনেকের জীবন শেষ করেছেন | উনি গতকাল রাত্রে মারা গেছেন | এতটাই পাপাত্মা ছিলেন যে , শ্মশানে দাহ করার সময় ওনার মুখটা পোড়াতে পারা যায়নি | ওনার বদ আত্মা তার মানে এই বাড়ির আনাচে কানাচে ঘুরেছে , মরার পরেও উনি আমাদেরকে শান্তিতে থাকতে দেবেন না |
সেই রাত কোনোমতে কাটিয়ে পরেরদিনই প্রথম ট্রেনে সীমা মেয়েকে নিয়ে কলকাতায় ফিরে আসেন | জীবনেও দ্বিতীয়বার আর মামারবাড়ি মুখো হননি |
ঘটনাটি সম্পূর্ণ সত্য | স্নেহা আর কেউ নয় , সে আমি নিজেই | গল্পের খাতিরে শুধুমাত্র নাম এবং স্থান পরিবর্তন করলাম | আমার মায়ের মামারবাড়িতে গিয়ে এই বিপদের সম্মুখীন হয়েছিলাম | বাড়ি ফিরে আসার পর টানা পনেরোদিন অসুস্থ ছিলাম | দয়াময়ের অশেষ কৃপায় বেঁচে ফিরি সে যাত্রা |
Copyright©️All Rights Reserved
Piyali Chakravorty

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন