শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২০

প্রেতপুরী পর্ব - ৫ (শেষ পর্ব) (পিয়ালী চক্রবর্তী)

 



Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty
প্রাথমিক পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট এসে গেছে | আশ্চর্যজনকভাবে হত্যাকারীর কোনো সূত্রই পাওয়া যায়নি | না একটা ফিঙ্গারপ্রিন্ট , না কোনো দেহজ বস্তু , না কোনো আনুষাঙ্গিক দ্রব্য যা দেখে হত্যাকারী সম্পর্কে কোনো কিছু ধারণা করা যেতে পারে |

এতোবছরের চাকরি জীবনে অফিসার এই প্রথম এরকম রহস্যজনক মৃত্যুর কেস পেলেন | বিচলিত হয়ে উঠলেন উনি | ঠিক করলেন আবার সেই বাড়িতে গিয়ে আরো ভালো করে তল্লাশি চালাবেন , যদি কিছু পাওয়া যায় |

জীপ নিয়ে , সাথে দুজন কনস্টেবলকে নিয়ে উনি আবার বেরিয়ে পড়লেন ওই বাড়ির উদ্দেশ্যে | বাড়ির সামনে পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমে এসেছে | দুজন কনস্টেবলকে ওপরের ফ্লোরে অনুসন্ধান করার জন্য পাঠিয়ে উনি নিজেই রান্নাঘর আর খাবার ঘরের গিয়ে বিভিন্ন ভাবে পরীক্ষা করতে লাগলেন |

হঠাৎ রান্নাঘরের জানালাটা সশব্দে খুলে গেলো , অফিসার চমকে উঠলেন | জানালার বাইরে চেয়ে দেখলেন একটা কালো কুকুর এসে দাঁড়িয়েছে , আর করুন শুরে কাঁদছে | মুহূর্তের জন্য অফিসারের শিরদাঁড়া দিয়ে ভয়ের ঠান্ডা স্রোত নেমে গেলো |

পিস্তলটা উঁচিয়ে উনি শান্ত অথচ দৃঢ় পদক্ষেপে বাইরে বেরিয়ে গেলেন | রান্নাঘরের পিছন দিকটায় গিয়ে সেই কুকুরটাকে আর দেখা গেলো না | দুঁদে পুলিশ অফিসারও এখন ধ্বন্দে পড়ে গেলেন | সত্যিই কি অশরীরী বলে কিছু আছে ! সত্যিই কি কোনো অতৃপ্ত আত্মা এখানে উপস্থিত |

দ্রুত উনি দুজন কনস্টেবলকে ডেকে নিলেন , কারণ একা থাকতে ওনার ভয় করতে শুরু করেছিল | এবারে উনি গুরুজীকে ফোন করে ওখানে ডেকে পাঠালেন সাথে  বিকাশ , প্রশান্ত , অয়ন আর অনিলকেও |

ওরা সবাই এসে পৌঁছতে অফিসার ওদেরকে জানালেন যে , প্রাথমিক পোস্ট মর্টেম রিপোর্টে কিছু খুঁজে পাওয়া যায়নি |

গুরুজী অফিসারের কথা শুনে অট্টহাস্যে ফেটে পড়লেন , ' যা জাগতিক নয় , তাকে পাবেন কি করে আপনি ? এখনো সময় আছে , বিশ্বাস করে নিন , নাহলে পস্তাবেন | আরও নিরীহ লোকের প্রাণ যাবে এই অবিশ্বাসের কারণে | '

অফিসার : আপনি প্রমান করে দেখতে পারবেন যা বলছেন তা সত্যি !

গুরুজী : আপনি যদি অনুমতি দেন তাহলে আমি এখানে প্ল্যানচেটের মাধ্যমে জানার চেষ্টা করতে পারি এই বাড়িতে কে আছে ! কেনই বা সে অতৃপ্ত !

অফিসার : প্ল্যানচেট করতে গিয়ে কারুর কোনো ক্ষতি যদি না হয় তাহলে আমি অনুমতি দিতে পারি , আর হ্যাঁ , আমি এই প্লানচেটের মধ্যে উপস্থিত থাকতে চাই , নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস হবেনা আমার | আপনি ব্যবস্থা করুন |

গুরুজী বললেন , ' এর জন্য আমার কয়েকটা জিনিসের দরকার | একটা তিন- পা ওয়ালা টেবিল , কয়েকটা মোমবাতি , আর একটা খাতা ও পেন্সিল | আমার সাথে আরো দুজন থাকবে | আমি হবো "চক্রপতি" অর্থাৎ আত্মার সাথে যোগাযোগের মাধ্যম আর বাকি দুজন আমার সহায়তা করবে |

গুরুজীর কথামতো সমস্ত ব্যবস্থা করা হলো | প্রশান্ত স্যার আর অফিসার ওনার সহায়তা করবে | প্রেতের সঙ্গে আলাপচারিতার আদিমতম প্রক্রিয়াতেই গুরুজী আজকে এই বাড়ির অতৃপ্ত আত্মাকে আহ্বান জানাবেন |

টেবিলের মাঝখানে তিনটি মোমবাতি জ্বালিয়ে , টেবিলকে তর্জনী দিয়ে স্পর্শ করে তিনজন বসলেন | ঘরের সব আলো নিভিয়ে দেওয়া হলো | অফিসার আর বিকাশকে বলে দেওয়া হলো ওরা যেন একমনে বলতে থাকে , ' এই বাড়িতে যদি কোনো অতৃপ্ত আত্মা থেকে থাকেন , দয়া করে আমাদের কাছে আসুন | '
আর গুরুজীও একমনে ধ্যান করতে লাগলো |

পনেরো মিনিট কেটে গেছে | বাকি যারা ছিলেন তারা বাইরে অপেক্ষা করতে করতে অধৈর্য হয়ে উঠেছেন | আরও প্রায় মিনিট কুড়ি পর হটাৎ বন্ধ ঘরের মধ্যে মৃদু হীমশীতল বাতাস বইতে লাগলো | গুরুজী বুঝে নিলেন কেউ এসেছে |

গুরুজী : আপনি কে ? কেন আছেন এখানে ?

গুরুজীর কথায় টেবিলটা ঠকঠক করে নড়তে শুরু করলো | মোমবাতিগুলোর শিখা কাঁপতে লাগলো | অফিসার আর প্রশান্ত স্যার ভয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে , আর গুরুজী প্রশ্ন করে চলেছেন , ' আপনি কেন রাজনীশকে হত্যা করলেন ? কি চান আপনি ? '

প্রশ্ন করতে করতে গুরুজী হটাৎ স্থির হয়ে গেলেন | ওনার চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠলো | বামহাত দিয়ে খাতাটা টেনে নিয়ে ডানহাতে পেন্সিল তুলে নিলেন | তারপর ওই সাদা পাতায় ফুটে উঠতে লাগলো এক রোমাঞ্চকর কাহিনী |

মিঃ শিবরাজ গাইতোন্ডে আর মিসেস দিশা গাইতোন্ডে মুম্বাই শহর থেকে গোয়ায় এসে বসবাস শুরু করেন কুড়ি বছর আগে | ওনাদের বিয়ের সবেমাত্র একবছর হয়েছে তখন | মিঃ গাইতোন্ডে ওনার স্ত্রীকে খুব ভালোবাসতেন | যাকে বলে একদম বৌ- অন্ত প্রাণ |

মুম্বাই থাকতে মিসেস দিশা বেশ ভালোই ছিলেন | কিন্তু গোয়ায় আসার পর থেকে গোয়া শহরের চমক আর রঙিন দুনিয়ার মাঝে পড়ে উনি দিন দিন কিরকম বদলে যেতে লাগলেন |

শিবরাজ ছিলেন একজন পেশাগত লেখক | সেইসূত্রে বিভিন্ন জায়গায় ওনাকে পার্টি বা সামাজিক সমাবেশে অংশগ্রহণ করতে হতো | উনি সাথে ওনার স্ত্রীকেও নিয়ে যেতেন | কিন্তু ওনার স্ত্রী যে ওনারই এক প্রকাশকের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন তা উনি ঘুনাক্ষরেও টের পাননি |

যত দিন যায় , ওনার স্ত্রী বদলে যেতে থাকেন | শুধু ওই প্রকাশকই নয় , সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষদের সাথে উনি নিষিদ্ধ সম্পর্কে লিপ্ত হয়ে যান | স্বামীর প্রতি ওনার অবহেলা বাড়তে থাকে | এমনও দিন আসে যেসব দিনগুলোয় দিশা রাত্রে বাড়িও ফিরতেন না |

শিবরাজের সাথে কোনোরকম শারীরিক সম্পর্কেও দিশার চূড়ান্ত অনীহা দেখে শিবরাজের মনে ধীরে ধীরে সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে | কিন্তু উনি নিজের স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসায় এমন অন্ধ হয়ে ছিলেন যে কোনো সন্দেহকেই মনে পুষে রাখতে পারেননি |

এভাবেই দিন কাটতে থাকে , রাত আসতে থাকে | এরকমই একটা সন্ধ্যেবেলায় শিবরাজ নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে বাড়ি ফিরছিলেন | ভাগ্যও হয়তো ওনার প্রতি অবিচার করে ফেললো | সামনে থেকে আসা একটা ট্রাকের ব্রেকফেল হয়ে যাওয়াতে সোজা এসে ধাক্কা মারে শিবরাজের গাড়িতে |

হসপিটালে জ্ঞান ফিরতে উনি ওনার ডানদিকের হাঁটুর কাছে প্রচন্ড জ্বালা - যন্ত্রনা অনুভব করেন | তখনো উনি জানেননা যে ওনার ডান পা - টা হাঁটুর নিচ থেকে কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে |

যখন জানতে পারলেন , কান্নায় ভেঙে পড়লেন , ' কোন পাপে আমাকে এ শাস্তি দিলে ভগবান ! আমি তো কোনোদিন জ্ঞানতঃ কারুর কোনো ক্ষতি করিনি | এত নির্দয় হতে পারলে তুমি ! এর থেকে তুমি আমার প্রাণটা কেড়ে নিতে পারতে | সারাজীবন প্রতিবন্ধী হয়ে বেঁচে কি লাভ ! '

সেই দিন , সেই মুহূর্তে ভগবানের প্রতি ওনার সব বিশ্বাস চিরকালের মতো বিনষ্ট হয়ে গেলো |

এরপর কেটে গেলো প্রায় তিনমাস | এই তিনমাসে দিশা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে | ও নিজের পুরুষ সঙ্গীদেরকে বাড়িতে আনতেও শুরু করে দিয়েছে | একদিন দুপুরবেলা যখন দিশা বারান্দা সংলগ্ন ঘরটায় নিজের সঙ্গীর সাথে প্রেমলীলায় মত্ত , সেই সময় শিবরাজ কোনোক্রমে ক্র্যাচেসে ভর দিয়ে সেই ঘরে এসে উপস্থিত হয় |

দরজাটা ভেতর থেকে ছিটকিনি না লাগানো থাকায় শিবরাজের এক ধাক্কায় সেটা খুলে যায় | সঙ্গে সঙ্গে সেই পুরুষ সঙ্গীটি ভয়ে - লজ্জায় পালিয়ে যায় |

শিবরাজ ঘরের ভেতরে এসে রাগে - ক্ষোভে - দুঃখে ফেটে পড়ে | ক্রাচের একঘায়ে ওনার স্ত্রীকে ধরাশায়ী করে , মারতেই থাকেন , মারতেই থাকেন যতক্ষণ না পর্যন্ত ওনার স্ত্রীর প্রাণ না বেরিয়ে না যায় | তারপর উনি বারান্দার দিকে চলে গেলেন , আর ওখান থেকে নিচের পাথুরে মেয়েটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন | দুর্বল শরীর থেকে প্রাণ বেরোতে বেশি বেগ পেতে হলোনা ওনার |

তার পর থেকে এই বাড়িতেই দুজনের আত্মা বিচরণ করে | দিশার দুরাত্মা কোনো পুরুষমানুষকে এখানে শান্তিতে থাকতে দেয়না | আগেও যারা যারা এই বাড়িতে থাকতে এসেছে , তাদেরকেও হয় ভয়ে পালতে হয়েছে , নতুবা মারাত্মক জখম হতে হয়েছে |

শিবরাজের আত্মা চেষ্টা করেও কাউকে পাপী দিশার স্পর্শ থেকে রক্ষা করতে পারেননি | তাই উনি এই বাড়িতে আসা লোকজনকে ভয় দেখাতেন , যাতে দিশার শয়তানি আত্মা তাদের কোনো ক্ষতি করার আগেই তারা ভয়ে এই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায় |

গুরুজীর হাত থেমে গেলো | লেখা শেষ হলো | গুরুজী অজ্ঞান হয়ে টেবিলের ওপর পড়ে গেলেন |

অফিসার আলো জ্বালাতে গিয়েও আলো জ্বললো না | মোমবাতির আলো কাঁপতে কাঁপতে নিভে গেলো | কোনো মহিলা কণ্ঠস্বর মারাঠি ভাষায় হিসহিসিয়ে বলতে লাগলো , তুই আগের দিন আমাকে অপূর্ণ রেখে চলে গেছিলিস , আজ তোর আমার হাত থেকে পরিত্রান নেই | তোদের রাঁধুনীও আমাকে অপূর্ণ রেখেছিলো সেইজন্যেই ওকে মরতে হয়েছিল | আজ তোর পালা |

প্রশান্ত স্যারের গলায় প্রবল চাপ অনুভূত হতে লাগলো | অফিসারের চোখের সামনে ঘটনাগুলো ঘটায় ওনার আর অবিশ্বাসের কোনো অবকাশ রইলোনা | হঠাৎ দমকা হাওয়ায় প্রশান্ত স্যার ছিকটে গিয়ে মাটিতে পড়লো | ওনার বুকের ওপরে কেউ যেন চেপে বসেছে | দম বন্ধ হয়ে আসছে ওনার |

অফিসার খুব চেষ্টা করতে লাগলো গুরুজীর জ্ঞান ফেরানোর | ওই অন্ধকারেই কোনোভাবে হাতড়ে হাতড়ে জলের বোতল খুঁজে নিয়ে গুরুজীর চোখে - মুখে জলের ঝাপটা দিতে লাগলো |

সবাই শুনতে পেলো খট খট করে কোথাও থেকে ক্র্যাচেস এর শব্দ ভেসে আসছে | শিবরাজের আত্মা এবারে দিশার আত্মাকে প্রতিহত করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলো | কিন্তু দিশার বদ আত্মার সাথে শিবরাজ পেরে উঠছিলেন না |

ইতিমধ্যে গুরুজীর জ্ঞান ফিরে এলো | প্রশান্ত স্যারের তখন নাক - মুখ দিয়ে রক্ত বেরোতে শুরু করেছে | ওই অন্ধকারের মধ্যে অবস্থা আন্দাজ করে গুরুজী নিজের ব্যাগ থেকে সুদূর উত্তরপ্রদেশের কাশী থেকে আনা বাবা বিশ্বনাথের মন্ত্রপূত জলের ছিটা দিতে লাগলেন |

আর্তনাদ করে দিশার আত্মা প্রশান্ত স্যারকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো | কিন্তু , গুরুজী ততক্ষনে বুঝে গেছেন , এই আত্মাদুটি প্রবল শক্তিশালী | এদেরকে মুক্ত করা ওনার পক্ষে সম্ভব হবেনা | এই বাড়িতে আর কারুর কোনোদিন না আসাই বাঞ্ছনীয় | গুরুজী অফিসারকে অনুরোধ করলেন এই বাড়িতে যাতে আর কেউ কোনোদিন এসে থাকতে না পারে তার ব্যবস্থা করতে | প্রশান্ত স্যারকে হসপিটালে দেবার পর উনি খানিকটা সুস্থ হয়েছেন |

আজও ওই বাড়িতে কেউ বসবাস করেনা | দিশার আত্মা প্রতি মুহূর্তে অপেক্ষায় আছে কোনো পুরুষ শরীরের |
Copyright©All Rights Reserved
Piyali Chakravorty

সমাপ্ত ..............


২টি মন্তব্য:

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...