অফিস
থেকে বাড়ি ফিরেই নিজের ঘরে গিয়ে তুলির খোঁজ খবর নেওয়া রনির প্রথম কাজ | আজ ফিরতে অনেকটা দেরি হয়ে গেলো | কে জানে আমার পাগলিটা কি করছে বাড়িতে | মা আছে সাথে , তবুও রনির মনটা আজকে উচাটন |
বাড়ি ঢুকেই গেলো নিজের ঘরে , ' তুলি ....ও আমার তুলতুলি ....কই ....বলতে বলতে ঘরে ঢুকে তুলির দেখা পেলোনা | ভাবলো হয়তো বাথরুমে আছে বা বারান্দায় | না কোনো জায়গাতেই নেই | তাড়াতাড়ি ও ছুটলো ছাদের দিকে | ছাদের সিঁড়িতে তো তালা দেওয়া | তাহলে কোথায় গেলো !!! রান্নাঘর , মায়ের ঘর সব জায়গায় দেখলো রনি | কোত্থাও পেলোনা তুলিকে |
ওর মা কে জিজ্ঞেস করলো তুলিকে শেষ কখন দেখেছে ? মা বললো দুপুর ৩ টে নাগাদ ওর ঘরে ওকে ঘুম পাড়িয়ে তারপর মা নিজের ঘরে ঘুমোতে গেছিল |
এখন বাজে ৬:৩০ | তার মানে তুলি একা একা কোথাও বেরিয়ে গেলো !!! চিন্তা এসে গ্রাস করলো রনিকে |
রণজয় আর তুলিকার বিয়ে হয়েছে প্রায় দেড় বছর | তুলি বিয়ের আগেই থেকেই একটু আনমনা ধরণের মেয়ে | প্রায় সময় অনেক কথা ভুলে যেত | ওদের গত ৬ বছরের সম্পর্কে থাকতেই রনি বুঝেছিলো তুলি একটু অন্য রকম |
কিন্তু যেরকমই হোক না কেনা ওরা একে অপরকে এতটাই ভালোবাসতো যে তুলির সামান্য ভুলো মনের জন্য ও কখনই তুলির থেকে নিজেকে সরিয়ে নেবার কথা কল্পনাও করতে পারতোনা | গত একবছর ধরে তুলির ভুলে যাওয়া স্বভাবটা খুব বেশি বেড়ে যাচ্ছিলো |
ওকে একদিন মানসিক ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলো রনি | ডাক্তার তুলিকে দেখে সবধরণের পরীক্ষার পর জানালো তুলির আলঝাইমার্স | এটি একটি এমন মানসিক ব্যাধি , যাতে মানুষ ধীরে ধীরে সব কিছু ভুলতে থাকে | যত দিন যায় এই ভোলার প্রবণতাও বেড়ে যায় | আর দুর্ভাগ্যবশত এই রোগের কোনো ট্রিটমেন্ট এখনো বেরোয়নি | এই রোগাক্রান্ত মানুষেরা লাস্ট স্টেজে নিজের নাম , পরিচয় , নিকট আত্মীয় এমনকি নিজের বাবা- মা - স্বামীকেও ভুলে যেতে পারে |
ডাক্তারের কথা শুনে রনির পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাবার অবস্থা | তুলিকে এখন সবসময় নজরে রাখতে হবে | ডাক্তারবাবুর কথা মতো ওকে সবসময় আনন্দে রাখতে হবে , নিয়মিত ওষুধ পথ্য খাওয়াতে হবে | এক লহমায় রনির জীবনটা পুরো পাল্টে গেলো |
আজ অফিস থেকে ফিরে, বাড়িতে তুলিকে না পেয়ে রনি পাগলের মতো হয়ে উঠলো | তুলির একটা ছবি সাথে করে ও বেরিয়ে পড়লো রাস্তায় | সামনে যাকেই পেলো তাকেই ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করতে লাগলো , ' কেউ কি এনাকে দেখেছেন ? ' কেউই কোনো খবর দিতে পারলোনা | তারপর ও ছুটলো থানায় |
থানায় গিয়ে তুলির শারীরিক অবস্থার কথা বর্ণনা করে ও কাঁদতে শুরু করলো , ' দয়া করে আমার তুলিকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনুন স্যার , ওকে বাড়িতে কোত্থাও খুঁজে পাচ্ছিনা | অসুস্থ , কত রকম বিপদ হতে পারে ' |
পুলিশ রনিকে আস্বস্ত করে বাড়ি পাঠিয়ে দিলো | বাড়ি ফিরে ও এক মুহূর্তও শান্তি পাচ্ছিলোনা | এঘর ওঘর করতে করতে ও গেলো সিঁড়ির নিচে যেখানে জুতো রাখা থাকে | তুলি জুতো পরে বেরিয়েছে কিনা দেখতে গেলো | দেখলো তুলির জুতো রাখা আছে | খালি পায়েই বেরিয়েছে ও |
রনির বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো | যে মেয়েটা নরম জুতো ছাড়া পরতেও পারেনা , সে এখন কত কষ্ট পাচ্ছে খালি পায়ে বেরিয়ে |
নিজের ঘরে এসে বিছানার ওপর ক্লান্ত ভাবে বসে পড়লো ও | মা চা নিয়ে এসেছে , ' রনি , পুলিশ ঠিক খুঁজে আনবে তোর তুলি কে | সন্ধ্যে থেকে এত দৌড়ঝাঁপ করছিস , একটু কিছু খেয়ে না সোনা ' |
মা কে দেখে রনি চমকে উঠলো , মায়ের চোখের নিচ থেকে ওপরের ঠোঁট পর্যন্ত চেরা দাগ | যেন কেউ নখ দিয়ে ভীষণভাবে আঁচড়ে দিয়েছে |
' কি হয়েছে মা !!! এইভাবে তোমাকে আঁচড়ালো কে ? ' মা - ' ও কিছু নয় , আমি হয়তো ঘুমের ঘোরে জোরে চুলকে ফেলেছি ' |
এই বলে তাড়াতাড়ি বাইরে বেরিয়ে গেলেন রনির মা অনিমাদেবী |
রনির মনে কেমন একটা সন্দেহ হলো | কিন্তু সারাদিনের ক্লান্তি আর ঘুম ওকে পেয়ে বসেছে | আজ রাত্রে আর কিছু খাবেনা, মা কে জানিয়ে দিয়ে ও শোবার ঘোরে চলে এলো ,
বালিশে মাথা দিতে যাবে , এমনসময় দেখে বালিশের ওপর কয়েকফোটা শুকিয়ে থাকা রক্তের দাগ | রক্ত এখানে কি করে পড়লো !!!
ওর গা টা কিরকম গুলিয়ে উঠলো | বাথরুম গিয়ে হড়হড় করে বমি করে চোখে মুখে জল ছিটিয়ে বেরোলো তাড়াতাড়ি | বেরিয়েই সোজা গেলো মায়ের ঘরে |
মাকে শক্ত করে ধরে চোখে চোখ মিলিয়ে ও জিজ্ঞাসা করলো , ' মা , তুলি কোথায় ? কি হলো বলো আমার তুলি কোথায় ? কি করেছো ওকে তুমি ? তুমি সব সত্যি করে বলো মা , নাহলে তোমাকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে আমি দুবার ভাববো না ' |
অনিমা দেবী কান্নায় আর ক্ষোভে ফেটে পড়লেন , ' আমি মেরেছি , আমি তোর তুলিকে শেষ ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছি | যবে থেকে ওই মেয়েটা তোর জীবনে এসেছে তুই আমাকে ভুলে গেছিস , ভুলে গেছিস যে কত কষ্ট করে আমি ছোট থেকে তোকে আগলে রেখেছি | তোকে সমস্ত সুযোগ সুবিধা দেবার জন্য সারাদিন কত পরিশ্রম করেছি | তোর বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে তোকে কোনোদিন আমি বাবার অভাব বুঝতে দিয়েছি বল ?
আর সেই তুই কিনা ওই একরত্তি পাগলী মেয়ের জন্য আমাকে ভুলে গেলি !!! তোর বৌয়ের চাকর করে রেখেছিস আমাকে , আমার কোনো সুবিধা অসুবিধার কথা জিজ্ঞেস করেছিস কোনোদিন ? আমার কোনো কষ্ট , ব্যাথার জন্য কেঁদেছিস কোনোদিন ? আর ওই মেয়েটাকে একদিনের জন্য কাছে না পেয়ে কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করছিস ?
তাহলে একবার ভাব , ও আসার পর থেকে তুই আমার থেকে কত দূরে চলে গেছিস ? একদিনের ঘৃণা নয় , যেদিন থেকে ওই মেয়ে তোর জীবনে এসেছে , সেদিন থেকে তিলে তিলে বেড়ে ওঠা ঘৃণার ফল আজকের হত্যা | হ্যাঁ , আমি স্বীকার করছি , আমিই মেরেছি ওই কালনাগিনী কে , যে আমার থেকে তোকে কেড়ে নিয়েছে |
আজ দুপুরে তুলি তোদের বিয়ের ছবিগুলো দেখছিলো ঘরে বসে , আমি গিয়ে পেছন থেকে ওর গলায় নাইলনের দড়ি দিয়ে চেপে ধরি , ও ছটফট করতে থাকে , বাঁচার চেষ্টা করতে থাকে , ও যত ছটফট করে আমি আরো চেপে ধরতে থাকি , মরার আগেই নখ দিয়ে আমার মুখ চিরে রক্তারক্তি করে ফেলে , তাও আমি ছাড়িনি |
যখন ও নিস্তেজ হয়ে পড়লো , ওর শরীরটাকে নিয়ে আমার ঘরের বক্স খাটের ভেতরে ঢুকিয়ে রাখি ' |
কোথায় ? বক্স খাটের ভেতরে ? এই বলে রনি লাফিয়ে উঠলো আর সঙ্গে সঙ্গে খাটের ওপরের গদিটা একঝটকায় টেনে মাটিতে ফেলে , ওপরের ডালা ধরে টান দিয়ে ওঠাতেই দেখলো তুলি শুয়ে রয়েছে ভেতরে |
তাড়াতাড়ি ওর শরীরটাকে বার করে তুলির গালে মুখে ধরে জোরে জোরে ঝাঁকাতে লাগলো আর বলতে লাগলো , ' একবার চোখ খুলে দেখো , আমি বাড়ি এসেছি অফিস থেকে , চলো একসাথে আমরা বারান্দায় গিয়ে বসবো | একটিবার চোখ খুলে দেখো সোনা | '
রনি কাঁদতে কাঁদতে ওর তুলির মুখে জলের ঝাপটা দিতে লাগলো |
হঠাৎ যেন তুলির ঠোঁটদুটো একটু কেঁপে উঠলো | ' তুলি ...... তুলি ...... বলে চেঁচাতে চেঁচাতে রনি তাড়াতাড়ি অ্যাম্বুলেন্সে ফোন করলো |
হসপিটালের বেডে যখন তুলির জ্ঞান ফিরলো , রনির আর খুশির সীমা রইলোনা |
কিছুক্ষনের মধ্যেই পুলিশ এলো তুলিকে জিজ্ঞসাবাদ করতে | মিসেস তুলিকা রায় , আপনার এই অবস্থা হলো কি করে ? কে বা কারা এর জন্য দায়ী ? সব বলুন আমাদেরকে | কোনো কিছু লুকিয়ে রাখবেন না |
তুলি বললো , ' স্যার , আমার এই অবস্থার জন্য আমিই দায়ী , আমার একটা মানসিক অসুখ আছে , আলঝাইমার্স , সেই জন্য কিছুদিন ধরে অবসাদে ভুগছিলাম , তাই আজকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলাম | কিন্তু সঠিক সময়ে আমার স্বামী এসে আমার প্রাণ বাঁচিয়েছে |
সব শুনে তুলিকে উপদেশ দিয়ে ইন্সপেক্টর চলে গেলেন | তুলির প্রতি রনির ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা শতগুনে বেড়ে গেলো | আরো কিছুক্ষন পরে রনি তুলিকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলো |
বাড়ি এসে বারংবার বেল দিতে দিতেও ওর মা দরজা খুললনা | অনেক ডাকাডাকির পর আশেপাশে ফ্ল্যাটের লোকেরা আওয়াজ শুনে বেরিয়ে এলো | সবাইমিলে রনিদের দরজা ধাক্কা দিয়ে ভেঙে ফেললো |
দৌড়ে গিয়ে ওর মায়ের ঘরে ঢুকেই রনি দেখে সিলিং ফ্যান থেকে ওর মা গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছে | আর নিচে বিছানার ওপর একটা চিঠি পড়ে রয়েছে |
চিঠিতে লেখা , ' রনি , আমি তোর তুলিকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিলাম , আমার মতো পাপী মানুষের ছায়া যেন তোর ওপর আর না পড়ে তাই তোর থেকে অনেক দূরে চলে যাচ্ছি | আমাকে ক্ষমা করে দিস | আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয় - ইতি তোর ক্ষমাপ্রার্থী মা |
©️All rights reserved
Piyali Chakravorty
+++++++++++++সমাপ্ত+++++++++++++

দুর্দান্ত, অসাধারণ গল্প। 👌
উত্তরমুছুন