#গল্প: ঝরা পাতা
#কলমে:শুভ্রজিত চক্রবর্তী
All Rights Reserved © Subhrajit Chakravorty
বিনয়ের শুধু নাম টাই বিনয় নয়, স্বভাবেও খুব বিনয়ী। জীবনে কারুর সাথে উচ্চবাক্যে কথা বলেনি। কঠোর পরিশ্রমী। সারাদিনে ১২ ঘন্টা রিক্সা চালায়। লিক লিকে চেহারা। গায়ে তিন হাতির জোর। গত দশ বছর ধরে রিক্সা চালায় এই ছোট্ট শহরে বিনয়। ভোর বেলা একটা ট্রেন ঢোকে স্টেশনে। সেটার যাত্রী ধরতে ৫ টায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। শেষ ট্রেন রাত ৮ টায়। বাকি দিনটা শহরের ভেতর রিক্সা চালায়। মাঝখানে খেতে গিয়ে বাড়িতে একটা ঘুম দেয়। এভাবেই চলে যাচ্ছে বিনয়ের জীবন। ছোটবেলাতেই বিনয় অনাথ হয়েছে। তিনকুলে কেউ নেই। বিয়েটাও করতে পারছে না।
ঘোষ বাবুকে যেদিনই বাজার থেকে বাড়ি পৌঁছায়, সেদিনই উনি বলেন, "কি রে বিনয়? তোর জন্য পাত্রী দেখবো তো বল!"
বিনয় বলে, "বাবু, বিয়ে করে বউকে কি খাওয়াবো?"
বিনয়ের যে বিয়ে করার ইচ্ছে নেই তা নয়। কিন্তু ভাবে, যেদিন সে পাতা ধরতে পারবে, আর কোটিপতি হয়ে যাবে পাতা ধরে, সেদিন বিয়ে করবে।
বিনয়ের বিশ্বাস, গাছের ঝরে যাওয়া পাতা মাটিতে পড়ার আগে লুফে নিতে পারলে, মানুষ কোটিপতি হয়ে যায়। কোথা থেকে শুনেছে সে নিজেই জানেনা। হয়তো স্কুলের বন্ধুদের কাছ থেকে শুনেছিলো। হ্যাঁ, আমাদের বিনয় একবার স্কুলে ভর্তি হয়েছিলো। ওর মা-বাবা বেঁচে থাকতে ওকে পাঠশালায় ভর্তি করিয়েছিলেন। কোন ক্লাস অবধি পড়েছে, সেটাও ওর পরিষ্কার মনে নেই। বিক্ষিপ্ত এক দুটো স্কুলের ঘটনা মনে আছে শুধু বিনয়ের। সেখানেই কোনো এক বন্ধু বলেছিলো যে পাতা ঝরার ঋতুতে যদি কেউ পাতা মাটিতে পড়ার আগেই ধরে নিতে পারে, তাহলে সে রাতারাতি কোটিপতি হয়ে যাবে। তখন থেকেই বিনয়ের মাথায় বসে গেছে যে একদিন ও পাতা ধরবে আর বড়লোক হবে।বিনয় পাতা ধরতে পারেনি এরকম নয়। একবার ধরেছিলো, কিন্তু সেটা ছিলো বর্ষাকাল। আর সে জন্যই সম্ভবত ওর অবস্থার উন্নতি হয়নি। পাতা ঝরার আসল ঋতু কোনটা সে জ্ঞান ওর নেই। এক কলম বিদ্যে নেই যে পেটে!
একদিন ঘোষ বাবুকে নিয়ে ফেরার সময় জিজ্ঞেস করেছিলো, "বাবু, গাছের পাতা কখন ঝড়ে?" ঘোষ বাবু বলেছিলেন , "শীতকালে।"
শীতকাল আসে যায়, বিনয়ের আর পাতা ধরা হয় না।
সেদিন ঘোষবাবুকে নিয়ে ফিরছিলো বিনয়। কথার মাধ্যমে ঘোষ বাবু যখন জানতে পারলেন যে বিনয়কে বাড়ি গিয়ে রান্না করে খেতে হবে। তখন থেকেই বিনয়ের জন্য পাত্রী খুঁজতে শুরু করেছিলেন। দু-চারদিনের মধ্যেই পাত্রীর সন্ধান পেয়ে গেলেন।
ঘোষ বাবু বিপত্নীক হয়েছেন অনেক বছর আগেই। এক ছেলে সেও বিদেশে পাড়ি দিয়েছে অনেক বছর। বিশাল বাড়িতে একাই থাকেন। বিনয়ের একটা হিল্লে করতে পারলে যেনো শান্তি হয়। মালা এসে দুবেলা রান্না করে দিয়ে যায়। মা মরা মেয়েটাকে বড়ই ভালোবাসেন উনি। খুব মায়াবী মুখ। মালার বাপটা দিন রাত মদ খেয়ে পড়ে থাকে। মালার সাথেই বিনয়ের বিয়ে দেবেন বলে ঠিক করেছেন। কিন্তু বিনয়টা যে কিছুতেই রাজি হচ্ছে না বিয়ে করতে।
একদিন ঠিক করলেন যে আজকে বিনয়কে রাজি করিয়েই ছাড়বেন। একদিন বাজার থেকে ফেরার সময় বিনয়কে চেপে ধরলেন। বললেন, "বুঝলি বিনয়, কাল আমার জন্মদিন। কাল রাতে আমার ঘরে খাবি। মালা খুব ভালো রান্না করে। মেয়েটাও বড়ো ভালো। কাল রাতে কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করে চলে আসবি।"
বিনয় যে কিছুই বুঝতে পারেনি তাও নয়। মালার কথা আরও অনেক শুনেছে ঘোষ বাবুর কাছ থেকে। দু একবার দেখেওছে মালাকে সে। কিন্তু এখনও যে সে পাতা ধরতে পারেনি! আবার ঘোষ বাবুর আবদার হোক বা আদেশ, বিনয় ফেলতে পারেনি। রাজি হলো আসতে।
রাতে খেতে এসে সে মালাকে দেখলো। যদিও আগেও দেখেছে দু একবার, কিন্তু ঘোষ বাবুর উদ্দেশ্য জানার পর, মালাকে দেখে একটু যেনো লজ্জাই পেলো সে। ওদেরকে খাইয়ে মালা বাড়ি চলে যায়।
পরদিন মালার মনের কথাও জানলেন উনি। মালাও রাজি বিয়েতে। রাজি না হয়েই বা যায় কোথায়? না হলে যে ওর বিয়ে টাই হবে না!
দিনক্ষণ দেখে বিয়ে ঠিক করে ফেললেন। কিন্তু এখনো বিনয় পাতা ধরতে পারেনি। দেখতে দেখতে বিয়ের দিন এসে হাজির। দুদিন পর বিয়ে। ঘোষ বাবুই বিয়েটা দেবেন। বিনয় ঘোষ বাবুকে জিজ্ঞেস করে, "বাবু, এখন কি পাতা ঝরার দিন? " ঘোষ বাবু হ্যাঁ বলেন।
বিনয় সুবিধা মতো গাছ খুঁজে পাচ্ছিলো না। ওর হঠাৎ খেয়াল হয়, ঘোষ বাবুর বাড়ির সামনেই ছাদের গা ঘেষে একটা বিশাল নাম না জানা গাছ। দু একটা পাতা বাকি রয়েছে এখনো। ওটা থেকে ওকে পাতা ধরতেই হবে। কিন্তু কিভাবে? পাতা ধরার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে লোকে যদি চোর ভাবে?
পরিকল্পনা করে বিয়ের আগেরদিন রাত টা ঘোষ বাবুর বাড়িতে থাকার অনুমতি নিয়ে নিলো। পুরো ছক টা কষে নিলো কিভাবে ওই গাছ থেকে পাতা ধরা যায়। আগে থেকে জেনে নিলো যে ভোরের দিকেই পাতা ঝরে বেশি। গাছে মাত্ৰ একটা পাতা বেঁচে আছে। যে কোনো সময় সেটা ঝরতে পারে। রাতের বেলা তাড়াতাড়ি খেয়ে ঘোষ বাবুকে হাত পা টিপে ঘুম পাড়িয়ে তিনতলার ছাদে চলে গেলো বিনয়। চাঁদের আলোয় পাতার দিকে লক্ষ্য রাখতে শুরু করলো। ছাদের একদম ধারে দাঁড়িয়ে রইলো বিনয়, কখন পাতা ঝরবে আর ও লুফে নেবে সেটা। রাতারাতি সে বড়লোক হয়ে যাবে আর পরম সুখে সংসার করবে মালার সাথে। ওর সারাজীবনের স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। ওর পুরো বিশ্বাস, আজকে ও পাতা ধরবেই।
ঘোষ বাবু অঘোরে ঘুমোলেন সারারাত। পরের দিন উনার স্নেহের মালার বিয়ে উনার পুত্রসম এবং একমাত্র কাছের লোক বিনয়ের সাথেই। উনি ঠিক করে রেখেছেন, বিয়ে দিয়ে, ওদেরকে নিজের কাছেই রেখে দেবেন এবং সেটা বিয়েতে ওদেরকে উপহার স্বরূপ বিয়ের পর ঘোষণা করবেন। সম্পত্তির মূল্য নেই নেই করেও কয়েক কোটি টাকা হবে। মরার আগে উইল করে দিয়ে যাবেন ওদেরকে। দুটো প্রাণীকে সংসার করিয়ে দেবেন, যদি মৃত্যুর পর স্বর্গবাস হয়। জীবনে তো কারুর জন্যই কিছু করতে পারেন নি। এক ছেলে, সেও প্রায় ভুলেই গেছে।
ভোর বেলা বাড়ির সামনে লোকজনের আওয়াজে ঘোষ বাবুর ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ভাঙতেই মনে পড়ে, আজকে মালা আর বিনয়ের বিয়ে। বিনয়কে হাঁক দিলেন, সাড়া না পেয়ে, নিজেই দরজা খুললেন। পাশের বাড়ির সেন বাবু উনাকে বাইরে ডাকলেন। বাইরে গিয়ে যা দেখলেন, তাতে উনার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেলো, মনে হলো আকাশ ভেঙে মাথায় পরে গেছে। সাধ করে বানানো গেটের ওপর যে রড গুলো বেরিয়ে রয়েছিলো সেগুলোর ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে আছে বিনয়। চোখ ফ্যালফ্যাল করে নিথর দেহে শুয়ে আছে। দেহে কোনো প্রাণ নেই। কেউ কেউ বলছেন ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে সে। পুলিশ এসে দেহ টা নামালো। ঘোষ বাবু দাঁড়িয়ে দেখছিলেন, গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বিনয়কে, বিনয়ের হাতের মুঠোয় একখানা পাতা ধরা রয়েছে।
(পাতা ধরতে গিয়ে ছাদথেকে পড়ে গিয়ে বিনয়ের মৃত্যু হয়েছে)
All Rights Reserved © Subhrajit Chakravorty

খুব ভালো লিখেছেন। গল্পটি পড়ে ভালো লাগলো।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ
মুছুনGalpo ya pore 1tu dukho peya gelam. Binoy k crorepati bania dite parte
উত্তরমুছুনআমিও ভাবছি, বিনয় কোটিপতি হলো না কেনো?
মুছুনখুব ভালো হয়েছে। গল্পের নামকরণ 'ঝরা পাতা' একেবারে স্বার্থক হয়েছে। লেখাটা শেয়ার করার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ🙏 অনেক অনেক শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন রইল তোমার জন্য। 😇😇😇😇
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। এভাবেই পাশে চাই।
মুছুনদুর্দান্ত। সমৃদ্ধ হলাম 🙏🏻♥👌🏻👌🏻
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। পাশে থাকার অনুরোধ রইলো
মুছুনKhub sundor
উত্তরমুছুনধন্যবাদ।
মুছুনআজ কাল বোকা হয় এত কেউ!
উত্তরমুছুনএত বোকা হয় কেউ ! কিংবা কুসংস্কার প্রিয়। লেখা ভালো।।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। পাশে থাকবেন।
মুছুনবেশ অভিনব গল্পের কাঠামো।গোটা গল্পটাই ছিল টানটান।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ ম্যাডাম, পাশে থাকবেন।
মুছুন