# বিষয় -বড় গল্প
# নাম - 'বোবা সানাই'
#কলমে - মৃদুল কুমার দাস।
আমি বোবা। নাম বিশ্রুতি মেইকাপ।
জন্ম দু'হাজার সালে। দু'হাজারি মেয়ে আমি। শুনেছি এই '2K' সালের পয়লা তারিখে যারা জন্মেছিল তার জন্য নাকি আর্থিক মাপকাঠি বিচার করে বিশ হাজার টাকা সরকার পুরস্কৃত করেছিল বহু বাবা মাকে। আমার সে ভাগ্য হয়নি। তবে আমি তার চেয়েও আরো বেশি ভাগ্যবতী, তারিখটা একুশে ফেব্রুয়ারী বলে। অর্থ দিয়ে সব ভাগ্য বিচার তা আমি মনে করি সত্যিই তা দুর্ভাগ্য। আমার খুব গর্ব হয় এই দিনটার জন্য,আমি জন্ম-বোবা ও আন্তর্জাতিক ভাষাদিবসে আমার জন্ম বলে।
সমাজের চোখে আমি বড়ই করুণার পাত্রী। জানেন আমার অসহায় অবস্থা বড্ড মালুম হয় সবার। চারপাশের সবাই আমাকে নিয়ে বড্ড আহা উহু করে। আমার জীবন আর পাঁচটা স্বাভাবিক জীবনের থেকে আলাদা বলে নাকি তাদের দরদ বড্ড উপচে পড়ে। আবার তাতেই নাকি ভালবাসায় মন ওঠে।
জানেন ভালবাসায় আমার একটা কেমন আপেক্ষিক আপেক্ষিক গন্ধ লাগে। ভালবাসার দাতা, গ্রহীতার চেয়ে বেশি খুশি হয়। প্রত্যেকে দাতা ও প্রত্যেকে গ্রহীতা বলে আপেক্ষিক লাগে তাই।
'মহাত্মা গান্ধী ডেফ অ্যান্ড ব্লাইন্ড ওয়েল ফেয়ার সোসাইটি' - বোবা ও কালাদের সংস্থা। গান্ধী আশ্রম নামেই বেশি নাম ডাক।
সনাতন সথপতি সংস্থার পরিচালক। একদিন বাড়িতে এসে অনেক করে আমার বাবা মাকে বললেন - "আপনাদের শিশুটিকে দিন, আমাদের সংস্থায়। ওকে মানুষ করে তুলব। অনেকের সাথে থেকে ও মানুষের মতো মানুষ হয়ে উঠবে।
সনাতন সথপতির প্রস্তাবে ডেফ অ্যান্ড ব্লাইন্ড হোম বা সংস্থার হাতে তুলে দিতে চাননি।
পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে এই হোম। হোম সম্পর্কে তাঁদের খুব একটা জানা নেই। প্রস্তাবে মনে হয়েছিল পরের হাতে সন্তান তুলে দেওয়া মানে পিতা-মাতা হিসেবে সবচেয়ে অযোগ্য বলে মেনে নেওয়া। গাঁ ঘরে ছি ছিক্কার পড়ে যাবে। আর ঐটুকু দুধের শিশুকে মানুষ করা পরের কম্ম নয়। খবরের কাগজে কত খবরই না বেরোয়, হোমের শিশুকে বিক্রি করে দিয়েছে। তাই নিয়ে হোম ভাঙচুর।
সনাতন সথপতিরা আমার দেখভালের বিকল্প হতে পারেন এ বিশ্বাস আমার বাবা মায়ের ছিলনা। তার উপর সংস্কারের বেড়া। আর তাঁদের বাৎসল্যের একান্ত আশ্রয় যে আমি। নিজেদের সন্তানকে অপরের হাতে তুলে দিতে তাঁদের মন তাই চায়নি।
সংস্থার দিদিমণি রেখা কুন্ডু। তিনি নিজেকে সেবিকা হিসেবে মা বাবার চেয়েও কোনো অংশে কম নন, মায়ের কাছে প্রমাণ দিতে আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন। ঐ তো বয়স। বেশ লম্বা। টানা টানা চোখ। নীলপাড় কাপড় পরেছিলেন। পায়ে হিল তোলা জুতো। সনাতন সথপতির সঙ্গে এসেছেন। কথায় বোঝাতে চান তিনি এতোগুলো বোবা ও কালা ছেলে মেয়ের দেখভাল করছেন, মায়ের চেয়েও অনেক বেশি শিশু মানুষ করায় অভিজ্ঞ। কারণ তিনি যে এই বিষয় নিয়ে ট্রেনিং প্রাপ্ত এক্সপার্ট।
কিন্তু বাবার বক্তব্য- "সন্তান আমাদের। সন্তানকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার কষ্ট কে বুঝবে?" এই কথাটাই দিদিমনির অহংয়ে লাগল। চুপ একেবারে। চোখে মুখে ব্যর্থতার ছাপ। নিজেদের লক্ষ্যভ্রষ্ট তিরন্দাজীর মতো মনে হয়েছিল। ওরা ফিরে যান। তারপরেও আরো কতবার নানা সূত্র ঘুরে ফিরে এসেছে আমাকে হোমে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
দেখতে দেখতে আমি বড় হচ্ছিলাম। বাবা আমাকে নিয়ে খুব দিশেহারা বোধ করতেন। ছেলে হলে না হয় ঠিক ছিল, কিন্তু মেয়ে যে। বিয়ে থা, শ্বশুর বাড়ি, সংসার, সন্তানের মা হওয়া - এতো একটা মেয়ের জীবনের এক একটা নবজন্মের অধ্যায়। ঠাকুরকে দোষারোপ করে বলেন বাবা - "হে ভগবান আমার মেয়েটা গতজন্মে কী পাপ করেছিল? এজন্মে তার ঐ বাকেন্দ্রিয়ের কর্মক্ষমতা কেড়ে নিলে!"
কন্যাদায়গ্রস্থ পিতার চেয়েও অনেক কষ্ট বাবার, আমি সারাজীবন বাবার কাছে আটকে গেলাম বলে !
ভগবান মুখে কথা না বসানোয় ভুলে যেতে পারেন, কিন্তু আমাকে বাকি সব দিক দিয়ে যেন ঢেলে সাজিয়ে ছিলেন। মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত এত সুন্দর করে শিল্পীর মতো একমনে গড়েছেন যে আমার কোনকিছুই বাকি রাখেননি।
সবচেয়ে সুদৃশ্য আমার হাত ও পায়ের আঙুল। মাথা ভর্তি চুল। নাক টিকালো। গোল মুখে চওড়া কপাল। হাসলে গাল টোল খায়।
ফর্সা ততটা নই। আবার একেবারে কালোও নয়। বাবা মা কালো। বাবা কালো বলে,কালো মাকে পছন্দ করেছিলেন। ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত। ঐ যে আছে কালোই জগত করে আলো। কালো মেয়ের পায়ের তলে আলোর নাচন কী সব কথা আছে না, বাবা বন্ধুদের বলতেন। বিয়ে নিয়ে কত হাসি মস্করা করতেন। মা কোলে নিয়ে শুতে শুতে যে সব মজার গল্প করতেন। এও একটা বেশ জমাটি গল্প ছিল। তবে নিজের জীবনের গল্প কোনো দিন বুঝতে দিতেন না। এতো সুন্দর করে বলতেন, মনে হতো সত্যি সত্যি কোনো গল্প। আমার ঘুমপাড়ানি গল্প।
(২)
বয়স দশ পর্যন্ত পড়াশোনার কোনো প্রশ্নই ছিল না। আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশার আলো দেখা কারো পক্ষে সম্ভব ছিল না। যাই হোক মা কিন্তু একদম হতাশ নন। বরং আমাকে নিয়ে তাঁর দিব্যি সময় কাটে। আমার দৈনন্দিন জীবনের সব চাহিদা মা-ই একমাত্র ভালোভাবে বুঝতে পারতেন।
নবীন কাকু, নবীন সান্ধকি। বাবার ছেলেবেলার বন্ধু। তিনি বি ডি ও দিয়ে চাকরি জীবন শুরু করেছেন। বদলির চাকরি। বদলি হয়ে এসেছেন। হলদিয়া মহকুমায়। গান্ধী আশ্রমের উপদেষ্টা সদস্য।
ওনার দপ্তরে একদিন বাবা বিশেষ কাজে গিয়েছিলেন। পুরনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলে ঠিক যেন উথলে ওঠা দুধের মতো আবেগ। যেমন পরিবার, ছেলে মেয়ে ইত্যাদি।
তিনি একদিন বাবাকে বললেন- "সনাতন সথপতির এই দায়িত্ব নেওয়াটা গ্রহণ করে নে। তুই জানিস না হ্যানডিক্রাফটদের জন্য অনেক সরকারি সাহায্য থাকে। ওরা তার সব জানে। খোঁজ খবর রাখে। সরকারি সাহায্য আসে অনেক। এরা এন জিও হিসেবে কাজ করে। মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়ে দেবে এরা।"
"ইতিমধ্যে খোঁজখবর নিয়ে জেনেছি ওদের আশ্রমের যথেষ্ট সুনামের কথা।কিন্তু ওর মাকে যে একটুও বোঝাতে পারা যাচ্ছে না। একদিন বাড়িতে আসার নিমন্ত্রণ রইল। ওখানকার উপদেষ্টা সদস্য হয়ে বোঝালে ওর মা বুঝতে পারে। তাহলে হয়তো রাজি করানো যাবে।" বাবার এই কথাগুলোতে বেশ অনুরোধ ঝরে পড়েছিল।
"ঠিক আছে একদিন যাবো!" খুব আন্তরিক হয়ে বললেন।
একদিন সত্যি সত্যি নবীন কাকু এলেন বাড়িতে। সেদিন রোববার। সকাল দশটা নাগাদ। আমি তখন দাওয়ায় বসে। মা আখের কুচি একটা বাটিতে দিয়েছেন খেতে। আপন মনে বেশ চিবিয়ে চিবিয়ে রস নিচ্ছি। নবীন কাকুকে দেখে আমি নির্লিপ্ত। আপন মনে আখ চিবিয়েই যাচ্ছি। কাকু বাবাকে ডাকছেন। আর আমাকে দেখছেন।
মা রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন এক হাত ঘোমটা টেনে। ঘোমটার আড়াল থেকে বললেন - "উনি বাড়িতে নেই। এই এখুনি একটু বাইরে গেলেন।"
"বৌঠান ও আমায় বাড়ীতে ডেকেছিল। ঠিক আছে পরে আসবো।"
" না, না আপনি বসুন।"
বলে চেয়ার দিলেন বসতে। আর নবীন কাকু আমাকে তারিয়ে তারিয়ে দেখছেন। আমার ভয় করলো। ছুটে গিয়ে মায়ের পেছনে লুকিয়ে পড়লাম।
একটু পরে বাবা হন্তদন্ত হয়ে বাড়ীতে ঢুকছেন। বাড়ীতে নবীন কাকুকে দেখে তখনো ক্ষোভ যেন থামছেই না। সামনে যেন শোনানোর কাউকে চাইছিলেন। নবীন কাকুকে পেয়ে বলেই যাচ্ছেন -
"ছি ছি বামুন হয়ে কসাইয়ের বাড়িতে খেতে গেছে। চারদিকে ছি ছিক্কার পড়ে গেছে।"
কথাগুলো গড়গড়িয়ে বলে গেলেন বাবা। আর নবীন কাকুকে দেখে বিস্ময়ের ঘোরের মাঝে কথাগুলো বলে বাবা যেন স্বাভাবিক হলেন।
মা সান্ধকী কাকুর কাছে বাবাকে ঠেকিয়ে দিয়ে রান্না ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। বাবা মাকে বললেন চা দিয়ে যেতে। মায়ের পেছনে পেছনে আমি। মা বলছেন - "মাছ ভাজা খাওয়াব চল।" খুব মনে আছে এই কথাগুলো কানে কানে হয়েছিল।
বাবাতে কাকুতে ছেলেবেলাকার কত গল্প হলো। বললেন - "এখানে সাতকুলে কেউ নেই। সব সম্পত্তি বিক্রি করে কলকাতায় ফ্ল্যাট কিনেছি। বাবা বছর পাঁচেক আগে গত হয়েছেন। মা ঠিক তার বছর খানেক পরে। বদলির চাকরি। চারদিকে পরিবারকে সঙ্গে চক্কর দিতে হয়। এর আগে উলুবেড়িয়ায় বিডিও ছিলাম। তখন ওখানকার জগতপুরে বোবাদের হোমে উপদেষ্টা হয়ে কাজ করে আমার ভারি সুন্দর অভিজ্ঞতা হয়েছিল। প্রমোশন নিয়ে এখানে এলাম। সৌভাগ্যক্রমে এদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ হলো। আমার ছেলে এখন ডাক্তারি পড়ছে। মেয়ে সবে দশ।"
বাবা বললেন "আমার ছেলে থাকলে তোমার ছেলের মতো ঐ অতো বড় হতো। ছোটোবেলায় কঠিন রোগে সেই যে বিছানা নিল, অনেক চিকিৎসা হলো, জলের মতো টাকা বেরিয়ে গেল, কিন্তু বিছানা ছেড়ে আর উঠলো না। চলে গেল।" বলতে বলতে গলা ভারি হয়ে এলো বাবার, চোখের কোণ আলতো চিকচিক করে উঠলো।
তারপরে আমি এলাম বোবা হয়ে। ভাগ্যকে মেনে আর সন্তান নেওয়ার ঝুঁকি নিলেন না। এই আমাদের পরিবার।
এভাবেই নানা কথায় কথায় কোথা দিয়ে ঘন্টা দু'য়েক কেটে গেল। মায়ের হাতের রান্না খেয়ে কি খুশিটাই না হয়েছিলেন নবীন কাকু।
খাওয়ার পর মা, বাবা,কাকু মিলে আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে কত কথা হলো।
অনেক গল্প বললেন কাকু। তার মধ্যে বোবাদের পিতা আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের জীবন কাহিনি কি সুন্দর করে বলেছিলেন! তাই ছিল মাকে বোঝানোর মোক্ষম দাওয়াই।
গল্পটা আরো বিস্তারিতভাবে পরে হোমে শুনব।
কাকুর মুখ থেকে মা যা শুনেছিলেন- "আলেকজন্দার গ্রাহাম বেলকে বলা হয় বোবাদের পিতা। ছোট থেকেই আবিষ্কার পাগল ছিলেন বেল। বারো বছর বয়সে গমের খোসা ছাড়িয়ে ময়দা তৈরির যন্ত্র আবিষ্কার করলেন। তিনি আবার টেলিফোন আবিস্কারের জনক।
টেলিফোনে হ্যালো যে বলি,এই মার্গারেট হ্যালো ছিলেন বেলের বান্ধবী। দূরাভাষে বান্ধবীর সঙ্গে প্রথম কথা হ্যালো দিয়ে। তা থেকেই দূরাভাষে হ্যালো বলার প্রথা চালু হয়েছে।
একসময় নিজের টেলিফোন আবিষ্কারের উপর বিতশ্রদ্ধ হয়ে পড়লেন তিনি। কারণ তাঁর নীরব জীবনকে যখন তখন ব্যতিব্যস্ত করে তুলতো এই দূরাভাষ। তাই নিজের ঘর থেকে যেন যন্ত্রটিকে কান ধরে বের করে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছিল,যা সত্যিই আবিষ্কারের ইতিহাসে বিরল ঘটনা।
১৮৭৬ খ্রীষ্টাব্দে আমেরিকা প্রথম তাঁকে টেলিফোন পেটেন্টের সম্মানে সম্মানিত করেছিল। যখন মারা গেলেন সারা আমেরিকা তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে এক মিনিট রিংটোন বাজিয়েছিল।
তবে বোবাদের নিয়ে তাঁর গবেষণা ছিল বেশ চমকপ্রদ। মা ও স্ত্রী দু'জনেই ছিলেন বোবা। মায়ের সঙ্গে নীরবে কথা বলতে সাংকেতিক শব্দের ব্যাপক পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছিলেন।
মূকাভিনয়ে অসাধারণ পারদর্শী ছিলেন। বাড়িতে অতিথি এলে তাঁদের সঙ্গে নীরবে আপ্যায়নের অপূর্ব সাংকেতিক ভাষায় মুকাভিনয় করতেন।
আর এই গ্রাহাম বেল বলতেন আমাদের যখন কোনো দ্বার রুদ্ধ হয়ে যায়, সেই রুদ্ধ দ্বারের দিকে তাকিয়ে বসে বসে নিজেদের ধ্বংসের প্রহর গুণি, ফিরেও তাকাই না খোলা অপর দ্বারের দিকে। একটা দ্বার বন্ধ থাকলে অন্য কোনো দ্বার খোলা থাকতে বাধ্য। "সেই দরজা আমি খুলে দিয়ে গেলাম। এবার তোমাদের ব্যাপার।"
সুতরাং তোমাদের বিশুর ভবিষ্যৎ যদি সত্যিকারের রক্ষা করতে চাও তাহলে আর দেরী না করে হোমে ভর্তি করে দাও বৌঠান।"
সেদিন মায়ের নবীন কাকুর প্রতি সমীহ ভাব, সে আমি কোনোদিন ভুলতে পারবো না। মা শুধু বলেছিলেন - "দাদা আপনি যখন আছেন আমরা নিশ্চিন্ত।"
কাকু বলে গেলেন - "কাল গাড়ি আসবে। ওকে গাড়িতে নিয়ে তোমরা যেও।" আমার ভবিষ্যতের সানাই এবার নতুন পথে সামিল হলো।
পরদিন গাড়ি আমাকে নিয়ে যেতে এলো। সঙ্গে মা বাবা। এই প্রথম বাড়ির বাইরে পা। চারদিক শুধু মাথা ঘুরিয়ে নিঃশ্বেষে দেখতে শুধু চংবং করছি। মা সাবধানে বসতে বলছেন। কে শোনে! বাবাকেও ইঙ্গিতে কৌতূহল নিবারণের জন্য বেশ ভালো মতো জ্বালিয়েছিলাম। পৌঁছে গেল গাড়ি আশ্রমের গেটে।
সারাদিন মা ছিলেন হোমের মধ্যে। দিনের শেষে ছেড়ে যেতে তাঁর খুব কষ্ট হয়েছিল। এই প্রথম মায়ের কোল ছাড়া হয়ে ঘুমোতে হবে। মাও অনুরূপ ভেবে একটু বেশি অস্থির। যাওয়ার সময় বারবার পেছন ফিরে তাকাচ্ছেন। গেটের বাইরে গিয়ে আবার ফিরে এসেছেন,এই বলার জন্য সাবধানে থাকি যেন। জল খাই যেন। কাল আবার আসবেন।
সত্যি আমার রাতে ঘুম একটুও হয়নি। এখানে থাকা অসম্ভব। এ যে জেলখানা। পরের দিন যথানিয়মে মা এলেন। হোমে সারাদিন থাকলেন। এইভাবে ধীরে ধীরে হোম জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে থাকলাম।
দিন পনরো পরে মা হঠাৎ একদিন কুন্ডু ম্যামকে অনুরোধের সুরে বললেন, আমাকে দু'টো দিনের জন্য বাড়ি নিয়ে যেতে চান। বাড়িতে লক্ষ্মীপূজো আছে।
তখন কুন্ডু ম্যাম বলেছিলেন - "বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য ভুলেও ভাববেন না। ও এখন শারীরিক সক্ষমতায় অনেকটাই পিছিয়ে। ওর প্রতি বিশেষ কেয়ার নেওয়া হয়েছে।"
"বাড়ী থেকে ওর জন্য কুলের আচার এনেছিলাম,আর আমের কুশি দিয়ে ওর জন্য কাসুন্দি এনেছি। দেওয়া যাবে?"
"আমরা বাড়ির খাওয়ার দিতে দিই না। এতে আমাদের হোমে বৈষম্য-পীড়িত মানসিক অবস্থা তৈরি হবে ছেলে মেয়েদের মধ্যে। তাই বারণ। অনেক বড় বাড়ির বাচ্চা আছে। এই পদ্ধতি চালু হলে হোম পরিচালনায় অসুবিধে আছে।" কুন্ড ম্যাডাম খুব মিষ্ট স্বরে কথাগুলো বললেন। আর স্কুলের নিয়মাবলী সম্পর্কিত একটি বুকলেট দিলেন। তিনটের সময় মা শুকনো মুখে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সেই পরিচিত অসহায় চাহনি নিয়ে তাকিয়ে আমার দিকে। মাকে আগের থেকে বেশ শুকনো লাগছিল। একাকিত্বের হতাশার ছাপ চোখে মুখে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছিল বেশ।
দেখতে দেখতে এখন আমি বিশ বছরের। ঐ সময়কার মুখের আদল ছবির মতো ভাসছে।
প্রথম প্রথম মা তার কষ্টটা ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠলেন। আমার কি কষ্ট হতো না। কিন্তু আমাকে প্রকৃতি যে অনেক কিছু সহ্য করার আলাদা শক্তি দিয়েছে। কথা বলতে পারিনি বলে প্রকাশ ছিল না। তাই সহনশীলতা এসেছিল ধীরে ধীরে।
(৩)
হোমে আমি দশ বছর কাটিয়ে দিলাম। সত্যিই হোমের জন্য আমি বেঁচে গেলাম। হোমের ভেতরটা সত্যিই অতুলনীয় পরিবেশ। পুঁথিগত বিদ্যার উপর জোর দেওয়া হয়না। সব হাতে নাতে কাজ- সেলাই,ফোড়াই, বাগান গড়া।
অফুরন্ত খেলাধুলা ও শারীর শিক্ষা -জিম, সাঁতার, ক্যারাটে, কুস্তির উপর খুব জোর দেওয়া হয়। কেননা হাত ও কাঁধ হল আমাদের ভাষা প্রকাশের প্রধান সহায়। শারীরিক সক্ষমতা আমাদের সকল প্রকার পিছিয়ে থাকার দুর্বলতা নাশের প্রধান উপায়।
সাংস্কৃতিক শিক্ষা - মূকাভিনয়,নাচ, গান, বাজনা- জানেন আমার পিয়ানো বাজাতে খুব ভালো লেগে গেল,পরে হোমের সেরা পিয়ানো বাদক হয়ে উঠলাম।
আর সর্বোপরি বোবাদের পিতা গ্রাহাম বেলের জীবনদর্শন নিয়ে চলচ্চিত্র,তাঁর বোবা ও কালাদের নিয়ে গবেষণার বিষয় আমাদের সামনে কি নিখুঁতভাবে তুলে ধরা হয়।
আমাদের পশুপালন, পাখি পালন, ছেলেদের কাঠের কাজ, চাষবাস কি নিষ্ঠাসহকারে শেখানো হয়। বিশেষ করে শ'খানেক দেশী ও জার্সি মিলিয়ে দুগ্ধপোষ্য গাভী হোমে পুষ্টির যোগানদার। এদের সকাল হলে দুধ দোয়া হয় যন্ত্রের সাহায্যে। সব মিলিয়ে মন কয়েক দুধ সংগ্রহ হয়। আমাদের সকালে টিফিনের সঙ্গে এক গ্লাস দুধ বরাদ্য থাকে। বাকি দুধ বাইরে চালান যায়। পুকুরে মাছ চাষ হয় হোমের প্রয়োজন কুলিয়েও বাইরে চালান যায়।
সবচেয়ে ভালো লাগে হাতে নাতে রাখি, মোমবাতি বানানো। বাইরে থেকে অর্ডার আসে। আমি রাখি বানানোয় খুব দক্ষ হয়ে উঠি। আমার হাতের তৈরি বিখ্যাত রাধা ও কৃষ্ণ রাখী। রাখীর উপর রাধা ও কৃষ্ণ এতো স্বমহিমায় বিরাজ করতেন আমার নিজের সৃষ্টির দিক থেকে আমি নিজেই চোখ ফিরাতে পারিনা। এখনো এই রাখি বানাই। ও আমার জীবনের প্রিয় সখ।
যখন বাইরে থেকে রাখী ও মোমবাতির অর্ডার আসে,আশ্রমের সব আবাসিক মিলে, রাতভিত জেগে এসব বানাই। সে কি মজা রাখি ও মোমবাতি বানাতে! বিশেষ করে রাখী বানানোর অর্ডারের দিকে সকলে মুখিয়ে থাকতাম। আমাদের এই রাখী বানানোর হাতের কাজের বাইরে খুব সুনাম ছিল। ফিবছর অর্ডার লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তো। শেষে অর্ডার নেওয়ার উপর রেস্ট্রিকশন আনতে হোম পরিচালন সমিতি বাধ্য হয়েছিল। সৃষ্টির সে যে কি আনন্দ তা বলে বোঝানোর নয়।
সবমিলিয়ে হোমে আমার জীবনটাই একেবারে বদলে গেল। আমি আগেই বলেছি আমার বেশ লম্বাটে গড়ন। হোমের পরিবেশে আমি সব আবাসিকদের ক্রমে মাথা ছাড়িয়ে যেতে লাগলাম। শরীর চর্চায় আমার রূপ যেন ফেটে বেরিয়ে আসতে লাগল। সকলের নজর কাড়া এই শরীর নিয়ে ভাববেন না আমি বেশ নিশ্চিন্তে ছিলাম।
তাহলে হোমে আমাদের শিক্ষার মান কেমন ছিল বলি। আগেই তো বললাম আমাদের যা কিছু শিক্ষা বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো হাতে নাতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। তাবলে পুঁথিগত শিক্ষা না হলে পূর্ণতা কি আসে?
শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের ব্যবস্থাপনাও বেশ সুন্দর। সাইন ল্যাঙ্গোয়েজ আমাদের যা কিছু শিক্ষার মাধ্যম। সে মুখের ভাষা হোক, কিংবা ভাষাশিক্ষা হোক।
এই সাইন ল্যাঙ্গোয়েজ বডি ল্যাঙ্গোয়েজের একটি অঙ্গ। বডি ল্যাঙ্গোয়েজ, যেমন কাউকে ইশারায় চুপ করতে বললে মুখে তর্জনীর প্রথমা আঙুল ঠেকিয়ে, ঠোঁট ঈষৎ কুচকে শারীরিক ভাষা প্রকাশের জন্য নিঁখুতভাবে অভিনয় করি, ঠিক তেমনি সাইন ল্যাঙ্গোয়েজ ব্যবহারের জন্য হাত,কাঁধ প্রধান সহায়ক হয়।
এই ভাষা শিক্ষা দানের জন্য শিক্ষক শিবনাথ বাউরি। বড়ই মজাদার স্যার। লম্বায় প্রায় ছ'ফুটের কাছাকাছি। শ্যাম বর্ণ। ঝাঁকড়া চুল। ধূতি ও পাঞ্জাবিতে বেশ মানায়। আরো জনা দশেক স্যার আছেন। হোমে দু' চারজন বাদে সবাই বাইরে আশপাশে থাকেন। বাউরি স্যার হোমেই থাকেন। পুরুলিয়ার অযোধ্যায় অজ গাঁয়ের লোক। মাঝে সাঝে বাড়ি যান।
তাঁর ক্লাসে থেকে জানতে পারি আমরা যে ভাষায় কথা বলি তা সাইন ভাষা। সাইন ভাষাকে বলে ইশারা ভাষা। মুখের একপ্রকার ভঙ্গি। কাঁধের ওঠানামা। আঙুল তাক করা হল এই ইশারা ভাষা প্রকাশের প্রধান অঙ্গ। বিশেষ করে হাত ও আঙুল দিয়ে সুচিন্তিত ও সূক্ষ্ম দ্যোতনা দিয়ে বড়ই সুন্দর করে প্রকাশ ঘটাতে হয়। যেমন-
হ্যালো - অনেকটা স্যালুট দেওয়ার ভঙ্গিতে। হাত কপালের কাছে এনে হাতের তালু ধরতে হবে।
এক্সকিউজ মি - এক হাতের তালু মেলে ধরে, অন্য হাতের আঙুলগুলো দিয়ে তালুর এমাথা থেকে ওমাথা আলতোভাবে ঘষতে হবে।
হেল্প - এক হাতের তালু মেলে আরেক তার উপর বসিয়ে বুড়ো আঙুল দেখাতে হবে। সে অবস্থায় দু'হাত আস্তে করে উপরে উঠাতে হবে।
প্রথমদিন এই তিনটি শব্দ হাত ও আঙুলের সাহায্যে কি নিষ্ঠাসহকারে শিখিয়ে ছিলেন। তারপরে আমি একে একে হসপিটাল,হারি, বিশেষ করে 'থ্যাঙ্ক ইউ'- এক হাত চিবুকের কাছে আনতে হবে। তারপর হাত সামনে বাড়িয়ে দিতে হবে।
'সরি'- হাত মুঠি করে বুকের কাছে নিয়ে বৃত্তের মতো করে ঘুরাতে হবে। হোয়াই,হাঙরি,হাউমাচ সমস্ত একে একে শিখে ফেলেছিলাম।
(৪)
দু'হাজার ঊনিশ একুশে ফেব্রুয়ারী- আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসে পুরুলিয়ার ঝালদা স্কুল মাঠে প্রোগ্রামের আমন্ত্রণ এল। ইতিপূর্বে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হোমের খুব নাম ডাক হয়েছে। আমরা পঁচিশ জনের টিম ওখানে প্রোগ্রামে গেলাম। সঙ্গে অযোধ্যা পাহাড় দেখে ফিরব। শিবনাথ বাবুর জেলা। সুতরাং সবকিছু স্যারের নখদর্পণে। ঐ স্কুলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন তিনি। স্কুলের সামনের মাঠ আদিগন্ত। সার সার সব বৃক্ষ। সূর্য উঠলে গাছের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারে যাতে সেই মতো যেন গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে।
অনুষ্ঠানে অনগ্রসর উপজাতি উন্নয়নের বিভাগীয় মন্ত্রী দিবাকর কিস্কু আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে এলেন। অনগ্রসর শ্রেণীর উন্নয়নের জন্য সরকারের পদক্ষেপ খুব সাজিয়ে গুছিয়ে বক্তব্যে তুলে ধরলেন। আর আমাদের জন্য দরদ উথলে উঠল,আবেগ ভরা কন্ঠে। ওসব প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি অনেক শুনেছি। আমরা দাবি পত্র পেশ করলাম সাইন ল্যাঙ্গোয়েজ বা আমাদের সাংকেতিক ভাষা উন্নয়নের জন্য সরকারের পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য। মন্ত্রী ম'শাই যথাস্থানে এই দাবি পত্র পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন। ভাষা দিবসে এই দাবি পেশ খুবই অর্থবহ ছিল। অনেক বার দাবি পত্র পেশ হয়েছে। কিন্তু কার্যকরী পদক্ষেপ যে তিমিরে সেই তিমিরেই। তবে আশা করতে ক্ষতি কি! আশা কোনো দিন মরে না।
প্রোগ্রাম শেষ হতে সেই রাত্রি ন'টা। আমরা সব্বাই কত কত উপহার পেলাম। ছৌ নাচ এই প্রথম দেখলাম। ছৌ মুখোসের উপহার ওরা সকলকে দিয়েছিল।
আমার পিয়ানো বাজানো শুনে ওদের মুগ্ধতার শেষ ছিল না। পাশাপাশি রণিতা মিস্ত্রীর সাইন ভাষায় খবর পড়া ছিল একটা খুব চমকপ্রদ মুহূর্ত। শিবনাথ স্যার তার খবরের সাংকেতিক ভাষা কথা দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। রাতে স্কুলেই থাকলাম। পরদিন গন্তব্য অযোধ্যা পাহাড়। তবে গাছের আড়াল থেকে সূর্যের উকি মারা দেখতে ভুল করলাম না।
এই প্রথম বাইরে এসে শিবনাথ বাবুর মনের খুব কাছাকাছি হলাম। ঐ তো বয়স। চব্বিশ কি পঁচিশ। সবার থেকে শিবনাথ স্যারের আমার প্রতি একটা আলাদা নজর ছিল। আমি মেয়ে। আমাদের এটুকু অতিরিক্ত উপলব্ধি শক্তি দিয়েছেন ভগবান। শিবনাথ বাবু মনের কথা বুঝতে পারি ঠারে ঠোরে। যতই বেচারা হয়ে লুকনোর ভাব করুক না কেন, পারবে কেন,পারা যায় না, এমনি রহস্য যে মেঘের আড়ালে বিদ্যুতের ঝিলিকের মতো। নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারেননি, অযোধ্যা পাহাড় দর্শনের সময় ধরা দিয়েছিলেন। স্যারের বাবা মায়ের হাতের নাড়ু, ছোলা ও চালভাজা দিয়ে গিয়েছিলেন। তা সবই আমার ব্যাগে কখন চালান করে দিয়েছিলেন বুঝতে দেননি। কিন্তু এটা বুঝতে অসুবিধা হলো না শিবনাথ স্যারের মনের গোপন কথাটি।
রমলা মিস্ত্রী আমার প্রতিপক্ষ। ওর যেকোনো ক্ষেত্রে পারদর্শিতার সঙ্গে আমার টক্কর চলে। অনেক ক্ষেত্রে পেরে ওঠে না আমার সঙ্গে। তাই ও আমাকে নিয়ে বেশ জেলাসি অনুভব করে। হোমের সে সাত থেকে সতের আমার প্রতি আন্তরিক ভালবাসাটা একটু বেশি বলে এজন্যও জেলাসিটা ওর ভেতরে ভেতরে গুমরে মরে। পুরুলিয়া প্রোগ্রামে থেকে ফিরে এসে ঘটনা একটা ঘটবে যে,তা যেন প্রহর গুণছিল। আমাকে ও শিবনাথ বাবুকে নিয়ে গালগল্প। হোমে যা লুকোছাপা ছিল, এবার পুরোপুরি ধরা পড়ে গেলাম। আগেই তো বলেছি যে কেউ সোমত্ত পুরুষ মানুষ আমাকে পাওয়ার জন্য পাগল হবে।
শেষে হোমে জানাজানি হয়ে গেল। আপনাদের বলিনি শিবনাথ বাবু মডেল ছবি আঁকায় তুখোড়। আমার চলন বলন কখনো কখনো গোপনে দেখে দেখে মনে মনে ছবি এঁকে ফেলেছিলেন। সেই ছবির কথাও প্রকাশ্যে এসে গেছে। সে ছবি বলতে ছবি। বিভিন্ন পোজের এক একটা নিখুঁত ছবি। যেন আমার জ্যান্ত প্রতিকৃতি। গোপনে গোপনে এতো দূর এগিয়ে গেছে ঘুনাক্ষরেও টের পাইনি। তাহলে এবার কী হবে। হোমে চাপা উত্তেজনা, কানাঘুষোয় আড়ালে আবডালে চলে ফিচকেমি। যেন ধনুক থেকে তীর ছোঁড়া হয়ে গেছে। থামানোর উপায় নেই।
রমলার বাবা রমেশ মিস্ত্রী পয়সাওয়ালা অভিভাবক । হোমকে ভালোই অর্থ ডোনেট করেন। ইনকাম ট্যাক্সের সুবিধা পাওয়ার জন্য। হোম সেজন্য রমেশ বাবুর প্রতি বেশি আনুগত্য দেখায়। তাই রমলা একটু বেশি দেমাকি। প্রতিভাকেও তুচ্ছ করে দিতে পারে টাকার জোর।
সত্যিই তাই হলো আমার ভাগ্যে। জাপানে ছবি আঁকা প্রতিযোগিতা হবে। প্লাস্টিক দূষণের উপর ছবি এঁকে পাঠাতে হবে। আমার ও রমলার ছবি প্রতিযোগিতার জন্য সিলেক্ট হলো। রমলার চেয়ে ছবি আমার অনেক ভালো ও নিখুঁত ছিল। কিন্তু রমলার ছবি ফার্স্ট করে পাঠানো হলো। একটাই ছবি পাঠাতে হবে। আমাকে পিছু হটতে হলো। কর্তৃপক্ষের পক্ষপাতিত্ব দোষ নিয়ে হোমে ভালই গুঞ্জন তৈরি হয়েছিল। কিন্তু প্রভাবশালীর লম্বা হাত ছাটবে কে?
এর পরেও ফের ঘটনার পুনরাবৃত্তি। ডেফদের নিয়ে দিল্লিতে সেমিনার হবে। প্রতি হোম থেকে একজন করে প্রতিনিধি পাঠাতে হবে। এক্ষেত্রেও রমলা নির্বাচিত হলো। হোমের এরকম পক্ষপাতিত্ব নিয়ে,আমার জন্য সকলের মন খারাপ। নবীন কাকু ব্যাপারটায় ভালো মনে নিলেন না। আবার কিছু বললেনও না।
দিল্লি যাওয়ার একদিন আগে রমলা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হল। অগত্যা আমার ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ল। এক সপ্তাহের জন্য হোমের বাইরে চললাম। সরকারের যুব ক্রীড়া দপ্তরের তত্ত্বাবধানে চললাম একা। যাওয়ার সময় শিবনাথ বাবুর কেমন একটা মায়াময় দৃষ্টি দিল্লি যাওয়া থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত সমস্ত মনের উপর ছেয়ে ছিল। প্রোগ্রামে আমি সবার মন কেড়ে নিয়েছিলাম আমার পিয়ানো বাজানো দিয়ে। আমাকে স্মারক ও সংশাপত্র দিয়ে যে স্বীকৃতি দেওয়া হয় তা আমার জীবনের সেরা উপহার।
ইত্যবসরে এই সাত দিনে হোমে ঘটে গিয়েছিল যে দুর্ঘটনা তা আমার জানার কথা নয়। ফিরে এসে জানলাম।
হোমের মোসাদ্দেক হোসেন। বছর বারো বয়স। এই বোবা ছেলেটি গোড়া থেকে বেশ ফুচকে গোছের ছিল। সবাই ডেফ থেকে ডেফো নাম দিয়েছিল। শিবনাথ বাবু ও আমাকে নিয়ে খুব ফিচকেমির ওস্তাদি নাকি মাত্রা ছাড়িয়ে গেল। তাকে সাবধান করা সত্ত্বেও,তবুও নাকি ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছিল সে। শিবনাথ বাবু একদিন খুব মারধর করেন। সেই অভিমানে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে। তাই নিয়ে সাম্প্রদায়িক আবেগে গোটা চত্বর প্রবল উত্তেজনা ছড়ায়। একশ' চুয়াল্লিশ ধারা পর্যন্ত জারি হয়। এমনকি শিবনাথ বাবুর হাজতবাস একদিনের জন্য হয়। বিচারে প্রমাণিত হয় আসলে তাঁর মারের জন্য মোসাদ্দেকের আত্মহত্যা ঘটেনি। আত্মহত্যার জন্য দায়ী পারিবারিক কারণে। মাস ছয়েক আগে সপ্তাহখানেকের জন্য মোসাদ্দেক তার বাড়িতে গিয়েছিল। পারিবারিক বিবাদে মোসাদ্দেকের মা আসিফাকে তার বাবা প্রচুর মারধরের জন্য মা অভিমানে আত্মহত্যা করেছিলেন। শেষে প্রমাণিত হয় তার বাবাই মেরে ওভাবে ঝুলিয়ে দিয়েছে। ওর বাবা এখন হাজতে।
মোসাদ্দেকের বাড়িতে খবরটা যেতেই ওর আত্মীয়স্বজন আমাদের হোমের নিকটবর্তী স্থানীয় আত্মীয় স্বজনদের নিয়ে হোমে এসে ভাঙচুর করেছিল।
মোসাদ্দেক আসলে হতাশায় ভুগছিল। হতশা কাটানোর জন্য আরো ফিচকেমি করতো। মা চলে যাওয়ায় ও নিজেকে আরো বেশি আপনজনহীন বলে ভাবতো। আর শিবনাথ বাবুর সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়াটা এই হতাশা আরো গভীরতা পায়। তার কাছে বাঁচার কোনো মানেই নেই,এমন বোধ থেকে সে এই আত্মহত্যায় এসেছিল। মনস্তাত্ত্বিকবীদগণের তাই মত। হোমে এমন ঘটনার জন্য সকলে শোকে কাতর হয়ে পড়েছিল।
এই ঘটনায় শিবনাথ বাবুও খুব মনমরা। হোমে আর মন টিকল না। চলে গেলেন সোজা পুরুলিয়া। নিজের বাড়ি।
দিল্লি থেকে ফিরে এতসব খুব খারাপ ঘটনা শুনে আমার মনটাও কেমন হয়ে গেল। মুখে অরুচি হলে যেমন হয় তেমনি।
হোমে সেই প্রাণের বড়ই অভাব দেখলাম। বাড়ি গেলাম কয়েকটা দিনের জন্য। শুধু শিবনাথ বাবুর জন্য মনটা কেমন কেমন লাগে। ইচ্ছে করে ছুট্টে চলে যাই তাঁর গাঁয়ে।
হঠাৎ একদিন বাড়িতে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার আসে উলুবেড়িয়ার জগৎপুর ব্লাইন্ড অ্যান্ড ডেফ সংস্থা থেকে। ওখানে শিক্ষিকা হয়ে যেতে হবে। বেতন ভালই।
নবীন কাকু যখন ওখানে ছিলেন ওখানকার হোম কর্তাদের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। নবীন কাকুর সূত্রে আমার এই অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার।
আমার জীবনের সানাই সুরের নতুন রিদম শুরু হবে এবার। এই যে এতোসব বললাম এর মূল সূত্রধর যে শিবনাথ বাবু, এতক্ষণ পরে অকপটে স্বীকার করতে কোনো দ্বিধা নেই। হোমে আর যাওয়া হবে না। জগৎপুরে সানাইয়ের নতুন সুর এবার বাজবে।
এতদিনের সুর যে ধরিয়ে দিয়ে গেলেন, তিনি ছাড়া নতুন রিদমে বাজব কী করে? সুর আসবেই বা কী করে?
এত নিখুঁত সুর ধরে দিয়ে গেলেন যিনি, সেই সানাইয়ের সুরের কাছে আমার পিয়ানো বাজানোর সুর কোন ছার।
#কলমে - মৃদুল কুমার দাস।
@Copyright reserved for Mridul Kumar Das
বাহ খুব ভালো লাগলো💐💐💐
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।
মুছুনসুন্দর লিখলেন
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।
উত্তরমুছুনঅসাধারণ বললেও কম বলা হবে।সামাজিক একটা বার্তা আছে বলে এত মনোগ্রাহী হয়েছে লেখাটা।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ দিদি। শুভেচ্ছা। ভালো থাকবেন। ❤💫💫💥💥
মুছুনসুন্দর একটা গল্পো ,পড়ে খুব ভালো লাগলো।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ দিদি। অনুপ্রাণিত। শুভেচ্ছা।💫💫💥💥❤❤
উত্তরমুছুনঅসাধারণ 👌
উত্তরমুছুনসুন্দর তথ্য সমৃদ্ধ একটি সুন্দর গল্প।
ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা । অনুপ্রাণিত।
মুছুনঅসাধারণ 👌
উত্তরমুছুনতথ্য সমৃদ্ধ একটি সুন্দর গল্প।