# বিষয় - 'শান্তিনিকেতন'
# নাম- 'রামকিঙ্কর বেইজ স্মরণে'
রামকিঙ্কর পরামাণিক। জন্ম ১৯০৬ নাগাদ। বাবা চন্ডীচরণ। মা সম্পূর্ণা। চার মেয়ে, দুই ছেলে। থাকমণি, নরায়ণী,কালিদাসি,ইন্দুমতী,আর বড় ছেলে রামপদ,ছোট রামকিঙ্কর। পেশায় ক্ষৌরকার। বড়ই অভাবের সংসার।
যুগিপাড়া ও ছুতোরপাড়ার মাঝখানে রামকিঙ্করদের বাড়ি। অনেক পাড়া- কামারপাড়া, তাঁতিপাড়া,পোদ্দারপাড়া। অধিকাংশ শ্রমজীবী পেশার পরিবারের বাস। যুগিপাড়ার কাছে দোলতলার এক গাছের নিচে বাবা চন্ডীচরণ রামকিঙ্করকে বসিয়ে দিতেন ক্ষৌর কাজে। ক্ষৌর কাজের বদলে নরুন নিয়ে গাছের গায়েই ছবি এঁকে ফেলতেন। আর বাড়িতে বাবাকে রামায়ণ পড়ে শোনানো নিত্যদিনের কাজ ছিল। বইয়ের পড়াশোনা আদৌ ভালো লাগতো না। পড়তে বসে ছবিতে ডুবে থাকতেন। বাবা বিরক্ত হলেও মনে মনে সায়ও ছিল। কেননা রামকিঙ্করের ঘরে বসে আঁকা ছবি, হাতে গড়া মাটির নানা মূর্তি নিয়ে বাবা চন্ডীচরণ যেতেন হাটে বিক্রি করতে। দু'চার পয়সা পেতেন। সংসারের খরচের সামান্য সুরাহা হত। এই থেকে রামকিঙ্কর নিয়মিত ছবি এঁকে যেতে লাগলেন।
** শিক্ষাবেলা:-
পড়াশোনা চলছে নামমাত্র। সুরেন পন্ডিতের (সুরেন্দ্রনাথ দত্ত) পাঠশালায় চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত। এরপর কিছুদিন বঙ্গ বিদ্যালয়ে। অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত হল। মাধ্যমিক শেষ যেন না হওয়ার অবস্থায়।
**রাজনীতিতে হাতেখড়ি:- ননকোপারেশনের ঢেউ লেগেছে গ্রামে, গ্রামে। রামকিঙ্করের ডাক পড়ল নেতাদের ছবি আঁকার। অনীল বরণ রায় রাজনৈতিক গুরু। নেতাদের ছবিতো আঁকবেন রঙ কেনার পয়সা কই? হাতের কাছে পেলেন সহজ সমাধানও। রান্নার হলুদ দিয়ে হলুদ রঙ,শিমপাতা নিংড়ে সবুজ,পুই মেচুড়ি থেকে বেগুনি রঙ সংগ্রহ করলেন। স্বদেশী আন্দোলনের ভরা গাঙ। ঘরে ঘরে চরকা কাটার জাতীয়তাবাদ তুঙ্গে। অল্পস্বল্প গানের তালিমও চলে রাজেন্দ্রনাথ দত্তের গানের স্কুলে। পরাধীনতার শেকল ভাঙার গানে তিনি তদ্গত। তবে তাঁর কাজ মিছিল-মিটিং-চরকা কেটে নয়। তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল পোস্টার চিত্র আঁকা ও স্বদেশ চেতনার উদ্ধৃতি দিয়ে পোস্টার লেখা। সেইসব ছবি কংগ্রেস অফিসের সামনে ঝুলিয়ে রাখা হত। যেমন,ভারতমাতার অবস্থা,ঝড়,রুগ্ন শিশু, ইত্যাদি। পোস্টার আঁকা ও লেখা হত গোপনে গোলোক কর্মকারের দো'তলার বাড়িতে।
১৯২১ সালে ইংল্যান্ডের যুবরাজ আসছেন কলকাতায়। তাই দিকে হরতাল ডাকা হয়েছে। এইসময় রামকিঙ্কর বিখ্যাত তিনটি পোস্টার চিত্র আঁকেন। ১৯২২-এ 'বাঁকুড়া এগ্রিকালচার অ্যাসোসিয়েশন'-এর উদ্যোগে স্বদেশী মেলার আয়োজন হয়। উদ্বোধক আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। এই মেলায় রামকিঙ্কর বেশ কয়েকটি ছবি ও পোস্টার চিত্র আঁকেন। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছবি হল,একটি বিরাট আকারের 'শৃঙ্খলিত হাতি'। হাতির পায়ে দড়ি বাঁধা। নীচে লেখা: 'ক্ষুদ্র এক তৃণ বলো কিবা শক্তি ধরে/ একত্র হইলে পারে হস্তী বাঁধিবারে।' স্বদেশী বাবুদের তিনি অনায়াসে নজর কাড়তে পেরেছিলেন। এইভাবে বাঁকুড়ার স্বদেশ প্রেমের জলহাওয়ায় রামকিঙ্করের দেশাত্মবোধের হাতে খড়ি হয়। এই পর্যন্ত তাঁর জীবনের আদিপর্ব বলে গণ্য করা হয়। পরের পর্ব শান্তিনিকেতনে গন্তব্য।
শান্তিনিকেতনে আসার একটা নাটকীয় ঘটনার কথা পাই। মাধ্যমিক পরীক্ষা অসম্পূর্ণ রেখে শান্তিনিকেতনে চলে আসেন। সাল ১৯২৫। কংগ্রেসের আন্ডার গ্রাউন্ড নেতাদের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে গিয়েছিল। তা থেকে রেহাই পেতে,শান্তিনিকেতন তখনো ব্রিটিশ কর্তৃত্বের বাইরে ছিল বলে নাকি তাঁর এই শান্তিনিকেতনে চলে আসা। সে যাই হোক শান্তিনিকেতনে চলে আসার পেছনে অবদান 'প্রবাসী'-র সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের।
রমানন্দ বাবুর বাড়ি ছিল যুগিপাড়ার কাছে পাইকপাড়ায়। পিতা চন্ডীচরণ রামানন্দবাবুদের বাড়িতে হাজামত করতে যেতেন। যজমান বাড়ি। একদিন কথায় কথায় রামানন্দ বাবু ছোটো ছেলের খবর নিলেন। ছোট ছেলের ছবি টবি আঁকার হাত যশের কথা বলেন। তাই শুনে রামানন্দ বাবু একদিন তাঁদের বাড়িতে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। একদিন তো হঠাৎ হাজির। বললেন, 'কই তোমার ছেলের ছবি দেখাও চন্ডী।' সব ভালো করে দেখে তিনি শান্তিনিকেতনে ফিরে চিঠি দিয়ে জানাবেন ছেলেকে ওখানে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সঙ্গে ছবি নিয়ে যেতে বললেন। ঠিক মাস তিনেক পরে সত্যি সত্যিই চিঠি এল। রাজনৈতিক ডামাডোলে বাবা ছেলেকে নিয়ে খুবই চিন্তায় ছিলেন। যাক সমস্যা সুরাহার পথ হল। শান্তিনিকেতন যাবেন তো বটে, কিন্তু পথ যে জানা নেই। যেতে যে হবেই। আসানসোল ঘুরে অনেক কষ্টে শান্তিনিকেতনে পৌঁছলেন। এই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে নিজে বলছেন, ' কী করে শান্তিনিকেতনে এলাম সে এক কাহিনি।'
আচার্য নন্দলাল বসুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দিলেন রামানন্দ বাবু। নন্দলাল বাবু সব ছবি দেখে বললেন, 'তুমি সবই জানো। আবার এখানে কেন?' তারপর তিনি ভেবে বললেন, ' আচ্ছা,দু'-তিন বছর থাকো তো।' সেই দু'-তিন বছর আর ফুরলো না,বছর বাড়তে বাড়তে রামকিঙ্কর শান্তিনিকেতনেই জীবনাবসান ছুঁয়ে থাকল।
** শান্তিনিকেতন পর্ব:-
গুটি গুটি পায়ে রামকিঙ্কর নন্দলাল বসুর ক্লাসে যখন ঢুকছেন, মুখোমুখি সব স্কলার সহপাঠী - ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ দেববর্মন, রমেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী,বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়, সুধীর খাস্তগীর,বিনয়ক মাসোজি, প্রভাতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়,হরিচরণ,বাসুদেবন, সুকুমার দেউস্কর,কানু দেশাই প্রমুখ। পরণে খদ্দর, চেহারায় গ্রামীণ ছাপ, উচ্চারণে আঞ্চলিক ছাপ। অচেনা পরিবেশ। জড়সড় ভাব। আগামীর রামকিঙ্কর তখন ছিলেন ছাই চাপা আগুন, সবার অজান্তে।
তাঁর নাম ও পদবী নিয়ে দু'চারজনের ঠাট্টা তামাশা সয়ে নিলেন, মস্করার তোয়াক্কা করেন না। বিশেষ করে গানের গলা নিয়ে মস্করা করতে সহপাঠীরা পরামর্শ দেন, সাঁওতালদের মাঠে গিয়ে জোর জোর করে গলা সাধতে। তাতেও রাজি তিনি, তাই তাঁর দূরাগত কন্ঠ্যধ্বণি শুনে বন্ধুদের সে কি হাসির হল্লা। পরে কিন্তু সব কৌতুকের যোগ্য জবাব দিয়েছিলেন কি দরাজ গলায় গাইতেন! রাজেন দত্তের আখড়ায় যে পূর্ব প্রস্তুতি হয়েছিল,সে কথাতো কারো জানার কথা নয়। 'রক্তকরবী'র বিশু পাগল,আর 'মুক্তধারা'র ধনঞ্জয়ের গান গাওয়ার দরাজ গলায় স্বয়ং কবিগুরুও মুগ্ধ না হয়ে পারেননি। সহপাঠীদের রীতিমতো লজ্জা পাইয়ে দিয়েছিলেন।
**গুরুদেব ও রামকিঙ্কর:-
গুরুদেবের নজর গিয়ে পড়ল রামকিঙ্করে। রামকিঙ্কর 'সুজাতা' স্কাল্পচারে জোরদমে মনোনিবেশ দিয়েছেন। সাল ১৯৩৫। এইসময় চিত্রকলা চর্চায় গুরুদেবও যে মধ্যগগনে। পশ্চিমী ঘরানার পোশক। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর অনুরাগী। যার যাত্রা শুরু হয়েছিল 'পূরবী' কাব্যের পান্ডুলিপি কাটাকুটির সূত্রে।
একদিন রামকিঙ্কর এতো মগ্ন হয়ে কাজ করছেন, কখন গুরুদেব কাছে দাঁড়িয়ে বিভোর হয়ে দেখছেন টেরও পাননি। হঠাৎ ঘোর ভাঙতে, গুরুদেবকে দেখে বিনয়াবনত। গুরুদেব পাশে গিয়ে বললেন, ' তুমি নিজের মত কাজ করে যাও। কারো পরোয়া করো না। যা কাজের লক্ষ্য আছে, সেটা চোখের সামনে রেখে করে যাও।' সেই সঙ্গে গুরুদেব জিজ্ঞেস করলেন, ' সমস্ত আশ্রম এর চেয়েও বড় বড় মূর্তি গড়ে ভরে দিতে পারবি?' গুরুদেবের এই ভরসা ছিল খুব স্বতঃস্ফূর্ত। কেননা, সেই সময় শান্তিনিকেতনে একমাত্র গুরুদেব ও তিনি পশ্চিমী ঘরানার চিত্ররীতির সমর্থক ছিলেন। অন্যরা ভাবতেন ওসব পশ্চিমী ঘরানার কিউবিজম শান্তিনিকেতনে বেখাপ্পা, মডেল নিয়ে কাজ করার আপত্তি ছিল খুব জোরালো। অ্যাবস্ট্রাকশনেও আচার্য নন্দলাল বসুর সায় ছিল না। এসব বিদেশি আদর্শে প্রণোদিত কলকাতার গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলে চলতে পারে, শান্তিনিকেতনের আলো বাতাসে বেমানান, উৎকট হয়ে দাঁড়ায়। তাই অনেকের কাছে গোপনে নিন্দামন্দের খোরাক ছিল। এমনকি গুরুদেবের চিত্রকলা অনেকের কাছে ততটা গ্রহণযোগ্য হতো না। এই নিয়ে গুরুদেবের মনে অভিমানের সুর একান্তে ধরা পড়তো। গুরুদেব রামকিঙ্করের চিত্রকলার আন্তরিক সমঝদার ছিলেন। রামকিঙ্করও গুরুদেবে সমঝদারিত্ব পোষন করতেন। তাই রামকিঙ্করকে গুরুদেব প্রশ্রয় দিতেন।
গুরুদেবের মৌখিক সংশাপত্র রামকিঙ্করের জীবনে মন্ত্রের মত কাজ করে গেল। আর তাঁকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। সৃষ্টির প্রবল উন্মাদনা তাঁকে পেয়ে বসল।
** নন্দলাল বসু ও রামকিঙ্কর:-
এই যে বলা, 'কারোর পরোয়া করো না'- কিছু তো একটা ব্যাপার ছিল। শান্তিনিকেতন ছিল রক্ষণশীল। ফাইন আর্টের পক্ষপাতী। ফাইন আর্ট শৈলীর চেয়ে রামকিঙ্করের পছন্দ তেল রঙের ব্যবহারে পশ্চিমী ঘরানায় মডেল আর্টের উপর কাজ করা। এতে বসু ম'শায়ের না পসন্দ। তাই রামকিঙ্করকে আশ্রমিক পরিবেশে নিঃসঙ্গ হয়ে যেতে হয়।
তিনি কী করে বোঝান যে তিনি ট্র্যাডিশনে বিশ্বাস করেন না- এ যে স্কাল্পচার,এ তো ঠাকুর গড়া নয়, আলপনাও নয়। এর ট্র্যাডিশনটাই যে আলাদা। এ 'বাইরের কাজ'। শান্তিনিকেতনের অন্তর্মুখী 'আমাদের কাজ' দিয়ে বিচার করা বৃথা। কেননা নিষিদ্ধ জিনিসের মধ্যে ছিল অয়েল কালার পোট্রেট করা। মন গড়া জিনিস না করে প্রত্যক্ষ দেখে স্টাডি করা - এ সবই রিয়ালিস্টিক কাজের মধ্যে পড়ে। কে-ই বা বুঝবে। কিন্তু রামকিঙ্করের পছন্দে বাধা হতেন না। রামকিঙ্করের কাজ দেখে যেতেন কিছু বলতেন না। বসু ম'শাই যাই ভাবুন না কেন, মনে মনে স্বীকার করতেন তাঁর দামাল ছাত্রটির কি অসাধারণ ক্ষমতা! দেখছেন মাটির কাজের উপর কি অসাধারণ দখল। হাতের dexterity দেখে বুক কেঁপে যায়। এ যে অনেক জন্মের সাধনা নিয়ে রামকিঙ্কর জন্মেছে। একান্তে আরেক প্রিয় শিষ্য বিনোদবিহারি মুখোপাধ্যায়ের কাছে দ্বিধাহীন চিত্তে বলতেন।
শান্তিনিকেতন যদি একটা মহাকাব্য হয়,তার অন্যতম আলোময় আয়ত সর্গের নাম রামকিঙ্কর। আবার এও বলতে দ্বিধা নেই যে শান্তিনিকেতনের রামকিঙ্কর আর রামকিঙ্করের শান্তিনিকেতন- কথা দুটি একে অপরের পরিপূরক। কেননা শান্তিনিকেতনে আকাশখোলা মাটির বুকে দাঁড়িয়ে আছে রামকিঙ্কর ও তাঁর ভাষ্কর্য - 'সুজাতা', 'সাঁওতাল পরিবার', 'ধানঝাড়া', 'বুদ্ধ', 'কলের বাঁশি', 'বাতিদান' আরো কত কত! গুরুদেবের কথা রাখতে গোটা শান্তিনিকেতন ভরিয়ে দিয়েছিলেন আধুনিক ভাষ্কর্য দিয়ে। তাঁর চিত্রকলা চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল নিজস্বতা। আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি।
** চিত্র- ভাস্কর্য ও রামকিঙ্কর:-
শান্তিনিকেতনে চিত্র-ভাষ্কর্যে অমর হয়ে আছে তাঁর ভালো লাগার সেইসব নারীরা যাঁদের সংস্পর্শে রামকিঙ্কর কোনো না কোনোভাবে এসেছিলেন। যেমন তাঁর ছাত্রী জয়া আপ্পাস্বামী। ১৯৩৫-এ 'সুজাতা'-র অবয়ব সৃষ্টির মূলে ছিল তাঁর এই ছাত্রীটি। ১৯৩৭-এ তাঁর প্রথম নারীদেহের পূর্ণাবয়ব তৈলচিত্রটি হল 'সোমা যোশী'-র প্রতিকৃতি। যে ছবিটি 'লেডি উইথ ডগ' নামে পরিচিত। এরপর ১৯৪৫-এ কলাভবনে এলেন তাঁর ছাত্রী রূপে মণিপুরের রাজকন্যা বিনোদিনী। বছর খানেক থাকার পর চলে যান। আবার দ্বিতীয় বারের জন্য এলেন ১৯৪৭-এ। ১৯৪৯-এর এপ্রিল পর্যন্ত থাকেন। কথিত আছে বিনোদিনীর সঙ্গে রামকিঙ্করের গভীর প্রণয় পর্যন্ত গড়ালেও বিবাহ পর্যন্ত গড়াতে পারেনি। কেননা জাতকৌলিন্যহীন রামকিঙ্করের বৈবাহিক সম্পর্ককে শান্তিনিকেতনের সামন্ততান্ত্রিক মনোভাব মনোনয়ন দেয়নি। এই ব্যর্থতার গ্লানি থেকে মুক্তি পেতে জলরঙে-তেলরঙে বা রেখাভিত্তিক বিনোদিনীর বিভিন্ন ভঙ্গিমার পূর্ণাবয়ব প্রতিকৃতি সারা পট জুড়ে একের পর এক এঁকেছিলেন।
আসামের আরেক প্রতিভাধর গুণী মেয়ে নীলিমা বড়ুয়ার পূর্ণ প্রতিকৃতি চটের উপর গ্রাউন্ড দিয়ে এঁকেছিলেন। ভূবন ডাঙার মেয়ে খাঁদু, অপূর্ব সুন্দরী- স্নানরতা মডেল থেকে নীলরঙ দিয়ে অপূর্ব প্রতিকৃতি আঁকেন। আবরণী নামে একটি মেয়ের থেকে আঁকা ছবি 'দেশ' পত্রিকায় 'চন্দ্রনীড়' নামে প্রকাশিত হয়েছিল। এছাড়া উল্লেখযোগ্য নারীকেন্দ্রিক পূর্ণাবয়ব ভাষ্কর্যগুলি যাঁদের থেকে এসেছিল, তাঁরা হলেন- প্রীতি পান্ডে, মীরা চ্যাটার্জী,মধুরা সিং,ইরা ভাকিল প্রমুখ। সুন্দর মুখ দেখলেই রামকিঙ্করের দৃষ্টি থেকে কারো রেহাই ছিল না। এমনিভাবে ষাটের দশকে যেমন বিখ্যাত সব ভাষ্কর্যগুলির পেছনে যাঁরা ছিলেন যেমন, শীলা বর্মা, চৈতালী দে,কিরণ থাপা, কুমকুম ভট্টাচার্য প্রমুখ। এঁরা সকলে কোনো না কোনোভাবে কলাভবনে শিল্প শিক্ষার পাঠ নিতে এসেছিলেন। এগুলি অবশ্য সময়ের সাথে সাথে সব লয় পেয়েছে। এরই পাশাপাশি স্মরণীয় অমর সৃষ্টি গ্রামের বধূ দনুজদলনী,বা গর্ভবতী মহিলা ভাষ্কর্য দুটি। এসবই নারী সৌন্দর্যের প্রতি দূর্নিবার আকর্ষণ থেকেই তিনি অবনীন্দ্রনাথের পরে দ্বিতীয় শিল্পী, যিনি নব্য ভারতীয়ধারার প্রচুর প্রতিকৃতি এঁকেছিলেন। তাঁকে বলা হয় আধুনিক চিত্রকলায় নব্য ধারার পথিকৃৎ।
এত যে বিপুল সৃষ্টি, তাঁর সৃষ্টির মূলে কত নারী এসেছে, চলেও গেছে, কিন্তু স্থায়ী সঙ্গী হয়ে যে নারী তাঁর সৃষ্টির ফসল ফলিয়ে ছিলেন, সেই নারীর অবদান না থাকলে সৃষ্টি অসম্পূর্ণ থেকে যেত, কলাভবনোত্তর নিঃসঙ্গ জীবনের একমাত্র আশ্রয় হয়ে কিভাবে সৃষ্টির রসদ যুগিয়েছেন, সেই কাহিনি না শুনলে এতক্ষণের আলোচনা বৃথা। বিয়ে না করেও রামকিঙ্করকে কীভাবে জীবন সঙ্গিনীর মতো আস্বাদনের পূর্ণতা দিয়েছিলেন- সেই তিনি হলেন রাধারানী।
** রামকিঙ্কর ও রাধারাণী:-
জাতকৌলিণ্যহীনের তকমার জন্য যা একটু সামন্ততান্ত্রিক মনোভাব পোষণকারীদের কাছ বিব্রতবোধ করতেন রামকিঙ্কর। তবে আমল দিতেন না। সৃষ্টির সৌজন্য তাঁকে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দম যোগান দিত। একদিন হঠাৎ জীবনে এসে গেলেন রাধারাণী। যেন তাঁরই জন্য অধীর অপেক্ষায় ছিলেন। পেয়ে গেলেন সৃষ্টির ব্যক্তিগত খুশির লাগামহীন দৌড়। যোগ্য সঙ্গতও দিয়েছিলেন রাধারাণী দেবী। রাধারাণীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে বাঁধা না পড়েও সুখের দাম্পত্য জীবনের স্বাদ পাওয়ার কোনো অসুবিধা হয়নি, বা উভয়ে কোনো অংশে কম ছিলেন না। কে এই রাধারাণী?
শান্তিনিকেতনের অদূরে বীরভূম-বর্ধমানের সীমান্তে গুসকরার এক মধ্যবিত্ত অন্ত্যজ পরিবারে জন্ম রাধারাণীর। গড়াই ছিল তাঁদের পদবী। জাতিতে কলু। তিন ভাই ও বোনের মধ্যে রাধারাণী বড়। মা দুর্গা দাসী,বাবা চন্দ্র গড়াই। চন্দ্র গড়াই ছিলেন সাধারণ চাকুরেজীবী। তিনি রাধারাণীর বিয়ে দেন বোলপুরে। স্বামীর ছিল মুদির দোকান ও চাষবাস।
বিয়ের কিছুদিন পরে রাধারাণী জানতে পারেন তাঁর স্বামী অন্য এক নারীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে জড়িত। রাধারাণীর বয়স তখন কুড়ি। স্বামীর ঘর ছেড়ে বাপের বাড়িতে চলে আসেন। বাবা তাঁকে অনেক পীড়াপীড়ি করেন স্বামীর কাছে পাঠাতে। রাধারাণীর তখন রাগে, ক্ষোভে, দুঃখে বাপের বাড়ি ছাড়ার জেদ চাপে। বাবাও জেদের কাছে নতি স্বীকার না করে তাঁকে ত্যাগ করেন। সেই যে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলেন রাধারাণী আর ফিরে যাননি না বাবার কাছে,আর স্বামীর কাছেতো নয়ই। বোলপুরে এ বাড়ি ও বাড়ি কাজ করতে করতে অবশেষে ওঠেন শান্তিনিকেতনে। কবি কন্যা মীরা দেবীর আশ্রয় পান। তাঁকে আবার কবিগুরুর পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীও পেত চেয়েছিলেন। শেষে মীরাদেবী তাঁকে ছাড়েননি। এই মীরাদেবীর বাড়ির কাছে শ্রীপল্লিতে তখন থাকতেন রামকিঙ্কর। কবি কন্যার বাড়িতে অবাধ যাতায়াত ছিল রামকিঙ্করের। রামকিঙ্করের সাথে এখানেই রাধারাণীর পরিচয় হয়। পরিচয় থেকে ঘনিষ্ঠতা। ঘনিষ্ঠতা থেকে রামকিঙ্করের বাড়িতে রান্নাবান্না পর্যন্ত করে দিয়ে আসতেন রাধারাণী। রামকিঙ্করকে রাধারাণী বাবু বলে সম্বোধন করতেন। আর রাধারাণী নিজেকে সেবাদাসী বলে পরিচয় দিতেন। অপার মমতা আর শুদ্ধার সঙ্গে বলতেন, 'বাবু-র সেবা করেই কেটে গেছে সারাজীবন।'
ইতিপূর্বে উল্লেখিত অপূর্ব সুন্দরী নারীরা তার মডেল ভাষ্কর্যে-চিত্রে-রেখায় অমর হয়ে আছেন। এই রাধারাণীও ধরা দিলেন একইভাবে, তবে অপার সৃষ্টির রহস্যকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে। শান্তিনিকেতনের ঐতিহ্যের গন্ডি ভাঙলেন। চিত্রে-ভাষ্কর্যে-রেখায় যে পশ্চিমী 'ন্যুড স্টাডি' পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য রাধারাণী রামকিঙ্করের কাছে নিজেকে একেবারে সমর্পণ করলেন। সাহসের বলিহারি বলতে হয়। শান্তিনিকেতনের বদ্ধদুয়ারে সজোরে আঘাত হানলেন। সৃষ্টির অপার রহস্যে রাধারাণী কোনো 'রাধুণী', 'ঝি', 'শয্যাসঙ্গিনী' নন, ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার সূচনাপথের এক মাইলস্টোন হয়ে যান রাধারাণী। 'রামকিঙ্করের ড্রয়িং' নামক গ্রন্থে যতগুলি রেখাভিত্তিক "নগ্নিকার' চিত্র ছাপা হয়েছে তার সবগুলোই রাধারাণী ভিত্তিক। শান্তিনিকেতনে বসে এভাবে ন্যুড স্টাডি,যা ভাবা সত্যিই দুঃসাহসের পরিচয়। পাশ্চাত্য ন্যুড চিত্রকার রঁদা-র সঙ্গে একমাত্র তুলনা তখনই এসেছে, রামকিঙ্করের ন্যুড শিল্প রীতির অসমান্যতা পরিমাপ করতে গিয়ে। উভয়ে সমমানের।
রঁদা বিশেষ কোনো বসিয়ে ন্যুড স্টাডি করতেন না। তাঁর নির্বাচিত কয়েকজন মেয়ে মডেল ছিল। তাঁরা নগ্ন হয়ে ঘুরে বেড়াতেন, রঁদা তাঁদের দেখতেন,আর ড্রয়িং করতেন। ঠিক অনুরূপ ছিলেন রামকিঙ্করের রাধারাণী। তাই বলা হয়, রাধারাণী ভিত্তিক নগ্নিকার চিত্রগুলি ছিল গুণের দিক দিয়ে রঁদারই মতো।
** শেষ কথা:-
সত্যিই সাধক রামকিঙ্করের সাধনভূমি ছিল শান্তিনিকেতন, যেখানে সাধক আর সাধনভূমি একে অপরের হাত ধরাধরি করে এগিয়েছে।
মাথার উপর জ্বলছে সূর্য। বীরভূমের গ্রীষ্মের দুপুর। ঘরের বাইরে থাকা লোককে যেখানে চক্কর মেরে ফেলে দেয়, ঘরের ভেতরে ঝিমোয় যেখানে, সেই খরতাপে রামকিঙ্করের সৃষ্টি মেতে ওঠে। রোদেপোড়া নির্জনতা তাঁকে সরস করে তোলে। গায়ে ফতুয়া,মাথায় টৌকা,ভারায় দাঁড়িয়ে খোয়াইয়ের পাথর সিমেন্ট মেখে ছুঁড়ে ছুঁড়ে দেন মনের ভেতরে থাকা মূর্তির দিকে;এই আনন্দে অরূপের রূপ হয়ে উঠবে বলে।
২৮আগষ্ট,১৯৭৫ এসেছেন ঋত্বিক ঘটক পরিচালক,নায়ক রামকিঙ্কর। রামকিঙ্কর তখন খড়োচালা মাটির ঘরে,উসকো-খুসকো চুল, খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি, বারান্দায় বসে বিড়ি টানছিলেন। আগন্তুককে দেখে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। আপ্যায়নে বিড়ি বিনিময় হয়ে গেল। মুহূর্তে সাজগোজ হয়ে গেল। অদূরে নদী তার পাড়েই টৌকা মাথায় হয়ে গেল দৃশ্য গ্রহণ, রেকর্ডিং। অপূর্ব সে তথ্য চিত্র।
কি অবস্থায় দেখলাম রামকিঙ্করকে! কলাভবন থেকে নিক্ষেপিত। অবহেলা, উপেক্ষা,বিদ্রুপ, নিষেধাজ্ঞায় রামকিঙ্কর পড়ে আছেন একেবারে নির্জনে। শান্তিনিকেতনের অচলায়তনের নিত্যদিনের অভ্যাস তাঁর জীবনযাপন নিয়ে মস্করা করা, অভিযোগের পর অভিযোগের নানা ফিরিস্তি - তাঁকে নেই শান্তিনিকেতন করে দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় আধুনিক শিল্পকলার অধিনায়কের ঠাঁই খড়োচালার মাটির ঘরে,চাল ফুঁড়ে বৃষ্টি নামে,মশারির উপর বিছিয়ে দেওয়া পেন্টিং দিয়ে বৃষ্টি থেকে বিছানা বাঁচান,আর শুয়ে শুয়ে নিজের আঁকা ছবিতে মগ্ন হয়ে সময় কাটান। আর রক্তকরবীর বিশুপাগল, মুক্তধারার ঠাকুরদার স্মৃতি নিয়ে এক অভিযোগহীন নৈর্ব্যত্তিক শিল্পী মনন নিয়ে দিন কাটান। আর মুখোমুখি থাকেন কেবল রাধারাণী।
একেবারে শেষ পর্যায়ে। শরীরে অসুখ গুরুতর। চিকিৎসার জন্য কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হবে। কারো মুখে কথা নেই, রবীন্দ্রনাথের মতো যেন এই শেষ যাত্রা না হয় মনে মনে সকলের প্রার্থণার স্তব্ধতাকে মুছে দিয়ে তিনি বলে উঠলেন, 'যাচ্ছি শান্তিনিকেতন ছেড়ে। যাচ্ছি - কিন্তু আর ফিরব না। রবীন্দ্রনাথও ফেরেননি।' ৩ আগষ্ট,১৯৮০ - শান্তিনিকেতন অপেক্ষায় থাকে তার বিশুপাগলের মরদেহ কখন ফিরবে।
# কলমে ~ মৃদুল কুমার দাস
@Copyright reserved for Mridul Kumar Das
#__সমাপ্ত__#

খুব সুন্দর তথ্য সমৃদ্ধ লেখা,,,,,,,পড়ে উপকৃত হলাম 👌👌👌💐💐💐😊😊😊
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা। অনুপ্রাণিত।💐💐🌻🌻
মুছুনদারুন , অসাধারন ।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা। অনুপ্রাণিত।💐💐🌻🌻
মুছুনতথ্য সমৃদ্ধ লেখা।অসাধারণ দাদা।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা। অনুপ্রাণিত।💐💐🌻🌻
মুছুন