রবিবার, ২২ নভেম্বর, ২০২০

রিক্ত (ছোটো গল্প)_Subhrajit Chakravorty


 রিক্ত
--------

আফ্রিকার এক গভীর জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ের ক্লিফে পা ঝুলিয়ে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে সুমিত ভাবছে, এরকম কি ওর সাথে ঘটা উচিত ছিলো? ও তো কস্মিনকালেও এরকম চায় নি! ওর জীবনের এই পরিণতি হবে সেটা ও কি স্বপ্নেও ভেবেছিলো, যেদিন প্রথম দেখেছিলো প্রিয়াকে কলেজে?

এক লহমায় মন পৌঁছে যায় সেই দিনগুলোতে ।

দুজনের জুটিকে "সুপ্রীত" নাম দিয়েছিলো বন্ধুবান্ধবরা। প্রিয়া আর সুমিত দুটো নামের মেলবন্ধনে তৈরি একটা নাম। সবাই বলতো, যদি তোদের ছেলে হয়, তাহলে সুপ্রীত নাম রাখবি, আর মেয়ে হলে সুপ্রিয়া। 

সুপ্রিয়া নাম টা শুনে প্রিয়া রেগে যেতো। বলতো, কিরকম আদ্দিকালের নাম। নামটা প্রিয়ার ভালো না লাগার আরেকটা কারণ ছিলো, সে চাইতো ওর প্রথম সন্তান যেনো ছেলে হয়। 

প্রথম সন্তান ছেলে চায় না মেয়ে, সেটা নিয়ে সুমিত কিছু ভেবে পেতো না। কিন্তু ও যখনই ভবিষ্যত নিয়ে ভাবতো, ওর চোখে ভেসে উঠতো একটা পুত্রসন্তানের মুখ। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের দু বছর প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে, যখন কলেজ থেকে বেরোলো ওরা, দুজনেই হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজতে শুরু করলো। প্রিয়া খুব সহজেই শহরের বুকে চাকরি পেয়ে গেলো। মোটামুটি মাইনে। সুমিতের চাকরি পেতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিলো। উপরওয়ালা বোধহয় অন্য কিছু লিখে রেখেছিলো। 

সুমিত প্রথম চাকরি পেলো, দুবাইতে। প্রিয়া প্রচন্ড কান্না কাটি শুরু করেছিলো। চাকরি ছেড়ে দিয়ে সুমিতের সাথে দুবাই যেতে রাজি ছিলো। কিন্তু সেটা সুমিতের বিবেকে বাঁধছিলো। কি করে প্রিয়ার কেরিয়ার নষ্ট করতে পারে ও? বিশাল অংকের মাইনের চাকরি ছেড়ে দিলো সুমিত। বললো, ওরকম চাকরি অনেক পাবো, অনেক টাকা কামাবো জীবনে, কিন্তু আমার প্রিয়ার কেরিয়ার আমি নিজের হাতে শেষ করতে পারবো না। বিদেশের তিন ভাগের এক ভাগ টাকার মাইনের চাকরি পেয়ে শহরে থেকেই বিয়ে করলো প্রিয়াকে। 

বিয়ের দু বছরের মধ্যেই কন্যা সন্তান জন্ম নিলো। সুমিত হাসতো আর বলতো, দেখেছো, আমরা চাইতাম পুত্র সন্তান, কিন্তু ভগবান আমাদেরকে দিলেন কন্যা। সেই নিয়ে কোনো আক্ষেপ ছিলো না কারুরই। বরং বেশ ভালো লাগছিলো ওদের। প্রিয়ার পছন্দ নয় বলে, সুপ্রিয়া না রেখে, মেয়ের নাম রেখেছিলো সুস্মিতা। প্রিয়ার কথা এক বাক্যে মানতো সুমিত। প্রিয়াও সুমিত ছাড়া কিছুই বুঝতো না। 

সুমিত শেষ অবধি প্রিয়ার কেরিয়ার বাঁচাতে পারে নি। মেয়েকে দেখভাল করার জন্য স্বচ্ছন্দে চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলো প্রিয়া। সুস্মিতা দুজনের চোখের মণি ছিলো। আস্তে আস্তে বড়ো হচ্ছিলো আদরের সুস্মিতা। এরই মধ্যে, অনেকবার বিদেশে চাকরির অফার পেয়ে ফিরিয়ে দিয়েছে সুমিত। প্রিয়া আর সুস্মিতা কে ছাড়া একদিনও যে কল্পনা করতে পারে না সুমিত!

কিন্তু মানুষের মনের কথা মানুষ নিজেই বুঝতে পারেনা, নিজেকেই নিজে চিনতে পারে না মানুষ। সাধের চাকরি ছেড়ে দিয়ে, মনের কোথাও এক কোনে যেনো একটা না পাওয়া থেকে গিয়েছিলো প্রিয়ার। ওর মন আবার, কিছু একটা করার জন্য উতলা হয়ে উঠলো। সুমিতকে না জানিয়েই শুরু করলো চাকরি খুঁজতে। পেয়েও গেলো একটা পার্ট টাইম জব। দুপুরে দু ঘন্টা করে ডেটা এন্ট্রির কাজ। 

সুস্মিতার স্কুল আর সুমিতের অফিসে থাকার সুযোগ নিয়ে ধরে নিলো কাজটা। কিছু একটা করে দেখানোর ক্ষিদে টা যেনো আরও বেড়ে গেলো প্রিয়ার। কাজের পরিমান বাড়ায় আরো এক ঘন্টা করে ডিউটি বেড়ে গেলো প্রিয়ার। সব কিছুই সুমিতের কাছে গোপন রাখতে রাখতে, গোপন রাখাটা অভ্যাসে পরিণত হয়েগেছিলো প্রিয়ার। 

কর্ম সূত্রেই প্রিয়ার পরিচয়, এবং বন্ধুত্ব হয়েগেছিলো রৌনক এর সাথে। রৌনক দিল্লি থেকে আসা, সুপুরুষ এবং মিস্টিভাষী ছেলে। নিজের অজান্তেই সুমিতের থেকে দূরে চলে যাচ্ছিল প্রিয়া। নিত্য নতুন পারিবারিক সমস্যা দেখা দেওয়ায় এবং সংসারের প্রতি আনমনা ভাবের কারণ জিজ্ঞেস করায়, প্রিয়া একদিন বলেই ফেলেছিল সুমিতকে নিজের নতুন চাকরি এবং বন্ধু রৌনকের ব্যাপারে। যদিও প্রথমে সুমিত প্রিয়াকে পূর্ণ সমর্থন করেছিলো কিন্তু দিনের পর দিন সংসারের প্রতি উদাসীনতা আর সারাক্ষন রৌনকের সাথে চ্যাটিং করতে দেখে সুমিতেরও সহ্যের সীমা অতিক্রম করতে থাকে। ফলস্বরুপ চূড়ান্ত অশান্তি আর ঝামেলা দেখা দেয় ওদের মধ্যে। 

এরই মধ্যে প্রিয়ার মুম্বাই কর্ম ভ্রমণ বা ট্যুর এসে উপস্থিত হয়। ট্যুরে রৌনকের একটু বেশিই ঘনিষ্ট হয়ে ওঠে প্রিয়া।

সুমিতের বোঝার কিছুই বাকি ছিলো না যে ওর সোনার সংসারে ভাঙ্গন দেখা দিচ্ছে। নিজের জীবনের ওপর চরম বিরক্তি লেগে গেছিলো সুমিতের। কেউ কারুর মুখদর্শনেও রাজী নয়।

ঠিক এরকম সময়েই সুমিত আবার বিদেশ থেকে চাকরির সুযোগ পায়। নিজের প্রতি প্রিয়ার উদাসীন ব্যবহার, সংসারের ওপর বিরক্তি আর আগের বিদেশের সুযোগ হারানোর ব্যাথা থেকে মুক্তি লাভ করতে, সুমিত চলে গেলো আফ্রিকা। 

আজ তিন বছর অতিক্রম হয়েগেছে, প্রিয়ার সাথে শুধু হাতে গোনা কয়েকবার ফোনে কুশল বিনিময় ছাড়া আর কোনো কথাই হয় নি সুমিতের। যা কথা বার্তা শুধু প্রাণাধিক প্রিয় সুস্মিতার সাথে হয়ে থাকে।

সুস্মিতার কাছেই সুমিত জানতে পেরেছে যে ওর প্রিয়া ভালো নেই। রৌনক কিছুদিনের মধ্যেই স্থানান্তরিত হয়ে অন্য শহরে চলে গেছে। অনুতাপ হোক বা সুস্মিতার প্রতি দায়বদ্ধতা বোধই হোক, সুমিতের গৃহত্যাগের কিছুদিনের মধ্যেই প্রিয়া চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলো। প্রিয়ার স্বভাবেরও আমূল পরিবর্তন এসেছে। খুব প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বেরোয় না। সারাদিন আনমনা থাকে। সুমিতের সবই জানা, যে ওর 
 বিরহে প্রিয়া ভালো নেই। প্রথম প্রথম ভাবতো, এটাই প্রিয়ার পাওনা ছিলো। কিন্তু নিজের ভালোবাসা কষ্টে আছে জেনে সুমিতের মানসিক পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে।

আজ সে রিক্ত, অবসন্ন, ভগ্ন হৃদয় নিয়ে বসে আছে সুদূর আফ্রিকার এক পাহাড়ি ক্লিফে। এই তিন বছর এক মুহূর্তও এমন ছিলো না, যখন ও প্রিয়ার কথা ভাবে নি। কিন্তু আবার ভাবে যে প্রিয়াও কি ওকে ভালোবাসে না? যদি ভালোবাসে তাহলে একবারের জন্যও কেনো ওকে ডাকেনি?

সে নিজেও ভালো নেই। ইচ্ছে করে উড়ে চলে যায় ওর প্রিয়ার কাছে। বাহুডোরে আবদ্ধ করে ক্ষমা চেয়ে নেয়, বলে, "আমি তোমাকে ভালোবাসি প্রিয়া।"

 সবকিছু আগের মতো কেনো হয়ে যায় না?  দুজনেই যদি শিশু সুলভ আচরণ না করতো, তাহলে জীবনের মানেই অন্য হতো। একবার তো প্রিয়া ডাকতে পারতো! একটা ফোনেতেই পাল্টে যেতো সব। সব মান অভিমান ভুলে যেতে সুমিত। কিন্তু না, প্রিয়া ফোন করে নি।  আজ সব শেষ। হেরে গেছে ভালোবাসা। মৃত্যু হয়েছে শাশ্বত প্রেমের। আর দেখা হবে না প্রিয়ার সাথে। ওর প্রিয়া, যার জন্য ও সব ত্যাগ স্বীকার করেছিলো। যার জন্য অনেকবার বিদেশে যাওয়ার সুযোগ পেয়েও যায় নি, আজ তার কারণেই সে বিদেশে বসে। এইসব ভাবনার মাঝেই হঠাৎ প্রিয়ার মেসেজ ঢুকলো "কবে আসবে বাড়ি, তোমাকে ছাড়া আর এক মুহূর্তও কাটতে চায় না যে। তোমাকে ভালোবাসি আমি সুমিত। ফিরে এসো।"
Copyright©All Rights Reserved
Subhrajit Chakravorty

২৪টি মন্তব্য:

  1. অসাধারণ,,,,, খুব ভালো লাগলো 💐💐💐👌👌👌👌👌

    উত্তরমুছুন
  2. দারুন লিখছো....
    অনেক সময় একসঙ্গে থাকতে থাকতে ভালোবাসা অভ্যাসে পরিণত হয়.... তখন কিছু টা সময় দুরে থাকলে ভালোবাসার গভীরতা আরও দৃঢ় হয়৷

    উত্তরমুছুন
  3. খাঁটি হিরে যেমন কাচের মাঝে হারিয়ে যায় অনেকসময়,ঠিক তেমনই সত্যি ভালোবাসাও অনেক সময় সাময়িক ভালোলাগার ভিড়ে হারিয়ে যায়...তবে মুছে যায় না....মন অনুতাপের আগুনে পুড়ে খাঁটি সোনার ন্যায় হলেই সে আবার আসল হীরের ন্যায় বিশুদ্ধ ,স্বার্থহীন ,অফুরান ভালোবাসার কাছে ফিরে আসে.....
    অসম্ভব সুন্দর শিক্ষণীয় বাস্তব গল্প...এভাবেই যেন সমস্ত ভালোবাসা সাময়িক ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ,আবার নতুন সাজে নতুন ভাবে গড়ে ওঠে..

    উত্তরমুছুন
  4. সময়, বড়ো শিক্ষক। ভুল ভাঙে, ভুল গড়ে সময় ।পরিবর্তন জীবন। ভালো লাগলো। ।

    উত্তরমুছুন
  5. Annarakom laglo https://media.tenor.co/images/4bcafb33a0ffd85eeab5d1b2ac5248f5/tenor.gif

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...