সৌগত মুখোপাধ্যায়
মায়ের মৃত্যুটা আমাকে যেনো অনেক টা বছর পিছিয়ে দিয়েছিলো আজ আমি যা তাতে আমার মায়ের পরিশ্রম,উৎসাহের পুরস্কার পেয়েছিআমার এই ৩৮ বছর বয়সে দেশেরকনিষ্ঠতম নিউরো সার্জেন্টেরখেতাব জয় এও আমার মায়ের দান।বিদেশে দু দুটো সার্টিফিকেট পাওয়া আমার মায়ের উৎসাহ, আত্মত্যাগের দাম।মায়ের ইচ্ছা ছিলো দেশে ফেরার পর মা সম্পূর্ণ বিশ্রাম নেবেন।আমার বিয়ে দিয়ে তার সাজানো সংসার কারো হাতে তুলে একটু নিশ্চিন্ত হবেন।কিন্তু মানুষ ভাবে এক নিয়তি দেয় আর এক।দেশে ফেরার কয়েকমাস পরেই হঠাৎ মায়ের হার্ট এট্যাক,একটু সময় অব্দী আমায় দিলেন না আমাকে একা কর চলে গেলেন।দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়া কালীন বাবা এখন মা।নিজেকে পৃথিবীর বুকে একজন এক অজানা অচেনা মানুষ বলে লাগতে শুরু করলো।নার্সিংহোমে আমার পরিচয় ডাক্তার বাবু কিন্ত বাকি সময়টা আমি কে ? কি আমার পরিচয়, কে আমার আপনজন,কাউকে খুঁজে পচ্ছিলাম না।বিদেশে পড়ার সুবাদে এখানে সেরকম বন্ধু বান্ধব সেরকম কেউ ছিলো না।ফ্লাট বাড়ির জীবনে পড়া ছাড়া বন্ধুত্ব করার সময় কখনো পাইনি বিদেশে পড়ার সময় ফেসবুক ব্যাবহার করতাম যদিও গ্রুপ ওয়াইস পড়াশোনার কাজে ব্যাবহার করতাম।ইউরোপিয়ান কান্ট্রি এই সব মিডিয়া বেশির ভাগটাই নিজেদের স্বার্থে ব্যাবহার করে থাকে।যে যার কর্মের সঙ্গে গ্রুপ বেঁধে নেয়।আমাদের দেশের মতো খুব একটা এইসব মিডিয়াকে কোনো এন্টারটেইনমেন্ট বা সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যম হিসেবে দেখে না।যার ফলে কোনো ফেক id বা তার সম্পর্কিত ক্রাইম ওখানে খুব একটা দেখতে পাওয়া যায় না এক কথায় ওখানে ফেক id একটা বড়ো ক্রাইম হিসাবে গন্য হয়আবার অনেকদিন পরে আমার এই একাকিত্বে ফেসবুকের বন্ধু পাওয়ার উদ্দেশ্যে নতুন করে লগিং হলাম ।যেহেতু আমার ইউরোপিয়ান গ্রুপ ,আমার সঙ্গে আমার পরিচিত কেউ সংযোগ করতে পারে।আমার id কোনো পরিবর্তন করলাম না।ও দেশের হিসাবেই আমার সারনেম এবং
জন্মতারিখ আমার id হলো।প্রতিদিন সবার লেখা পড়তাম ,ভালো লেখা পেলে like করতাম,দুএকবার মন্তব্য করলামপ্রথম প্রথম সেরকম কেউই আমায় পাত্তা দিতো না।মাসখানেক লাগলো আমার বন্ধুজমাতে।আমি প্রথমবার ভারতীয় ফেসবুকে আমার পরিচয় গোপন করে লগ হলাম।ওখানেই পরিচয় হলো বিদিশাদির সঙ্গে।খুব ভালো মহিলা উনিও একা,কোন এক বিদেশি এয়ারলাইন্স কোম্পনির এয়ার হোস্টেসের কাজ করতেন,ওনার ছেলেবেলার সখ ছিলো আকাশে ওড়ার,ওই কাজের অছিলায় সারা বিশ্ব উনি উড়ে বেড়াতেন।ওনার একটা কোনো একটা অসুখের কারনে আজ উনি গৃহ বন্দী।৬১বছর বয়েস আমার মায়ের বয়সি।ওনার সঙ্গে কথা বলতে আমার খুব ভালো লাগতো।আমরা প্রতিদিন অনেক রাত অব্দি কথা বলতাম।একমাত্র ওনার কাছে আমি আমার সব পরিচয় দিয়েছিলাম।মায়ের অভাবে আমি যে আর কাজে মন বসাতে পারিনা নিজেকে একামনে করি সব সব বলেছিলাম আমি ওনার প্রোফাইল দেখেছিলাম সেখানে আমি ছাড়া গোটা কয়েক আরো বন্ধু ছিলো।কিন্তু আমি ছাড়া আর বিশেষ কারো সঙ্গে কথা বলেন বলে মনে হলো না।বেশ কিছু মেয়ের ছেলেবেলার ছবি ছিলো।ওনাকে জিজ্ঞাসা করায় বলেছিলেন ওনার ছেলেবেলার ছবি।উনই আমাকে একদিন বলেছিলেন আমি যেনো আর কখনো মায়ের অভাব বোধ না করি।উনি আমার পাশে মায়ের মতো দাঁড়িয়েছিলেন।আমি আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়াত চেষ্টা করছিলাম।মাঝে মাঝে কথা বলতাম কি মিষ্ট গলা মনেই হয়না ওনার বয়েস ৬১বছর,শুনেছিলাম ছেলেবেলা থেকে উনি গানের রেওয়াজ করে মা ছেলের এই FB প্রেম বেশ চলছিলো, হঠাৎ একদিন উনি আসা বন্ধ করলেন।তিনদিন কেটে যাওয়ায় আমার মন আনচান করতে লাগলো,চতুর্থ দিন আমি কল করলাম কিন্তু ফোনের সুইচ অফ।প্রতিদিন FB পেজে আমার বন্ধু আমার বিদিশা মায়ের খোঁজে লগ হতাম কিন্ত না সে আসে না।ফোনের সুইচ অফ।আমরা কখনো কারো ঠিকানা চাই নি আমার আনন্দের দিন গুলো আসত আসতে অপরাহ্ন গ্রাস করতে লাগল।আমি আবার মানসিক ভাবে ভেঙে পড়তে লাগলাম,নিজেকে একা খুঁজে পেতে লাগলাম।
মাসখানেক কেটে গেছে আমি আবার নিজেকে আরো বেশি কাজে মধ্যে জড়িয়ে দিয়েছি ,অনেক বেশি অপারেশন টেবিলে বেঁধে রাখতে চাইলাম একাকিত্বের নাগপাশ থেকে বেরিয়ে আসার শেষ চেষ্টা করতেথাকলাম।মেডিকেল বোর্ডের সব ডাক্তার সহমতে আজ আমাকে জীবনের সব থেকে বড়ো অপারেশন করতে হবে।ব্যাঙ্গালোর থেকে আমায় কলকাতায় উড়িয়ে আনা হয়েছে।এখানকার আরো দুই নিউরো সার্জেন্ট এই অপারেশনে আমায় এসিস্ট করবেন।খুব ক্রিটিক্যাল অপারেশন রুগীর ব্রেন টিউমার লাস্ট স্টেজ, টিউমার পেকে গেছে, বাঁচার চান্স ৪০%,এই৪০% শুধুমাত্র তার বয়েস মাত্র ১৬ তাই।মাকে স্মরণ করলাম মা আমাকে শক্তি দাও এই বাচ্ছাটাকে তার বাবা মার কোলে যেনো ফিরিয়ে দিতে পারি।অপারেশন থিয়েটারে ঢোকার আগে তার
বাবা মা আমার পা জড়িয়ে ধরলেন,ডাক্তার বাবু আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দিন।আমাদের দিপুকে ফিরিয়ে দিন,আপনি
ভগবান আপনি মুখ তুলে না তাকালে আমাদের কোল খালি হয়ে যাবে।ওনাদের আস্বস্ত করে অপারেশন রুমে ঢুকি।১২ ঘন্টার আমার সর্বস্ব ক্ষমতা দিয়ে অপারেশন সাকসেস করি।কিন্তু চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে জ্ঞান না ফিরলে কোমায় চলে যাবার আশঙ্কা আছে।
বাড়িতে ফিরে এসেও আমি শান্তি পাচ্ছিনাওইবাচ্ছা মেয়েটার মুখআমার সামনে কেবলই ভেসে উঠতে লাগলো আমি নার্সিংহোমে ফিরে যাই মেয়েটার বাবা মাকে ডাকি ।ওদের মুখেই সব শুনি ,দশ বছর অব্দি মেয়েটির কোনো অসুখ ছিলো না,পড়াশোনা,গানবাজনা, আর আকাশেভেসে বেড়াবার স্বপ্ন নিয়ে দীপিকা বেড়ে উঠছিলো।হটাৎ একদিন স্কুল বাস থেকে পড়ে গিয়ে মাথায় চোট পায়।তারপর থেকে প্রায়ই মাথায় যন্ত্রনা,চোখে কম দেখা এইসব নানা উপসর্গ দীপিকাকে ঘিরে
ধরে।গতবছর থেকে শরীরে আরো
অবনতি ঘটে মাথার টিউমার ধরা
পড়ে।স্কুলে পড়া গানবাজনা সব বন্ধ
দীপিকা একা ঘরে বন্দী হয়।একমাস আগে চোখের দৃষ্টি চলে যায়সব
ঝাপসা দেখতে থাকে।বাকিটা তো-----ওর বাবা বলে ডাক্তার বাবু এই একবছরে
ওর কল্পনার সংসারে মা
আমার কতো কি করেছে জানেন।ভদ্রলোক পকেট থেকে একটা খাম বার কর বলে নার্সিংহোমে আসার আগের দিন আম হাতে দিয়ে বলেছিলো বাপী নার্সিংহোমের
ডাক্তার কাকুদের দিও।
এটা আমার ছেলেকে তারা যেনো দিয়ে দেয় , আমার ছেলে মস্ত ডাক্তার,ও কষ্ট পাবে আমার অসুখ শুনলে তাই তো ফোন অফ করে রেখেছিলাম, কিন্ত আমি যখন থাকবো না এই চিঠিটা ডাক্তার কাকুরা আমার ছেলের হাতে যেনো পৌঁছে দেয়,না হলে ও ওর মাকে ভুল বুঝবে আমার মাথা বনবন করে ঘুরতে থাকে।ভদ্রলোক আরো কি সব বলতে থাকে,আমি চিঠিটা হাত থেকে কেড়ে নিয়ে খাম ছিঁড়ে সেটা বার করি তাতেলেখা,তুমি আমায় ভুল বুঝনা সবার কাছে আমি দীপিকা হলেও তোমার আমি বিদিশামা, আমি স্বর্গে গিয়ে তোমার মাকে খুব বকবো কেনো তোমায় একা করে চলে গেছে,ICU মনিটরে আঁকতে থাকা আমার ছোট্ট মায়ের প্রান এখনআমার হৃৎপিণ্ডের ভিতরে চলতে থাকে আমি আমার মায়ের পাদুটো নিজের বুকে
চেপে ধরি।আমার এক মা আমায় ফাঁকি দিয়েচলে গেছে,আমার এই ছোট মা কে আমি কিছুতেই যেতে দেবো না।
💐💐 সমাপ্ত💐💐💐💐

Khub khub valo laglo🥰.
উত্তরমুছুন😊😊😊😊💐💐💐💐
মুছুন