রবিবার, ২২ নভেম্বর, ২০২০

অভিমানী ভালোবাসা

 


অণুগল্প : অভিমানী ভালোবাসা 

কলমে : ঈরু

© All rights reserved to Eshita Biswas 'Iru'


ভালবাসার অনিল অসিমে ভেসেছিলাম তুমি -আমি। বিন্দু বিন্দু ভালবাসায় পূর্ণ করতে চেয়েছিলাম আমাদের প্রেমের তরী। কিন্তু এক টুকরো মান-অভিমান ভেঙে দিল সব স্বপ্ন। অভিমানটা বড্ড বেশি ছিল হয় তোমার নয়তো আমার। মনে পরে সেই দোলের দিনে প্রথম যখন রং লাগাবে বলে এসেছিলে, ছুটে পালিয়ে যেতে চেয়েছিলাম তোমার থেকে।

তখন তুমি আমার হাত ধরে কাছে টেনে নিয়েছিলে আমাকে। আবির রঙে রাঙিয়ে দিয়েছিলে আমার সিঁথি, আর বললে এবার পালাও দেখি কেমন পারো! তোমার কথা শুনে লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিলাম আমি, আর তখনই তোমার সুমধুর চুম্বনে নিজের করে নিয়েছিলে আমাকে।

বাগান করতে খুব ভালো লাগে আমার, ইদানিং সখটা যেন আরও পেয়ে বসেছে। নানা ধরনের নাম না জানা ফুলের গাছ দিয়ে সাজিয়ে রেখেছি আমার ছাদবাগান। তোমাকে ভুলে থাকার এসব বৃথা চেষ্টা করেও, বার বার তোমাকে মনে করিয়ে দেওয়া ফণীমনসা গাছটি আজও রেখে দিয়েছি সযত্নে। সেবছর আমার জন্মদিনে আগে থেকেই বলে রেখেছিলে,

"বিকেল বেলায় মাঠে আসবে তোমার জন্য বিশেষ উপহার আছে।"

আমিও তেমনি গভীর আগ্রহ আর কৌতুহল নিয়ে গিয়েছিলাম তোমার কাছে। তখন তুমি আমার সব আশায় জল ঢেলে হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলে এই গাছটি। আমার অশ্রুসিক্ত নয়ন দেখে তুমি বুঝতে পেরেছিলে আমি খুব কষ্ট পেয়েছি। তখন তুমি বলেছিলে,

"ওরে পাগলি আমার কষ্ট পেয়ো না। এটা তোমাকে দেওয়া আমার ভালোবাসার প্রথম উপহার। এ গাছটি যেমন অক্ষয় তেমনি আমার ভালোবাসাও অমর।"

গাছটি সেই আগের মতোই আছে শুধু এখন আর পাইনা তোমার ভালোবাসার ছোঁয়া।

তুমি চলে গেছো আজ বেশ ক'বছর হলো। তোমাকে হারানোর পর প্রতিটি বছর আমার জন্মদিনে একটা করে উপহার পাই। জন্মদিনের দিন ভোর বেলায় সদর দরজা খুলেই দেখতে পাই র‍্যাপিং পেপারে মোড়ানো একটি জিনিস আর তার সাথে একটা চিঠি। আমি জানি না এই উপহার গুলো আমাকে কে পাঠায়, তবু্ও আমার ষষ্ঠোন্দ্রিয় আমাকে অনুভব করায় যে এগুলো তুমিই পাঠাও।আজ পর্যন্ত একটা র‍্যাপারও খুলে দেখি নি কি আছে তার ভেতর
কেন জানো?

- কারণ যে মানুষ উপহার পাঠাতে পারে সে কেনো আমার সামনে আসতে পারে না। কেনো বলতে পারে না প্রিয়তমা এই উপহার শুধু তোমার জন্য!

প্রতিটি দুর্গা পুজোই আমাকে মনে করিয়ে দেয় তোমার খুনসুটি মাখা স্মৃতি। সেবছর ছিল আমাদের প্রথম পুজো,তুমি আগে থেকেই আমাকে বলেছিলে এবার পুজোর পাঁচটা দিনের প্রতিটি দিনই আমাকে শাড়ী পরতে। আমি বলেছিলাম আমিতো শাড়ী পরতে পারি না!

তুমি বলেছিলে সেসব আমি কিছু জানি না শাড়ী তোমাকে পরতেই হবে। তুমি চেয়েছিলে পুজোর প্রতিটা দিন আমাকে নতুন রূপে দেখতে নতুন ভাবে জানতে।

ষষ্টী গেলো সপ্তমী গেলো দুদিনের একটা দিনও তোমার দেখা পেলাম না। কথা মতো আমি ঠিকই মন্দিরে যেতাম, কিন্তু তুমি আসতে না। অষ্টমীর দিনে অঞ্জলির শেষে হঠাৎ কোথা থেকে তুমি উদয় হলে, আমার হাতটা ধরে নিয়ে গেলে মন্দিরের পেছনে শিউলি গাছের নিচে।সেদিন আমি পরেছিলাম নীল রঙের একটি শাড়ী, তুমি আমাকে দেখে মোহিত হয়েছিলে। আর আমাকে বলেছিলে নীল শাড়ীতে আজ আমায় লাগছে তোমার স্বপ্নের নীলাম্বরী। অভিমানের সুরে  আমি বলেছিলাম গত দুদিন আসোনি কেনো? আমার হাতে একজোড়া চুড়ি পরাতে পরাতে বলেছিলে,

"তোমাকে পুজোয় কি দিব সেটা ভেবে পাচ্ছিলাম না। পুজোর উপহার না নিয়ে তোমার সামনে কি করে আসবো বলো! তবে হ্যাঁ এই দুদিন তোমার শাড়ী পরাটা একদম বৃথা যায় নি। আমি তোমাকে দেখেছি দূর থেকে আমার স্বপ্ন পরীকে।"

সেদিন তোমার কথা শুনে আমার চোখে মুখে লেগেছিল হাসির ঝলক, অন্তরে জেগেছিল আনন্দের দোলা।

কিন্তু এখন আর কোনো পুজোতেই  সেই আনন্দের দোলা জাগে না আমার অন্তরে। এখনো প্রতিবছর পুজোর প্রতিটি দিনই  আমি শাড়ী পরি। মাঝে মাঝে মনে হয় কেউ বোধহয় আমাকে দেখছে, কিন্তু হায় নাহ্, সেই ভালোবাসা ভরা নয়নে আজ আর আমাকে দেখে না! প্রতিবছর  অষ্টমীতে তোমার দেওয়া চুড়ি জোড়া পরি আমি, অঞ্জলি শেষে সেই শিউলি গাছের কাছে যাই আমি আর ভাবি এই হয়তো বা আসবে তুমি! কিন্তু তুমি আর আসো না আমায় প্রেমের বাহু ডোরে আলিঙ্গন করে আমার ললাটে ভালোবাসার চুম্বন এঁকে দিতে আর আসো নি প্রিয়!

আজ পয়লা বৈশাখ

আজ নতুন শাড়ি, নতুন চুড়ি,  নতুন জামায় নতুনভাবে সাজবে বাঙালি। কিন্তু আমার জীবনে আজকের দিনটা আর পাঁচটা দিনের মতোই সাদামাটা। আমার বৈশাখ বিবর্ণ করে দিয়েছ তুমি, কোনো এক বৈশাখে।

সেদিন তোমার সাথে ঘুরতে যাবো  বলে নিজেকে সাজিয়েছিলাম নতুন করে। লাল পেড়ে সাদা শাড়ি, লাল চুড়ি, লাল টিপ সাথে খোপায় রজনীগন্ধা ফুলের মালা।

কথা ছিলো তুমি আমি দুজনে দেখা করবো ঠিক বিকেল পাঁচটায় আমাদের প্রতিদিনের দেখা করার জায়গায়। আমি ঠিকই গিয়েছিলাম সময় মত, তোমার জন্য বসেছিলাম অপেক্ষারত চাতক পাখির মতো। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলো, কিন্তু সেদিন তুমি আর আসো নি। তুমি হারিয়ে গেলে সন্ধ্যার গোধূলির মতো।

পরদিন তোমাদের বাড়িতে গিয়ে দেখি কেউ নেই সেখানে! পাশের বাড়ি থেকে জানতে পারি তোমারা এখান থেকে চলে গেছো। কোথায় চলে গেছো কেউ বলতে পারল না।

নয় নয় করে আজ বারোটা বছর কেটেছে, তুমি আজও আসলে না ফিরে। জানি না আজও আমাকে ভালোবাসো কিনা, মনে রেখেছ কিনা আমাকে।
কিন্তু আমি আজও ভুলতে পারি নি তোমায়। আজও খুব ইচ্ছে করে তোমার বাহুডোরে নিজেকে আবদ্ধ করতে, তোমার আলিঙ্গনে হারিয়ে যেতে। ইচ্ছে করে তোমার বুকে মাথা রেখে তোমার প্রতিটা হৃৎস্পন্দন শুনতে। তোমার চুম্বনে বিলীন হতে ইচ্ছে করে খুব। চাই তোমাকে আবার নতুন করে ফিরে পেতে। জানি না কখনো তুমি ফিরে আসবে কিনা। আমার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবার নিজের করে নেবে কি আমার ভালোবাসা! 

© All rights reserved to Eshita Biswas 'Iru'




২টি মন্তব্য:

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...