#বিষয়- 'উপন্যাসে সমাজের পরিচয়।'
#নাম- 'সমাজ ভাবনায় উপন্যাস : একাল ও সেকাল'
সাহিত্য সমাজের দর্পণ। সমাজ বহতা নদীর মতো। যে সমাজ যত প্রগতিশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল তার সমাজ ও সাহিত্য তত সমৃদ্ধ।
ইংরেজরা এদেশে আসার জন্য নবজাগরণ এসেছে। আমাদের সমাজের ইতিহাস আর পাঁচটা সমাজের মতো বিবর্তনের পথে ছিল বলেই কথাটা এসেছে বাংলা উপন্যাসে - একাল ও সেকাল।
আর কথাসাহিত্যের হাঁটা পথ,ছোটা পথ ঐ সমাজের পথে। তা বুঝতে গেলে প্রধান তিনটি সূত্র আছে। যথা-
১. রবীন্দ্রনাথকে মাঝখানে রেখে আগে ও পরে।
২. বিশ্বযুদ্ধকে মাঝখানে রেখে আগে ও পরে।
৩. নবজাগরণকে মাঝখানে রেখে আগে ও পরে।
মোদ্দা কথা বাংলা উপন্যাসে সমাজের একাল সেকাল উপন্যাসকে প্রাণের গতিশীলতা দিয়েছে। কী এই গতিশীলতা। দেখা যাক তাহলে।
বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তীই তাঁর 'চন্ডীমঙ্গল' কাব্যে বলা হয় আধুনিক উপন্যাসের বীজ প্রথম বপন করেছিলেন।
ঊণবিংশ শতাব্দীতে সমাজ ভাবনার বলয়ে প্রথম উপন্যাস ভবানী চরণ বন্দ্যোপাধ্যায়েরর 'নববাবু বিলাস'(১৮২৫)। নৈতিক উচ্ছৃঙ্খলতার গ্লানিকর উল্লাসের ছবি এতে পাই। সেই সঙ্গে আছে সমাজের শুভাশুভ ও নীতিচেতনা সম্পর্কে লেখক অবহিতও করেছেন। নবজাগরণের ধারায় ইয়ংবেঙ্গল সমাজের প্রেক্ষাপটে সমাজের যথার্থ স্বরূপ ফুটে উঠেছে প্যারিচাঁদ মিত্রের রচিত 'আলালের ঘরের দুলাল' উপন্যাসে। সমাজের মূল পরিচয় সততা ও শঠতা,মূল্যবোধ ও অবক্ষয়কে সামনে আনা হয়েছে এই উপন্যাসে।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসে সমাজ এলো আরো নিখুঁত পরিচয় নিয়ে। তিনি উপন্যাসে দেখিয়েছেন ব্যক্তির চেয়ে সমষ্টি বড়। নীতি নৈতিকতা বড়। তাঁকে বলা হয় নীতিবাগীশ বঙ্কিমচন্দ্র। নারীর নীতিভ্রষ্ট আচরণ দু'চোখে দেখতে পারতেন না। বিধবা বিবাহ সমর্থন করতেন না। তাই তাঁর উপন্যাসে চরিত্রের চেয়ে কাহিনী বড়। কাহিনীর স্বার্থে চরিত্রকে শাস্তিস্বরূপ গুলি করে হত্যা করতে পিছপা হননি। তাঁর 'কৃষ্ণকান্তের উইল' উপন্যাসে বিধবা রোহিনীর দ্বিচারিতার শাস্তিস্বরূপ গোবিন্দলালের হাতে গুলি খেয়ে মরতে হয়েছে। নীতিবাগীশ বঙ্কিমকে এজন্য ভালোই সমালোচনা হজম করতে হয়েছিল। সাহিত্যিকের এভাবে চরিত্রের উপরে শাস্তি বা যে জীবন দানের ক্ষমতা লেখকের হাতে নেই, তিনি মৃত্যুর বিধান দেন কি করে!
সেই সমাজ কাঠামোতে রবীন্দ্রনাথ বদল আনলেন তাঁর 'চোখের বালি' (১৯০৩) উপন্যাস দিয়ে। এখানে বিধবা বিনোদিনী মহেন্দ্রকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে কাশীতে। চরিত্রের মৃত্য নয় মুক্তি ঘটল। এই প্রথম মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস। বাংলা উপন্যাসে সমাজ ভাবনায় 'চোখের বালি' দিক পরিবর্তন করেছে। বঙ্কিমচন্দ্র উপন্যাসে ত্রিভুজ প্রণয় দিয়ে যত জটিলতা সমাজের দেখিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথও তাই। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সমাজ ভাবনায় পার্থক্য বঙ্কিম সমাজের গুরুত্ব বোঝাতে কাহিনীকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। আর সমাজে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের পরিচয়কে বড় করে দেখাতেই কাহিনীর চেয়ে চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক পীড়নের দিকটিকে রবীন্দ্রনাথ বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন।
এর পরে আসি শরৎ সাহিত্যে সমাজের কথায়। মূলত গ্রাম সমাজ বিপুল শক্তি নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে। 'পল্লীসমাজ' উপন্যাস তাঁর সময়কার সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য দলিল। সমাজ ও লোকচক্ষুর কারণে রমেশের জন্য রমা নিজের হৃদয়ে প্রেম বিসর্জন দিয়েছে। আর সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি সমাজ থেকে নাশের হরদম চেষ্টা করেছেন শরৎচন্দ্র। নারীর জন্য সারাটা জীবন ভেবেও নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করেছেন।
এর ঠিক পরেই বিশ্বযুদ্ধোত্তর সাহিত্য আনল কল্লোল যুগের নতুন সমাজ ভাবনার কথা। সে ত্রিশের দশক থেকে শুরু। ত্রয়ী বন্দ্যোপাধ্যায়ের যুগ - বিভূতি-তারাশঙ্কর-মানিক। বিভূতি প্রকৃতি ও জীবনের আষ্ঠেপৃষ্ঠে বন্ধনের জয়গান গাইলেন। তারাশঙ্কর সামন্ততান্ত্রিক ও ধনতান্ত্রিক সমাজের সন্ধিক্ষণের দাঁড়িয়ে কালিন্দী, গণদেবতা, হাঁসুলী বাঁকের উপকথা একে একে উপহার দিলেন। আর মাণিক মনোবিকলন ও সমাজতন্ত্রের রূপকার হয়ে 'পুতুল নাচের ইতিকথা', আঞ্চলিক উপন্যাস 'পদ্মানদীর মাঝি' প্রভৃতিতে তুলে ধরলেন।
এর ঠিক পরেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, মহামারি সব মিলিয়ে সমাজের ছবি এলো আরেক অভিমুখ নিয়ে। রাজনৈতিক ডামাডোল,ভয়াবহ মন্বন্তর, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার শাঁড়াশি আক্রমণে সমাজের মুখ তখন অতীব করুন। তাই নিয়ে হাজির হলেন জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী 'বারো ঘর এক উঠোন', সন্তোষ কুমার ঘোষ এর 'কিনু গোয়ালার গলি', 'মোমের পুতুল', সমরেশ বসুর 'বিবর', 'পাতক', সুনীলের 'আত্মপ্রকাশ',শীর্ষেন্দুর 'পারাপার'
সেকাল গ্রামীন জীবনের সমাজ কথকথা থেকে এসেছে নীতিনৈতিকতা ও অবক্ষয়ের কথা। আর একালে নগর সভ্যতা সেই সমাজকে দিল পরিবর্তনের শ্লোগান। তাতে বিশ্বযুদ্ধ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা,মন্বন্তর ও মহামারিতে সমাজ কাঠামোতে বদল একালের সমাজের পরিচয় তো আলাদা হবেই। যত ভোগবাদ চেপেছে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য তত জোরদার হয়েছে। তার স্বরূপ উপন্যাস না যদি বলে তাহলে তার অস্তিত্ব কি করে বজায় রাখে!
#কলমে~ মৃদুল কুমার দাস।
#(copy right- All rights reserved.)
অত্যন্ত সুন্দর , হৃদয়স্পর্শী । বর্ণনার ধারাবাহিকতা এবং বিভিন্ন কবিদের লেখার তুলনাগুলোর মাধ্যমে উপন্যাসে একাল ও সেকালের সমাজের পরিচয় দৃঢ় ভাবে ফুটে উঠেছে। এক কথায় অনবদ্য।❤️❤️❤️
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।💐💐🌻🌻
মুছুনএক কথায় অসাধারণ লেখনী।
উত্তরমুছুনঅনুপ্রাণিত। শুভেচ্ছা।💐💐🌻🌻
মুছুনঅসাধারন, হৃদয় ছুঁয়ে গেল👌
উত্তরমুছুনঅনেক তথ্য জানলাম।
অনুপ্রাণিত। ধন্যবাদ।💐💐🌻🌻
মুছুনঅনবদ্য লেখনী
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা। অনুপ্রাণিত।💐💐🌻🌻
মুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।💐💐🌻🌻
উত্তরমুছুনঅসাধারণ তথ্য সমৃদ্ধ অপূর্ব লেখনী। বাংলা সাহিত্যর একাল- সেকাল সম্বন্ধে অনেক কিছুই জানতে পারলাম।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা। অনুপ্রাণিত হলাম।💐💐🌻🌻
মুছুনঅসাধারণ দাদা..💐👌
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা। অনুপ্রাণিত।💐💐🌻🌻
মুছুনঅসাধারণ! ধন্যবাদ।👌👌💫💫💥💥
মুছুন