বাসুদেব মালাকারের 'তিমিরবসনা' গল্প ( 'দেশ' - ২০১৪ সালের ১৪ মে প্রকাশিত) অবলম্বনে নাটক -
# নাম - 'গুনিনের ভবিষ্যৎ'
# কলমে - মৃদুল কুমার দাস।
@ চরিত্র পরিচিতি :-
১.তিনকড়ি হালদার - গুনিন। ২. তরুলতা - গুনিনের স্ত্রী। ৩. অসীম পুরকায়স্থ - পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি। ৪. সুনীল মন্ডল - গ্রাম প্রধান। ৫. রঘুনাথ সামই - পঞ্চায়েত সদস্য। ৬. গোবর্ধন কুন্ডু - সম্পন্ন গ্রামবাসী। ৭. শিউলি - গোবর্ধন কুন্ডুর বৌমা। ৮.কালীদাসী - বিধবা আয়া। ৯. শমিতা শাসমল - বিধবা মা। ১০. অংশুমান - শমিতার ছেলে ও বিজ্ঞানের শিক্ষক। ১১. নিতাই কুন্ডু - গ্রামের মস্তান গোছের ছেলে।
********
********
@ প্রথম দৃশ্য @
( তিনকড়ির খালি গা। পরণে লাল রঙের ধূতি। হাঁটুর অনেকটা উপরে- প্রায় জাঙ্গিয়ার মত করে পরা। মাথায় ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া এলোমেলো চুল। থুতনিতে তিন - চার ইঞ্চি লম্বা দাঁড়ি। গালে চুলের একটুও চিহ্ন নেই। গলায় একটি রুদ্রাক্ষ মালা- তিনটি রুদ্রাক্ষের পর একটা করে ক্রিস্টালের গুলি পরপর গাঁথা। হাতে একটা লাল রঙের পুঁটলি।
রঘুনাথ ধোপ দুরস্থ - বেশ ফিটফাট। পাঁচ আঙুলে পাথর বসানো রূপার আংটি। )
রঘুনাথ :- ( গম্ভীর স্বরে ) এই রোদ্দুরের ভিতরি কোথায় গেছিলি রে?
তিনকড়ি :- ( মৃদু হেসে ) আর বলো কেন! কাল রেইতে খেইতে বসিচি - সবে দু'গেরাস ভাত প্যাটে চালান দিইচি কি, সেই কালে মেটেগাছির ভোবন সদ্দারের নাতি আইসে বল্ল - চলো হে গুনিন, সনঝেবেলায় দাদুরে লতায় কেটেচে। তা সেই বিষ নামাতি নামাতি রাত কাবার! বাপরে - বাপ্! সে কি দুজ্জয় বিষ! নীল বন্ন জিউলির আঁঠার মতো - পায়ের চামর যেন কেমড়ে ধরে আচে!
রঘুনাথ:- তা নামালি সেই বিষ?
তিনকড়ি :- নামাব না! মা বিষহরির নাম স্মরণ কইরে পোথমে একটা হালকা ডোজ দেলাম। ও মা ,বিষ দেখি ডবল জোর নে বিজ বিজ করে উটল! তারপর দু'লম্বর, তিন,চার,পাঁচ লম্বর মারবার পর এই বিহানবেলা বিষ জলের বন্ন ধারণ কল্ল। তারপর হড়হড় করি নামল! সদ্দার ম'শাইও চোখ মেললেন। সারা গেরামে তখন আমার জয়জয়কার। নগদ কুড়ি টাকা,এক ফানা কাঁটালি কলা - এই দ্যাখো। ( পুটলি উঁচু করে ধরে) - তা ইদিকে কি মনে করে, কোথায় চল্লে?
রঘুনাথ :- ও-পারে যাব - দরকারে। গণেশ,গদাই,শিবুর নৌকা নিয়ে আসার কথা ছিল। দেখছি কোনো পাত্তাই নেই যখন চল ঐ তেঁতুল গাছটার মোটা শেকড়ে পাছা ঠেকাই।
( উভয়ে বসে)
--- সিগারেট টানবি?
(দু'জনে সিগারেট ধরায়। আর তিনকড়ি খুব আয়েস করে তিন আঙুলে ধরে সিগারেটের পেছনটা চুষতে থাকে)
--- তোকে কতদিন বলেছি গতর খাটিয়ে খা! একশ' দিনের কাজ,বি.পি.এল.কার্ড করে দেব বললাম,কে শোনে! - ওসব ঢপবাজির লাইন ছেড়ে দে!
তিনকড়ি :- ভূত-পেত-দানো-জিন পোষা কুত্তার মত পায়ে পায়ে ঘুরে। মন্তর পড়ে তিন ফুঁ দিলে সবার দাবড়ানি চলে যাবে। তোদের খপ্পরে পড়ে মশাই মশাই করতে হবে। হাত জোড় করে পা ঘষতে হবে! বরঞ্চ এই তো বেশ আছি। গুনিন বলে কেডা মোকে সমঝায় না বল?
রঘুনাথ :- তোকে একটা গুহ্য কথা কচ্ছি,পাঁচকান করবিনে তো? তুই বড় কাতলা মাছ তোলার মন্তর জানিস? অল্পজলে খলবল করচে -- পিঠের পাখনা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু খুব পেছল গা,ধরতি গেলেই অমনি... কিছু ব্যবস্থা আছে তোর কাছে?
তিনকড়ি :- ব্যবস্থা আছে বইকি! সে কোন দিঘির মাছ?
রঘুনাথ :- সে আছে। পরে বলব। ( বলে প্রস্থান)
তিনকড়ি রঘুনাথের দিকে চেয়ে থাকে। আর আপন মনে বলে -
শালার রাজনীতির চুঙি! ভাগাড়ের শকুন! কার দিকয় নজরে তাক করেচে কি জানি!
@ দ্বিতীয় দৃশ্য @
( তিনকড়ির বাড়ি )
( তিনকড়ি রঘুনাথের কাতলামৎস নিয়ে খুব গভীর চিন্তায় মগ্ন। উঠোনময় পায়চারি করতে থাকে। থেকে থেকে অন্যমনস্কভাবে তরুলতাকে ডাকে। তরুলতা পা টিপে টিপে এসে চিন্তামগ্ন তিনকড়িকে চমকে দেয়। )
তিনকড়ি :- কী করিস? অত হাঁক পাড়চি। রা কাড়বি তো।
তরুলতা :- গাঁজার গন্ধে তো ধারে কাছে থাকা যায় না। কেন হাঁকের এত ঘটা শুনি?
তিনকড়ি :- রঘু আজ একডা কাতলমৎস্যের কথা কইছিল। খুলে কিছু বলেনি। পাঁচ কান কত্তি না বলেচে। হুঁঃ! কিছু না বলে,তার আবার পাঁচ কান! তুই কী জানস? রঘু না বল্লেও খড়ি পেতে ঠিক ধরে ফেলুম। এখন ভাবচি ওকে এড়ানোই ভাল ছিল। রাজনীতি দিয়ে ও তো মোকে যখন তখন চমকায়....
তরুলতা :- অ - তাই বল! ক'দিন ধরে রঘুকে যত্ত দেখছি সনদহ সনদহ ঠেকছিল। বুজেচি!
তিনকড়ি :- ( উৎফুল্ল হয়ে) কি বুজচিস বল্ না!
তরুলতা:- বনমালীর বউ বাসন্তী হল সেই কাতল্ মৎস্য।
তিনকড়ি :- বলিস কি! সব্বনাশ! বনমালী তো কলকেতায় ডাল কারখানায় চৌকিদারির কাজ নিয়ে সেখানেই আছে। ঘরে অন্ধ বুড়িমা। বছর চারেকের বাচ্চা নিয়ে থাকে। বুড়ি অবশ্য অন্ধ হলেও কি হবে, গাছের পাতা খসে পড়লেও শুনতে পায়।
তরুলতা :- বনমালী দার বউ অবিশ্যি জানে বলে মনে হয় না। বনমালী দার খোঁজ খবর নেওয়ার কুমতলবে এটা ওটা জিনিস লিয়ে গে বউটাকে পটানোর খুব ধান্ধায় তাহলে! বাব্বা! তলে তলে এত! ( খেতে বসতে ডেকে তরুর প্রস্থান)
তিনকড়ি :- ( খুব রেগে গেল) এসব কাজে গুরুর বারণ আছে। আইবুড়ো মদ্দ যদি আইবুড়ো মেয়েকে বশ করতে চায় এই তিনকড়ি সে ব্যবস্থা করে দিবে। কিন্তু ঘরের বউকে টেনে বের কত্তে চাইলে গুরুদেব ছাড়বে না। তাছাড়া বনমালী দা আমাকে খুব ভালবাসে। পত্তিবার আসার সময় প্রসাদ সঙ্গে করে আনতে ভুলে না।তার সব্বনাশ আমি করব!
( পরের দিন তিনকড়ি দেখা করতে যায় রঘুনথের সঙ্গে)
রঘুনাথ:- এই যে তিনকড়ি তোমারই কথা এখুনি ভাবছিলাম।
তিনকড়ি :- গতকালের কথা বলতে এইচি। খড়ি পেতে সব বেত্তান্ত জানলাম। কাতলা মাছের ঝোল তোমার ভাগ্যে নেইকো! বনমালী মারকুটে লোক -- একবার দেড়বছর জেল খেটেছিল, মনে পড়ে?
রঘুনাথ :- (প্রচন্ড রেগে যায়) শালা ঢপবাজ! যা জেনেছিস তা যদি পাঁচকান করেছিস... সব বুজরুকি বের করে শালার স্যাটা ভেঙে ঘর জ্বালিয়ে দেব।
তিনকড়ি:- (রাগের কারণ জানতে না পেরে হকচকিয়ে যায়। তারপর হেসে ফেলে) ঘরে আগুন দিবি ? আগুণ দিবি? অ্যাঁঃ! শালা,এমন বান মারা মারব না, সোজা হয় দাঁড়াতি পারবি না! (উভয়ের প্রস্থান)
@ তৃতীয় দৃশ্য @
( গোবর্ধনের উঠোন। গ্রামের লোকেদের ভিড়। গোবর্ধন কুন্ডুর ছেলের বউকে ভূত ধরেছে। ষোলো সতেরোর বাচ্চা মেয়ে। তার স্বামী পবন। বয়স দ্বিগুণ। মেয়েটি উঠোনের কোনে উবু হয়ে বসে। চোখে হিংস্র দৃষ্টি। তিনকড়ি হাজির হয়ে মেয়েটিকে দু'বার প্রদক্ষিণ করে।)
তিনকড়ি :- একেবারে সদ্য মরা কুজাতের ভূত গো! আত্মা এখনো মাটি কেমড়ে রয়েচে! খুব মেহনতের কাজ।
গোবর্ধন :- মেহনত পুষিয়ে দেব,গুনিন। বউকে ভালো করে দাও।
তিনকড়ি:- ( দু'হাত মুঠো করে চোখ বুজে মুখটা উঁচু করে খানিকক্ষণ বিড়বিড় করল। তারপর উপস্থিত ভিড়কে উদ্দেশ্য করে বলল )
উত্তর দিকে কেউ থাকবা না। ওদিক দিয়ে সে যাবা। হাতের কাছে যারে যারে পাবা তারে সঙ্গে নে যাবা কিন্তু!
( মুহূর্তের মধ্যে সেই দিকটা ফাঁকা হয়ে যায়। তিনকড়ি উত্তর দিকের ঘণায়মান সন্ধ্যার অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে )
--- তুই কে? ( কোনো উত্তর নেই --
আবার উচ্চস্বরে ) তুই কে?
শিউলি :- ( হঠাৎ একসময় শোনা যায় বউয়ের গলায় খনখনে নাকি সুরে ) তাঁ জেঁনে তোঁর কীঁ হবেঁ? বাঁচতে চাঁস তোঁ পাঁলা।
তিনকড়ি :- টাইম নেবে। তবে যেতি শালারে হবেই। ( হাতের মুঠোয় খানিকটা মাষকলাই নিয়ে মন্ত্রপাঠ করে ) -- "ধাও ধাও শিবোবন্ধু শিবোবন্ধু শিবো/ ডাকিনী শাকিনী প্রেত সকলে বান্ধিব!" ( এই বলে মাষকলাই শিউলির গায়ে ছুঁড়ে মারে। )
শিউলি :- ( পুরুষের গলায় বলে ) এই শালা ! আঁগুনের গোঁলা ছুঁড়ছিস কেঁনরে ঢ্যাঁমনা?
তিনকড়ি :- ( ভিড়ের উদ্দেশ্যে অট্টহাসি করে বলে ) কেউ হাত বন্ধন করে দাঁড়াবা না। বাবারা। মায়েরা। হাত খুলে দাও সব। মা- জননীগণ কানে আঙুল দ্যাও।
( শুরু হল বীভৎস নারকীয় অধ্যায়। কাঁচা নারকেল,শলার ঝাঁটা দিয়ে শিউলিকে এলোপাথাড়ি মারতে থাকবে তিনকড়ি - সেই সঙ্গে মুখে অশ্রাব্য গালিগালাজের বন্যা। কলসি কলসি জল এনে ঢালা হতে লাগল শিউলির গায়ে। একসময় শিউলি সহ্য করতে না পেরে থরথর করে কাঁপতে থাকবে। তিনকড়ি উল্লসিত হয়। শেষ পর্যন্ত শিউলি তিনকড়ির পায়ে লুটিয়ে পড়ে বলে)
শিউলি :- আমাকে ছেড়ে দ্যাও গুনিন! তোমার পায়ে পড়ি। তুমি আমার ধম্ম বাপ! আর এরকম হবে না। ( জ্ঞান হারায় )
তিনকড়ি:- ( হাঁফাতে হাঁফাতে দু'হাতে নিজের মাথা চেপে ধরে মাটিতে বসে পড়ে। )
ওফ্ যাবার কালে খুব ধকল দে গ্যাল। পা দিয়ে খুব জোর মেরেচে মাথায়! শনিবার অমাবস্যায় অপঘাতে মরা ভূত।
( সকলে জয়ধ্বনি দিয়ে উঠল তিনকড়ির জন্য। মেয়েরা সমস্বরে উলু দিল। জলকাদার মধ্যে মেয়েটি অজ্ঞান হয়ে পড়ে রইল। গ্রামবাসীর বিদায়। তিনকড়ির পাওনা গোবর্ধন মেটায় কিছু নগদ,আর পুটলিতে চাল ও তরি তরকারি দিয়ে। তিনকড়ি অনেক রাতে বাড়ি ফিরছে যখন তখন পথে দেখা কালিদাসীর সঙ্গে।)
কালিদাসী :- কোন গাঁ থেকে ফিরচ গো কড়ি দা?
তিনকড়ি :- কড়ি দা নয়,বল তিনকড়ি দা।
কালিদাসী :- ওই হল -- তিন নয়, তুমি হাজার! এ তল্লাটে তুমি গুনিনের মত একজন গুনিন বটে! একদম গুননিদি গুনিন। তোমার ভয়ে ভূত পেত সব তো এক্কেবারে পগার পার!
তিনকড়ি :- ( আহ্লাদিত হয়ে ) তুই ও তো কম কিসে শুনি! সব পোয়াতির প্রাণের প্রাণ। তোর দাপটে স্বাস্থ্য কেন্দ্রের দোর কেউ মাড়ায় না। এই কালি একটু আগে ফুলের বাস নাকে এয়চে না রে? ওনারা বোধ হয় বেরইচেন। একটু সাবধানে পায়ের দিকে নজর দে যাস! আমি লতা বন্ধন মন্ত্র পড়ে দিচ্চি -- তবুও সাবধানের মার নেই।
কালিদাসী :- ( তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে ) ধুস! চটির ফিতেয় কার্বলিক অ্যাসিড মাখানো আছে, তুমি বরং সাবধানে যাও। ( বলে হনহন করে চলে যায়। )
@ চতুর্থ দৃশ্য @
( পঞ্চায়েত সমিতির হল ঘর। বার্ষিক সভা। সুনীল মন্ডলের সঙ্গে রঘুনাথ খুব সাজগোজ করে হাজির। কালো প্যান্টের উপর ইট রঙা ইস্ত্রি করা শার্ট। চোখের সানগ্লাস হাতের মধ্যে। খুব ভারিক্কি ভাব নিয়ে রঘুনাথ সুনীলের পাশে বসে। )
অসীম পুরকায়স্থ :- ( সুনীল মন্ডলকে উদোম ঝাড়।) এই যে তরণীপুরের প্রধান সাহেব -- সারা ব্লকের মধ্যে একমাত্র আপনার পঞ্চায়েতে গত একবছরে তিনটি ডায়নির ফতোয়া হয়েছে। তুকতাক করে ছ'টা সাপে কাটা হয়ে লোক মারা গেছে। হেপাটাইটিসে মরেছে পাঁচজন। এ সব হচ্ছেটা কি? বাচ্চাদের পোলিও খাওয়ালে বাঁজা হয়ে যাবে -- এসব কথা আপনার পঞ্চায়েত থেকে রটছে,সে খবর কি রাখেন? চোখে কানে ঠুলি এঁটে বসে আছেন? গভর্নমেন্ট কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢালছে,সে টাকা পকেটে ঢোকাচ্ছেন -- ভেবেছেনটা কি? আপনাদের জন্য ডি. এম.,এস.ডি.ও.-র সামনে মুখ দেখানো ভার ! লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যাচ্ছে।
সুনীল :- ( মিউ মিউ করে বলার চেষ্টা করে। ) দাদা বিলটাই যত ঝামেলা করছে। যদি একটা বাঁধ দিয়ে রাস্তা মতো করা যেত -- ডাক্তার,বদ্যি সবই তো ওপারে!
অসীম :- ( হুঙ্কার দিয়ে ) তাই বলে লোকের মধ্যে মিনিমাম চেতনাটুকু জাগাতে পারছেন না! লোকে চাঁদে জমি কিনছে,আর আপনার পঞ্চায়েতে তুকতাক,বানমারা, ভূতের নাচ .... রাবিশ্! আরে মশাই এই নিয়ে জবাব দিতে দিতে মুখে ফ্যানা উঠে যাচ্ছে! সে যাক। আপনাদের ওখানে একটা ছেলে পাঠাব। সে গ্রামে গ্রামে ঘুরে শো করবে। তাকে সাহায্য করতে -- শো এ লোক জোগাড় করা, গ্রামে গ্রামে প্রচার করা,ছেলেটির খাওয়া থাকার বন্দোবস্ত -- সব ব্যবস্থা আপনাদের করতে হবে। আমার চিঠি নিয়ে ছেলেটি আপনাদের সঙ্গে দেখা করবে। যত্তসব কুঁয়োর ব্যাঙ্। দেশটাকে কেবল পেছনে টানছে।
@ পঞ্চম দৃশ্য @
( শমিতার বাড়ি )
অংশুমান :- মা, বাবা বেঁচে থাকলে এখন কত বয়স হত?
শমিতা :- কত আর! পঞ্চান্ন- ছাপান্ন হত বোধ হয় -- তুই তখন তিন বছরের। দেখতে দেখতে তুই এখন চব্বিশ বছরের। তা হঠাৎ কেন এই প্রশ্ন?
অংশুমান :- না, এমনি!
শমিতা :- তখন তোর বাবার বয়স ছিল বত্রিশ বছর। রাস্তার কুকুর কামড়ালো। সঙ্গে সঙ্গে দরকার ছিল যথাযথ ভ্যাকসিনের। কিন্তু তোর দাদু-ঠাকুমা- জ্যেঠুর অগাধ আস্থা ছিল থালাপড়ার উপর। প্রহ্লাদ গুনিন তোর বাবার পিঠের উপর ময়দা দিয়ে কাঁসার থালা আটকে দিয়ে বলেছিল - ওবেলাতেই থালা বিষ টেনে নিয়ে তুঁতে রঙ ধরবে। তারপর থালা আপনাআপনিই খসে পড়বে। কাঁসার থালা সেদিন জলাতঙ্ক রোগ আটকাতে পারেনি। বাবা তোর অকালে চলে গেল। তোকে মানুষ করতে কি-ই না কষ্ট করেছি। এখন তুই হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে বিজ্ঞানের শিক্ষক। বিজ্ঞান মঞ্চের সদস্য। মানুষের মধ্যে বিজ্ঞান চেতনা গড়ে তুলতে তোরা এখন ভালোই কাজ করছিস শুনছি। আমার মতো আর যেন কেউ কলাপড়া,থালাপড়ার চক্করে পড়ে অকাল বিধবা না হয় দেখিস বাবা!
অংশু :- বিলের ওপারে তিনকড়ি গুনিনের নাম তুমি শুনেছ?
শমিতা :- শুনেছি! তার নাকি ঐশ্বরিক ক্ষমতা। বিলের ওপারে গ্রামকে গ্রাম তার যেন মৌরসিপাট্টা। লোকটার ভেতরে কি আছে কি জানি,এতো লোক মানে গনে!
অংশু :- কাল তো ওনার এলাকায় যাচ্ছি। দেখা নিশ্চয় হবে।
শমিতা :- সাবধান বাবা! ওর ত্রিশূল বাণ নাকি খুব মারাত্মক! সুস্থ মানুষকে নাকি বোবা করে ওর বশে আনে শুনেছি। বাবা,তোর বিলের ওপারে গিয়ে কাজ নেই। তোকে হারালে আমি আর বাঁচব না।
অংশু :- এই তো এখুনি বিজ্ঞান চেতনায় উৎসাহ দিয়ে নিজেই আবার কুসংস্কারের বশ হলে তো!
শমিতা :- কি করি বল! অপত্য স্নেহ যে অতি বিষম বস্তু।
অংশু :- ভয় নেই। পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি অসীম পুরকায়স্থের চিঠি নিয়ে গিয়ে ওখানকার প্রধান সুনীল মন্ডলের সঙ্গে দেখা করলে ওরা একটা বিজ্ঞান মঞ্চের ব্যানারে সেমিনার ও ম্যাজিক শোর আয়োজন করে দেবে। তার আগে কাল ব্যক্তিগতভাবে একবার তিনকড়ির সঙ্গে দেখা করব ভাবছি।
শমিতা :- তুই যা ভালো বুঝিস কর। তোর খুব খিদে পেয়েছে। খাবি আয়।
(উভয়ের প্রস্থান।)
(পরদিন তিনকড়ির বাড়িতে অংশুমান হাজির। গ্রামের প্রান্তে খড়ের ছাউনি দেওয়া কুঁড়ে ঘর। উঠোনের একপাশে একটা ঝাঁকড়া কয়েতবেল গাছ। তার তলায় একটা তুলসি মঞ্চ। তুলসি মঞ্চের সামনে একটা ত্রিশূল পোঁতা। উঠোনে ঢুকে অংশুমান তিনকড়িকে ডাকতে লাগল।)
অংশুমান :- গুনিন মশাই বাড়িতে আছেন নাকি?
তরুলতা :- ( অচেনা কন্ঠ্যস্বর শুনে তরুলতা বেরিয়ে এল। মাথায় ঘোমটা টেনে দিয়ে বলল )
না বাড়ি নেই। কী দরকার? ( জলচৌকি পেতে দিয়ে বলল)
বসেন। এক্ষুনি এসে পড়বে। এক ঘটি জল পড়তি আর কতক্ষণ লাগবে!
অংশুমান :- ( না বসে ) কীসের জল পড়া?
তরুলতা :- হালদারের বাড়ির মেজ বৌয়ের বাও লেগেছে। কোলের কচি বাচ্চাটা ডালের মতো ছ্যাড়াচ্ছে সারাদিন।
অংশুমান :- এই জল পড়ার জন্য গুনিন কত পাবে?
তরুলতা :- এই ধরেন,এক কেজি চাল, সঙ্গে পাঁচটা টাকা। বাঁধা রেট তো কিছু নেই।
অংশুমান :- আজ চলি। পরে আসব। (প্রস্থান )
( তরুলতা উঠোনটা আরো একবার ঝাঁট দিয়ে দেয়। আর নিজের মনে অচেনা লোককে সন্দেহ লাগে। তাই নিয়ে বকবক করতে করতে ঘরে চলে যায়।)
@ ষষ্ঠ দৃশ্য @
( অংশুমান, রঘুনাথ,সুনীল মন্ডল আলোচনায় ব্যস্ত। কালীদাসী ত্র্যস্তভাবে ঢুকে সুনীল মন্ডলকে বলে )
কালীদাসী :- কপিলেশ্বরপুর হতে জনাকয়েক এয়েচে মাস্টারবাবুর সঙ্গে কথা বলবে বলে।
( অংশুমান একান্তে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে চমকে ওঠে। সেমিনার ও ম্যাজিক শো চলাকালীন অধিকাংশ এরাই উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু এদের দিয়ে আসল লক্ষ্য ঠিক পূরণ হয়নি। আজন্ম-লালিত বিশ্বাসের শেকড়ে চিড় ধরেছে বলে কাজের কাজ হয়নি। সেমিনার ম্যাজিক শো এদের রুটি রুজিতে ঘা দেওয়ায় ওরা হাজির। মাস্টারবাবুর সঙ্গে দেখা করবে। রঘুনাথ,সুনীল যে এদের মদত দিচ্ছে না তাও অস্বীকার করা মুসকিল।)
রঘুনাথ :- কী ভাবছ মাস্টার!
সুনীল :- ( কালীদাসীকে নির্দেশ দেয় )
--- ডেকে আন ওদের।
( একদল লোক অংশুকে ঘিরে ধরে সমবেত কন্ঠে বলে )
--- তুমি ভূত নামাতি পারবা?
অংশুমান :- ( মাথা নেড়ে ) ভূত বলে কিছু নেই। যা নেই তা নামানো যায় নাকি?
( লোকগুলো হৈ হৈ করে তাকে আরো ঘিরে ধরল। সস্তার জিনস্,খাটো ঝুলের হলুদ টি শার্ট পরা,ডান হাতের কব্জিতে এক গাদা লাল সুতো জড়ানো এক যুবক খুব তড়পাচ্ছিল। সেই এদের নেতা। সে সামনে এসে বলল।)
নিতাই :- তোমার ওসব ম্যাজিক বহুত দেখেছি। ভূত লাবাতি পারবা কিনা বলো। ওলা বিবিরে আটকে দিয়ে গেরামবন্ধন করতি পারবা তিনকড়ি গুনিনের মতন?
( তার মধ্যে অন্য একজন চিৎকার করে বলে।)
এই গুনিনকে ডেকে নে আয়। ভূত লাবাবে। এও লাবাবে। যদি না পারে পোঁয়ায় জিউলির কচা ভরে তাড়িয়ে দোব। ( সকলে সমর্থন করে।)
অংশুমান :- ঠিক আছে, তাই হবে। গুনিন যদি ভূত নামাতে পারে আমি গ্রাম ছেড়ে চলে যাবো।
( গুনিনের প্রবেশ )
( গায়ে তান্ত্রিকের পোশাক। সকলে উচ্ছ্বসিত অংশুমান ছাড়া। )
তিনকড়ি :- ভূত লাবাব! তবে শর্ত আছে। এক পাল লোক সঙ্গে থাকলে চলবে না। দু'জন। বড় জোর তিনজন থাকতে পারে ফরিদকাটি শ্মশানে। সঙ্গে কোনোভাবেই টচ বা লাইটার রাখা চলবে না। খুব রিক্সের কাজ কিনা - ভূত রেগে গেলে , আমি তো বাঁচবো না,বাকিরাও জ্যান্ত ফিরবে না। চল্লিশ হাতের মধ্যে কেউ থাকবে না। আমি বাদে বাকি দু'জন বা তিনজনের মধ্যে যে কোনো একজনকে একুশ দিনের মধ্যে ভূত টেনে নেবেন।
নিতাই :- আমি ও-তে নেই।
অংশুমান :- তোমাদের কাউকে না কাউকে তো থাকতে হবে। কে রাজি বলো। ( কেউ রাজি হয় না। )
কালীদাসী :- আমি রাজি। পানটা যায় যাক। অনেক দিনের সখ ভূত দেখবো - কড়িদা তুমি না পারলে তোমাকে কিন্তু গাঁ ছাড়তে হবে। ( সকলের প্রস্থান।)
@ সপ্তম দৃশ্য @
( রাত তিনটা। ফরিদকাটি শ্মশান। অংশুমান ও কালীদাসী সঙ্গী। তারা চল্লিশ হাত দূরে বসে। একটা নতুন মাটির সরায় খানিকটা সরষে,তিল, মাষকলাইয়ের উপর একটা লাল চেলি,তার উপর একটা ছোট্ট করোটি ( মাথার খুলি) তার পাশে একটা লম্বা হাড় - ফিমার বোন রেখে দুর্বোধ্য ভাষায় বিড় বিড় করে যাচ্ছে তিনকড়ি। মাঝে মাঝে ঝাঁকড়া চুল ঝাঁকিয়ে মাথা মাটিতে ঠুকছে। হাঁটু গেড়ে বসে তিনকড়ি। নেপথ্য থেকে অশরীরী কন্ঠ্যস্বর অন্ধকার কাঁপিয়ে ভেসে আসে )
----- ডেঁকেচিস কেন? কী চাঁস?
তিনকড়ি :- ( স্খলিত স্বরে ) কিছু চাইনে! অপরাধ নিও না। সন্তোষ নিয়ে ফিরে যাও। অবিশ্বাসীরে নিব্বংশ করো!
( অংশুমান দেখল পূব আকাশের আসন্ন স্ফুটনোন্মুখ আলোয় শ্লেটরঙা ফ্যাকাসে পটভূমিতে এক নারী মূর্তির আভাস। আলুলায়িত কেশ, সম্পূর্ণ নিরাবরণ এক রমণীর সেলুলয়েড যেন। অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার সময় মুহূর্তের জন্য অংশুমান দখতে পেল জীবন্ত নারীর দুই উরুর বিভাজন। অনাবৃত স্তনের স্পষ্ট রূপ। )
কালীদাসী :- ( ভয়ে অংশুমানকে জড়িয়ে ধরে,চোখ বন্ধ করে।)
--- মুখে রাম-রাম-রাম-রাম --- ভূত আবার জ্যান্ত হয় বাপের জন্মে শুনিনি।
অংশুমান :- চোখ খোলো। ভূত তো দেখার কথা দেখলে! জ্যান্ত কি! মরা কি!
( উভয়ের প্রস্থান )
( সমবেত ভীড় মানুষের। সকলে সক্কাল সক্কাল হাজির গ্রামের মজলিশে। তিনকড়ির ভূত নামানোর কথা শুনবে বলে সকলে উৎকন্ঠিত। )
অংশুমান :- (সবার কাছে স্বীকারোক্তি) কাল রাতে তিনকড়ি ভূত নামিয়েছে। শর্ত অনুযায়ী আমি কথা দিচ্ছি আর আসবো না।
কালীদাসী :- না মাস্টারবাবু তোমার ম্যাজিকগুলো খুব ভাল। যেখানে শো হবে আমাকে ডাকবে তো।
নিতাই :- না মাস্টার তোমার ঐ ম্যাজিক দেখানোর বুজরুকি আর চলবে না।
( সকলে বলে ) চলবে না! চলবে না!( সকলের প্রস্থান)
( তিনকড়ির বাড়ি। বারান্দায় বসে কচু কুটছিল তরুলতা। অংশুমানকে দেখে বুকের আঁচলটা টেনে নিল। অংশুমান বারান্দার সামনে দাঁড়াল। )
অংশুমান :- গুনিন কোথায়?
তরুলতা :- ( ভারী গলায় ) ঘুমাচ্চে
কাল রাতে শরীলের উপর খুব ধকল গেছে --- দু'দিন এখন অজ্ঞান হয়ে ঘুমাবে। ভেতরে এসে বসেন। ( জলচৌকি পেতে দেয় )
অংশুমান :- ( মাথা নিচু করে ঘরে ঢুকল ) তোমাকে একটা কথা বলে যাই ---
গুনিন জলপড়া,তেলপড়া,তাবিজ, মাদুলি দেয় ঠিক আছে --- বিশ্বাসে লোকে নেয় বলে, তাই ওতে লোকের মনে একটা জোর আসে। কিন্তু সাপে কাটা, কুকুরে কামড়ানো, কলেরা --- গুনিনকে এ সবের মধ্যে যেতে দিও না। একটা জীবন চলে গেলে আর ফেরত পাওয়া যায় না। ( নতমস্তকে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে তরুলতা শোনে)
---- আর একটা কথা,যতই অন্ধকার থাক গতরাতে,একজন অচেনা অজানা পুরুষের সামনে তোমার উলঙ্গ হতে একটুও লজ্জা করল না!
তরুলতা :- ( বুক কেঁপে উঠল ) হাজার হোক সোয়ামি তো! তার মানটুকু আমি না রাখলি কে রাখবে? তুমি তো মোদের প্যাটে লাথি মারতে এয়েচিলে। সোয়ামির মান ,প্যাটের থেকে ন্যাংটা হওয়ার নজ্জা কি বড় হল?
@ copyright reserved for Mridul Kumar Das.
দারুন উপস্থাপনা । অনেক শুভেচ্ছা ।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।💫💫💥💥🤎
উত্তরমুছুন