বিষয়--- অণুগল্প ।(জীবনে প্রেম আসে বার বার।)
#নাম--- যদি আবার দেখা হতো---- ?
#কলমে-- পারমিতা মন্ডল।
আজ মনে হয় আর ট্রেনটা পাবো না । অনেক দেরী হয়ে গেল। তবে এখনো একটু সময় আছে । অটো করে গেলে পেয়েও যেতে পারি। এই মনে করে ছুট লাগালো শিউলি। ট্রেনটা তাকে ধরতেই হবে । রোজ শিয়ালদহ থেকে ছ'টা পাঁচের নৈহাটি লোকাল ধরে বাড়িতে আসে শিউলি। ব্যাগের কোম্পানিতে কাজ করে সে।
বাড়িতে যৌথ পরিবার ছিল। অনেক অভাবের সংসার । তারপর বরটাও ভালো না। যা রোজগার করে মদ খেয়ে উড়িয়ে দেয়। আর মদ কেনার পয়সা না পেলে শিউলিকে ধরে পেটাতো ।একদিন তো ছেলের দুধের টাকা কেড়ে নিয়ে মদ কিনে এনেছিল। সেদিন ছেলেটাকে কিছুই খেতে দিতে পারেনি। অথচ একে ভালোবেসেই বিয়ে করেছিল শিউলি । বাড়ির সবার অমতে। দুজনে একসাথে ঘর বেঁধেছিল। সুখেই ছিল। কিন্তু বাইরে কাজ করতে গিয়ে বাজে লোকদের পাল্লায় পড়ে মদের নেশা ধরে যায়। আস্তে আস্তে দুজনের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয়।একসময় অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে শিউলি রমেশকে ছেড়ে, ছেলেকে নিয়ে চলে আসে , মায়ের কাছে। তারপর হন্যে হয়ে শুরু হয় কাজের খোঁজা। অবশেষে সেন কাকুর চেনাশোনা এই ব্যাগের কারখানায় কাজ পায় শিউলি।তারপর থেকে চলে জীবনের নতুন পর্যায় । ছেলেকে মানুষ করতে হবে।মায়ের কাছে ছেলেকে রেখে সকালে বেরিয়ে আসে শিউলি।সারাদিন কাজ করে ছ'টা পাঁচের নৈহাটি লোকাল ধরে রাতে বাড়িতে ফেরে। এভাবেই চলছিল জীবন।
প্রথম দিকে লেডিসেই উঠতো শিউলি। কিন্তু নেমে অনেকটা হাঁটতে হয় বলে এখন জেনারেলেই ওঠে। ওখানেই আলাপ হয় চিন্ময়ের সাথে। মধ্যবয়সী চিন্ময় খুব ধীর স্থির। কম কথা বলে । প্রচন্ড ভীড় ট্রেনে একদিন অনেক কষ্ট করে দাঁড়িয়ে ছিল শিউলি। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে পায়ে ব্যাথা হয়ে যাচ্ছিল। তখনই চিন্ময় নিজের জায়গা ছেড়ে দিয়ে বসতে দেয় শিউলিকে।ব্যারাকপুর এলে ভীড়টা একটু ফাঁকা হলে ,শিউলি আবার জায়গা ছেড়ে চিন্ময়কে বসতে বলে , ।তখন চিন্ময় না বসে শিউলিকেই বসতে বলে।তারপর শুরু হয় দুজনের মধ্যে কথাবার্তা। শিউলি জানতে পারে উনি নৈহাটির আগের স্টেশনে নামবেন।
সেদিনের পর থেকে রোজই প্রায় দেখা হয়। আস্তে আস্তে দুজনের মধ্যে একটা বন্ধত্ব গড়ে ওঠে। এভাবেই চলে তাদের একসাথে পথ চলা।যে আগে এসে যায় সে নির্দিষ্ট জায়গায় আরেকজনের জন্য জায়গা রাখে । দুজনে গল্প করতে করতে চলে যায় । সংসারের সব কিছু তারা ঐ সময় টুকুতে ভুলে থাকে। মাঝে মাঝে শিউলি এটা ওটা বানিয়ে নিয়ে আসে চিন্ময়ের জন্য। পরম তৃপ্তিতে সেগুলো খায় চিন্ময়। আর শিউলি মনে মনে আনন্দ পায়। সেদিন ঘুগনি বানিয়ে এনেছিল। সারাদিনের কাজের শেষে পরম যত্নে শিউলি যখন চিন্ময়কে দিকে এগিয়ে দেয় ,তখন সেও পরম তৃপ্তি অনুভব করে। তাহলে শিউলিকে কি সে ভালো বেসে ফেলেছে। তা কি করে সম্ভব? তার তো বৌ আছে। রাধিকা। তাকে তো চিন্ময় ভালো বাসে। তাহলে ? কেন এতো ভালো লাগে শিউলির সঙ্গ ? তাহলে কি প্রেম জীবনে বার বার আসে ? একসাথে কি দুজনকে ভালোবাসা যায় ? নাকি এ প্রেম পরকীয়া , অবৈধ ? তবে সত্যিই কি প্রেম কখনোই অবৈধ হয় ? প্রেম তো পবিত্র বন্ধন । তা কি কখনোই পরকীয়া হয় ?
ছুটতে ছুটতে ট্রেনে উঠলো শিউলি। দেরী হয়ে গেছে , তাই ভীড় হয়ে গেছে। ভীড় ঠেলে নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে দেখে জানলার ধারে অন্য লোক বসে আছে। চিন্ময় নেই। মনে ভাবলো অন্য জায়গায় হয়তো বসেছে। ভীড়ে হয়তো জায়গা পায়নি। না তন্ন তন্ন করে কোথাও খুঁজে পেলনা চিন্ময়কে । তাহলে কি আজ আসেনি ? কি হলো ?শরীর খারাপ ? হঠাৎ মনে হলো ফোন করে দেখি তো ? ফোন করে শিউলি । ফোন বেজে যায়। ও প্রান্ত থেকে কোন সাড়া নেই। একটা অস্থিরতা নিয়ে সারা রাস্তা কেটে যায় শিউলির ।ট্রেন এসে থামলো নৈহাটি জংশনে। সবাই নেমে গেল। ফাঁকা ট্রেন । হঠাৎ গলার মধ্যে দলা পাকানো কান্নাটা এবার বেরিয়ে এলো অশ্রুধারা হয়ে। সত্যিই কি সে চলে গেল ? কোন ঠিকানা না রেখে ? কেন এতো কষ্ট হচ্ছে ? তাহলে সেও কি ভালো বেসে ফেলেছে চিন্ময়কে ?এভাবেই কি নিজের অজান্তে প্রেম আসে বার বার ?
সমাপ্ত।
সত্যিই, প্রেম এভাবেই ফিরে আসে বার বার।
উত্তরমুছুনখুব সুন্দর।😍
খুব সুন্দর। 💐💐
উত্তরমুছুন