সুখ নীড় "
পারমিতা মন্ডল ।
"মা তোমার ব্যাগপত্র ঠিক ঠাক করে গুছিয়েছো তো ? তাড়াতাড়ি করো । বেশী দেরী করা যাবে না । সবাই অপেক্ষা করছে।" বলেই ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল অশোক ।মৈত্রী দেবীর একমাত্র সন্তান ।খুব বড় পোস্টে চাকরি করে । অনেক দিন হলো বাড়ি থেকে যাতায়াত করেছে । এবার প্রমোশন দিয়ে কলকাতায় পাঠিয়ে দিয়েছে । এখন এতদূর থেকে যাতায়াত করা অসুবিধা হচ্ছে । তাছাড়া এতদিন ওর বাবা বেঁচে ছিলেন ।তিনি মোটামুটি আমাদের অথাৎ বৌমা নাতি বাপনের দেখা শোনা করতেন । তাই খুব একটা অসুবিধা হতো না । কিন্তু আজ প্রায় এক বছর হলো উনি আর নেই । অনেক অসুবিধা হচ্ছিল খোকার ।তাই কলকাতায় ফ্ল্যাট কিনেছে । আজ তার গৃহপ্রবেশ।
মনে মনে ভাবে মৈত্রীদেবী । আজ ছেলের গৃহপ্রবেশ, আর আজ ই তাকে গৃহ ছাড়তে হবে । যেতে হবে বৃদ্ধাশ্রমে । একে কলকাতা তার উপর ফ্ল্যাট বাড়ি । সেখানে বাবা মায়ের জন্য জায়গা হয়না । মৈত্রীদেবী ভাবে , খোকাকে কি আর একবার বলবে , আর কিছু দিন না হয় ওদের সাথে থাকতাম ।অন্তত আজকের দিনটা । না ,থাক । নিজের কাছে নিজেকে আজ খুব ছোট লাগছে । ছেলেকে তিনি নিজেই ঠিক ঠাক মানুষ করতে পারেন নি । তাই আজ তার জায়গা হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে।
বয়স হয়ে গেছে তো ।সংসারের প্রয়োজন ও আজ ফুরিয়ে গেছে ।তাই আবর্জনার মতো দূরে ফেলে দিচ্ছে এরা । অথচ এই ছেলেকে মানুষ করতে গিয়ে চাকরি ছেড়েছে মৈত্রী দেবী । ওর বাবার ছিল ট্রান্সফারের চাকরি ।সব সময় বাইরে বাইরে থাকতে হতো।এদিকে ছেলে হওয়ার পর চাকরি করা খুব অসুবিধা হচ্ছিলো । ছেলেকে দেখার মতো কেউই ছিল না। আয়া মাসির কাছে রেখে যেতে হতো ।খোকার ঠিক মতো খাওয়া ঘুম হতোনা ।তাই একদিন চাকরি টাই ছেড়ে দেন মৈত্রী দেবী । তখন অনেকেই বারন করেছিল চাকরি ছাড়তে । ওর বাবাও বারন করেছিল । "বলেছিল ছেলে বড় হয়ে যাবে কিছু দিনের মধ্যে ।তখন তোমার একা লাগবে । না না মৈত্রী দেবীর কখনোই একা লাগে নি ।ছেলেকে লেখা পড়া শেখানোর জন্য সব সময় তার সাথে সাথে দৌড়েছেন । যখন যা প্রয়োজন মিটিয়েছেন।।তাইতো খোকা এতো ভালো রেজাল্ট করেছে । আর পড়াশোনা শেষ করে সাথে সাথেই চাকরিও পেয়ে গেছে ।
হঠাৎ বৌমার ডাকে চিন্তা সূত্র ছিড়ে গেল ।""মা আপনার ঘরে যে পালঙ্ক টা আছে ওটা খুলতে লোক এসেছে । এতো বড় খাট কি জানি ফ্ল্যাটে ঢুকবে কিনা ?" তাছাড়া সব জিনিস পত্র তো সরাতে হবে । আপনি সব গুছিয়ে নিয়েছেন তো ?"দেরী হয়ে গেলে ওদিকে আবার অসুবিধা হবে । একবার মনে হলো বৌমাকে বলতে যে আর কিছু দিন কি তোমাদের সাথে থাকতে পারতাম না ? আসলে এই বাড়িতে তো একদিন বৌ হয়ে এসেছিল মৈত্রী দেবী । তার শাশুড়ি তাকে বরণ করে ঘরে তুলেছিলেন ।মনে হয় এই তো সেদিনের কথা । এটা অনেক দিনের পুরনো বাড়ি । সেই খোকার ঠাকুরদার আমলের বাড়ি । খোকার বাবাও একমাত্র সন্তান ছিলেন । তাই শ্বশুর শাশুড়ি সবাই একসাথে থেকেছেন এই বাড়িতে ।কখনোই কোন অসুবিধা হয়নি ।যদিও বাড়িটা এখন অনেকটা ভেঙে গেছে । তাই খোকা প্রমোটারকে দিয়ে দিয়েছে ফ্ল্যাট করার জন্য । মৈত্রী দেবীর অনুমতি নিয়েই করেছে ।অনুমতি না দিয়েই বা কি করতেন ।
তবে মৈত্রী দেবী বৌমাকে খুব ভালো বাসতেন । তার চেয়েও বেশি ভালোবাসেন নাতিকে ।ওকে রেখে কিভাবে থাকবেন? একথা মনে করেই চোখের কোনে জল চলে এলো । না না কাঁদলে হবেনা।ছেলের অমঙ্গল হবে । যেতে যখন হবে ই তখন আর দেরী করে লাভ নেই । তাড়াতাড়ি গুছিয়ে নিতে লাগলেন সব । হঠাৎ একটা ছবিতে চোখ আটকে গেল । ওনার স্বামীর ছবি ।ছেলে মাঝখানে ।আর ওনারা দুজন দুদিকে । মনে হয় যেন এই তো সেদিনের কথা । এর মধ্যেই ছেলে বড় হয়ে গেল। ছেলের বিয়ে দিলেন। ছোট্ট নাতি তৃষিতের জন্ম হলো । কত ভালো বাসতেন মানুষ টা তার নাতিকে । হঠাৎ একদিন কি যে হলো ? বাজার থেকে এসে শরীর ভালো লাগেছে না বলে শুয়ে পড়লেন। আর উঠলন না । স্ট্রোক করে গেছিল । বাঁচানো গেল না । আর তার এক বছরের মধ্যেই তাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে। কিন্তু ওনার ছেলে ,বৌ , নাতি সবাই তো তাকে খুব ভালো বাসতো ।তিনি ও কখনোই বৌমার সাথে খারাপ ব্যাবহার করেন নি ।আজ সত্যিই তার প্রয়োজন ফুরিয়েছে ।
বৌমা নাতিকে নিয়ে চলে গেল । ফ্ল্যাটে পুজো হবে তো গোছগাছ করতে হবে । মৈত্রী দেবীকে তার খোকা পৌঁছে দেবে বৃদ্ধাশ্রমে ,তারপর ফ্ল্যাটে যাবে । ছোট একটা ব্যাগের মধ্যে এতো দিনের স্ংসারকে পুরে নিয়ে , চোখের জলে বিদায় জানালেন মৈত্রী দেবী শ্বশুর স্বামী র ভিটেকে।
। আর হয়তো কোনো দিন দেখা হবে না এই তুলষীতলা , বাড়ির পিছনে সেই আম, জামে কাঁঠাল গাছের সাথে । দেখা হবে না পাড়ার রায়দি ,সরকার দির সাথে । পোষা পাখি টাকে খাঁচা খুলে উড়িয়ে দিলেন মুক্ত আকাশে । সে জানেনা খোকা তাকে আর কোন দিন বাড়িতে আনবে কিনা ?
গাড়ি চলছে হু হু গতিতে । মৈত্রী দেবী মনে মনে ভাবে খোকাকে আর একবার বলিনা , ওদের সাথে এক কোনে আমাকে যদি একটু জায়গা দেয় । না, থাক ।ওদের সত্যিই হয়তো অসুবিধা হচ্ছে । চোখ দিয়ে দুফো়ঁটা জল গড়িয়ে পড়ল । হঠাৎ ছেলে তাকিয়ে দেখে মা কাঁদছে । ছেলে বলে "মা কেন কাঁদছো ? এখানে তুমি অনেক ভালো থাকবে । বাড়িটার সামনে একটা পার্ক আছে ।ওখানে তোমার মতো আরো অনেকে বিকেলে হাঁটতে আসে । এখানে তুমিও যাবে ।অনেক নতুন নতুন বন্ধু হবে । দেখবে খুব ভালো লাগবে ।" হয়তো তাই ।তবে মায়ের মন তো । তোদের ছেড়ে কখনোই কি ভালো থাকতে পারবো ? মনে মনে ভাবে মৈত্রী দেবী।
বিশাল বড় একটা বাড়ির সামনে গাড়িটা এসে দাঁড়ালো । এটাই তাহলে সেই বৃদ্ধাশ্রম। গাড়ির দরজা খুলে মাকে নামালেন অশোক বাবু । মা বললেন "বাবা আমাকে মাঝে মাঝে নিয়ে যাবি তো তোদের কাছে ।? তোদের ছেড়ে থাকতে আমার যে খুব কষ্ট হবে বাবা ।" "মা তুমি কিছু চিন্তা করোনা । তুমি ঠিক আমাদের কাছে থাকবে। "বলে ছেলে এগিয়ে গেল । দোতলায় যেতে হবে । হঠাৎ একটা নেমপ্লেটের দিকে মৈত্রী দেবীর চোখ আটকে গেল । লেখা আছে "মৈত্রী ভবন"। এতো তার ই নামে আশ্রমের নাম । কলিং বেল বাজাতে একজন মাঝবয়সী লোক বেরিয়ে এলো । তিনি গেট খুলে দিয়ে সরে দাঁড়ালেন । "এটাই তোমার ঘর মা "ছেলে বলল। কিন্তু ঘরটা তো অন্ধকার। কিছুই দেখা যাচ্ছে না । লাইট জ্বালা হোক । হঠাৎই লাইট জ্বলে উঠল। আর চারিদিক থেকে ফুল এসে পড়লো মৈত্রী দেবীর মাথায়। এরা কোথা থেকে এলো ? বৌমা , নাতি ? অবাক হয়ে যায় মৈত্রী দেবী ।
ছেলে কাছে এসে মায়ের হাতে একটা চাবির গোছা , আর একটা কাগজ হাতে দিয়ে বলে মা এ ফ্ল্যাট আজ থেকে তোমার । এই নাও বাড়ির চাবি আর দলিল । আমি তোমার এতোটা অকৃতজ্ঞ ছেলে নয় যে তোমাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে আমি আরামে থাকবো । মা বাবার ঋণ কখনোই শোধ করা যায় না ঠিক ই কিন্তু তাদের তো আমারা একটু ভালো রাখতে পারি ।"
মৈত্রী দেবী জড়িয়ে ধরে ছেলেকে । না আমার শিক্ষা বিফলে যায়নি । আমি তোর এই দলিল, চাবি কিছুই চাই না ।শুধু নাতিকে আর বৌমাকে নিয়ে একসাথে থাকতে চাই ।
(পৃথিবীর সব ছেলে যেন মৈত্রী দেবীর ছেলের মত হয় , এই প্রার্থনা করি।)
সমাপ্ত।
খুব ভালো লাগলো ।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ
মুছুনচমৎকার লিখেছ
উত্তরমুছুনধন্যবাদ
মুছুন