সোমবার, ২৩ নভেম্বর, ২০২০

আবার ফিরে এলে (বড়গল্প) (পিয়ালী চক্রবর্তী)

মনে পড়ে সেই ছাব্বিশ বছর আগের কথা? যেদিন শ্মশানে তোমার মৃতদেহ আগলে বসে, ক্লাস এইটে পড়া ছেলেটা বলেছিল তোমার কানে কানে, "ফিরে এসো তুমি আমার কাছে । তোমায় ছাড়া  আমি বাঁচতে পারবো না ।" সেদিন রাত্রে, সেই ছেলের স্বপ্নে এসে তুমি কথা দিয়েছিলে ফিরে আসবে । কেটে গেছে সুদীর্ঘ ছাব্বিশটা বছর ।


কথার দাম রেখেছো তুমি । ফিরে এসেছো আমার কাছে, নতুন ভাবে, নতুন সাজে, নতুন সম্পর্কের বাঁধনে । এ বাঁধন ছিন্ন হবার নয় । যুগ যুগ ধরে তুমি আমার, আমি তোমার । মনে মনে কথাগুলো বলতে বলতে প্রিয়ম হারিয়ে গেলো অতীতের কালচক্রে ।


উত্তর কলকাতার মুখার্জিবাড়ির বড়ো ছেলে প্রিয়ম । মা - বাবা - কাকা - জ্যাঠা - পিসি সবার চোখের মণি সে । খুব ডাকাবুকো, ডানপিটে ছেলে প্রিয় । সারাদিনে কিছু না কিছু দস্যিপনার নমুনা বাড়ি তথা পাড়া পড়শির লোকেরা টের পেয়েই থাকে । বাবা মাঝে মধ্যে বকা ঝকা করলেও , খুব একটা বেশি কিছু করতে পারেনা, তার কারণ হলো প্রিয়র সাধের ঠাকুমা এবং মুখার্জিবাড়ির সর্বময় কর্ত্রী প্রত্যূষা দেবী । দুধে আলতা গায়ের রঙ, ঢেউ খেলানো একরাশ চুল আর পরমা সুন্দরী প্রত্যুষা দেবীর স্বামী প্রিয়ময় বাবু ওনাকে "সুন্দরী" নাম দিয়েছিলেন । যত দুষ্টুমিই করুক না কেন প্রিয়কে কারুর কিচ্ছুটি বলার ক্ষমতা ছিলোনা । ছোটোবেলা থেকে প্রিয় ওনাকে "সুন্দরী" বলে ডাকে । 


প্রিয়র ঠাকুমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, ওনার মৃত স্বামী প্রিয়ময় বাবুই বড়ো নাতির রূপে জন্ম নিয়েছে ওনার সান্নিধ্য উপভোগ করবেন বলে । উনিই সাধ করে তাই ওর নাম রেখেছিলেন প্রিয়ম । বাকি নাতি নাত্নীদের মধ্যে প্রিয়ই ওনার প্রাণপ্রিয় এবং মনের কোণে এক বিশেষ স্থানের মালিক ।


ভালোবাসা, আদর, প্রশ্রয়ের সাথে সাথে প্রিয়র জন্য ওনার অসম্ভব টান ছিল । একে অপরের বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল ওরা দুজন । প্রিয়র স্কুল থেকে ফিরতে একটু দেরি হলেই প্রত্যূষাদেবী জানালার গ্রিল ধরে গেটের দিকে তাকিয়ে নীরবে চোখের জল ফেলতে ফেলতে ভাবতেন, "দস্যি ছেলে, কে জানে এখনও ফিরলো না কেন ! ভগবান ওকে সব বিপদ থেকে রক্ষা করো ।" গেট দিয়ে প্রিয়কে ঢুকতে দেখে তবে ওনার অশ্রুপাত বন্ধ হতো ।


সে ছেলেও ভালোবাসতো তার সুন্দরীকে সবচেয়ে বেশি । এমিনকি মা বাবার চেয়েও বেশি । স্কুল থেকে ফিরে, কোনোমতে নাকে মুখে গুঁজে, সোজা চলে যেত সুন্দরীর কাছে । দুজনে মিলে সে কতো গল্প, কত গান, কত হাসি ।


দিন যায়....দিন যায়....


প্রত্যূষাদেবী ছিলেন হৃদরোগী । প্রিয়র যখন ক্লাস এইট, প্রত্যূষাদেবী শয্যা নিলেন । সাংঘাতিক অসুস্থ হয়ে পড়লেন তিনি । প্রিয় যতক্ষণ বাড়ি থাকতো, ওর সুন্দরীর কাছেই বসে পড়তো, খেতো, গল্প করতো, আদর করতো, মাথায় গায়ে হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিত ।


ক্লাস এইটের হাফ ইয়ারলি পরীক্ষার রেজাল্ট সেদিন । প্রিয় স্কুল গেছে । এদিকে প্রত্যূষাদেবীর অবস্থা খুব গুরুতর হয়ে উঠেছে । ওনাকে নামী হাসপাতালের আই সি সি ইউ তে ভর্তি করা হয়েছে । প্রিয় স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে সেই খবর শুনে পাগলের মতো অবস্থা ওর । কাঁদতে কাঁদতে কিছু না খেয়ে সুন্দরীর ঘরে , সুন্দরীর বালিশ আঁকড়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে বেচারি ।


রাত্রের দিকে প্রত্যূষাদেবীর অবস্থা আরও সঙ্কটজনক হয়ে পড়লো । মাল্টিপল অর্গান ফেলিওর । প্রিয়র বাবা বাড়িতে এসে সেই খবরটা দিতে বাড়িতে সবাই ভেঙে পড়ল । 


প্রিয়র চোখে ঘুম নেই । সারাটা রাত বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলো সে । কষ্টে ওর বুকটা ফেটে যাচ্ছে, কেঁদে কেঁদে চোখের জল যেন শুকিয়ে গেছে । সেইভাবেই বারান্দায় দাঁড়িয়ে, বসে রাতটা কাটিয়ে দিলো ও ।


খুব সকালে প্রিয়র বাবা, কাকা, জ্যাঠারা সবাই হাসপাতালে পৌঁছে গেছেন । সকাল তখন দশটা । প্রিয় পাগলের মতো হয়ে গেছে । বাড়ির বাইরে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়ে আছে । এমন সময় ওর বড়ো জ্যাঠা ট্যাক্সি থেকে নামলো । প্রিয় দৌড়ে গেল ওনার কাছে, "কি গো, কেমন আছে সুন্দরী?" বড়ো জ্যাঠা মাথা নেড়ে জানালেন, "সকাল নয়টা বেজে পাঁচ মিনিটে মারা গেছে ।" রাস্তার মধ্যেই কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়লো প্রিয় । 


হসপিটাল থেকে ডেডবডি বাড়িতে এসে পৌঁছতে দুপুর হয়ে গেলো । রাজরাণীর মতো করে সাজানো হয়েছিল প্রত্যূষাদেবী কে । মেজো জ্যাঠার দেওয়া কাঞ্চিপুরম শাড়িটা সেই বছর পুজোয় প্রিয় নিজে পছন্দ করেছে ওর সুন্দরীর জন্যে । শ্মশানে নিয়ে যাবার সময় প্রিয় নাছোড়বান্দা, ও যাবেই সাথে । বাধ্য হয়ে ওকেও সাথে করে নিয়ে গেলেন ওর বাবা । 


মৃত প্রত্যূষাদেবীর পাশে বসে তাকে সারাক্ষণ আগলে রেখেছে ও । কত কথা বলছে মনে মনে । মাথায় হাত বুলিয়ে চুমু খেয়ে আদর করছে প্রাণ ভরে ওর সুন্দরীকে । 


শবদাহের আগে প্রিয় ওনার কানে কানে বলে দিল,  "ফিরে এসো তুমি আমার কাছে । তোমায় ছাড়া আমি বাঁচতে পারবো না ।" 


তারপরে কেটে গেছে সুদীর্ঘ ছাব্বিশ বছর । প্রিয় এখনও অবিবাহিত । পৈতৃক ব্যবসার দেখাশোনা করে । মোটামুটি স্বচ্ছল অবস্থাপন্ন । একবার ওর এক বন্ধুর ছেলের স্কুলের বাৎসরিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখতে গেছে বন্ধু ও তার পরিবারের সাথে । 

প্রোগ্রাম শুরু হলো । সঞ্চালিকা স্টেজে উঠলেন । প্রথমের দিকের সারিতে বসায় সঞ্চালিকা কে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো । পার্পল রঙের শাড়ি আর ম্যাচিং ব্লাউসের সাথে বাদামী রঙের খোলা চুল, রূপ লাবণ্য যেনো ফেটে পড়ছে । মেদবিহীন তন্বী দেহ ।  দেখলে যেকোন ছেলে রূপের আগুনে পুড়ে যাবে এমন সৌন্দর্য্য । বয়স আন্দাজ একুশ কি বাইশ । 


নিজের নাম বললেন মাইকে, রূপলেখা চ্যাটার্জী । প্রিয়র মনে হলো যেনো কতদিনের চেনা একজন । যেনো এনার সাথে আগেও দেখা হয়েছে । বিস্ময়মাখা দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো রূপলেখার দিকে । 


ফাংশনের শেষে স্টেজের থেকে যখন নেমে আসলেন সঞ্চালিকা, প্রিয় উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে গেলো তাঁর দিকে । ওর বন্ধু আর বন্ধুর স্ত্রী প্রিয়র অমন ব্যবহারে হকচকিয়ে গেল । 


স্টেজ থেকে নেমে রূপলেখা যত এগিয়ে আসছেন ধীরে ধীরে, প্রিয়র হৃদপিন্ডের ধুকপুকানি বেড়ে বেড়ে যেনো আকাশ ছুঁই ছুঁই । সামনাসামনি আসতে প্রিয়ই এগিয়ে গিয়ে প্রথম কথা বললো, "আপনার সঞ্চালনা দারুণ লেগেছে । কিছু মনে করবেন না, আমি কি আপনাকে আগে কোথাও দেখেছি!"


রূপলেখার চোখেও যেনো অপার বিস্ময় । প্রিয় কি জিজ্ঞাসা করছে কিছুই যেনো তার মাথায় ঢুকছে না । একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ওর দিকে । প্রিয় ওর মুখের সামনে হাত নেড়ে জিজ্ঞাসা করলো আবার, "আগে কি আমাদের দেখা হয়েছে কোথাও!" 


প্রিয়র কথায় সম্বিৎ ফিরে পেয়ে রূপলেখা বলে উঠলেন,"ঠিক বলেছেন, খুব চেনা চেনা লাগছে আপনাকে । আমাদের কোথাও দেখা হয়েছে বলে তো মনে করতে পারছিনা । 


প্রিয় : কি অদ্ভুত না ! আমাদের একে অপরকে এত চেনা লাগলো । আমরা কি বন্ধু হতে পারি? 


রূপলেখা : অবশ্যই, কেনো নয় । এই আমার কার্ড । ফ্রি টাইমে ফোন করবেন । 


প্রিয় এতটা আশা করেনি । এ তো মেঘ না চাইতেই জল । আনন্দে উত্তেজনায় ওর মনটা নেচে উঠলো ।


বাড়ি ফেরার পথেও কেমন যেনো ঘোরলাগা অবস্হায় প্রিয় । রূপলেখার মুখটা বার বার তার মানসপটে ভেসে উঠছে । কিছুতেই সে যেনো শান্তি পাচ্ছে না । 


ওদিকে অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফেরার পথে রূপলেখার অবস্থাও একই । একজন অচেনা - অজানা, মধ্য বয়স্ক পুরুষের প্রতি এত আকর্ষণ জাগছে কেনো তা সে নিজেও বুঝতে পারছে না । মনে মনে সে বলছে, "নিজের কার্ড তো দিলাম ঠিকই, ওনার নম্বর টা তো নেওয়া হলো না । এমনকি নাম টাও জিজ্ঞাসা করা হলো না । বড়ো ভুল হয়ে গেল । উনি যদি ফোন না করেন!!!" হতাশাগ্রস্ত হয়ে চিন্তায় পড়ে গেল রূপলেখা ।


বাড়ি ফিরে প্রিয় কোনোমতে ব্যাগ রেখেই ছাদে চলে গেলো । আর পকেট থেকে রূপলেখার কার্ড টা বের করে নম্বর ডায়াল করলো । কলার টিউন বাজছে, "আমার ভিতর বাহিরে, অন্তরে অন্তরে, আছো তুমি, হৃদয় জুড়ে" .।

কিছুক্ষণ গান বাজার পরে ওদিক থেকে হ্যালো শুনে যেনো বুকের রক্ত চলকে উঠলো প্রিয়র । প্রত্যুত্তরে, "হ্যালো, আপনার সাথে স্কুলের প্রোগ্রামে দেখা হয়েছিল । আমি প্রিয়ম মুখার্জি । প্রিয়র গলার আওয়াজ শুনে রূপলেখা যেনো হারিয়ে গেলো, কি বলবে বুঝে উঠতে পারছে না । প্রিয় আবার বলে উঠল, "হ্যালো ম্যাডাম, শুনছেন! আমি প্রিয়ম বলছি ।" রূপলেখা সম্বিৎ ফিরে পেয়ে, "হ্যাঁ, বলুন, কেমন আছেন?"


প্রিয় : সত্যি কথা বলতে কি, ভালোই ছিলাম এতদিন, কিন্তু আপনাকে যখন থেকে দেখেছি, আমি যেনো কোথায় হারিয়ে গেছি । কিছু মনে করবেন না যেনো, আপনাকে দেখে আমার খুব আপন মনে হয় । যেন মনে হয় খুব কাছ থেকে দেখেছি, যেনো ওই চোখ - মুখ - চুল - রঙ সব আমার চেনা । 


রূপলেখা : এ কিভাবে সম্ভব বলুন তো! আমারও আপনাকে দেখে মনে হয়েছে যেন কত কাছ থেকে দেখেছি । যেনো মনে হয় কতবার স্পর্শ করেছি ওই মুখ - কপাল - চুল - শরীর । কিন্তু এ কিভাবে সম্ভব? আগে কোনোদিন আমাদের দেখা বা কথা হয়নি । তাও আপনাকে কেনো এতো আপন মনে হচ্ছে !


প্রিয় : আমরা কি একবার দেখা করতে পারি? আপনাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে কাছ থেকে । আমাকে ভুল বুঝবেন না । আমার কোনো অসৎ উদ্দেশ্য নেই । 


রূপলেখা : আপনার যে কোনো অসৎ উদ্দেশ্য নেই, তা আমি জানি । আমিও চাই একবার আপনার সাথে দেখা করতে, কথা বলতে । আপনার সংসার আছে কি নেই তা আমি জানি না । কিন্তু, বিশ্বাস করুন, আমি এই টান উপেক্ষা করে থাকতে পারছিনা । 


কেমন একটা ঘোরলাগা গলায় প্রিয় বললো, "যদি কিছু মনে না করেন, আমি কি আপনাকে "সুন্দরী" বলে ডাকতে পারি?"


রূপলেখা : আমি যে আপনার কোনো কথাতেই কিছু মনে করবো না । আপনি যা ইচ্ছে বলে ডাকবেন আমায় । আর বাকি সবাই আমাকে রূপা বলে ডাকে । আপনিই একমাত্র, যে আমাকে সুন্দরী নামটা দিলেন । খুব পছন্দ হয়েছে আমার এই নাম । যদি কিছু মনে না করেন, আমি কি আপনাকে গোলু বলে ডাকতে পারি? 


প্রিয়ম এক লহমায় পৌঁছে গেলো ছোটবেলার দিনগুলোতে । সুন্দরী ওকে গোলু বলে ডাকতো । সেই ভালোবাসা - স্নেহভরা দিনগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠলো । 


প্রিয় বললো, " আপনি কিকরে জানলেন বলুন তো আমার একটা নাম গোলু । আমার ঠাকুমা, যাকে আমি সুন্দরী বলে ডাকতাম, তিনি আমাকে ওই নামে ডাকতেন । উনি সব নাতি নাত্নীদের মধ্যে আমাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন । উনি মনে করতেন আমি ওনার মৃত স্বামী এসে জন্মেছি আবার ওনার সান্নিধ্য লাভের আশায় । 

রূপ : জানিনা, আপনাকে কেন যেন শুধু ওই নামেই ডাকতে ইচ্ছে করলো । আমরা কি আগামীকাল বিকেলে দেখা করতে পারি?


প্রিয় : আমি অপেক্ষা করবো আপনার জন্য, সারাজীবন যেমন করে আসছি । 

কথাটা বলে প্রিয় নিজেই চমকে উঠল । রূপের সাথে সবেমাত্র আজকেই দেখা হলো । তবে ওর জন্য সারাজীবন কিভাবে অপেক্ষা করে আসছে? মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করতে লাগলো প্রিয়র ।


রূপ প্রিয়র কথা  শুনে বললো, "বলেছিলেন তো আবার ফিরে আসতে, আমাকে ছাড়া আপনি বাঁচতে পারবেন না । আমার জন্যই তো এতদিন পথ চেয়ে বসেছিলেন ।" 

কথাগুলো যেন আপনা আপনি রূপের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো । নিজেই চমকে উঠলো ও । 


রূপের কথা শুনে প্রিয়র যেন পায়ের নিচে মাটি কেঁপে উঠলো । কান দিয়ে আগুনের ভাপ বেরোচ্ছে, চোখ মুখ লাল  হয়ে গেছে । মনে হচ্ছে যেন মাটিতে পড়ে যাবে । কথাগুলো ও বলেছিল ওর সুন্দরীকে, শ্মশানে বসে তার কানে কানে । এই কথাগুলো একটা অচেনা অজানা মেয়ে জানলো কিভাবে? হে ভগবান! এও কি সম্ভব!! তোমার লীলা শুধু তুমিই জানো । তাকে ফিরিয়ে দিলে তুমি আমার কাছে, যাকে ছাড়া একটা দিনও আমার শান্তিতে ঘুম হতো না । যার জন্য সদা সর্বদা মনের গভীরে রক্তক্ষরণ হতো, তাকে তুমি ফিরিয়ে দিলে আমার কাছে । সেই জন্যই প্রথম দেখাতেই ওকে আমার এত আপন বলে মনে হয়েছে!!! প্রিয়র চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় আনন্দাশ্রু বেয়ে পড়ে ওর গাল গলা বুক ভিজিয়ে দিতে লাগলো ।


রূপ নিজের বলা কথাগুলো নিজেই বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না । কেনই বা প্রিয়কে ওর এত চেনা লাগছে, কেনই বা প্রিয় ওর অপেক্ষায় বসে আছে , কেনই বা ওকে কাছে পাবার, স্পর্শ সুখ লাভ করার ইচ্ছা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছে । কেন যে মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে চলে যায় ওর গোলু সোনার কাছে । অপেক্ষা আর যেন সইতে পারছে না সে ।


প্রিয় মনে মনে বুঝে গেছে কে ফিরে এসেছে ওর জীবনে । এখন শুধু তাকে নিজের জীবনের সাথে সারাজীবনের মতো জড়িয়ে নেবার অপেক্ষা । পরমুহূর্তেই প্রিয়র মনে পড়ে তার বয়স রূপলেখার চেয়ে অনেক বেশি । সব কেমন মাথার মধ্যে তালগোল পাকিয়ে যায় । তবুও, দেখা ওর সাথে করতেই হবে । ওকে ছাড়া থাকা আর সম্ভব নয় । ওকে বুঝিয়ে দিতে হবে কে ও? কেনই বা ফিরে এলো ওর কাছে আবার ।


ফোনটা রেখে ধীরপায়ে নীচে নেমে এলো সে । সুন্দরীর ঘরটা এখন ওরই স্টাডি রুম । আলমারিটা ঠিক আগের জায়গাতেই আছে । ধীরে ধীরে আলমারিটা খুলে বের করে আনলো একজোড়া কানবালা । যত্ন করে রেখে দেওয়া প্রত্যূষাদেবীর শেষ স্মৃতি । প্রিয় ভাবতে লাগলো, "কালকে দেখা করতে যাবো যখন ওর জিনিস ওকেই দিয়ে আসবো ।" আর সাথে নিয়ে নিল সুন্দরীর একটা ছবি । 


ওদিকে রূপ ব্যাকুল হয়ে আছে ওর গোলু কে কাছে পাবার জন্য । সবেমাত্র একদিনের আলাপ, কিন্তু যেন জন্মের পরিচয় । বিনিদ্র রাত কাটলো রূপের । বেশ বেলা করে ঘুম ভাঙলো । ঘুম ভেঙে ফোনটা হাতে নিয়েই প্রিয়কে মেসেজ করলো, "গুড মর্নিং গোলু সোনা । আজকে আমার গোলু সোনাকে দেখবো বিকেলে । সময় যেন কাটতেই চাইছেনা । মিস ইউ সো মাচ ।"


ওদিকে সারারাত বিছানায় শুয়ে ছটফট করতে লাগলো প্রিয়ম । ঘুম নেই চোখে । কেবলই মানসপটে ভেসে উঠছে ওই সুন্দর মুখটা ।  পরেরদিন রবিবার । সারারাত না ঘুমোনোর ফলে, ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়ে, প্রিয় ঘুম থেকে উঠলো অনেক বেলায় । প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজে । কাজের মেয়েটা চা দিয়ে যাবার সময় জিজ্ঞাসা করে গেল আজকের রান্না কি হবে । প্রিয় যেন সব কিছুতেই নির্লিপ্ত । ও শুধু অপেক্ষা করছে বিকেলের । 


রূপের মেসেজ পেয়ে প্রিয় আরো অস্থির হয়ে পড়লো । রিপ্লাই করলো, "রূপ, তোমার রূপের আগুনে পুড়েছি সারারাত । আজকে ভালোবাসার স্পর্শে শান্ত করতে চাই মন । মিস ইউ টু ।"


একে অপরের মেসেজ দেখে আনন্দে উত্তেজনায় আত্মহারা । দুজনেরই অপেক্ষা বিকেলের ।


যথাসময়ে বেরিয়ে গেলো যে যার বাড়ি থেকে একে অপরের সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে । গন্তব্যস্থল হলো মিলেনিয়াম পার্ক । মনোরম পরিবেশে গঙ্গার ধারে সুন্দর একটি পার্ক, বিশেষত প্রেমিক যুগলের স্বর্গ বলা যায় একে ।


প্রিয় কিছুক্ষণ আগেই পৌঁছে দাঁড়িয়ে আছে পার্কের গেটের সামনে । ব্লু জিন্সের শার্ট আর ব্ল্যাক প্যান্টে বেশ হ্যান্ডসাম লাগছে দেখতে ওকে । দূর থেকে দেখলো এগিয়ে আসছে রূপ । সি - গ্রীন রঙের কুর্তির সাথে ক্রিম রঙের লেগিংস । খোলা চুল ও হালকা প্রসাধনীতে অপরূপ সুন্দরী মেয়ে । 


সামনে আসতেই প্রিয় আর নিজেকে সামলাতে পারল না । রূপের হাত ধরে টেনে নিল ওর বুকের কাছে । রূপও নিজেকে আটকাবার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে ঝাঁপিয়ে পড়লো প্রিয়র বুকে । রাস্তায় লোকজন ফিরে ফিরে তাকাচ্ছে । প্রিয় বলে উঠলো, "চলো, ভেতরে গিয়ে বসি ।" রূপের কোমরটা জড়িয়ে ধরে নিয়ে প্রিয় গেল পার্কের ভেতরে ।


একটা নিরিবিলি জায়গা বেছে নিয়ে দুজনে ঘনসন্নিবিষ্ট  হয়ে বসলো । রূপ প্রিয়র চোখের দিকে যেনো তাকাতে পারছে না । আর প্রিয় অপলক তাকিয়ে আছে রূপের দিকে । 


স্তব্ধতা ভেঙে প্রিয় বলল, "এত লজ্জা পেলে তোমার গোলু কে দেখবে কি করে?" 


রূপ : জানিনা, আমি মুখ তুলে তাকাতেই পারছিনা । 


প্রিয় : আমাকে লজ্জা পাচ্ছ? আমি কে তোমার বলো তো? কোন টানে ছুটে এসেছো আমার কাছে? কোন মোহে নিজেকে আমার বুকে সপেঁ দিয়ে সুখ খুঁজে নিয়েছো? বলো তো কে আমি? 


রূপ এই প্রথমবার গভীর দৃষ্টিতে তাকালো প্রিয়র দিকে । হাত দিয়ে স্পর্শ করলো ওর কপাল, মুখ, গাল, ঠোঁট । দুজনের কাছেই কত দিনের যেন চেনা সেই স্পর্শ । একে অপরের মধ্যে ডুবে যেতে লাগলো, হারিয়ে গেলো একে অপরের চোখের গভীরে ।


রূপের নরম ঠোঁট স্পর্শ করলো প্রিয়র রুক্ষ ঠোঁটকে । ওষ্ঠ সুধা পানে নিমগ্ন হয়ে পড়লো দুজন । একে অপরের মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে আবেশে ডুবে গেলো তারা । প্রিয়র হাত স্পর্শ করতে লাগলো রূপের গলা, পেট, কোমর, স্তন । প্রবল আশ্লেষে জড়িয়ে ধরলো একে অপরকে । এই ভাবে কতক্ষণ বসে রইলো দুজনে, সময়ের কোনো হিসাব নেই ।


সন্ধ্যে নেমে এলো গঙ্গাবক্ষে । এবারে ঘরে ফেরার পালা । যাবার আগে পকেট থেকে একটা ছবি বের করে রূপের সামনে মেলে ধরলো প্রিয় । রূপ দেখে, ঠিক যেনো অবিকল তার মতই দেখতে, কিন্তু অনেক পুরনো, অনেক বছর আগের কারোর ছবি এটা । দু - কানে রয়েছে দুটো কানবালা । সেগুলোও খুব চেনা লাগছে । 


এবারে প্রিয় ওর পকেট থেকে একজোড়া কানবালা বের করে রূপের সামনে ধরলো । রূপের মাথাটা কেমন গুলিয়ে উঠলো । বহুদিনের পুরনো একটা চিত্র ভেসে উঠলো ওর চোখের সামনে । কোনো একজন রাশভারী লোক, তার  স্ত্রীর পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে, ঝুঁকে পড়ে ওর স্ত্রীর দিকে বাড়িয়ে দিলো একজোড়া কানবালা । বিস্ময়মাখা আনন্দে ওনার স্ত্রী মুখ ঘুরিয়ে তাকাতেই রূপ দেখলো, এ যেনো অবিকল নিজের প্রতিচ্ছবি । আর এই রাশভারী লোকের সাথে প্রিয়র চেহারা, মুখ, চোখের অনেক মিল । সব মনে পড়তে লাগলো রূপের । সব যেনো দিনের আলোর মত পরিস্কার হতে লাগলো । মনে পড়তে লাগলো যে, সে উত্তর কলকাতার মুখার্জী বাড়ির কর্ত্রী প্রত্যুষা মুখার্জী । কম


বয়সে বিধবা হয়েছিলেন । তার কয়েকবছর পরেই তার নাতি জন্মালো হুবহু তার স্বামীর শারীরিক চিহ্নগুলি নিয়ে । স্বামীর নাম ছিল প্রিয়ময় । সেই অনুসারে নাতির নাম রাখলেন প্রিয়ম । বেঁচে থাকতে বুকের পাঁজর ছিল নাতি । মরার পরেও তার কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল যে, ফিরে আসবেই তার কাছে । 


আজ এত বছর পরে সে সত্যিই ফিরে এলো । তার গোলুর কাছে । অন্য রূপে, অন্য ভাবে, অন্য সাজে । ঠিক যেমনটা প্রিয়ময় বাবুকে দেখে  মনে অনুভূতি জাগতো প্রেমের, ঠিক তেমন অনুভূতি জাগছে প্রিয়মকে দেখে । 


রূপের চোখ মুখের ভাব ভঙ্গী দেখে প্রিয় বুঝতে পারলো যে,  সব মনে পড়েছে রূপের । কানবালা জোড়া রূপের হাতে দিতে গেলে, রূপ বললো, "এভাবে নয়, ঠিক যেমন আগেও দিয়েছিলে, তেমন করেই দাও ।" প্রিয় যেন ধ্বন্দে পড়ে গেলো । মাথায় যেন হাজার ভোল্টের শক লাগলো তার । শরীর কেমন খারাপ করতে লাগলো । কতো বছরের বিবর্ণ স্মৃতির মতো চিত্র ভেসে উঠলো মানসপটে । রাশভারী একটি লোক তার গিন্নির জন্য এনেছে একজোড়া কানবালা । কিন্তু যেহেতু খুব গম্ভীর এবং নিজের স্বভাববিরুদ্ধ কাজ করে গিন্নির জন্য উপহার এনেছেন, তাই লজ্জায় দিতে পারছেন না সামনে গিয়ে । সারাদিন পাঞ্জাবির পকেটে নিয়ে নিয়ে ঘুরছেন সুযোগের অপেক্ষায় । একসময় গিন্নি বিকেলে খাটের ওপরে বসে প্রসাধনে ব্যস্ত । সেই গম্ভীর মানুষটি ধীরপায়ে গিয়ে দাঁড়ালেন তার প্রাণাধিক প্রিয় স্ত্রীর পেছনে । কাঁপা কাঁপা হাতে বাড়িয়ে দিলেন উপহারটি । মনে সংশয় ও প্রত্যাশা, গিন্নির ভালো লাগবে সেই আশা । প্রথমবার উপহার  পেয়ে গিন্নি তো যারপরনাই খুশি । খাট থেকে নেমে, স্বামীর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বললেন, "খুব পছন্দ হয়েছে ।" রাশভারী লোকটির চোখে জল, স্ত্রীকে বুকে টেনে নিলেন । 

এবারে প্রিয়রও মনে পড়ে গেলো সব কথা । ধীরপায়ে উঠে রূপের পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো । পিছন থেকে রূপের দিকে বাড়িয়ে দিলো কানবালা জোড়া । জড়িয়ে ধরলো প্রিয়ময় ও প্রত্যুষা একে অপরকে ।


যুগ যুগান্ত পরে, 

মিললো প্রাণ সখা,

দীর্ঘ সময় পার করে পেলো, 

একে অপরের দেখা ।


সময় যেনো থমকে গেছে,

ত্রিশটি বছর পিছে,

দুঃখ - ব্যথা - ক্লান্তি - গ্লানি,

সবই আজ হলো মিছে ।


ভগবানের দরবারে করজোড়ে করা,

প্রার্থনা না যায় বৃথা ।

লীলাখেলা তার হায় বোঝা ভার,

তিনি সবের সমাদৃতা ।

Copyright © All Rights Reserved

Piyali Chakravorty


৪২টি মন্তব্য:

  1. অসাধারণ হয়েছে। শুরু করে না শেষ করে থামতেই পারলাম না। দারুন।

    উত্তরমুছুন
  2. খুব সুন্দর লিখেছো। পড়ে খুব ভালো লাগলো।

    উত্তরমুছুন
  3. খুব সুন্দর লিখেছো। পড়ে খুব ভালো লাগলো।

    উত্তরমুছুন
  4. ভালোবাসার যেন এক শক্তির ন্যায়..এর সৃষ্টিও নেই বিনাশ ও নেই.. এ শুধুই দুই আত্মার ,আত্মিক মিলন...বার বার এই নশ্বর দেহের বদল ঘটলেও অবিনশ্বর আত্মার মৃত্যু ঘটে না...তাই ভালোবাসা কেবল রূপান্তরিত হয়ে নব রূপে নব ভাবে পূর্ণতা লাভ করে...
    প্রিয়ময়-প্রত্যুষা দেবীর নশ্বর দেহের বিনাশ ঘটে নবরূপে গোলু-সুন্দরীর ভালোবাসা পূর্ণতা পেলো,ফিরে পেলো দুজন দুজনকে ,দুই মন মিলেমিশে সারাজীবনের জন্য এক হয়ে থাকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলো,নিজেদের মতো করে নিজেরা নিজেদেরকে ভালোবাসলো... দুটি ব্যাকুল চিত্ত প্রেমের পরশ পেয়ে শীতল হলো ...
    ভালোবাসার প্রত্যাবর্তনের অসম্ভব সুন্দর একটি গল্প উপহার দিলে ...সব ভালোবাসা এভাবেই বেঁচে থাকুক জন্মজন্মান্তর ধরে...গল্পের ন্যায় ,বাস্তবেও সব ভালোবাসাই যেন এভাবেই ভালোবাসার মানুষদের চিনে নিয়ে এক হতে পারে,একে অপরকে জড়িয়ে থাকতে পারে এই কামনা করি...

    উত্তরমুছুন
  5. মন ছুঁয়ে গেল। সত্যিই অপূর্ব সৃষ্টি 🙏🏻👌🏻♥

    উত্তরমুছুন
  6. খুব সুন্দর। অসাধারণ বললেও কম বলা হয়। শুরু থেকে শেষ এক নিঃশ্বাসে শেষ করলাম।

    একটু খটকা থেকে গেল। প্রিয়মের সুন্দরী যখন মারা গিয়েছিলেন, তখন প্রিয়মের ক্লাশ এইটের ফাইনাল বছর। যদি পুনর্জন্ম হয়ে থাকে তবে রূপরেখার সঙ্গে বয়সের পার্থক্যটা অনেকটাই বেশী হবে।


    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. হ্যাঁ, রূপলেখার সাথে বয়সের তফাৎ অনেক তো । সেটার জন্যেই তো একটা সময়ে প্রিয় দোনা মোনা করছিল । কিন্তু বিধির বিধান খণ্ডাবে এমন সাধ্য কারো নেই ।অনেক ধন্যবাদ বন্ধু । পাশে থেকো ।

      মুছুন
  7. বিষয়কে ছুঁয়ে নিয়তির হাত ধরে ঘটনা দৌড়ে গেছে, সঙ্গে আমিও।

    উত্তরমুছুন
  8. অতীত-বর্তমানের বাঁধনে মিষ্টি প্রেমের গল্প, খুব ভালো লাগলো।

    উত্তরমুছুন
  9. খুব সুন্দর একটা প্রেমের গল্প ❤️❤️

    উত্তরমুছুন
  10. গল্পের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিলাম। অসম্ভব ভালবাসায় ভালো লাগলো।

    উত্তরমুছুন
  11. জন্মজন্মান্তরের চিরাচরিত বন্ধনের এক কাহিনী...অপূর্ব...💙💙💙

    উত্তরমুছুন
  12. অসাধারণ, অনেক ভালবাসা রইল।

    উত্তরমুছুন

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...